পাট শিল্প


পাট শিল্প  ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলায় এবং পাকিস্তানি আমলে পূর্ব বাংলায় (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) পাটজাত দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদন ছিল একক বৃহত্তম শিল্প। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর জাতীয় জিডিপি এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই শিল্পের অবদান হ্রাস পায় (অনপেক্ষ এবং আপেক্ষিক অর্থে)। কিন্তু তারপরও এই শিল্প দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

পাট থেকে কার্পেট উৎপাদন

১৮৮৫ সালে জর্জ অকল্যান্ড একজন বাঙালি অংশীদার (শ্যামসুন্দর সেন) নিয়ে কলকাতার হুগলি নদী তীরবর্তী রিশড়া নামক স্থানে প্রথম পাটকল স্থাপন করেন। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় পাট উৎপাদিত হত। কিন্তু ১৮৮৫ সালের পূর্বে স্থানীয় তন্তুবায় শ্রেণি দরিদ্র জনগণের জন্য মোটা বস্ত্র তৈরি করত। পাটভিত্তিক শিল্প স্থাপনের অনুপ্রেরণা আসে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি থেকে। নেপোলিয়ানের যুদ্ধের সময় ঘন ঘন নৌ-অবরোধের ফলে রাশিয়ার শন জাতীয় গাছের কারখানাগুলি বিকল্প হিসেবে পাট ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে। ১৮৩২ সালে বেলফোর ও মেলভিলের কারখানাগুলি কলকাতার বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচাপাট আমদানি করে এবং এই কাঁচাপাটের সঙ্গে তিমির তেল ও পানি মিশিয়ে পাট নরম করে নেয়। ১৯৩৮ সালে এই নতুন প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হয়। এ সময় ডান্ডির মিলগুলি জাভা থেকে আমদানি করা চিনির জন্য ডাচ সরকারের নিকট থেকে বিপুল পরিমাণ ব্যাগ তৈরির কার্যাদেশ পায়। ডাচ সরকার এই তৈরিকৃত পাটের ব্যাগ গ্রহণ করে এবং এই মোটা ক্যানভাস বিশেষ সামগ্রী হিসেবে স্থায়ীরূপ লাভ করে। এই ব্যবস্থা কাপড় ও ব্যাগ উৎপাদনে পাটের ব্যবহার শুরুতে সহায়তা করে। ফলে পাটশিল্পে নতুন প্রেরণার সূচনা হয়। অবশ্য ক্রিমিয়ার যুদ্ধই (১৮৫৪-৫৬) প্রকৃতপক্ষে পাটশিল্পকে একটি শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে। বিশ্ববাণিজ্য প্রতি বছর শতকরা ৫ ভাগ বৃদ্ধি পেতে শুরু করলে ঔপনিবেশিক অঞ্চল থেকে বিকল্প অাঁশ সহজলভ্য হলে ডান্ডির কারখানাগুলি আর অলসভাবে বসে থাকে নি। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-৬৫) এই বিকল্প প্রক্রিয়ায় আরো উৎসাহ প্রদান করে। এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকা থেকে তুলার সরবরাহ অনেকাংশেই সীমিত হয়ে পড়ে। কারণ পরিখা যুদ্ধকালে ইউনিয়ন এবং কনফেডারেসির সৈন্যদের জন্য মোটা বস্তা ও বালির বস্তা, পাটের অাঁশ দিয়ে পাকানো সুতা, দড়ি সরবরাহ বিঘ্নিত হয় এবং মূল্যও বৃদ্ধি পায়। ফলে ডান্ডির টেকসই বিকল্প অাঁশের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। উভয় ক্ষেত্রেই এই শিল্প নতুন ব্যবহারকারীর সন্ধান পায় যারা আর কখনো শন বা তুলার ব্যবহারে ফিরে যায় নি। এই স্থায়ী পরিবর্তনের প্রধান কারণ ছিল তুলনামূলকভাবে পাটের সস্তা দামের সুবিধা।

এভাবে প্রথম যখন বাংলায় পাটকল স্থাপিত হয় তখন ডান্ডির মিলগুলি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তাদের পণ্যের জন্য নতুন বাজারের সন্ধান করছিল। কিন্তু কলকাতার মিলগুলি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দ্রুত অগ্রগতি সাধন করে। ১৮৮২ সালে  মিলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১৮টিতে উন্নীত হয় এবং ১৯০১ সালে ৩ লক্ষ ১৫ হাজার সুতা কাটার টাকু, ১৫ হাজার তাঁত, ১ লক্ষ ১০ হাজার শ্রমিক এবং ৪ কোটি ১০ লক্ষ টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে মিলের সংখ্যা ৩৫-এ উন্নীত হয়। এখানে উৎপাদিত ৮৫% পাটজাত দ্রব্য অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়। এভাবে উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পাট শিল্প উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পে পরিণত হয় এবং কলকাতা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাটজাত দ্রব্য উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ঘটনাক্রমে সব পাটকল রাজধানী শহরের আশেপাশে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিদেশি পুঁজিপতিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে বাঙালিরা এই শিল্পের সঙ্গে আদৌ জড়িত ছিল না, শুধুমাত্র একজন প্রথম পাটকল স্থাপনের অংশীদার ছিলেন। পাটজাত দ্রব্য উৎপাদনের কারখানা কলকাতা কেন্দ্রিক গড়ে উঠার পিছনে কিছু সহায়ক উপাদান কাজ করে। এগুলি ছিল কম শ্রম-মূল্য (প্রায় ১/৩ ভাগ), কাঁচাপাটের সহজলভ্যতা, দীর্ঘ সময় কাজ করানো এবং অধিকতর মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন।

বিশ শতকের প্রথম তিন দশক থেকে পাটশিল্পের অভাবিত উন্নতি সাধিত হয়। ১৯০৩-০৪ সালে পাটকলের সংখ্যা ছিল ৩৮টি, কিন্তু ১৯২৯-৩০ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৯৮টিতে উন্নীত হয়। উৎপাদনের দিক থেকে স্থাপিত তাঁতের সংখ্যা ৩ গুণ বেড়ে যায় এবং এই শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা ১,২৩,৬৮৯ থেকে ৩,৪৩,২৫৭ জনে উন্নীত হয়। এর মূল কারণ ছিল বিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে উচ্চ মুনাফা। বিশ্ববাজারে পাটজাত দ্রব্য সামগ্রীর চাহিদার কারণেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।

সারণি ১  বাংলায় পাট শিল্পের বিকাশ (১৮৭৯-১৯৩৯)।

বৎসর মিলের সংখ্যা তাঁতা’০০০ টাকু ’০০০ নিয়োজিত কর্মী ’০০০
১৮৭৯-৮০ ২২ ৭১ ২৭
১৯০০-০১ ৩৬ ১৬.১ ৩৩১.৪ ১১৪.৮
১৯২০-২১ ৭৭ ৪১.৬ ৮৬৯.৯ ২৮৮.৪
১৯৩৮-৩৯ ১১০ ৬৯ ১৩৭০ ২৯৯

সারণি ২  ১৮৭২-১৯১৪ মেয়াদে পাট চাষের আওতায় আবাদি জমির শতকরা অনুপাত।

জেলা ১৮৭২ ১৮৯১/৯৫ ১৯১০/১৯১৪
ঈাবনা ১৪ ২০.৮ ২১.২
ঊগুড়া ১১.৩ ১৪.৫ ২৫
দার্জিলিং ৯.১ ৬.৮ ২.৪
দিনাজপুর ৭.১ ৬.১ ৭.১
রংপুর ৬.৩ ১৭.৮ ২৭.৮
হুগলী ২.৬ ১৩.২
ত্রিপুরা (কুমিল্লা) ৩.৯ ১৯.৫ ২৪
ঢাকা ২.৪ ১৮ ১৮.২
ফরিদপুর ১.৯ ৭.৪ ১৬
রাজশাহী ১.১ ৯.৮ ১০.৯
যশোর ০.৩ ৩.৬ ১০.২
নদীয়া --- --- ৯.৮

১৮৯৫ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে বিশ্বে পাটের চাহিদা শতকরা ৩০০ গুণ বৃদ্ধি পায় এবং যুদ্ধের বছরগুলিতে এর পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পায়। এর সঙ্গে আরেকটি অনুকূল উপাদান যোগ হয় এবং সেটি হলো যন্ত্রপাতি এবং মিলের প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর রপ্তানির উপর সরকার কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞা। ফলে বাংলার পাটকলগুলি থেকে পাটজাত দ্রব্য সামগ্রীর বর্ধিত চাহিদা মেটাতে হয় এবং এ কারণে বিদেশে বর্ধিত চাহিদার সঙ্গে উৎপাদন ক্ষমতার উপর বাধা-নিষেধ আরোপিত হয়ে মিলগুলি উচ্চহারে লাভ করার সুযোগ পায়। প্রকৃত মুনাফার সূচি ১৯১৪ সালের ১০০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯১৭ সালে ৫৭০-এ উন্নীত হয়। কিন্তু এই সাফল্য ও উন্নতি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাটকলগুলির বিনিয়োগ থেকে লক্ষণীয় মাত্রায় মুনাফা হতে শুরু করে এবং যুদ্ধ পরবর্তীকালে তা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। ১৯২০-২১ এবং ১৯২৯-৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২১টি পাটকল স্থাপিত হয় এবং ১৯৩০ সালের মধ্যে মোট তাঁতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৪০০০-এ উন্নীত হয়। এর পাশাপাশি সপ্তাহে কর্ম-সময় ৫৪ ঘন্টা থেকে ৬০ ঘন্টায় বৃদ্ধি পায়।

JuteIndustry.jpg

পাটশিল্প যখন অতিরিক্ত উৎপাদন করার ক্ষমতা অর্জন করে তখনই বিশ্ব অর্থনীতিতে মহামন্দা দেখা দেয়। পাটজাতদ্রব্য সামগ্রীর চাহিদা ও মূল্য হ্রাস পায় এবং ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (আইজেএমএ) এর কর্ম-সময় কমিয়ে ৪০ ঘণ্টা করে এবং ১৫% তাঁত বন্ধ করে দেয়। এসব পদক্ষেপ অবস্থার উন্নতিসাধনে ব্যর্থ হয় এবং ১৯২৯-৩০ সাল থেকে ১৯৩৪-৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৮৩০০০ শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা হয়। এই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করা খুব একটা কষ্টসাধ্য নয়। প্রথমত, পাটপণ্য আমদানিকারক দেশগুলি তাদের নিজস্ব শিল্প রক্ষার স্বার্থে পাটজাত দ্রব্যসামগ্রী আমদানির উপর অত্যধিক শুল্ক আরোপ করে। ঘটনাক্রমে মোট তাঁতের সংখ্যার দিক দিয়ে কলকাতাতে ছিল ৫৭% মিলের অবস্থান; অবশিষ্ট মিলগুলি ছিল উপমহাদেশের বাইরে। দ্বিতীয়ত, আইজেএমএ-বহির্ভূত মিলগুলিতে সপ্তাহে ১০৮ ঘণ্টা কর্ম-সময় বাড়িয়ে তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি করে। তৃতীয়ত, মন্দার প্রথম ৫ বছরে মিল বহির্ভূত সদস্যরা ইচ্ছামতো ও প্রতারণা করে চটের ব্যাগের শতকরা ১৮ ভাগেরও বেশি উৎপাদন করে। আইজেএমএ তার সদস্যদের স্বার্থরক্ষার জন্য সবসময় আপাত-একচেটিয়া সংগঠন হিসেবে কাজ করে। কিন্তু পরিবর্তিত অবস্থার কারণে সংগঠনটি তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। একই সঙ্গে এই সংগঠনটি আইজেএমএ বহির্ভূত মিলগুলিকে একটি নিয়ম-নীতির মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সরকারকে আইন প্রণয়নে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়। তাই উৎপাদন বৃদ্ধি করা ব্যতীত আইজেএমএ-এর অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। এভাবে বিশ্বব্যাপী পাটজাত দ্রব্য সামগ্রীর মূল্য সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যায় এবং ১৯২৯ (১৯২৮=১০০) সালে যেখানে লভ্যাংশের হার শতকরা ৮৬ ভাগ ছিল ১৯৩৭ সালে তা হ্রাস পেয়ে শতকরা ১২ ভাগে উপনীত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে এই মন্দাভাবের অবসান ঘটে। কারণ ঐ সময় প্রচুর বালুর বস্তার চাহিদা দেখা দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিলগুলি কাঁচামালের মূল্য অনেকখানি কমিয়ে এনেছিল। কিন্তু পরে মিলগুলি তেমন কার্যকরভাবে কাঁচামালের মূল্য কমিয়ে আনতে না পারলেও তারা বেশ ভালো পরিমাণ মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়। ১৯৩৫-৩৮ সালের পরিশোধিত মূলধনের প্রকৃত মুনাফার পরিমাণ ৭% থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে ৫২%-এ উন্নীত হয় এবং ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে প্রকৃত মুনাফা ৪০%-এ অবস্থান করে। ফলে মন্দার সময় নতুন পাটকল প্রতিষ্ঠার হার যেখানে কমে গিয়েছিল পরিবর্তিত অবস্থায় তা বৃদ্ধি পায় এবং ১৯৪৫-৪৬ সালে প্রদেশে এর সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৮.৪ হাজার তাঁতসহ ১১১টি।

ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকে পাটশিল্পের উল্লেখযোগ্য উন্নতির কারণ হলো ভারতীয়দের বিশেষ করে মাড়োয়ারি উদ্যোক্তাদের এই শিল্পে ক্রমবর্দ্ধমান হারে অংশগ্রহণ। ১৯২০ সালের মধ্যে ভারতীয়রা ১০টি পাটকল স্থাপন করে এবং এগুলির অধিকাংশ মালিকই ছিল মাড়োয়ারি। একই সঙ্গে শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে মাড়োয়ারিরা ব্রিটিশ কোম্পানির পরিচালকমন্ডলির পদ লাভ করে। ১৯৩০ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে বিদেশি মিলগুলির শতকরা ৫৯ ভাগ পরিচালকের পদ মাড়োয়ারিদের হাতে চলে যায়। তারা তাদের শেয়ারের সংখ্যা ১৯৪২ সালের শতকরা ৬২ ভাগ থেকে বৃদ্ধি করে ১৯৪৫ সালে শতকরা ৮২ ভাগে উন্নীত করে। এছাড়াও বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে পাটশিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো পাট পণ্যের কেন্দ্র হিসেবে ডান্ডি তার গুরুত্ব হারাতে থাকে এবং পাট শিল্পের পরিসর বৃদ্ধি পায়। ১৮৯০ সালের মধ্যে কলকাতার মিলগুলির উৎপাদনের পরিমাণ ডান্ডির মিলগুলির উৎপাদনের সমপর্যায়ে চলে আসে। ১৯৪০  সালের মধ্যে এই মিলগুলির মোট উৎপাদনের শতকরা ৫৭ ভাগ সম্পন্ন হয় এবং জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকা সাকুল্যে উৎপাদন করে শতকরা ২৮ ভাগ এবং গ্রেট ব্রিটেনের অংশ ছিল মাত্র শতকরা ৭ ভাগ।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশে এবং বিদেশে কাঁচাপাটের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বাংলায় পাটচাষের পরিমাণ অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ১৮৪৫-১৮৫০ সালে পাটচাষের জমির পরিমাণ যেখানে ছিল ১৯ হাজার একর সেখানে ১৯০১-০২ সালে সেই জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ২ কোটি ৯০ লক্ষ একরে উন্নীত হয়। পরবর্তী বছরগুলিতে অবশ্য পাটচাষের পরিমাণ কমে যায়, কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৯৪৫ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি একরে। কাঁচাপাট উৎপাদনের একচেটিয়া এলাকা বাংলা হলেও অধিকাংশ পাটচাষ হতো প্রদেশের পূর্ব অংশে। একথা সত্য যে, শুরুর দিকে পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জে একটি মিল স্থাপিত হলেও ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পের কারণে এটি ধ্বংস হলে আর চালু করা সম্ভব হয় নি। এই মিলের যন্ত্রপাতিগুলি হুগলিতে এনে ডেলটা জুট মিল স্থাপন করা হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে নারায়ণগঞ্জে একটি পাটকল স্থাপনের কথা শোনা গেলেও এ ব্যাপারে ঐ শতকের পঞ্চশের দশকেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় নি। ফলে অবস্থা এরূপ দাঁড়ায় যে, পশ্চিম বাংলায় সব পাটকল অবস্থিত হলেও অধিকাংশ কাঁচাপাট পূর্ব অঞ্চল থেকেই নেয়া হত। এর কারণ খুব একটা অজানা নয়। প্রথমত, পাট একটি রপ্তানিমুখী শিল্প হওয়ার কারণে পাটজাত দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করার জন্য বাজারের প্রয়োজন ছিল। একমাত্র অনুন্নত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিদেশের বাজারে যাওয়া ব্যতীত পূর্ববাংলায় পাটজাত দ্রব্য সামগ্রী ক্রয় করার মতো তেমন কোনো বাজার ছিল না। দ্বিতীয়ত, পাটশিল্পের জন্য প্রয়োজন হয় ভারী যন্ত্রপাতি এবং বড় বড় গুদাম এবং কলকাতা থেকে পূর্ববাংলার যেকোনো জেলায় এগুলি পাঠাতে অত্যন্ত উচ্চমূল্য বহন করতে হতো। তৃতীয়ত, হুগলির মিলগুলি রানীগঞ্জের কয়লা খনির নিকট অবস্থিত হওয়ার কারণে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় যে, ‘বৃহত্তর কলকাতা’ এলাকার তুলনায় পূর্ববাংলার শহরগুলিতে বিদ্যুতের মূল্য অপেক্ষাকৃত বেশি ছিল। পরিশেষে, রাজধানী শহর হওয়ার কারণে কলকাতা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। এসব কারণে পূর্ববাংলায় পাটশিল্পের বিকাশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারত ও পাকিস্তান একে অন্যের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সব পাটকল ভারতে অবস্থিত হলেও শতকরা ৮০ ভাগ পাট উৎপাদনের এলাকা ছিল পাকিস্তানে। অন্যদিকে, ভারতকে তার মিলগুলি চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচাপাটের অধিকাংশ আমদানি করতে হতো, আর পাকিস্তানের সমস্যা ছিল তার কাঁচাপাট বিক্রয়ের। এ অবস্থায় দুটি দেশ তাদের সীমান্ত দিয়ে পাটজাত দ্রব্য সামগ্রী মুক্তভাবে চলাচলের জন্য ১৯৪৭ সালে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি ১৯৪৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর ছিল। কারণ ভারত ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্ক আরোপের জন্য পাকিস্তানকে একটি বিদেশি রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্য চুক্তি করে, কিন্তু ভারত চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য কাঁচাপাট পেতে ব্যর্থ হয়। স্থানীয়ভাবে কাঁচাপাটের প্রাপ্যতা, পাটজাত দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদনে অতিরিক্ত উচ্চমূল্য এবং উদ্বৃত্ত শ্রমিক নিয়োগের সম্ভাবনা ইত্যাদি কারণে পাকিস্তানে নিজস্ব পাটশিল্প বিকাশের বিষয়টি অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। কিন্তু রপ্তানি বাণিজ্যের অনিশ্চয়তার বিষয়টি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয় এবং এরূপ অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েও পাকিস্তানের প্রথম পাটকল বাওয়া জুট মিলস লিমিটেড ১৯৫১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাদের উৎপাদন শুরু করে। দ্বিতীয় মিলটি ভিক্টোরি জুট প্রডাক্টস লিমিটেড একই বছরের শেষের দিকে উৎপাদন শুরু করে। এগুলি ছিল বেসরকারি খাতের। একই বছর উৎপাদন শুরু করা তৃতীয় মিলটি ছিল আদমজি জুট মিলস। এই মিলটি পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এভাবে সরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের মধ্যকার সক্রিয় সহযোগিতায় শিল্প বিকাশের পথ সুগম হয় এবং ১৯৬০ সাল নাগাদ ১৪টি মিলের মধ্যে ১২টি মিল পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৯-৬০ সালের মধ্যে এই ১৪টি মিলের কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ৫৭০০, তাঁতের সংখ্যা ছিল ৭৭৩৫টি এবং পাটজাত দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২,৬০,৩৯৩ ম্যাট্রিক টন। পরবর্তী দশকে পাটশিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটে এবং ১৯৬৯-৭০ সালের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে কিঞ্চিতধিক ২৫ হাজার তাঁত সহ মোট পাটকলের সংখ্যা ছিল ৭৭টি এবং এগুলির কাঁচাপাট ব্যবহার করার ক্ষমতা ছিল ৩৪ লক্ষ বেল। ঐ বছরই সকল পাটকলে কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ সত্তর হাজার এবং বিশ্বের ১২০টি দেশে পাটজাত দ্রব্য সামগ্রী রপ্তানি করে ৭৭ কোটি টাকা আয় করা হয়। এভাবে পূর্ব পাকিস্তান পাটজাত দ্রব্যসামগ্রী রপ্তানির শীর্ষ দেশে পরিণত হয়। ১৯৫২-৫৩ সালে পাকিস্তানের অর্জিত মোট বৈদেশিক মুদ্রার মাত্র ০.২% ছিল পাটজাত দ্রব্য সামগ্রী রপ্তানি থেকে। ১৯৬৯-৭০ সালে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪৬%।

পূর্ব পাকিস্তানের পাটকলগুলি ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিয়েই মূলত বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু মুদ্রার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে ভারত রপ্তানি বাণিজ্যে নিজের পক্ষে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকার রপ্তানি বোনাস স্কিম চালু করে। এই স্কিমের আওতায় পাট রপ্তানিকারকরা সাধারণ বিনিময় মূল্য হিসেবে ১ পাউন্ড স্টালিং-এর বিপরীতে ১১.৪৫ রুপি এবং ১ ইউএস ডলারের বিপরীতে ৪.৭৬ রুপি পেত; কিন্তু তাদের একটি বোনাস ভাউচার দেয়া হতো যা তারা বিলাসবহুল সামগ্রীর আমদানিকারকদের কাছে প্রিমিয়াম মূল্যে বিক্রি করতে পারত। ভারতের রপ্তানি মূল্যের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময়ে পাট রপ্তানির বিপরীতে বোনাসের অনুপাত উঠানামা করত।

বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের দিকে পাট উৎপাদন খাতে অ-বাঙালিরাই ছিল বেসরকারি বিনিয়োগকারী, কিন্তু ষাটের দশকের প্রথমদিকে কিছু বাঙালি উদ্যোক্তা এই খাতে বিনিয়োগের উৎসাহ প্রকাশ করে। এই বাঙালি উদ্যোক্তারা নিজস্ব উদ্যোগেই ব্যবসা-বাণিজ্য বা ক্ষুদ্র শিল্প ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল, কিন্তু ইতোমধ্যে তারা নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য করে বেশ কিছু পুঁজি সঞ্চয় করে। অধিকন্তু, পূর্ব পাকিস্তানে অবাঙালিদের আধিপত্যমূলক শিল্প বিনিয়োগ রাজনৈতিক অসন্তোষের জন্ম দেয়। মূলত এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এই শিল্পখাতে বাঙালির অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সরকারের শিল্পমন্ত্রী এ.কে খান পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থাকে দুটি অংশে বিভক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর একটি হবে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য এবং অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। তিনি এই নীতিও গ্রহণ করেন যে, ২৫০টি তাঁতমিল নিয়েও টিকে থাকা সম্ভব (পূর্বে ৫০০টি তাঁতের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল)। একজন বাঙালি উদ্যোক্তাকে বা একদল উদ্যোক্তাকে ২৫ লক্ষ টাকার পুঁজি (বা সম পরিমাণ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি) নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় একটি পাটকল স্থাপনের অনুমতি দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এই ব্যবস্থা বাঙালি উদ্যোক্তাদের ১৯৭০ সালের মধ্যে প্রায় ১১,৫০০ তাঁত বা বিভিন্ন শ্রেণীর সমগ্র তাঁতের শতকরা ৩২ ভাগ তাঁত নিয়ে ৪১টি পাটকল স্থাপন করতে সাহায্য করে। মাত্র দুই দশকের মধ্যে এরূপ বৃহৎ পাটশিল্প স্থাপন ছিল প্রকৃতই একটি বড় ব্যাপার। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে এই বাঙালি উদ্যোক্তারা প্রায় অপরিচিতই ছিলেন।

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর অ-বাঙালি এবং দেশ ত্যাগ করে চলে যাওয়া মালিকদের পাটমিলগুলির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য সরকার জুট বোর্ডকে নির্দেশ দেয়। জুট বোর্ড প্রত্যক্ষভাবে বা প্রশাসক বিনিয়োগের মাধ্যমে এই ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। ব্যবস্থাপনা-দক্ষতার বাছ-বিচার না করেই রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। তারা ধীরগতিতে সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করছিলেন এবং এটিই ছিলো এই শিল্পকে অবহেলার ভিত্তি। মিলের উর্দু ভাষী অনেক কর্মচারী দেশ ছেড়ে চলে গেলে তাদের শূন্য পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল রাজনৈতিক কর্মী অথবা ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের।

১৯৭২ সালের মার্চ মাসে সরকার দেশের বিভিন্ন খাতের সব শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ করে। এ শিল্পের অবাঙালি মালিকানার মিলগুলির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হবে, কারণ তারা বর্তমানে বিদেশি। কিন্তু প্রজাতন্ত্রের সংবিধানে সন্নিবেশিত সমাজতন্ত্রের নামে জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সকল জাতীয়করণকৃত মিলগুলির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিভিন্ন কর্পোরেশন বা সংস্থাকে দেয়া হয় এবং বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনকে (বিজেএমসি) পাটকলগুলির পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। কর্পোরেশনের প্রধান হবেন একজন চেয়ারম্যান এবং তাঁর পদমর্যাদা হবে সরকারের একজন সচিবের পদমর্যাদার সমান। বিজেএমসি ধীরে ধীরে কাঁচা পাট ক্রয়, বিক্রয়, অর্থ যোগান, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। আর্থিকভাবে টাকার অবমূল্যায়ন শতকরা ৬৬ ভাগ হওয়ার কারণে ১৯৭৫-৭৬ সাল থেকে ১৯৭৮-৭৯ সাল পর্যন্ত বিজেএমসি-র আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০ কোটি ১৯ লাখ টাকা। পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষতির মূল কারণ ছিল কাঁচাপাটের মূল্য বৃদ্ধি, গুদামজাতকরণের বর্ধিত ব্যয়, খুচরা যন্ত্রাংশের উচ্চমূল্য, মজুরি ও বেতন বৃদ্ধি এবং অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি।

১৯৭৫ সালে সরকার পরিবর্তনের পর পাটশিল্পের সমস্যার পর্যালোচনার জন্য বিশেষজ্ঞ বা দক্ষ কমিটি নিয়োগ দেয়া হয়। কমিটি এর পর্যালোচনায় উল্লেখ করে যে, মিলগুলির ক্ষতির কারণ হলো: (ক) কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের নৈতিক অবক্ষয়; (খ) প্রশাসনের সর্বস্তরে অপর্যাপ্ত তত্ত্বাবধান ও তদারকি; (গ) উদ্ধুদ্ধকরণ ও প্রণোদনার পূর্ণ অনুপস্থিতি এবং একত্ববোধের অভাব; এবং (ঘ) নির্বাহি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার অভাব। অন্য সব জাতীয়করণকৃত শিল্পখাতে এসব দুর্বলতা কম-বেশি বিদ্যমান ছিল, এবং এটি কোনো বিস্ময়কর বিষয়ও ছিল না, কারণ প্রয়োজনীয় আদর্শিক প্রস্ত্ততি ছাড়াই সমাজতন্ত্র প্রবর্তন করা হয়েছিল।

১৯৭৯-৮০ সালে বিশেষজ্ঞ বা দক্ষ কমিটির সুপারিশ অনুসারে শিল্প-কল-কারখানার বিরাষ্ট্রীয়করণ শুরু হয় এবং কমিটির সুপারিশ অনুসারে ৩জন বাংলাদেশি মালিকের পাটকল ফেরত দেয়া হয় এবং এরূপ অন্য ৩টি মিল বাংলাদেশিদের নিকট নিলামে বিক্রয় করা হয়। পরবর্তীকালে সরকার এরূপ মিল প্রতিষ্ঠার জন্য পুরাতন ও ব্যবহূত যন্ত্রপাতি আমদানিসহ ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের পরিমাণ উন্মুক্ত করে দেয়। ১৯৮২ সালে সরকার ৩৫টিরও বেশি পাটকল সাবেক বাংলাদেশি মালিকদের নিকট হস্তান্তর করে। ১৯৮২-৮৪ সালে বেসরকারি খাতের বেশ কিছু পাটকল (বিজেএমসির প্রতিনিধিত্বে) মুনাফা অর্জন করে, কিন্তু পরবর্তীকালে এগুলিও পূর্বের ন্যায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

কেন্দ্রীয়ভাবে কাঁচাপাট ক্রয়, বিক্রয়, আনুপুঙ্ক্ষিক বিষয় পর্যালোচনার জন্য পূর্বোল্লেখিত কারণ ছাড়াও এরূপ ক্ষতির কারণগুলি হচ্ছে: (ক) ভারত কর্তৃক পাটজাত দ্রব্য সামগ্রীর মূল্য হ্রাস; (খ) বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি; এবং (গ) শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি। এরূপ ধাপে ধাপে মূল্য বৃদ্ধির কারণে সরকার ১৯৮৬-৮৯ সালে ১৩৫.৭৯ কোটি টাকা রপ্তানি কার্য-সম্পাদন সুবিধা হিসেবে ১৯৮৯-৯২ সালে ২৫৫.৪২ কোটি টাকা নগদ ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করে। ১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারকে পাট শিল্পে সমীক্ষা চালানোর পরামর্শ দেয়। এই সমীক্ষা পরিচালনার জন্য সরকার একজন বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ দেয় যিনি স্থানীয় চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টদের সহায়তায় এই সমীক্ষণ পরিচালনা করবেন। এই সমীক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ১৯৯১ সালের জুন মাসে পাটকলগুলির ব্যাংকের নিকট পুঞ্জীভূত বা ক্রমবর্ধমান দায় বা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০৭৫.৩২ কোটি টাকা যার মধ্যে বিজেএমসির মিলের ঋণের টাকার পরিমাণ ১২৯৯.০৫ কোটি টাকা এবং ৩৫টি বিরাষ্ট্রীয়করণ মিলের ঋণের টাকার পরিমাণ ৭৭৪.২৭ কোটি টাকা। এই সমীক্ষায় সুপারিশ করা হয় যে, মিলগুলির অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ছাঁটাই করতে হবে এবং বিজেএমসি-র অধীনস্থ মিলগুলিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানা থেকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করতে হবে। এসব পদক্ষেপসহ অন্যান্য সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বব্যাংক নগদ ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। বাংলাদেশ সরকার এসব সুপারিশ গ্রহণ করে ৪টি মিল বন্ধ করে দেয়, রপ্তানি ক্ষতিপূরণের জন্য তহবিল প্রদান করে এবং অতিরিক্ত শ্রমশক্তি ছাটাই করার জন্য বিজেএমসি-এর মিলগুলিকে আর্থিক সাহায্য প্রদান করে। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন সত্ত্বেও ১৯৯২-৯৫ সাল পর্যন্ত বিজেএমসি এবং বিজেএমএ-এর অধীনে পরিচালিত মিলগুলি বাণিজ্যিকভাবে বিকশিত হতে এবং টিকে থাকতে সক্ষম হয় নি বরং লোকসানের সম্মুখীন হতে থাকে। ১৯৯১-২০০০ সাল পর্যন্ত বিজেএমসি-এর অধীনে পরিচালিত মিলগুলির মোট লোকসানের পরিমাণ ছিল ৬৯৫.৫৫ কোটি টাকা। ২০০২ সালের জুন মাসে সরকার এই খাতের সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজি জুট মিল বন্ধ ঘোষণা করে। নিকট অতীতের অভিজ্ঞতাও প্রায় অনুরূপ। ২০০১-০২ থেকে ২০০৬-০৭ সাল পর্যন্ত বিজেএমসি-এর অধীনে পরিচালিত মিলগুলির প্রায় ১৯১১ কোটি টাকা লোকসান হয়। বেসরকারি খাতের মিলগুলিও খুব একটা ভাল চলছিল না। ১৯৯৮ সালে এই খাতের ৪১টি পাটকলের মধ্যে ৩টি বন্ধ করে দেয়া হয় এবং দুটিকে লে-অফ ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব মিলের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ছিল ১২ বিলিয়ন টাকারও বেশি। এভাবে জাতীয়করণকৃত শিল্পসমূহের সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যক্তি মালিকানায় রূপান্তরও কোনো সমাধান দিতে পারছে বলে মনে হয় না।

যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের পাটশিল্প বিভিন্ন সমস্যার মোকাবেলা করে আসছে: (ক) স্থবিরতা বা রপ্তানি মূল্য হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি; (খ) পুরাতন যন্ত্রপাতির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস; (গ) শ্রমিক সমস্যা; (ঘ) বহুবিস্তৃত দুর্নীতি; (ঙ) অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং এর ফলে পুঞ্জীভূত বিশাল পরিচালন লোকসান প্রভৃতি বহুবিধ কারণে এক সময়ের একটি গতিশীল শিল্প বর্তমানে ‘অস্তমিত’ শিল্প হিসেবে অভিহিত হচ্ছে এবং সোনালি অাঁশ তার ঔজ্জ্বল্য অনেকাংশে হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বর্তমানেও পাটশিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে: পাটশিল্পের ৪০% উৎপাদন ক্ষমতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও এই শিল্প প্রায় দেড় কোটি লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। বীমার অর্থ হিসেবে ১০০ কোটি টাকা প্রদান করে এবং প্রায় সমপরিমাণ টাকা খরচ হিসেবে কাঁচাপাটের অভ্যন্তরীণ পরিবহণে ব্যয় করতে পারে, ১৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে এবং ৩০ লক্ষ টাকার কাঁচাপাট ব্যবহার করতে পারে। এভাবে পাটশিল্প লক্ষ লক্ষ পাটচাষীর জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।  [এম মোফাখখারুল ইসলাম]

গ্রন্থপঞ্জি  AZM Iftikhar-ul-Awwal, The Industrial Development of Bengal 1900-1939 (New Delhi 1982), Omkar Goswami, Industry, Trade and Peasant Society: The Jute Economy of Eastern India, 1900-1947 (New Delhi 1991); M Serajul Huq Khan, Bangladesh Jute Industry (Post Liberation Episode).