পর্দা


পর্দা  মহিলাদের নিজস্ব পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ ব্যতীত অন্য পুরুষদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখার প্রথা। বাংলায় পর্দাপ্রথার উদ্ভব সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেকের ধারণা, এটি অতি প্রাচীন একটি প্রথা এবং আবার কারও কারও মতে মুসলিম শাসনামল থেকেই এর চর্চা শুরু। সম্ভবত মুসলিম শাসনই পর্দাপ্রথার ব্যাপক প্রচলন ঘটায় এবং সেটিই এখনও কিছুটা অন্য আদলে বিদ্যমান। পর্দাপ্রথা কড়াকড়িভাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকরূপে আরোপিত হয় পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে মুসলিম শাসনামলে। পঞ্চদশ শতকে জনৈক ইউরোপীয় পরিব্রাজক দুয়ার্তে বারবোসা তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে মুসলিম অভিজাততন্ত্র শাসিত রাষ্ট্রে অভিজাত শ্রেণির মহিলাদের সমাজের অন্যান্যদের চেয়ে আলাদাভাবে চিত্রিত করেছেন পর্দা প্রথার প্রতিষ্ঠান হিসেবে শাহী  হারেমের পরিবার, তুর্কি আফগানের কুলীন পরিবার এবং মুগল জানানাই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। নবাবি শাসনামলে হিন্দু অভিজাত সমাজেও মহিলাদের সমভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হতো, তবে তাদের তেমন বেশি কড়াকড়ি ছিল না। নবাবি আমলে আবির্ভূত ভূম্যধিকারী এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মধ্যবিত্ত শ্রেণি অভিজাত শ্রেণির অনুকরণে পর্দাপ্রথা অনুসরণ করে। ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথমার্ধে বাংলার সকল শ্রেণির লোকজন পর্দা পালন করত। কিন্তু হিন্দু সংস্কারবাদী আন্দোলনের সময় পর্দাপ্রথার কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল হতে শুরু করে। বিংশ শতাব্দীতে শহুরে হিন্দুসমাজ থেকে এ প্রথা অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু মুসলমান সমাজে তা কমবেশি অপরিবর্তিত থাকে। মহিলারা বাড়ির বাইরে যেত বোরখা দ্বারা সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত হয়ে।

শ্রমিক শ্রেণির মহিলা ছাড়া মুসলিম মহিলারা কখনও খোলা পালকি, নৌকা অথবা ভাড়াটে গাড়িতে যাতায়াত করত না। সে সময়ের পর্দাপ্রথার কারণে মহিলাদের স্কুল-কলেজে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণে বেশ কিছু অসুবিধায় পড়তে হয়। মুসলিম নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নিজেও পর্দাপ্রথায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি আগাগোড়া ঘোমটা আবৃত হয়েই ঘরের বাইরে বেরুতেন। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব এবং সামাজিক প্রতিপত্তি শিক্ষিত মুসলিম পরিবারগুলির মধ্যে পর্দাকে অতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত করে। কিন্তু যারা খুব কড়াকড়িভাবে ইসলামের বিধিবিধান মান্য করে সেসব মহিলা পর্দাপ্রথা কঠোরভাবে মেনে চলে, যদিও তারা সমাজের অন্যান্যদের কাছ থেকে নিজেদের একদম আলাদা করে রাখে না। বর্তমানে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় অংশগ্রহণকারী এবং রাজনীতিসহ জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত মুসলিম মহিলাদের ক্ষেত্রে পর্দাপ্রথা প্রায় অচল, তবে ধর্মীয় কারণে পর্দা এখনও একটি লক্ষণীয় প্রতিষ্ঠান।  [সিরাজুল ইসলাম]