পুঁতি


পুঁতি  বা গুটিকা হচ্ছে মানবব্যবহূত প্রাচীন অলঙ্কারগুলির মধ্যে অন্যতম। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকেই পুঁতি তৈরির জন্য মানুষ পাথর, ঝিনুক, হাড়, দাঁত এবং গাছের বীজ ব্যবহার করত। পুঁতি ছিদ্র করে সুতার সাহায্যে মালা গেঁথে পরিধান করা হতো। প্রাচীন যুগের মতো আধুনিক যুগেও সাধারণত আদিবাসীরা সামুদ্রিক শঙ্খ, ঝিনুক, মাড়ির দাঁত, ছেদক দাঁত, পশুর হাড়, হরিণের সিং প্রভৃতি দিয়ে পুঁতি বানিয়ে থাকে।

স্বল্পমূল্য পাথরের পুঁতি, মহাস্থান

শুধু অলঙ্কার হিসেবে নয় বরং ধর্মীয় কাজে, ঔষধ এবং তাবিজ-কবজ হিসেবেও পুঁতির ব্যবহার লক্ষণীয়। নরসিংদী জেলার উয়ারী-বটেশ্বর গ্রামের অধিবাসীরা অল্প মূল্যের পাথরের পুঁতিকে জপমালা হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। তারা ঔষধ হিসেবে পুঁতি ধৌত পানিও পান করে। কারণ, তারা বিশ্বাস করে যে, এ পানি পান করলে রোগ ভাল হয়ে যায়। তামিলনাড়ু এবং মালব উপকূল এলাকায় সমাধিতে প্রাপ্ত পুঁতি মৃতের রাহা-খরচ হিসেবে রাখা হয়েছিল বলে পুঁতিবিশেষজ্ঞ এইচ.সি বেক মনে করেন। রিভাট কারনাক মনে করেন যে, ইন্দো-আর্য, বৌদ্ধ এবং হিন্দুদের কাছে ক্রিস্টাল পবিত্র পাথর হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় প্রত্নস্থানসমূহে প্রচুর পরিমাণে ক্রিস্টালের পুঁতি পাওয়া যায়।

উপমহাদেশে উচ্চ পুরোপলীয় যুগের পুঁতি পাওয়া গেলেও তাম্র-প্রস্তর যুগ থেকে বাংলার বিভিন্ন প্রত্নস্থলে (পান্ডু রাজার ঢিবি, মহিষদল, ভারতপুর, হাতিগরা এবং মঙ্গলকোট) পুঁতি পাওয়া যায়। অধিকাংশ আদি-ঐতিহাসিক এবং আদি-মধ্যযুগের প্রত্নস্থল যেমন বাংলাদেশের মহাস্থান, উয়ারী-বটেশ্বর, পাহাড়পুর, ময়নামতী এবং পশ্চিম বাংলার পান্ডু রাজার ঢিবি, মঙ্গলকোট, মহিষদল, ভারতপুর, চন্দ্রকেতুগড়, তমলুক, হরিনারায়ণপুর, দেউলপটা এবং বানগড় থেকে প্রচুর পরিমাণে বৈচিত্র্যপূর্ণ পুঁতি পাওয়া যায়।

কাঁচের পুঁতি

বাংলার যত ধরনের পুঁতি পাওয়া যায় তার মধ্যে স্বল্প-মূল্য পাথরের পুঁতি সংখ্যা, প্রাচুর্যে, আকারের বিভিন্নতায় এবং নকশার বৈচিত্র্যে অন্য পুঁতির চেয়ে বেশি। এদের মধ্যে অ্যাগেট, ক্রিস্টাল, কারনেলিয়ান, চ্যালসেডনি, অনিক্স, গারনেট, জেসপার, মার্বেল, চার্ট, অ্যামেথিস্ট এবং নীলকান্তমণি প্রধান। সর্বাধিক সংখ্যায় পাওয়া যায় বন্ধনী নকশাযুক্ত অ্যাগেট, এরপর পর্যায়ক্রমে আসে কারনেলিয়ান, ক্রিস্টাল এবং চ্যালসেডনি। অধিকাংশ পুঁতির সূক্ষ্ম মসৃণ বৈশিষ্ট্যটি পুঁতি কারিগরদের দক্ষতার পরিচয় বহন করে। বাংলায় অনেক আকারের পুঁতি পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলি হলো: গোলাকৃতি, গোলাকার পিপাকৃতি, ষড়ভুজ পিপাকৃতি, গোলাকার সিলিন্ডার ও ষড়ভুজ সিলিন্ডার আকৃতি, ডিম্বাকৃতি, চাক্তি আকৃতি, হীরক ও প্রিজম আকৃতি, পিরামিড আকৃতি প্রভৃতি।

সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় পিপাকৃতির পুঁতি, অতঃপর আসে গোলাকৃতি এবং সিলিন্ডারাকৃতি। অল্প সংখ্যক পুঁতি অবশ্য কোন সুনির্দিষ্ট আকৃতির নয় এবং খুব উন্নত মানেরও নয়। যৌক্তিক কারণে ধারণা করা যেতে পারে যে, কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা ও অদক্ষ কারিগরের কারণে এরকমটি হতে পারে।

বাংলায় প্রাকৃতিক অথবা কৃত্রিম নকশাযুক্ত পাথরের পুঁতি পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক নকশাযুক্ত পাথর নির্বাচনে শিল্পিরা সূক্ষ্ম রুচিবোধ ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল, বিশেষ করে অ্যাগেট এবং অনিক্স পাথরে প্রাকৃতিক বন্ধনী নকশায় তা সুস্পষ্ট। অন্যদিকে স্বল্প-মূল্য পাথরের উপর কৃত্রিমভাবে নকশা করার পদ্ধতিকে বলা হয় ‘এচিং’। বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী ‘এচিং’ নকশা বাংলার পুঁতিতে পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, অনুরূপ ‘এচিং’ নকশাংকিত পুঁতি তক্ষশিলা; কোশাম্বী, রাজঘাট প্রভৃতি উত্তর ভারতীয় প্রত্নকেন্দ্রে পাওয়া যায়। বাংলা এবং উত্তর ভারতীয় পুঁতির নকশার সাদৃশ্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তৎকালীন বাংলার সঙ্গে উপর্যুক্ত অঞ্চলের যোগাযোগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

পাথরের পুঁতি, উয়ারী-বটেশ্বর

স্বল্প-মূল্য পাথরের পুঁতি ছাড়াও বাংলায় কাঁচের পুঁতিও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। কাঁচের পুঁতিগুলিও বিভিন্ন প্রযৌক্তিক কৌশলের স্বাক্ষর বহন করে। স্বর্ণ দিয়ে আবৃত এক ধরনের কাঁচের পুঁতি মহাস্থান, চন্দ্রকেতুগড়, হরিনারায়ণপুর এবং দেউলপোতায় পাওয়া যায়। ভারতবর্ষের খুব কম সংখ্যক প্রত্নকেন্দ্রে এ জাতীয় পুঁতি পাওয়া গিয়েছে। পুঁতি বিশেষজ্ঞ জুনিয়র পিটার ফ্রান্সিসের মতে গোল্ড-ফয়েল পুঁতির উৎস আদি ঐতিহাসিক যুগে মিশর দেশে। মহাস্থানগড় এবং উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নকেন্দ্রে আরেক ধরনের কাঁচের পুঁতি পাওয়া যায় যার নাম দেয়া হয়েছে স্যান্ডউইচ কাঁচের পুঁুতি। এটির উৎপত্তিস্থলও মধ্যপ্রাচ্য বলে জুনিয়র পিটার ফ্রান্সিস মনে করেন।

মহাস্থানগড়, উয়ারী-বটেশ্বর, চন্দ্রকেতুগড়, হরিনারায়ণপুর, দেউলপোতা, মঙ্গলকোট এবং তমলুকে অস্বচ্ছ বাদামি এবং অস্বচ্ছ লালচে-কমলা বর্ণের এক ধরনের কাচের পুঁতি পাওয়া যায় যেগুলিকে জুনিয়র পিটার ফ্রান্সিস ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একবর্ণ কাচের পুঁতি নাম দিয়েছেন। বাংলার বিভিন্ন প্রত্নকেন্দ্রে প্রাপ্ত উপর্যুক্ত কাচের পুঁতি বাংলার সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের আরিকামেডু এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সম্পর্ক নির্দেশ করে। কারণ অনুরূপ কাচের পুঁতি খ্রি পূ. ৩য় শতক থেকে খ্রিস্টীয় ১ম শতকে একমাত্র আরিকামেডুতে তৈরি হতো। পরবর্তীকালে অবশ্য শ্রীলংকা এবং ভিয়েতনামে একই ধরনের কাচের পুঁতি তৈরি হতো। বাংলা অঞ্চলে কাচের পুঁতি নির্মাণের কারখানার চিহ্ন পাওয়া যায় না। তবে চন্দ্রকেতুগড়ে প্রাপ্ত সবুজ রঙের কাচের বলের উপস্থিতি দেখে অনেকে ইঙ্গিত দেন যে, ঐ স্থানে কাচের পুঁতি নির্মাণের কেন্দ্র ছিল। স্বল্প-মূল্য পাথর এবং কাচের পুঁতি ছাড়াও প্রচুর পরিমাণ সুপারি, পিপা, সিলিন্ডার এবং ঘট আকৃতির পোড়ামাটির পুঁতি, অল্পসংখ্যক তামা, ফায়েন্স, স্টেটাইট, প্রবাল এবং ঝিনুক পাওয়া যায়।

পাথরের পুঁতি, মহাস্থান

সম্প্রতি মহাস্থানগড় এবং উয়ারী-বটেশ্বর এলাকায় ক্রিস্টাল, অ্যাগেট, অ্যামেথিস্ট এবং জেসপার পাথরের মৌল অংশ, ছিলকা, শিকল এবং ছিদ্রবিহীন অসমাপ্ত পুঁতি আবিষ্কৃত হয়েছে যা প্রমাণ করে যে, উপর্যুক্ত স্থানে পুঁতি তৈরির কারখানা ছিল। পুঁতি তৈরির জন্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত স্বল্প-মূল্য পাথর হয়ত বর্তমান ভারতের ছোটনাগপুর মালভূমি এবং দক্ষিণাত্য থেকে আসত। উল্লেখ্য যে, ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত পুঁতি নির্মাণকেন্দ্র যেমন উজ্জয়নী, কোশাম্বী, অহিচ্ছত্র, পাইথান, তের, কোন্ডাপুর, জাওগালা, ক্যাম্বে এবং ভারহুত প্রভৃতি নির্মাণ কেন্দ্র থেকে হয়ত স্বল্প-মূল্য পুঁতি বাংলায় আমদানি করা হতো।

আদি ঐতিহাসিক এবং আদি মধ্যযুগে বাংলার বিভিন্ন স্থানে স্বল্প-মূল্য পাথর এবং কাচের পুঁতির উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ঐসব স্থানে নগরায়ণ এবং শাসক শ্রেণির উদ্ভব একই সময় ঘটেছিল। সঙ্গত কারণে মনে করা হয় যে, বিকাশমান শাসকশ্রেণি, পুরোহিত এবং ব্যবসায়ীদের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন ধরনের পুঁতি আমদানি এমনকি স্থানীয়ভাবে পুঁতি নির্মাণ শিল্প গড়ে উঠেছিল। [সীমা পবনকর ও এস.এস মোস্তাফিজুর রহমান]

গ্রন্থপঞ্জি  Relevant articles on ‘Beads’, ‘Semi-precious Stone Beads’, ‘Glass Beads’ published in Journal of Bengal Art, 2, 4, 5, Dhaka, 1998-2000; S Pawankar, MM Hoque, SMK Ahasan and SSM Rahman, ‘Semiprecious Stone Beads from Wari and Bateshwar’, Journal of the Asiatic Society of Bangladesh, Dhaka, 1998; S Chakraborty, ‘Beads from Chandraketugarh’, Pratna Samiksha, 4 & 5, Calcutta.