পল্টন


পল্টন  ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঢাকা সেনানিবাস। একটি নতুন ক্যান্টনমেন্ট বা সেনানিবাস তৈরির উদ্দেশ্যে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ড’স (Charles Dawes) নওয়াবপুর ও ঠাটারী বাজার ছাড়িয়ে শহরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বেশ কিছু অংশ সংস্কার করেন। উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে সংস্কারকৃত স্থানেই স্থানান্তর করা হয় তেজগাঁও এলাকার বেগুনবাড়ি সেনানিবাসটি। পরিষ্কার করা জায়গাতে সিপাহিদের ছাউনি, অফিসারদের বাসস্থান এবং প্যারেড গ্রাউন্ডসহ প্রভৃতি তৈরি করা হয়। এ এলাকাটিই বর্তমানে পল্টন বা পুরানা পল্টন নামে পরিচিত। ড’স একাধারে এই নতুন সেনানিবাসটির নির্মাতা ও স্থপতি ছিলেন যদিও এর বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন করেন তার উত্তরসূরী হেনরি ওয়াল্টারস (Henry Walters) এবং সরকারি মিলিটারি বোর্ড।

ভৌগোলিক অবস্থানগতভাবে পল্টন এলাকাটি পুরানো পান্ডু নদীর একটি শাখার তীরে অবস্থিত ছিল। পল্টনে স্থানান্তরিত নতুন সেনানিবাসটি পরিবেশগত দিক দিয়ে অস্বাস্থ্যকর ছিল। উনিশ শতকের প্রথম দিকেই এর বেশিরভাগ অংশ পলিমাটি জমে ভরাট হয়ে যায়। ফলে এটি মশা, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার জন্য উপযুক্ত স্থানে পরিণত হয়। সিপাহি বা অফিসার কেউই এ রোগ থেকে রক্ষা পায়নি। এই জায়গাটি এমন অস্বাস্থ্যকর ছিল যে, ইউরোপীয় অফিসাররা এখানে তাদের নির্ধারিত কোয়ার্টারে বাস করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তাদেরকে শহরের মধ্যে ভাড়া করা বাড়িতে বাস করার অনুমতি দেয়া হয়। ১৮৪০ সালে ঢাকা ভ্রমণকারী কর্নেল ডেভিডসন-এর একটি বর্ণনায় পল্টন ক্যান্টনমেন্ট যে বসবাসের অযোগ্য ছিল তা জানা যায়। তিনি বলেন, ’খুব সবুজ ও সুন্দর কিন্তু রেজিমেন্টের সব অফিসারদের মধ্যে মাত্র একজন বা দুজন থাকেন সেনানিবাসের ভিতরে। বাকিরা জ্বরে ভোগে বা জ্বরের ভয়ে থাকেন শহরে’। ঢাকা সেনানিবাসের অস্বাস্থ্যকর অবস্থা এতই কুখ্যাতি অর্জন করেছিল যে, সেখানে বাদলি হওয়াকে সে যুগে একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বলে মনে করা হতো। উনিশ শতকের পত্রিকা দ্যা ঢাকা নিউজ এ প্রকাশিত একটি তথ্য থেকে জানা যায়, একজন সিপাহি সমুদ্র পাড়ি দিতে অস্বীকার করায় তাকে এমনি ধরণের শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। পল্টনে অবস্থিত সেনানিবাসের অস্বাস্থ্যকর বিষয়টি সমকালীন এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সাহিত্যেও স্থান পেয়েছে। ১৮৫১ সালে ঢাকার মানচিত্রে এ এলাকাটিকে উল্লেখ করা হয়েছে পল্টনের লাইন হিসেবে। ১৮৫২ সালে কলকাতায় একটি পত্রিকায় পল্টনকে অরণ্য, দুর্গন্ধযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর স্থান বলে বর্ণনা করা হয়।

অবশেষে ব্রিটিশ সরকার এলাকাটিকে পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ১৮৪০ এর দশকে সেনানিবাস লালবাগ দুর্গে স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়। উনিশ শতকের মধ্যভাগের পরও সেনানিবাসের কিছু অংশ ঐ এলাকায় ছিল। ১৮৫৯ সালের সার্ভেয়ার জেনারেলের  ঢাকার মানচিত্রে পল্টনকে একটি বিরাণ অঞ্চল হিসেবে দেখানো হয়েছে।

পল্টন থেকে সেনানিবাস অপসারিত হলে উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে এলাকাটির পরিচর্যার ভার দেয়া হয় ’মউনিসিপ্যাল কমিটি’র(১৮৪০) কাছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিটি এই বিস্তীর্ণ ভূমির কিছূ অংশে গড়ে তোলেন বাগান যা কোম্পানির বাগান নামে পরিচিত ছিল। বাকি অংশটি খোলা মাঠ হিসাবে ব্যবহূত হতে থাকে যা পরবর্তীতে ঢাকা কলেজের (১৮৪৬) ক্রিকেট মাঠ এবং খেলাধুলার একটি কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে। এখানেই অনুষ্ঠিত হতো কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া ও কুস্তি প্রতিযোগিতা। এ ছাড়াও সিপাহিরা এটিকে তাদের কুচকাওয়াজ-ময়দান, লক্ষভেদ অনুশীলন (Target Practice) এবং ছোট লাট ও বড় লাটদের পরিদর্শনের সময় সামরিক কলাকৌশল প্রদর্শনের ক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহার করত। উনিশ শতকের শেষার্ধে পল্টনের মাঠে মাঝে মাঝে জনসভা হতে শুরু করে।

হূদয়নাথ মজুমদার তাঁর স্মৃতিকথায় ১৮৬৪ সাল থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহরের যে চিত্র তুলে ধরেছেন তাতে পুরানা পল্টনের অবস্থানের কথা জানা যায়। তাঁর মতে, ’বাবু বাজার খাল ঢাকা শহরকে দুভাগে ভাগ করেছে। খালের উত্তর এবং পশ্চিমে শহরের পুরানো অংশ অবস্থিত। রায়ের বাজার থেকে শুরু করে ঢাকার উত্তরাংশের শেষ সীমা, শহরের পুরানো অংশ পূর্বদিকে পুরানা পল্টন ও রমনার মাঠ পর্যন্ত বর্ধিত হয়। শহরের অন্য অংশ ছিল বংশালের দক্ষিণে এবং তাঁতিবাজার ও কামারনগরের উত্তরে। যা দৃশ্যত পরে গঠিত হয়’। বিশ শতকের তৃতীয় দশক পর্যন্ত পল্টনে তেমন লোকবসতি ছিল না। পাকা রাস্তা বা বৈদ্যুতিক সুযোগ সুবিধা ছিল না।

১৯৪৭ সালের পরে কিছু নতুন বাড়িঘর তোপখানা ও পল্টন এলাকায় গড়ে উঠতে থাকে। ঢাকার ক্রীড়া অনুষ্ঠানের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পল্টনে পঞ্চাশের দশকে ঢাকার আধুনিক স্টেডিয়াম তৈরি করা হয়। ইতোমধ্যে পল্টনের মাঠ বা পল্টন ময়দান রাজনৈতিক সভার স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমানে ঢাকা শহরের আবাসিক ও ব্যবসা বানিজ্যের কেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্যতম পুরানা পল্টন। [গাজী মোঃ মিজানুর রহমান]

গ্রন্থপুঞ্জি  Hridaynath Majumder, Reminiscences of Dacca, Calcutta, 1926; Sharif Uddin Ahmed, Dacca: A Study in Urban History and Development, Curzon Press Ltd., London, 1986; মুনতাসীর মামুন, ঢাকা: স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৩।