পানাম


Nasirkhan (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ২২:২৭, ১৭ এপ্রিল ২০১৫ পর্যন্ত সংস্করণে (Text replacement - "\[মুয়ায্যম হুসায়ন খান\]" to "[মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]")

(পরিবর্তন) ←পুর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ→ (পরিবর্তন)

পানাম  সোনারগাঁয়ের একটি প্রাচীন এলাকা। বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার অন্তর্গত এ এলাকা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মোগরাপাড়া ক্রসিং থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। তেরো শতকের শেষপাদে সোনারগাঁয়ে হিন্দু আমলের রাজধানী শহরটি এখানেই অবস্থিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে পুরনো রাজধানী শহরের দক্ষিণে যে মুসলিম রাজধানী শহর গড়ে ওঠে, তারও অংশ ছিল এ পানাম এলাকা। সম্ভবত এখানে তখন মুসলিম শাসনকর্তাদের আবাসস্থল ছিল।

পানামনগর,সোনারগাঁও

মুগলদের সোনারগাঁও অধিকারের (১৬১১) পর মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ করে রাজধানী শহরের সঙ্গে পানাম এলাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পানামে এখনও মুগল আমলের তিনটি ইটনির্মিত সেতু রয়েছে। এগুলি হলো পানাম সেতু, দালালপুর পুল ও  পানামনগর সেতু। এ সেতুগুলির অবস্থান এবং পানামের তিন দিকের খাল বেষ্টনী থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এলাকাটি মধ্যযুগীয় নগরের উপশহর ছিল। ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে মোগরাপাড়া ক্রসিং থেকে পানাম অভিমুখী যে পাকা সড়কটি  নীলকুঠি পর্যন্ত বিস্তৃত, সেটি মধ্যযুগীয়  সোনারগাঁও এবং পানাম এলাকার একমাত্র পুরনো নিদর্শন বর্তমান পানামনগরের মধ্যে বিভাজন রেখা বলে মনে হয়। এ পাকা সড়কের পূর্ব পার্শ্বে এবং আমিনপুরের বিপরীত দিকে বর্তমান পানাম শহর অবস্থিত। এ সড়ক থেকে সরু খালের উপর নির্মিত এক খিলান বিশিষ্ট কুঁজো আকৃতির একটি সেতুপথ পানামনগরের প্রধান সড়কে গিয়ে মিলেছে।

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও  চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর ফলশ্রুতিতেই গড়ে উঠেছিল বর্তমান পানামনগর। উপনিবেশিক আমলে সোনারগাঁও সুতিবস্ত্রের প্রধানত ইংলিশ থান কাপড়ের ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং এরই সুবাদে গড়ে ওঠে নতুন শহর পানামনগর। উনিশ শতকে ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে উঠে আসা কিছুসংখ্যক হিন্দু তালুকদার স্থানটিকে আবাসস্থলরূপে বেছে নেন। পানামনগরের বর্তমান ইট নির্মিত ইমারতগুলি স্পষ্টতই ছিল হিন্দু ব্যবসায়ী-তালুকদারদের আবাসিক ভবন। ইমারতগুলি উনিশ শতকের প্রথম দিকে, এবং পরেরগুলি উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথম দিকে নির্মিত বলে ধরে নেওয়া যায়। উনিশ শতক থেকে গড়ে ওঠা পানামনগরের নির্মাণ অগ্রগতি ও শ্রীবৃদ্ধি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমাপ্তিকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

পানামনগর একটি একক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত শহর। গড়ে ৫ মিটার প্রশস্ত ও ৬০০ মিটার দীর্ঘ একটিমাত্র সড়কের দুপাশ ঘিরে গড়ে উঠেছে শহরটি। ইমারতগুলি সড়কের দুপাশে সারিবদ্ধভাবে নির্মিত এবং শহর এলাকার বাড়ির অনুরূপ বৈশিষ্ট্যে সবগুলি ইমারতের সদর বা সম্মুখভাগ রাস্তার দিকে। এ ইমারতসমূহ পানাম বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে রয়েছে ভগ্নপ্রায় ও অযত্নে লালিত ৫২টি বাড়ি; সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি এবং দক্ষিণ পার্শ্বে ২১টি। পানামনগরের চতুষ্পার্শ্ব কৃত্রিম খাল বা পরিখা দ্বারা সুরক্ষিত। শহরের উত্তর ও দক্ষিণ পার্শ্ব ঘিরে দুটি সুপ্রশস্ত খাল সরাসরি বিস্তৃত।

পশ্চিম পার্শ্ব ঘিরে একটি সরু খাল এ দুটি খালকে যুক্ত করেছে। এ সরু খালের উপরই স্থাপিত পানামনগরে প্রবেশের সেতুটি। পানামনগরের দক্ষিণের খালটি ডানদিকে মোড় নিয়ে পানাম বাজারের মধ্য দিয়ে উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত রাস্তা অতিক্রম করে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে। নগরের উত্তর দিকের পঙ্খীরাজ খালটি পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা-মেনিখালীর স্রোতধারায় গিয়ে মিশেছে।

পানামনগরের ইমারতগুলি কোথাও পরস্পর বিচ্ছিন্ন, আবার কোথাও সন্নিহিত। এদের অধিকাংশই আয়তাকার এবং উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত; উচ্চতায় এক তলা থেকে তিন তলা। বাড়িগুলির পেছন দিকের পুকুর, ঘাট ও ইদারার অবস্থান থেকে বোঝা যায় যে, সন্নিহিত বাড়ির বাসিন্দারা যৌথভাবে বাড়ির পশ্চাৎ ভাগের সুবিধাদি ভোগ করতেন। ইমারতগুলির অবয়ব ও নমুনায় বেশ কিছু সাদৃশ্য রয়েছে, যেমন দুই বা তিন তলা পর্যন্ত উচ্চতা, গঠনের অনুরূপতা এবং খিলান দ্বারপথের সাদৃশ্য ইত্যাদি। অন্যদিকে বারান্দা, ঝুলবারান্দা বা অলিন্দ, উন্মুক্ত গ্যালারি ও দেউড়ি সংযোজনের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ইমারতগুলির শীর্ষে অলঙ্কৃত ছাদ-পাঁচিল বা রেলিং ও অভিক্ষিপ্ত কার্নিস ইমারতের গঠন কাঠামোর সঙ্গে চমৎকারভাবে মানানসই হয়েছে। ইউরোপীয় স্থাপত্যের অনুকরণে রূপায়িত হয়েছে ইমারতগুলির অলঙ্করণ সজ্জা। কোথাও কোথাও স্থানীয় নকশা ব্যবহূত হয়েছে।

পানামের ইমারতগুলির সবই ইটনির্মিত। ইমারতের বহির্ভাগের গাঁথুনির উপযোগী করে ব্যবহূত হয়েছে বিভিন্ন আকৃতির ইট, যেমন- গোলাকার, খিলানকার, চোখা, অর্ধবৃত্তাকার, বক্ররেখ ইত্যাদি। ইমারতের দেয়ালগুলি ৫০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার পুরু। ছাদ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাঠের কড়ি-বরগার উপর স্থাপিত। প্রায় সব ইমারতেই অঙ্গসজ্জার উপকরণ হিসেবে কাঠের দরজা জানালার অনুকরণে প্লাস্টারে তৈরি কৃত্রিম দরজা ও জানালা ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়েছে ঢালাই লোহার তৈরি ব্রাকেট, ভেন্টিলেটর, জানালার গ্রিল, রেলিং-এর পিলপা। ইমারতের অভ্যন্তরভাগের কারুসজ্জায় প্রায় সর্বত্রই চীনামাটির বাসনের টুকরা (স্থানীয়ভাবে চিনিটিকরি নামে পরিচিত) ব্যবহূত হয়েছে। বহির্ভাগের অলঙ্করণে এর ব্যবহার কদাচিৎ দেখা যায়। খিলান ও ছাদের মধ্যবর্তী স্থানে ব্যাপকভাবে অলঙ্করণের প্রয়োগ দেখা যায়।

ইমারতের নকশা অনুযায়ী পানামের বসতবাড়িগুলিকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: মধ্যবর্তী হলঘর সম্বলিত ধরন, মধ্যবর্তী অঙ্গন (উঠান) সম্বলিত ধরন ও সমন্বিত ধরন। মধ্যবর্তী হলঘর ইমারতের সংযোগকেন্দ্র বিধায় এগুলোকে ব্যাপক অলঙ্করণের সাহায্যে অতীব মনোরম করে তোলা হয়েছে। অঙ্গনের চারপাশ ঘিরে নির্মিত হয়েছে অন্যান্য কক্ষগুলি। অঙ্গনের ভিত পাকা এবং এর উপরিভাগ ছাদহীন, উন্মুক্ত। সাধারণভাবে অঙ্গনের চারপাশে রয়েছে বারান্দা এবং এ বারান্দায় রয়েছে খিলানাকার দ্বারপথ। সমন্বিত ধরনের বাড়িগুলির অভ্যন্তরে কোন অঙ্গন বা হলঘর নেই। পানামের অধিকাংশ বাড়ি বিশেষত একতলা বাড়িগুলি এ সমন্বিত ধরনের অন্তর্ভুক্ত।

পানাম বরাবরই ছিল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর হিন্দুদের দেশত্যাগের ফলে পানাম অনেকটা জনমানবহীন শহরে পরিণত হয়।  [মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]