পাটিয়াল


পাটিয়াল  বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের বিভিন্ন স্থানে পাটি, মাদুর প্রভৃতি তৈরিতে নিয়োজিত একটি কারিগর শ্রেণী। পাটি শব্দ থেকেই পাটিয়াল শব্দের উৎপত্তি। পাটি তৈরিতে বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়। খড় বা বাঁশ থেকে সাধারণত কালো রঙের মাদুর তৈরি করা হয়। বেত থেকে উন্নতমানের পাটি তৈরি করা যায়। আর খেজুর গাছের পাতা থেকেও এক ধরনের পাটি তৈরি করা হয়। মোটা এবং অনুন্নত পাটিকে বলা হয় মোটাপাটি এবং পাতলা আবরণযুক্ত পাটিকে বলা হয় শীতলপাটি। সিলেট, নোয়াখালী ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে ব্যাপক পরিমাণে শীতলপাটি তৈরি হয়।

পাটিয়াল

পাটি বা মাদুর তৈরিতে ব্যবহূত গাছকে বলা হয় মারাথা। স্থানীয়ভাবে একে আবার মুর্তাবেত, মোড়াবেত, পাটিবেত প্রভৃতি নামে চিহ্নিত করা হয়। সিলেট, ময়মনসিংহ, পটুয়াখালী, নোয়াখালী এবং টাঙ্গাইলে এই গাছ প্রচুর উৎপাদিত হয়। এটি নিচু, স্যাঁতসেতে জমিতে ভাল জন্মায়। জুন-জুলাইয়ের দিকে গাছে ফুল আসে এবং সেপ্টেম্বরের দিকে যখন এর কান্ড পরিপক্ক হয় তখন সবুজ থাকা অবস্থায়ই তা কেটে ফেলা হয়।কাটার পর ডালপালাসহ ভেলার সাথে ঝুলিয়ে বা পুরোপুরি নিমজ্জিত করে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়, পরে সাদামাটা মাদুর, জায়নামায, দেয়াল মাদুর প্রভৃতি তৈরির জন্য উপযোগী করে তোলা হয়। ফুল, মসজিদ, বাড়িঘর, প্রাণী বা পাখিদের ছবি দ্বারা অনেক সময় পাটিকে কারুকার্যময় করা হয়।

চিত্রানুযায়ী পাটিকে বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়, যেমন খেলাঘর, আসমানতারা, জমিনতারা, তাজমহল প্রভৃতি। পাটি বা মাদুর ছাড়াও পাটিয়ালরা ওয়ালম্যাট, হাতব্যাগ, ঝোলানো ব্যাগ, মানিব্যাগ, টেবিলম্যাট প্রভৃতি তৈরি করে। কিছু কিছু পাটিতে এই বুননের সাথে রুপার পাত বা হাতির দাঁত সংযোজন করে সুসজ্জিত করা হয়। ৬ ফুট  ৯ ফুট আয়তনের এ ধরনের একটি পাটির দাম ৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এ ধরনের একটি পাটি তৈরিতে প্রায় দু্ই হতে আড়াই বছর সময় লাগে।

কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় পাটিয়ালদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেলেও তারা মোটামুটি সারাদেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মাদুর তৈরির জন্য বিখ্যাত স্থানসমূহের মধ্যে রয়েছে সিলেটের রাজনগর, বালাগঞ্জ, বড়লেখা ও মোল্লাবাজার, নোয়াখালীর সোনাগাজী, বরিশালের রামপুর, পটুয়াখালীর স্বরূপকাঠি, ফরিদপুরের সালাইর এবং মোহনগঞ্জের জৈনপুর। বর্তমানে বাংলাদেশে পাটিয়ালদের সংখ্যা প্রায় দশ হাজার।

পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রেই পাটিয়ালদের পেশা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলে। সিলেটের পাটিয়ালদের অধিকাংশই মহিলা। ফলে দক্ষ ও সুনিপুণ একজন মহিলা পাটিয়ালের বিয়ের বাজারে বেশ কদর থাকে। পাটিয়ালরা হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই হয়ে থাকে। হিন্দু পাটিয়ালরা মোটামুটি সবাই বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী। অপরপক্ষে মুসলমানরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুসারী।  [গোফরান ফারুকী]