পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড


পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড  বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি সংস্থা। ১৯৭৭ সালে এক সরকারি অধ্যাদেশবলে এ বোর্ড গঠিত হয় এবং ১৯৭৮ সালের প্রথম থেকেই বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ ও বিদ্যুৎ বিতরণের কাজ শুরু করে। আরইবি-র প্রধান কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত হলেও সকল কর্মকান্ড সমবায়ভিত্তিতে গঠিত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসমূহের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলি স্বায়ত্তশাসিত। এর সদস্যরাই সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যুতের গ্রাহক এবং তারা সকলে সমান অধিকার ভোগ করে থাকেন। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন তৈরি কিংবা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় এদের সকলের মতামত গণতান্ত্রিক পন্থায় গৃহীত হয়ে থাকে। ২০১১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত আরইবির উদ্যোগে সারা দেশে মোট ৭০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গঠন করা হয়েছে। এসব সমিতির মাধ্যমে সারা দেশের ৬১টি জেলার ৪৩৩টি উপজেলার ৪৮,৭৪৬টি গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব সমিতির উদ্যোগে ২,২২,৭৮০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন ও ৪২৬টি সাব-স্টেশনের মাধ্যমে গৃহস্থালি, কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ মোট ৮৩,২৯,৬৫৭টি বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হয়েছে।

মাত্র সিকি শতাব্দী আগেও বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে বিদ্যুতের অস্তিত্ব ছিল অকল্পনীয় বিষয়। শুধু শহর অঞ্চলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। এখন গ্রাম-গঞ্জে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে যাওয়ায় গ্রামের মানুষ উপকৃত হয়েছেন, এতে তাদের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামবাংলার প্রায় ২,৪০,৫৪২টি সেচ পাম্প এখন বিদ্যুতে চলছে। এছাড়া পল্লী অঞ্চলের ১,৩২,৯৬৩টি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ইউনিট, ৮,০৭,৯৪১টি দোকানপাট ও বাণিজ্যিক সংস্থা এবং ১৩,৯৪২টি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের সংযোগ পেয়েছে। বাংলাদেশে পল্লী বিদ্যুতায়ন কর্মসূচি অন্যান্য উপযোগ-সেবা কার্যক্রমের তুলনায় প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসমূহে গড় সিস্টেম লসের হার প্রায় ১৪.৫০%। অবশ্য কোন কোন সমিতি এই হার ১০% এ কমিয়ে এনেছে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতি কঠোর আনুগত্য এবং সরকারি ও দাতা সংস্থাগুলির অটল সমর্থন পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কর্মকান্ডের চমৎকার মান অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। অবশ্য সমিতির সদস্য তথা গ্রাহকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। আরইবি’র এই অর্জনের নেপথ্যে ছিল পারফরম্যান্স টার্গেট এগ্রিমেন্ট চালু করা। এই এগ্রিমেন্টই প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সম্পাদিত কাজের মান বৃদ্ধিতে উৎসাহের সঞ্চার করেছে। চুক্তির আওতায় প্রত্যেক অর্থবছরের শুরুতে আরইবি প্রতিটি বিদ্যুৎ সমিতির সঙ্গে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ খাতে তাদের কর্ম সম্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা দর কষাকষির মাধ্যমে স্থির করে এবং একটি করে চুক্তি স্বাক্ষর করে। যদি কোন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হয়, তবে এর কর্মীরা তাদের মূল বেতনের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বোনাস হিসেবে পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে সংশ্লিষ্ট সমিতির কর্মীদের এক শতাংশ পর্যন্ত বেতন কর্তন করা হয়।

আরইবি’র অধীনস্ত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলি মূলত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনে পল্লী অঞ্চলে সরবরাহের ব্যবস্থা করে থাকে। কিন্তু পল্লী অঞ্চলের গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষে মেটানো সম্ভব না হওয়ায় পরবর্তীকালে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডও বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি পায়। ১৯৯৪ সালে আরইবি ও এর অধীনস্ত পাঁচটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অংশগ্রহণে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড বা আরপিসিএল নামে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তা ও নির্দেশনাক্রমে ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এ কোম্পানি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ১৯৯৯ সালে ৩৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়। এ প্রকল্পের সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী বছরে আরো চারটি নতুন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে অংশীদার করে প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়ন করা হয়। বর্তমানে ময়মনসিংহ পাওয়ার প্ল্যান্ট-এ ১৫০-১৫৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের আওতায় ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি স্টিম টারবাইন পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি নির্মিত হলে আরপিসিএলের ময়মনসিংহ পাওয়ার প্ল্যান্টের মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২১০ মেগাওয়াট।

২০১০ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সারা দেশের ৯টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় মোট ১২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। এসব কেন্দ্রের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২২৫.৫৫ মেগাওয়াট। এছাড়াও আরইবি’র অধীনস্ত ১৪টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ছোট আকারের পাওয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের জন্য চুক্তি করেছে। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত এসব কোম্পানির মধ্যে ৯টি কোম্পানি মিলিয়ে প্রতিদিন মোট সর্বনিম্ন ২৮.৭ মেগাওয়াট থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে শুরু করেছে।

এছাড়াও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন কয়েকটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নিজেরাও বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ১৯৯৮ সালে জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে প্রাথমিকভাবে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১, নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১, এই তিনটি সমিতির আওতায় ১১ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় স্থাপিত এ কেন্দ্রগুলির সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ উদ্যোগ সম্প্রসারিত হয়। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বাংলাদেশে সর্বপ্রথম নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্যোগী হয়। ১৯৯৬-৯৮ সালে ফরাসি অনুদানে নরসিংদী জেলার আওতায় মেঘনা নদীর কয়েকটি দুর্গম চরে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে একটি ৬২ কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি প্রমত্ত মেঘনা নদী পেরিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন স্থাপন করতে না পারায় এই বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে বরিশাল, কক্সবাজার, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জেও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ২০০৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত এসব কেন্দ্র থেকে পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ ৭৪৪ কিলোওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়।

পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী (১৯৯৭-২০০২) পরিকল্পনায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলার ব্যয়ে নিন্মলিখিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার কথা: ৬৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ৫০,০০০ কিমি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০ লক্ষ নতুন গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান এবং ১২,০০০ গ্রাম বিদ্যুতায়ন। এ সকল প্রকল্প সরকারের বিদ্যুৎ খাত পুনর্গঠন কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, যথা ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সর্বত্র বিদ্যুৎ কাঠামো বিস্তার করা, বিদ্যুৎ খাতকে অর্থনৈতিকভাবে তথা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক খাতে পরিণত করা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর দ্রুত ভাগ্যোন্নয়ন ও আর্থ-সামাজিক উন্নতি ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, কুয়েত, কানাডা, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, চীন, সৌদি আরব ও ফ্রান্সের সরকারসহ তেল রপ্তানিকারক দেশসমূহের সংস্থা ওপেক এবং কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে সহায়তা করেছে। এদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২০১১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সারা দেশের পল্লী অঞ্চলের ৪৫ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে।  [মাহবুবুল আলম]