পরিবেশ প্রকৌশল


পরিবেশ প্রকৌশল (Environmental Engineering)  পরিবেশের ওপর মানব-সৃষ্ট ক্রিয়াকলাপের ফলে উদ্ভূত সমস্যাদি সমাধানে প্রকৌশল জ্ঞানের প্রয়োগ। বাংলাদেশ পৃথিবীর ঘন জনসংখ্যা অধ্যুষিত এবং দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে একটি। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে এবং কৃষি ও কৃষি সম্পর্কিত ক্ষেত্র থেকে জীবিকা নির্বাহ করে। এ কারণে, গ্রামীণ কৃষি উন্নয়ন এবং এর পরিবেশগত পরিবর্তন অথবা এদের ফলাফলসমূহ দেশটির জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ পরিবেশ মূলত এর জনসংখ্যা এবং গ্রামীণ জনপদের শিক্ষা, অর্থনীতি, মৃত্তিকা এবং পানির সহজলভ্যতা ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি ও অন্যান্য গৃহস্থালি কার্যক্রম, এমনকি শিল্পজাত বর্জ্যের কারণে সৃষ্ট দূষণ সরাসরি মৃত্তিকা, পানি এবং সর্বোপরি কৃষিগত সার্বিক পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে।

জৈববর্জ্যের ফলে পরিবেশগত অবনতি  গৃহস্থালি ও নর্দমার বর্জ্য, মানুষ ও প্রাণীর মলমূত্র এবং এসব নিষ্কাশনের সময় উদ্ভূত নোংরা পানি, শিল্পকারখানার কঠিন ও তরল জৈববর্জ্য ইত্যাদি সবমিলিয়েই গঠিত হয় জৈব আবর্জনা। এসকল বর্জ্যের জলীয় অংশ চুঁইয়ে অবশেষে পানির মূল উৎসসমূহের সঙ্গে মিশে যায়। এভাবে মানুষ, প্রাণীকুল এবং মাছের জন্য পরিবেশের ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। বাংলাদেশে এ সংক্রান্ত পরিবেশ প্রকৌশল প্রযুক্তি যেমন: ডাস্টবিন, আধুনিক নিষ্কাশন প্রণালী, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ইত্যাদির ব্যবহার এখনও সন্তোষজনক অবস্থায় পৌঁছায়নি; এমনকি শহর এলাকায়ও অবস্থা খুব একটা উন্নত নয়। কেবলমাত্র অগ্রসর গ্রামীণ এলাকা গুলোয় স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তর এবং বেশকিছু এনজিও এই অবনতিশীল পরিবেশ সম্পর্কে জনগণকে অধিক সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

কৃষি কার্যক্রমের ফলে পরিবেশগত অবনতি  কৃষি এবং পানি খুবই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। মৃত্তিকা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং পানির সহজপ্রাপ্যতা কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যাবশ্যক। অত্যাধুনিক কৃষি প্রযুক্তিসমূহ প্রয়োগের ফলে সামগ্রিক কৃষি পরিবেশ পরিবর্তিত হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু পরিবর্তন কৃষির জন্য বন্ধুভাবাপন্ন আবার কিছু পরিবর্তন মৃত্তিকা, পানি এমনকি সামগ্রিক গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর।

রাসায়নিক সারের উত্তরোত্তর ব্যবহার জৈবসারের ব্যবহারকে হ্রাস করেছে। প্রকৃতপক্ষে এর ফলে মৃত্তিকার উর্বরা শক্তি হ্রাস পেয়েছে এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিণতি স্বরূপ উদ্ভিদের পুষ্টিগুণও হ্রাস পেয়েছে। শস্যক্ষেতে কীটনাশক এবং বালাইনাশক ছিটানোর ফলে শুধুমাত্র ক্ষতিকর পোকামাকড় কীটপতঙ্গ ধ্বংস হয় না, সঙ্গে সঙ্গে মাটি ও পানির দূষণও ঘটে। এসকল রাসায়নিক কীট ও বালাইনাশক মৃত্তিকার উপকারী অনেক অণুজীব হত্যা করে এবং জলজ প্রাণীর প্রাণপুষ্টি পরিপূরণ প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই বিলম্বিত হয়।

ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও এর ব্যবহার কৃষি উৎপাদনে আশীর্বাদ বলে বিবেচিত। কিন্তু ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত পানিতে অতিরিক্ত মাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি সম্প্রতি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত মাত্রায় ভূগর্ভস্থ জলসম্পদ উত্তোলনের কারণে ভূঅবনমনের সম্ভাবনার কথাও এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে।

অন্যান্য কার্যক্রমের ফলে পরিবেশগত অবনতি  প্লাবনভূমি এলাকায় অত্যধিক জনসংখ্যার চাপের ফলে কৃষিজমির ঘাটতি দেখা দেওয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষ পাহাড় এবং বনাঞ্চলে বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে অভিগমন করেছে। পাহাড়ি ঢালগুলোর যথেচ্ছ ব্যবহার এবং নির্বিচারে বন কেটে ফেলায় মারাত্মকভাবে মৃত্তিকা ক্ষয় সাধিত হচ্ছে এবং উর্বর পৃষ্ঠমৃত্তিকা নিষ্কাশিত হওয়ায় ভূমির উর্বরতা ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। নির্মাণ কাজে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন স্থানে মাটি খুঁড়ে বালি ও নুড়িপাথর উত্তোলনও পরিবেশে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অপরিকল্পিতভাবে গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মকান্ড ও অন্যান্য প্রকল্পের কারণে কৃষিভূমি কমে যাওয়া ছাড়াও সর্বাপেক্ষা ক্ষতিকর যে প্রভাবটি পড়ছে তা হলো প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থায় বদ্ধতার সৃষ্টি।

পরিবেশের এ ধরনের অবস্থা বর্তমানে দেশের সর্বত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে। উপরন্তু এসব পরিস্থিতিতে লাগসই প্রকৌশল প্রযুক্তিসমূহ খুব একটা প্রয়োগ করা সম্ভব হয় নি। সরকারি, বেসরকারি এবং অন্যান্য বৈদেশিক সংস্থাসমূহ এ সংক্রান্ত সচেতনতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং পরিবেশগত অবনতি রোধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এসকল উদ্যোগ বা ব্যবস্থা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।  [এম.এ হামিদ]