পাকিস্তান


পাকিস্তান  দক্ষিণ এশিয়া থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের ফলে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। গোটা ঔপনিবেশিক শাসনের কালপর্বে বিশেষ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির দরুন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র নেতৃত্বে ভারতের মুসলমানেরা একটি নিজস্ব রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার কথা ভাবতে শুরু করে। কিন্তু কংগ্রেস দেশবিভাগের সকল প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্র ও দায়িত্বশীল সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানায়। ১৯৪০ সাল থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ক্রমেই জোরদার হয়ে উঠছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি মুসলিম লীগভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভিন্নমুখী মনোভাব গ্রহণ করে। ব্রিটিশের অগ্রাধিকার ছিল প্রতিরক্ষার এবং ভারতীয় রাজনীতিকদের সঙ্গে পূর্বাহ্ণ আলোচনা ছাড়াই তারা আকস্মিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে। প্রতিবাদে প্রদেশের কংগ্রেস মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেন। ফলত ব্রিটিশ রাজের বিরোধিতার দরুন অধিকাংশ কংগ্রেস নেতা জেলে আটক থাকায় কংগ্রেস ব্রিটিশের উপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুযোগ হারায়। মুসলিম লীগ অবশ্য ব্রিটিশদের প্রতি সহযোগিতার মাধ্যমে এসময় নিজেকে সংহত করার প্রয়াস পায়। ব্রিটিশরা ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর আনুগত্য ও বীরত্বের প্রশংসা করত, যাদের অনেকেই ছিল পাঞ্জাবী মুসলমান। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মুসলিম ভোটে মুসলিম লীগের মাত্র ৪.৫ শতাংশ আসন লাভের প্রেক্ষিতে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ৯০ শতাংশ আসন লাভ ছিল এক চমকপ্রদ সাফল্য। বস্ত্তত ১৯৪৬ সালের নির্বাচন ছিল পাকিস্তানের জন্য মুসলমানদের একটি গণভোট। লন্ডনে অতঃপর এটি সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের যেকোন আলোচনায় থাকবে তিনটি পক্ষ, ব্রিটিশ, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ।

এশিয়ায় জাপানীদের অগ্রগতি ও ওয়াশিংটনের প্রবল চাপের মুখে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের যুদ্ধকালীন কোয়ালিশন সরকার আপসের একটি প্রস্তাবসহ স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে ভারতে পাঠায়। পরিকল্পনা ছিল, যুদ্ধশেষে ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশগুলো এবং স্বেচ্ছায় যোগদানে ইচ্ছুক দেশিয় রাজ্যগুলো নিয়ে ভারতের জন্য স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য এবং যারা চাইবে না তাদের জন্য তদ্রূপ একটি পৃথক রাজ্য গঠন।

১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে গান্ধীর নেতৃত্বে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারত ছাড় আন্দোলন শুরু হয়। জিন্নাহ্ এ আন্দোলনের নিন্দা করেন। প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্রিটিশ সরকার প্রায় ৬০,০০০ লোক গ্রেফতার এবং কংগ্রেসকে বেআইনি ঘোষণা করে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৪৪ সালে জিন্নাহ্ ও গান্ধীর আলোচনা গান্ধী ও বড়লাটের মধ্যকার আলোচনার মতোই ব্যর্থ হয়।

১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে লেবার পার্টি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন হয়। ইতোমধ্যে ভারতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছিল এবং ১৯৪৫ সালে বোম্বেতে নৌবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ কর্মকর্তাগণ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, একটি অনিচ্ছুক অধীন দেশকে জোরপূর্বক আটকে রাখার একমাত্র বিকল্প হলো স্বাধীনতা দান। ১৯৪৫ সালে ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধরন নির্ধারণের জন্য ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সিমলায় মিলিত হন। কিন্তু কোনো মতৈক্যে পৌঁছান সম্ভব হয় না।

প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আইনসভার নতুন নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং স্বায়ত্তশাসনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে ৩ সদস্যের একটি দল (ক্যাবিনেট মিশন) ব্রিটেন থেকে ভারতে আসে। ক্রিপস প্রস্তাবিত ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা ছিল অবিভক্ত ভারতীয় ইউনিয়নের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের শেষ ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। মিশন তিন স্তরে যুক্তরাষ্ট্রীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার প্রস্তাব করে যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক, মুদ্রা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় সীমিত থাকবে এবং অন্যান্য যাবতীয় ক্ষমতা প্রদেশগুলোর কাছে হস্তান্তরিত হবে। পরিকল্পনাটিতে গঠিতব্য অঞ্চলগুলোও উল্লিখিত ছিল: সামান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাসহ উত্তর-পূর্ব বাংলা ও আসাম, সম্পূর্ণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাসহ উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান এবং সম্পূর্ণ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাসহ তৃতীয় অঞ্চল অর্থাৎ ভারতের অবশিষ্ট অংশ। এই আঞ্চলিক বর্ণনা থেকে নতুন পাকিস্তানের সীমানা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। মিশনের প্রস্তাবে আরও উল্লেখ ছিল যে আইন প্রণয়নকালে কোনো সম্প্রদায় তার স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে পারে মনে করলে তাতে ভেটো দিতে পারবে। পরিশেষে মিশন দ্রুত অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব করে।

১৯৪৬ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ প্রধান দুটি দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও মুসলিম লীগ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে মুসলিম আসনগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। প্রথমে মনে হয়েছিল ভিন্নমত সত্ত্বেও উভয় দলই ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, কিন্তু নেতৃবৃন্দের আচরণে অচিরেই তিক্ততা ও অবিশ্বাস দেখা দেয়। নেহেরু এই বলে কার্যত পরিকল্পনার সাফল্যের সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দেন যে, কংগ্রেস ব্রিটিশের চুক্তিতে শৃঙ্খলিত থাকবে না এবং তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে কংগ্রেস নবগঠিত গণপরিষদে নিজ আদর্শানুগ সংবিধান প্রণয়নে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ ব্যবহার করবে।

একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনও বিতর্কিত ছিল। জিন্নাহ মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে সমতার দাবি উত্থাপন করলে ভাইসরয় তা প্রত্যাখ্যান করেন। মুসলিম লীগ অতঃপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বর্জন করে এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ মুসলমান মন্ত্রী নিয়োগের অধিকার সম্পর্কে পরস্পরের সঙ্গে বাদানুবাদে লিপ্ত হয়, যে বিশেষ অধিকারটি একমাত্র মুসলিম লীগের বলেই জিন্নাহ্ দাবি করেন।

মুসলিম লীগকে বাদ দিয়েই ভাইসরয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে অগ্রসর হলে জিন্নাহ্ ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালনের আহবান জানান। ফলত, ভারতে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলা ও বিহারে দাঙ্গা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। কলকাতায় মুসলিম নিধনের সংবাদে গান্ধী কলকাতায় ছুটে আসেন এবং মুসলিম লীগ দলীয় মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহয়াওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে দাঙ্গা প্রশমনের চেষ্টা করেন। উভয়ের মিলিত চেষ্টায় বাংলায় দাঙ্গা বন্ধ হলেও অন্যত্র তা ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রোধের উদ্দেশ্যে জিন্নাহ্ অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদানে মুসলিম লীগকে অনুমতি দিলেন। কিন্তু গৃহযুদ্ধের আশঙ্কাতাড়িত সরকার অতঃপর মন্ত্রিবর্গের মতভেদের দরুন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

১৯৪৮ সালের জুন মাসের মধ্যেই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশসহ লর্ড  মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাইসরয় নিযুক্ত হন। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এট্লি কমন্সসভায় ভারতের স্বাধীনতা ও দেশবিভাগ সংক্রান্ত একটি বিল উত্থাপন করেন এবং ১৪ জুলাই ভারতের স্বাধীনতা আইন গৃহীত হলে উপমহাদেশে দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়, আর দেশিয় রাজ্যগুলো যেকোন একটি ডোমিনিয়নে যোগদানের স্বাধীনতা পায়। ভারত বিভাগ পরিকল্পনায় বলা হয় যে, পাঞ্জাব ও বাংলার মুসলিমপ্রধান সন্নিহিত জেলাগুলো পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে। আসামের সিলেট জেলায় একটি গণভোট অনুষ্ঠানের ফলে সেটি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং কংগ্রেসের বর্জন সত্ত্বেও প্রদেশটি পাকিস্তানের সঙ্গে যোগদানের সিদ্ধান্ত  নেয়।

১৯৪৭ সালের সারা গ্রীষ্মকাল ব্যাপী সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে থাকলেও দিল্লিতে দেশভাগের প্রস্ততি অব্যাহত থাকে। সম্পদ ভাগ, সীমান্ত চিহ্নিত করার জন্য সীমানা কমিশন গঠন এবং ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর অপসারণ সম্পন্ন হয়। সামরিক বাহিনী দুটি বাহিনীতে পুনর্গঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যেকোন একটি দেশ বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়। যেসব ব্রিটিশ কর্মকর্তা এদেশে থাকার সুযোগ পাবে না তাদের ক্ষতিপূরণসহ অবসর প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।

প্রাথমিক সমস্যাবলি  ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাষ্ট্রে ইসলামের ভূমিকা। পাকিস্তান হবে উপমহাদেশের মুসলমানদের একটি ধর্মনিরপেক্ষ আবাসভূমি, নাকি শরীয়া নিয়ন্ত্রিত একটি ইসলামী রাষ্ট্র, যেখানে অমুসলমানরা থাকবে সংখ্যালঘু নাগরিক হয়ে? দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারগুলোর মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের সমস্যা।

অপরাপর সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সহিংসতা ও উদ্বাস্ত্ত সমস্যা। মুসলমানরা ভারত থেকে এবং হিন্দু ও শিখরা পাকিস্তান থেকে পালাচ্ছিল। প্রায় ১০ লক্ষ মুসলমান ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষত বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ববাংলায় প্রবেশ করে। পাঞ্জাব ও পূর্ববাংলায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ লেগেই ছিল এবং ধর্মকে রাষ্ট্রীয় নয় বরং ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার জিন্নাহ্র অনুরোধ উপেক্ষিত হয়েছিল। এতে অন্যূন ২ লক্ষ ৫০ হাজার নিহত এবং ১ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ২ কোটি ৪০ লক্ষ লোক উদ্বাস্ত্ত হয়েছিল। ১৭ আগস্ট জনৈক ব্রিটিশ বিচারপতির নেতৃত্বাধীন একটি কমিশন কর্তৃক সীমানা নির্ধারণের আগে নতুন দুটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সীমানাও কেউ জানত না।

দেশবিভাগ ও আনুষঙ্গিক বিশৃঙ্খলার দরুন নতুন রাষ্ট্র কঠিন অর্থনৈতিক সমস্যারও মুখোমুখি হয়। অধিকন্তু পাকিস্তানের ছিল বাণিজ্যিক পরিবহণের সমস্যা। তবে দেশের দুই অংশের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণই কঠিনতম সমস্যা হয়ে উঠেছিল।

শাসনতান্ত্রিক সূচনা  মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তান আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা জিন্নাহ্কে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল এবং তিনি ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার চেয়েছিলেন। স্বাধীনতার মাত্র ১৩ মাস পর ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জিন্নাহ্ মৃত্যুবরণ করেন, উত্তরসূরীদের জন্য রেখে যান পাকিস্তানির আত্মপরিচয়ের সমস্যা মোকাবিলার দায়িত্ব।

জিন্নাহর উত্তরসুরী লিয়াকত আলী খান নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নতুন জাতিকে একটি সংবিধান প্রদানে ব্যর্থ হন, কেননা মুসলিম লীগ বা গণপরিষদ কোনটিই ইসলামের ভূমিকা ও প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসনের সীমা সংক্রান্ত সমস্যা ও মতবিরোধ সংসদীয় পদ্ধতিতে নিরসনের যোগ্য ছিল না। ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে রাওয়ালপিন্ডিতে আততায়ীর হাতে লিয়াকত আলী নিহত হলে খাজা নাজিমুদ্দিন তাঁর স্থলবর্তী হন; কিন্তু অচিরেই তাঁকে গভর্নর জেনারেল করা হয়।

কংগ্রেস যেভাবে স্বাধীনতা পরবর্তী ভূমিকার জন্য নিজেকে প্রস্ত্তত করেছিল, মুসলিম লীগ তা করে নি। কংগ্রেস স্বাধীনতার পূর্বেই সাংবিধানিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, এমনকি পররাষ্ট্র বিষয়ক নীতিমালাও নির্ধারণ করেছিল এবং যথাসময়ে সেগুলো প্রয়োগে প্রস্ত্তত ছিল। কিন্তু কার্যকর সরকার গঠনের জন্য মুসলিম লীগের প্রস্ত্ততি ছিল দুর্বল।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্বপাকিস্তানে যুক্তফ্রন্টের নিকট মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়ের মধ্যে রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে লীগের লক্ষ্যহীনতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। লক্ষণীয়, স্বায়ত্তশাসনের সমর্থক সাবেক দুই মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও ফজুলল হকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও কৃষক-শ্রমিক দলের কোয়ালিশনের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল। ইসলামী দলগুলোও, বিশেষত জামায়াত-ই-ইসলামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত এলাকার প্রতিনিধিত্বকারী বিভাগপূর্ব ভারতীয় গণপরিষদের সদস্যদের নিয়েই পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল। ৮০ সদস্যবিশিষ্ট পরিষদটি পাকিস্তানের আইন প্রণয়নকারী হিসেবে কাজ করত, কিন্তু প্রস্তাবিত সংবিধানের লক্ষ্য নির্ধারণে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারত না। সে সময় পর্যন্ত বিদ্যমান ক্ষমতাবণ্টন ব্যবস্থায় পূর্ববাংলার নেতৃবৃন্দ অসন্তুষ্ট ছিলেন।

লিয়াকত আলী নিহত হওয়ার পর সমস্যাবলির কোনটিরই সমাধান হয় নি, বরং গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ এবং প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের মধ্যে প্রবল বিরোধ দেখা দেয়। উল্লেখ্য, গোলাম মোহাম্মদ ছিলেন সিভিল সার্ভিসের একজন পাঞ্জাবী আমলা এবং নাজিমুদ্দিন ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এবং সে সময়ে পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী।

১৯৫৫ সালে পুনরুজ্জীবিত গণপরিষদের অধিবেশন আহূত হয়। পূর্ববর্তী গণপরিষদ থেকে এটির গঠনগত পার্থক্য ছিল, কেননা এতে মুসলিম লীগ সদস্যসংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পেয়েছিল এবং পূর্ববাংলার যুক্তফ্রণ্ট সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন যাদের প্রধান দাবি ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন। ১৯৫৫ সালে স্বাস্থ্যের অবনতি এবং জেনারেল ইস্কান্দার মির্জার উত্থানের ফলে গভর্নর জেনারেল পদ থেকে গোলাম মোহাম্মদ ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।

১৯৫৬ সালে গণপরিষদ একটি সংবিধান পাস করে, পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হয় এবং একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা যোগায়, গণপরিষদের নতুন নামকরণ হয় আইনসভা। উল্লেখ্য, পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় আইনজীবী-রাজনীতিকরাও স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে মুসলিম জাতীয়তার ধারণা উপস্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ ব্রিটিশ সংসদীয় ঐতিহ্যের নীতিমালা ও আইনি নজিরগুলো ঠিকই ব্যবহার করতেন।

মৌলিক গণতন্ত্র  কেন্দ্র ও পূর্ব-পাকিস্তানে সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করেন। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনব্যবস্থা ছিল এক ধরনের ‘প্রতিনিধিত্বমূলক একনায়কতন্ত্র’; কিন্তু ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ হিসেবে ১৯৫৯ সালে প্রবর্তিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল আইয়ুব খানের পরিভাষায় পাকিস্তানের স্বকীয় ‘প্রতিভা’।

পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার ফল হিসেবে ১৯৬২ সালে একটি নতুন সংবিধান ঘোষিত হয়। আইয়ুব খান একটি আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্র পাকিস্তানের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করতেন না, বরং স্বতন্ত্র প্রশাসনিক একক ‘মৌলিক গণতন্ত্র’কে অধিকতর উপযোগী ভাবতেন, যেগুলো তাঁর ভাষায় ব্যাপক অশিক্ষিত মানুষকে ‘তাদের সামর্থ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ’ সীমিত প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে জড়িত করে শিক্ষিত করে তুলতে পারে। মৌলিক গণতন্ত্র স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ছিল না। এর উদ্দেশ্য ছিল আইয়ুব প্রশাসনের ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি দ্বিমুখী যোগসূত্র সৃষ্টি এবং মন্থর গতিতে সামাজিক পরিবর্তনের অগ্রগতি সাধন।

মৌলিক গণতন্ত্র পদ্ধতি পাঁচ-স্তরবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। ইউনিয়ন কাউন্সিল ছিল সর্বনিম্ন ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর, প্রায় ১০,০০০ জনসংখ্যা অধ্যুসিত গ্রামগুলোর জন্য একটি। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ১০ জন নির্বাচিত এবং ৫ জন মনোনীত সদস্য থাকত এবং তাদের মৌলিক গণতন্ত্রী বলা হতো। ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব ছিল স্থানীয় কৃষি ও সামাজিক উন্নয়ন এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা। এগুলো স্থানীয় প্রকল্পের জন্য স্থানীয়ভাবে কর ধার্য করতেও পারত। অন্যান্য স্তর রাজনৈতিকভাবে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

১৯৬৯ সালে আইয়ুব খান ও তাঁর ব্যবস্থার পতন পর্যন্ত সময়কালে মৌলিক গণতন্ত্র পদ্ধতি দৃঢ়মূল হতে পারে নি বা এর উদ্দেশ্যও সাধন করতে পারে নি। এভাবে ব্রিটিশ সাংবিধানিক আইনে প্রশিক্ষিত কিছুটা প্রশাসনিক জ্ঞানসম্পন্ন রাজনীতিকদের একটি নতুন শ্রেণীর উদ্ভব ঘটত কিনা তা জানার আর অবকাশ ঘটে নি। জাতীয় সংহতির প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্রামীণ জনগণকে সংগঠিত করতেও এ পদ্ধতি তেমন সফল হয় নি। এতে একক গুরুত্ব পেয়েছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণ। মৌলিক গণতন্ত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব বেড়েছিল এবং পশ্চিমাঞ্চলে জমিদার ও বড় বড় শিল্পপতির ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ ছিল।

সংসদীয় পদ্ধতির পতন  ১৯৫৬ সালের সংবিধানে গৃহীত সংসদীয় ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল পাকিস্তানে ছিল না। জাতীয় গণতান্ত্রিক দল হিসেবে গড়ে উঠার উপযুক্ত একমাত্র দল মুসলিম লীগও ক্রমেই মর্যাদা হারাচ্ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানে সিন্ধু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ পাঞ্জাবের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভুত্ব মেনে নিতে পারে নি এবং আগের বছর গণপরিষদে গৃহীত ‘এক-ইউনিট’ পরিকল্পনার বিরোধী ছিল। একক প্রদেশ পরিকল্পনায় পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও পাঞ্জাব পশ্চিম পাকিস্তান নামের একটি একক প্রশাসনিক ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত হয়, আর এভাবে নতুন আইনসভা জনসংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব-পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের সমতা সৃষ্টির প্রয়াস পায়।

১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ ও মুসলিম লীগের বিদ্রোহী নেতা-কর্মীদের সমন্বয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের নবগঠিত রিপাবলিকান পার্টিকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রে একটি কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। সোহরাওয়ার্দী পূর্ব-পাকিস্তানে অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি ততটা মজবুত ছিল না। এক-ইউনিট পরিকল্পনার পক্ষে অটল ভূমিকার দরুণ সোহরাওয়ার্দী সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানে সমর্থন হারান।

১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ১৯৫৬ সালের সংবিধান স্থগিত ও সামরিক আইন জারি করেন এবং ১৯৫৯ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের তফশিল বাতিল করে দেন। রাজনীতিকদের ব্যাপারে সন্দিহান বেসামরিক আমলাতন্ত্রও মির্জাকে সমর্থন যোগায়। তা সত্ত্বেও ২৭ অক্টোবর মির্জা ক্ষমতাচ্যুত ও লন্ডনে যাবজ্জীবন নির্বাসিত হন। সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন।

আইয়ুব যুগ  ১৯৫১ সালের জানুয়ারি মাসে আইয়ুব খান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে জেনারেল স্যার ডগলাস গ্রেসীর স্থলবর্তী হন। এ পদে তিনিই ছিলেন প্রথম পাকিস্তানি। তাঁর চাকুরি জীবন তেমন উজ্জ্বল না হলেও এবং কোনো যুদ্ধে নেতৃত্ব না দিলেও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ও সুযোগ্য সেনানায়ককে এড়িয়ে তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। দক্ষ প্রশাসকের খ্যাতি, রাজনৈতিক উচ্চাশা ও শক্তিশালী কোনো দলের সমর্থন তাঁর ছিল না। অখ্যাত পাখতুন গোষ্ঠীর একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসার কারণে অভ্যন্তরীণ শক্তিবলয়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ না-থাকার জন্যই সম্ভবত তিনি সকল পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য ছিলেন।

কিন্তু পদোন্নতি লাভের স্বল্পকালের মধ্যেই আইয়ুব খান এক শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। সম্ভবত অন্য কোনো পাকিস্তানির তুলনায় আইয়ুব খান মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা লাভে এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটগঠনে অধিকতর সচেষ্ট ছিলেন। সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং ১৯৫৪ সালে কিছুকাল প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকার সুবাদে তিনি সামরিক বাহিনীর স্বার্থবিরোধী যেকোন সরকারি নীতিতে ভেটো প্রদানের ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।

১৯৫৮ সালে পারিবারিক ও বিবাহ আইন সংস্কারের উদ্দেশ্যে একটি আইন কমিশন গঠিত হয়। উক্ত কমিশনের রিপোর্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আইয়ুব খান ১৯৬১ সালে পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ জারি করেন। এ আইনে বহুবিবাহের সুযোগ সীমিত করা হয় এবং বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ ‘নিয়ন্ত্রিত’ হওয়ায় নারীদের আইনগত অধিকার পূর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পায়। এই মানবিক পদক্ষেপকে পাকিস্তানের নারী সংগঠনগুলো জোরালো সমর্থন জানায়।

আইয়ুব খান কর্তৃক অর্থনৈতিক উন্নয়নের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পায়। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার অর্থাৎ ‘সবুজ বিপ্লব’ সাধনের জন্য ভূমিসংস্কার, জোতজমি একত্রীকরণ ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে পল্লীঋণ কর্মসূচি ও কর্মসংস্থান প্রকল্প, কৃষিপণ্যের সংগ্রহমূল্য বৃদ্ধি, কৃষিখাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ এবং বিশেষত উন্নতমানের বীজ সরবরাহের ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল।

১৯৬২ সালের সংবিধান  ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান দ্রুত সাংবিধানিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৬০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ১১ সদস্যের একটি সাংবিধানিক কমিশন গঠিত হয়। কমিশন কর্তৃক প্রত্যক্ষ নির্বাচন, শক্তিশালী আইন ও বিচার বিভাগ, স্বাধীন রাজনৈতিক দল ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিতকরণ প্রভৃতি সুপারিশ আইয়ুব সরকারের দর্শনের বিরোধী হওয়ায় তিনি অপর কয়েকটি কমিটিকে সুপারিশগুলো পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।

১৯৬২ সালের সংবিধানে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকলেও মূল ভাষ্যে ইসলামী শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যাপক বিরোধিতার মুখে পরবর্তীকালে আয়ুব খান শব্দটি পুনরায় যুক্ত করেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হবেন একজন মুসলমান এবং সরকারকে কোরআন সুন্নাহ অনুযায়ী দেশের সকল আইনকানুন সংশোধনে সহায়তার জন্য ইসলামী ভাবাদর্শী একটি উপদেষ্টা পরিষদ এবং ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়েছিল। এ দুটি সংস্থাই ছিল উপদেষ্টামূলক এবং এগুলোর সদস্যরা প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত হতেন, ফলত উলামাদের ক্ষমতার কোন ভিত্তি ছিল না।

১৯৬২ সালের সংবিধানে আইয়ুব খান স্বীয় প্রাধান্য কিছুটা অটুট রাখতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার গঠনের দলিলেও তিনি আইনজীবী-রাজনীতিকদের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন এবং সহযোগী সামরিক কর্মকর্তাদের হাতে ক্ষমতা প্রত্যর্পণ করেছেন। শাসনকালের প্রথম কয়েক বছর আইয়ুব খান শাসনকার্যে দুটি প্রধান ধারা প্রয়োগে মনোযোগী ছিলেন : ক্ষমতা সংহতকরণ এবং বিরোধীদের ভীতিপ্রদর্শন। অর্থনৈতিক, আইনগত ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ পরির্বতনের মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার ভিত্তি স্থাপন করতেও চেয়েছিলেন।

নিজ শাসনামলকে জনপ্রিয় করার প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে আইয়ুব বিরোধীদেরও কোণঠাসা করেছিলেন। তিনি জনসমক্ষে নিজের একটি বিশেষ ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চাইতেন এবং প্রায়শ ‘জনগণের সঙ্গে সাক্ষাতের’ উদ্দেশ্যে সফরে বেরুতেন। পূর্ব-পাকিস্তানের কিছু অভাব অভিযোগ নিরসনের ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তিনি যথাসম্ভব সিভিল সার্ভিসের বাঙালি সদস্যদের পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োগ দিয়েছিলেন যেখানে ইতিপূর্বে অনেকেই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের যারা এ অঞ্চলের সমস্যা, জনমত বা ভাষা বুঝত না। অতঃপর ঢাকা পাকিস্তানের বিধানিক রাজধানী এবং ইসলামাবাদ প্রশাসনিক রাজধানী ঘোষিত হয়। পরিকল্পনা কমিশনের মতো কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থাগুলোকে ঢাকায় নিয়মিত বৈঠক করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পূর্ব পাকিস্তানে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও বেসরকারি বিনিয়োগ যথারীতি পশ্চিম পাকিস্তানেই অধিক ছিল। কিন্তু আইয়ুব প্রশাসন অত্যধিক কেন্দ্রীভূত থাকায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে তাঁর শাসনামলে যেটুকু উন্নয়ন ঘটেছিল তা ছিল মোটামুটি পশ্চিম পাকিস্তানেই সীমিত।

১৯৬৫ সালের যুদ্ধ  কুচের রান অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্বে অনির্ধারিত সীমানাসহ কতিপয় সীমান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ১৯৬৫ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ বাঁধে এবং শীঘ্রই তা কাশ্মীরের যুদ্ধবিরতি রেখা বরাবর ছড়িয়ে পড়ে। পারস্পরিক সম্মতিতে ব্রিটিশের পৃষ্ঠপোষকতা ও মধ্যস্থতায় কুচের রান অঞ্চলে সংঘর্ষের অবসান ঘটলেও কাশ্মীর বিরোধ অত্যধিক মারাত্মক ও ব্যাপকতর আকার ধারণ করে। ১৯৬৫ সালের বসন্তকালের গোড়ার দিকে ভারত ও জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরা ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের তৎপরতা বৃদ্ধির অভিযোগ উত্থাপন করে। পাকিস্তানের আশা ছিল যে, ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মীরীদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দিলে তারা তাতে সমর্থন যোগাবে, কিন্তু তেমন কিছু ঘটে নি। ভারত আগস্ট মাসে পাকিস্তান কর্তৃক দখলকৃত কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চল দখল করে নেয় এবং পাকিস্তান সেপ্টেম্বরে কাশ্মীরের দক্ষিণ পশ্চিমের চাম্ব এলাকা আক্রমণ করে। উভয় দেশেরই লক্ষ্য ছিল সীমিত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন কর্তৃক ভারত-পাকিস্তানে তাদের সামরিক সরবরাহ কমিয়ে দেয়ায় কারও পক্ষেই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাবার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে ২৩ সেপ্টেম্বর যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে তাসখন্দ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন এবং ফলত দু’দেশের বিরোধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে এবং পারস্পরিক সেনাপ্রত্যাহারের আহবান জানানো হয়। আইয়ুব খানের বাস্তব ও রাষ্ট্রনায়কসুলভ এ পদক্ষেপে পশ্চিম পাকিস্তানে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ছাত্র ও রাজনীতিকরা শহরাঞ্চলে আন্দোলন শুরু করে এবং অনেকেই গ্রেফতার হয়। তাসখন্দ ঘোষণা আইয়ুব প্রশাসনের রাজনৈতিক ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

ছয়দফা কর্মসূচি  ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় সম্মেলনে নিজ নিজ মতপার্থক্য ও সাধারণ স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আলোচনার জন্য সকল বিরোধী দল অংশগ্রহণ করে। আলোচনার মূল বিষয় ছিল তাসখন্দ ঘোষণা। অত্যন্ত লক্ষণীয় ছিল পূর্ব-পাকিস্তান থেকে অত্যল্প সংখ্যক রাজনীতিকের অংশগ্রহণ। সম্মেলনে আগত প্রায় ৭০০ প্রতিনিধির মধ্যে মাত্র ২১ জন ছিলেন পূর্ব-পাকিস্তানের। তারা এসেছিলেন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যিনি পূর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ছয়দফা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবি উত্থাপন করেন। ছয়দফার মধ্যে ছিল ফেডারেল ও সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, প্রাপ্তবয়স্কের সর্বজনীন ভোটে সংসদ-সদস্য নির্বাচন এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে আইনসভার প্রতিনিধি সংখ্যা নির্ধারণ, ফেডারেল সরকারের হাতে শুধু পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব প্রদান, প্রত্যেক প্রদেশের জন্য নিজস্ব মুদ্রা ও বাজেটের ব্যবস্থা, প্রতিটি ফেডারেল ইউনিটের হাতে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর এবং প্রতিটি ইউনিটের জন্য নিজস্ব আধা-সামরিক বাহিনী গঠন।

আইয়ুব খান ছয়দফা কর্মসূচি মোকাবিলায় কখনও সমঝোতা আবার কখনও দমননীতি চালাতে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ঢাকা ও খুলনায় সেনাবাহিনী তলব করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামাঞ্চলে কারফিউ কার্যকর হতো না; এবং স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা বুঝতে শুরু করে যে সরকারি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং বিক্ষিপ্ত গ্রামীণ বিদ্রোহের মুখে সরকার পিছু হটছে। ফেব্রুয়ারি মাসে আইয়ুব খান রাজবন্দিদের মুক্তি দেন এবং ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি ও অন্যান্যদের এক আলোচনার জন্য রাওয়ালপিন্ডিতে আমন্ত্রণ জানান, নতুন সংবিধান প্রণয়নের অঙ্গীকার করেন ও ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে নিজে অংশগ্রহণ না করার প্রতিশ্রতি দেন।

১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পুনরায় সামরিক আইন জারি করা হয়। সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন। ১৯৬২ সালের সংবিধান বাতিল ঘোষিত হয়, আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইয়াহিয়া খান অচিরেই প্রাপ্তবয়স্কের ভোটে গণপরিষদ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন।

ইয়াহিয়া খান ও বাংলাদেশ  নতুন প্রশাসন ডেপুটি ও প্রাদেশিক সামরিক আইন প্রশাসকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে যা বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পালন করত। জেনারেলরা ছিল ক্ষমতার অধিকারী এবং তারা আর নির্বাচিত ব্যক্তিবর্গ বা আমলা কারও সহায়ক শক্তি ছিল না, যেমনি তারা ছিল দেশের গোটা ইতিহাসের অধিকাংশ সময় জুড়ে। অতীতে সরকারের যেকোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রধানত সামরিক বাহিনীর আনুগত্যের উপরই নির্ভর করত। ইয়াহিয়া খান ও তাঁর সামরিক উপদেষ্টারা অবশ্য জাতীয় সমস্যা সমাধানে পূর্বসূরীদের অপেক্ষা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণে ব্যর্থ হলেন। বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি কিংবা বেসামরিক প্রশাসনের স্থলবর্তী হিসেবে সামরিক শাসকশ্রেণী গঠনের পদক্ষেপ সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্রের মধ্যকার সুসম্পর্ক ভেঙে ফেলে, অথচ তার উপরই প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করত। জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কোনো উল্লেখ্য উদ্যোগও নেওয়া হয় নি।

এ দুর্বলতাগুলো তৎক্ষণাৎ প্রকট না হলেও পূর্ব পাকিস্তানে দ্রুত সৃষ্ট সংকট থেকে তা স্পষ্টতর হয়ে উঠতে থাকে। ১৯৬৯ সালের ২৮ নভেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে ইয়াহিয়া খান সাংবিধানিক সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের প্রস্তাব ঘোষণা করেন। ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর গণপরিষদের সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ধার্য হয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে এ নির্বাচন ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায়। কথা ছিল, গণপরিষদ ১২০ দিনের মধ্যে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করবে এবং সর্বোচ্চ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করবে। ইয়াহিয়া খান খোলাখুলিই বলেন যে, ফেডারেল সরকারের কর ধার্যের ক্ষমতা প্রয়োজন, যা ছিল আওয়ামী লীগের ছয়দফা দাবির পরিপন্থী। তিনি সংবিধান অনুমোদনের অধিকারও সংরক্ষণ করেন। ১৯৭০ সালের ১ জুলাই এক-ইউনিট বিলুপ্ত ও ৪টি সাবেক প্রদেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ইয়াহিয়া খান জাতীয় সংসদে জনসংখ্যাভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের হারও নিশ্চিত করেন। এ ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান ১৬২ আসন (সংরক্ষিত অতিরিক্ত ৭ মহিলা আসন) এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো মোট ১৩৮ আসন (সংরক্ষিত অতিরিক্ত ৬ মহিলা আসন) লাভ করে।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনদিন পর প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। বিপুল সংখ্যক ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। ইয়াহিয়া সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন। পূর্ব-পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। এ পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০ আসনে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি পশ্চিম অঞ্চলে, বিশেষত পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে কোনো আসন লাভ করতে পারে নি। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) অধিকাংশ আসন লাভ করেছিল। মুসলিম লীগ ও ইসলামী দলগুলি পশ্চিমেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করতে পারে নি এবং পূর্ব পাকিস্তানেও কোনো আসন পায় নি।

সাংবিধানিক যেকোন বিষয়ের নিষ্পত্তি অতঃপর তিন ব্যক্তির মতামতের উপর নির্ভর করছিল: পূর্ব পাকিস্তানের শেখ মুজিবুর রহমান, পশ্চিম পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং মূল সামরিক সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী ইয়াহিয়া খান। রাষ্ট্রপ্রধান ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইয়াহিয়া খান অতঃপর ভুট্টো ও শেখ মুজিবকে মতৈক্যে আনার চেষ্টা চালান, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে শেখ মুজিব সরকার গঠনের দাবিতে অটল থাকায় এ চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এক্ষেত্রে ভুট্টোর বক্তব্য ছিল ভিন্নতর। তাঁর মতে পাকিস্তানে রয়েছে ‘দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা’। ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস্ পাটির গণপরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন বর্জনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান যিনি ইতিপূর্বে মুজিবকে ‘পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ আখ্যায়িত করেছিলেন, তিনিই বেসামরিক মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন এবং জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করেন। পূর্ব পাকিস্তানে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়; ধর্মঘট, বিক্ষোভ-সমাবেশ ও আইন অমান্য আন্দোলন প্রকাশ্য বিদ্রোহের রূপ পরিগ্রহ করে। শেখ মুজিব বাঙালিদের কর প্রদান বন্ধ রাখার এবং রেডিও টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের উপর আরোপিত সামরিক আইনের বিধিনিষেধ অমান্য করার আহবান জানান। ফলত, কেন্দ্রীয় সরকারের জারিকৃত বিধিনিষেধ পূর্ব পাকিস্তানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ইয়াহিয়ার কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক সুবিশাল জনসমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমান বস্ত্তত বাংলাদেশের স্বাধীনতাই ঘোষণা করেন। পরদিন থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়।

মার্চের শেষের দিকে মুজিব, ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খান ঢাকায় সমঝোতা বৈঠকে বসে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের সর্বশেষ প্রচেষ্টা চালান, আর একই সঙ্গে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল টিক্কা খান সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে থাকেন এবং সামরিক শক্তিবৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রীলঙ্কা হয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অতিরিক্ত সৈন্য আমদানির দাবি জানান। অবিশ্বাস ও সন্দেহজনক আবহে আলোচনা ভেঙে গেলে ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তান ফিরে যান।

সেদিনই টিক্কা খান তার জরুরি কার্যক্রম শুরু করেন। জনগণ ঢাকার সর্বত্র অবরোধ ও প্রতিবন্ধকতা গড়ে তোলে। সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিরোধের অন্যান্য স্থান আক্রমণ করে নির্বিচারে শিক্ষক, ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ চালিয়ে গণহত্যার সূচনা করে। শেখ মুজিবকে আটক করে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে বিচারের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথম কয়েক দিনের সামরিক দমননীতির মোকাবিলায় পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ অচিরেই স্বাধীনতা যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে এবং নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।  [আশা ইসলাম]