পুলিশ প্রশাসন


পুলিশ প্রশাসন  অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার্থে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। সাধারণ প্রশাসনের সঙ্গে সমান্তরালে চলে এ প্রশাসন। পুলিশী ব্যবস্থার অস্তিত্ব যে প্রাচীনকালেও ছিল, তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে। দ্বাদশ শতক থেকে বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশে সুলতানি শাসনামলে পুলিশী ব্যবস্থার কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও মুগল আমলেই এ ব্যবস্থা নতুন আঙ্গিকে ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়। মুগল আমলে ব্রিটিশ শাসনের আদলে পেশাদার পুলিশ বাহিনী না থাকলেও দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ পুলিশী ব্যবস্থাপনা ছিল।

কোম্পানি আমল থেকেই পুলিশ ব্যবস্থায় সার্বিক প্রশাসনিক রূপরেখা প্রণয়ন শুরু হয়। ঐ সময়ে পুলিশ প্রশাসনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে এক অভাবনীয় পরিকল্পনা ছিল ১৭৮২ সালের পুলিশ সংস্কার। মূলত ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় থানাদারি ব্যবস্থার অসারতা প্রমাণ হওয়ায় ১৮৬১ সালে গঠিত পুলিশ কমিশন ১৮৬০ সালের পুলিশ রিপোর্টের ভিত্তিতে পুলিশ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে সাড়া দেশে নিখুঁত ও অভিন্ন ভিত্তিতে স্থাপন করার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে বাংলাসহ ভারতের কয়েকটি প্রদেশে আইরিশ কনস্টেবল পদ্ধতির পুলিশ ব্যবস্থা প্রচলিত হয়। আর এ নতুন ব্যবস্থায় পুশিল বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও দক্ষ করে তোলার জন্য কিছু নতুন পদক্ষেপ গৃহীত হয়। এ সময় সমগ্র পুলিশ বাহিনীকে একক বাহিনীরূপে স্থানীয় সরকারের অধীনে সুবিন্যস্ত করা হয় এবং সকল জেলাব্যাপী পুলিশ প্রশাসন বিস্তৃত হয়। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো: প্রদেশব্যাপী বিস্তৃত পুলিশ তত্ত্বাবধানে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ পদ সৃষ্টি এবং জেলাগুলোতে ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ-এর অধীনে পুলিশ সুপার কর্তৃক পুলিশ প্রশাসন পরিচালনা।  বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সহ পাক-ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ উদ্ভাবিত আইরিশ কনস্টবল পুলিশ পদ্ধতিই চালু রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হলেন ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ (আইজিপি)। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে তিনি দেশের সকল পুলিশ বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করেন। তাকে পুলিশ সদর দপ্তরে সহযোগিতা করেন কয়েকজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা। সিভিল প্রশাসনিক ইউনিটের প্রত্যেক রেঞ্জে একজন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল নিয়োগ প্রাপ্ত হন। তিনি তার রেঞ্জের অধীনস্থ জেলার পুলিশ প্রশাসন খবরদারি করেন। বাংলাদেশে ছয়টি সিভিল রেঞ্জ ও একটি রেলওয়ে রেঞ্জ রয়েছে। প্রতিটি রেঞ্জে রয়েছেন একজন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল। এছাড়া বিভাগীয় মহানগর পুলিশ কমিশনার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইডি) প্রশাসনিক প্রধান, স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) প্রধান এবং সারদা একাডেমীর প্রধানের পদবী অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ।

জেলা পর্যায়ে সকল পুলিশের প্রশাসন পরিচালক হলেন জেলা পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট। জেলা পুলিশ সুপারকে প্রশাসনিক কার্যে সহযোগিতা করেন একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং আরও ক’জন সহকারি পুলিশ সুপার আর তার দাপ্তরিক স্টাফ। সার্কেলের প্রশাসন পরিচালনা করেন একজন সহকারি পুলিশ সুপার। সার্কেলের অধীনস্থ প্রতিটি থানায় পুলিশ প্রশাসন পরিচালনা করেন একজন ইন্সপেক্টর বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ও.সি)। জেলা পুলিশ সুপারের অধীনে জেলা সদরে কিছুসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ স্পেশাল আর্মড ফোর্স রিজার্ভ থাকে। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে জরুরী ভিত্তিতে এ ফোর্স মোতায়েন করা হয়। সিআইডি ও এসবি পুলিশ কেন্দ্রীয় দপ্তর ছাড়া জেলা পুলিশের সমান্তরাল মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারিত রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে রেঞ্জের অধীনস্থ দুটি রেলওয়ে জেলায় রেলওয়ে পুলিশের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন দুজন পুলিশ সুপার। পুলিশ সুপারকে প্রশাসনিক কার্যে সহযোগিতা করেন একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক সহকারি পুলিশ সুপার। রেলওয়ে স্পেশাল আর্মড ফোর্স নামে কিছুসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ তার অধীনে ন্যস্ত থাকে। প্রয়োজনে তিনি তাদের ব্যবহার করেন।

১৮৬৯ সালের পুলিশ আইন মোতাবেক পুলিশ বিভাগে পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠনের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামরিক অফিসারদের নিয়োগ করা হত। পুলিশ বাহিনী পুনর্বিন্যাসের প্রাথমিক দিকে এসব অফিসারই পুলিশদের প্রশিক্ষণ প্রদান ও শৃঙ্খলা সম্পর্কে জ্ঞানদান করতেন। তবে এহেন প্রশিক্ষণ এমন অপর্যাপ্ত ছিল যে ১৮৬৯ সালের সংস্কার পুলিশ বাহিনীর জন্য কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনতে পারে নি। এর ফলে জনমনে পুলিশ বাহিনীর প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। এ অবস্থার নিরসনের লক্ষ্যে লর্ড কার্জন ১৯০২ সালে একটি পুলিশ কমিশন গঠন করেন। কমিশনের অন্যান্য অনেক সুপারিশের মধ্যে নব-নিযুক্ত পুলিশ অফিসারদের জন্য ট্রেনিং কলেজ ও পুলিশ কর্মচারীদের জন্য ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠার কথাও ছিল। কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে একই বছর ভারতের মাউন্ট আবু-তে পুলিশ অফিসারদের জন্য একটি ট্রেনিং কলেজ চালু হয়। এই কলেজে ভারতীয় পুলিশ অফিসার (ক্যাডারভুক্ত ডিএসপি) এবং ইন্ডিয়ান পুলিশ ক্যাডারভুক্ত ব্রিটিশ অফিসার একত্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করত। ১৯০৩ সালে রাজশাহীর রামপুর বোয়ালিয়ায় একটি এবং ঢাকার মিল ব্যারাকে অপর একটি পুলিশ ট্রেনিং স্কুল স্থাপিত হয়। এ দুটো স্কুলে ১৯১২ সাল পর্যন্ত বাঙালি ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর ও কনস্টবলদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। ১৯১২ সালে সারদা পুলিশ ট্রেনিং কলেজ স্থাপিত হলে এখানে এএসপি ক্যাডার, ডিএসপি ক্যাডার, সাব-ইন্সপেক্টর ক্যাডেট এবং কনস্টবলদেরও ট্রেনিং প্রদান করা হতো। সারদা পুলিশ ট্রেনিং একাডেমী দেশের একমাত্র শীর্ষস্থানীয় পুলিশ ট্রেনিং ইনস্টিটিউশন। এখানে শিক্ষানবীশ অফিসারদের জন্য একটি পাঠ্য তালিকা অনুসরণ করা হয়। একজন অতিরিক্ত আইজিপি একাডেমীর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সারদা পুলিশ একাডেমীর প্রথম প্রিন্সিপাল ছিলেন মেজর এইচ. চীমন (১৯১২-১৯১৯)।

সারদা ব্যতীত কনস্টবলদের প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশে আরও চারটি আঞ্চলিক ট্রেনিং স্কুল রয়েছে। এগুলো হচ্ছে: ঢাকা বিভাগের জন্য টাঙ্গাইলের মহেরা পুলিশ ট্রেনিং স্কুল, রাজশাহী বিভাগের জন্য রংপুর সদরে অবস্থিত পুলিশ ট্রেনিং স্কুল, খুলনা বিভাগের জন্য বয়রা পুলিশ ট্রেনিং স্কুল এবং চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য নোয়াখালী মাইজদী পুলিশ ট্রেনিং স্কুল। কনস্টবলদের এক বছর ট্রেনিংয়ের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে এসব আঞ্চলিক স্কুলে ছয় মাসের ট্রেনিং শেষে নিয়োগ দেয়া হয়। চাকুরি স্থায়ীকরণের জন্য বাকি ছয় মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয় সারদা একাডেমীতে। প্রতিটি আঞ্চলিক ট্রেনিং স্কুলের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন একজন অতিরিক্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ। রাজধানীর রাজারবাগে একটি ডিকেটটিভ ট্রেনিং স্কুল রয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণীর পুলিশ অফিসারগণ এ স্কুলে একজন অতিরিক্ত ডিআইজি’র তত্ত্বাবধানে অপরাধ অনুসন্ধান বিষয়ক বিশেষ ট্রেনিং গ্রহণ করে থাকে। ঢাকার উত্তরায় এসবি পুলিশের নিজস্ব ভবনে এসবি পুলিশের একটি ট্রেনিং স্কুল চালু রয়েছে। একজন অতিরিক্ত ডিআইজি’র তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হয়। এখানে বিভিন্ন বিষয়ের উপর সেমিনার, বক্তৃতা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এসবি পুলিশের নিম্নপদস্থ অফিসার ও কর্মচারীগণ এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। ট্রাফিক পুলিশের প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকার মিল ব্যারাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রেনিং স্কুল রয়েছে। একজন পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে ইন্সপেক্টর ও তার নিম্নতম কর্মচারীদের এখানে যানবাহন সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এছাড়াও ঢাকার রাজারবাগে টেলিকম্যুনিকেশন ট্রেনিং সেন্টার চালু আছে। এখানে কনস্টবল থেকে বিভিন্ন পদপর্যাদার পুলিশ অফিসারদের টেলিকম্যুনিকেশন বিষয়ে ট্রেনিং দেয়া হয়। একজন পুলিশ সুপার এ ট্রেনিং সেন্ট্রারের তত্ত্বাবধান করেন। জঙ্গল ওয়ারফেয়ার ও ট্যাক্টিক্যাল ট্রেনিং স্কুল নামে একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউশন রাঙ্গামাটি জেলার বারবুনিয়া পাহাড়ী অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। ইতিপূর্বে এ ট্রেনিং সেন্টারটি কক্সবাজার জেলার চকোরিয়া থানার দুলাহাজরার দুর্গম এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইন্সপেক্টর ও তার নিম্নতম কর্মচারীগণ এখানে বিশেষ ট্রেনিং গ্রহণ করে থাকেন। একজন পুলিশ সুপার প্রিন্সিপালের দায়িত্বে থাকেন।

মহিলাদের মধ্যে পেশাধারী প্রতারণা, দেশি ও আন্তর্জাতিক চোরাচালান, হোটেল ও বিত্তবানদের গৃহে প্রমোদবালাদের অসামাজিক তৎপরতা প্রতিরোধ সংক্রান্ত অপরাধের অনুসন্ধান ও তল্লাশীর ক্ষেত্রে পুরুষের জন্য কিছু আইনগত ও সামাজিক অসুবিধা থাকায় ১৯৭৪ সালে সর্বপ্রথম স্পেশাল ব্রাঞ্চ পুলিশে ১২ জন মহিলা পুলিশ নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৮ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশে মহিলা পুলিশ নিয়োগ শুরু হয়। বর্তমানে মহানগর ব্যতীত সিআইডি, ইমিগ্রেশন, জেলা সদর ও পুলিশ সদর দপ্তরেও বিভিন্ন পদবীর মহিলা পুলিশ নিয়োজিত আছে। দেশের অন্যান্য মহানগর পুলিশে বিভিন্ন পদবীর মহিলা পুলিশ নিয়োজিত আছে। বর্তমানে বেশ ক’জন মহিলা পুলিশ অফিসার (বিসিএস) দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন।

বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগ সাংগঠনিক রীতি অনুসারে ১০টি শাখায় বিভক্ত এবং প্রত্যেকটি শাখায় কার্যপ্রণালী ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সুনির্দ্দিষ্ট। ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও এ শাখাগুলি বিভিন্ন পদমর্যাদার অফিসার কর্তৃক অনেকটা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ পুলিশ সংগঠনগুলো হলো: জেলা পুলিশ, সিআইডি পুলিশ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, রেলওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, রিভার পুলিশ, মহানগর পুলিশ, অশ্বারোহী পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান, রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স।  [আহমেদ আমিন চৌধুরী]