পরিবেশ


পরিবেশ  কোন একটি জীবের অস্তিত্ব বা বিকাশের উপর ক্রিয়াশীল সামগ্রিক পারিপার্শ্বিকতা, যেমন চারপাশের ভৌত অবস্থা, জলবায়ু ও প্রভাববিস্তারকারী অন্যান্য জীব ও জৈব উপাদান। বিশ্ব পরিবেশের দ্রুত অবনতি হচ্ছে, বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে এ অবনতি হয়েছে আরও দ্রুত। বাংলাদেশে ১৯৯৫ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন পাশ হয়েছে। কিন্তু জনবিস্ফোরণ, বনাঞ্চলের অবক্ষয় ও ঘাটতি এবং শিল্প ও পরিবহণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাবের দরুন দেশের পরিবেশ এক জটিল অবস্থার দিকে পৌঁছতে যাচ্ছে। নিম্নে বাংলাদেশের পরিবেশ বিষয়ক কয়েকটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হলো:


• পরিবেশগত অবস্থা

• পরিবেশ দূষণ

• পরিবেশের অবয়

• প্লাবন ও বন্যা

• পরিবেশের উদ্বেগজনক স্থান

• নদীভাঙন ও পলিসঞ্চয়

• পরিবেশ সংরণ সংস্থা

• পরিবেশ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা

• গ্রীনহাউজ প্রতিক্রিয়া ও বিশ্বউক্তায়ন

• পরিবেশ শিক্ষা

• নিম্যাপ

• পরিবেশনীতি


পরিবেশগত অবস্থাপরিবেশ দূষণ পরিবেশের অবক্ষয়প্লাবন ও বন্যা পরিবেশের উদ্বেগজনক স্থাননদীভাঙন ও পলিসঞ্চয় পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থাপরিবেশ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনাগ্রীনহাউজ প্রতিক্রিয়া ও বিশ্বউক্তায়নপরিবেশ শিক্ষা নিম্যাপপরিবেশনীতি

পরিবেশগত অবস্থা  ব্যতিক্রমধর্মী ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। প্রায় ১৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকার পানি নেমে আসে পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী দিয়ে। এই পানির মাত্র শতকরা ৮ ভাগ নিষ্কাশন এলাকা বাংলাদেশের অন্তর্গত। অধিকাংশ নিষ্কাশন অববাহিকা প্রতিবেশী দেশসমূহে অবস্থিত। বিশাল প্রবাহসহ নদ-নদীসমূহের গতি বাংলাদেশ ব-দ্বীপে হ্রাস পাওয়ার ফলে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে একটি অত্যন্ত পুরু পাললিক স্তর গঠন করে বাংলাদেশ গড়ে উঠে। নিম্নোক্ত বিষয়গুলি পরিবেশগত দিক থেকে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে: ১. অসংখ্য নদী, তাদের শাখা-প্রশাখা দ্বারা জালের ন্যায় বিস্তৃত বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপগুলির একটি; ২. অত্যন্ত পুরু পলিস্তর (বিশ্বে সবচেয়ে পুরু) দ্বারা গঠিত দেশটির সাধারণ ভূপৃষ্ঠ অত্যন্ত নিম্ন-উচ্চতাবিশিষ্ট; ৩. বাংলাদেশে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও দীর্ঘতম বালুময় সৈকত; ৪. বিশ্বের সর্বাধিক ঘনবসতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অত্যধিক চাপ; ৫. আর্দ্র ও শুষ্ক মৌসুমে (বন্যা ও খরা) ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানির প্রাপ্যতার পরিমাণের মধ্যে ব্যাপক তারতম্য; এবং ৬. বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পানির প্রবাহের ব্যাপকতা।

বাংলাদেশের উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ দেশটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশগত সমস্যাপ্রবণ করে তুলেছে। এদেশের ভূমি বহুলাংশে নিম্ন-প্লাবনভূমি। ভূমির বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য, ভৌগোলিক অবস্থান, অসংখ্য নদ-নদী ও মৌসুমি জলবায়ু বাংলাদেশকে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত আশঙ্কাপূর্ণ করে তুলেছে। বন্যা ও খরার চরমমাত্রা বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেশের টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অর্জনে বিরাট বাধা হিসেবে কাজ করে।

বাহ্যিক পরিবেশ জলবায়ু-  বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য ঋতুবৈচিত্র্যসহ উষ্ণমন্ডলীয় মৌসুমি জলবায়ু বিরাজমান। বর্ষা মৌসুমে (জুলাই-অক্টোবর) প্রচুর বৃষ্টিপাতের পর আসে শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি), তারপর গরম (মার্চ-জুন)। গ্রীষ্মকালে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪° সে এবং সর্বনিম্ন ২১° সে। শীতকালে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৯° সে এবং সর্বনিম্ন ১১° সে।

এ অঞ্চলের বৃষ্টিপাতে সময় ও স্থানগত ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের ৭০% থেকে ৮০% হয় মৌসুমি ঋতুতে। গ্রীষ্মের পর ভারত মহাসাগর থেকে মৌসুমি উষ্ণ আর্দ্র বায়ু বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং বিশ্বের কিছু এলাকায় সর্বোচ্চ রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত ঘটায়। এসব বৃষ্টিপাত প্রধানত সংঘটিত হয় উঁচু উজান অঞ্চলে, বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যে এবং বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে দেশের সর্ব পশ্চিমে প্রায় ১,১০০ মিমি থেকে উত্তর-পূর্ব পার্শ্বে প্রায় ৫,৭০০ মিমি। হিমালয়ে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২,০০০ থেকে ১৫,০০০ মিমি।

পানি পরিস্থিতি (Hydrology)-  বাংলাদেশের রয়েছে একটি ব্যতিক্রমী জল-ভৌগোলিক অবস্থান। তিনটি বিশাল নদী পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা ভুটান, নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ ও চীনের (তিববত) উজান থেকে পানি বয়ে নিয়ে আসে। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার নিষ্কাশন অববাহিকার মোট আয়তন প্রায় ১৫ লক্ষ বর্গ কিমি যার আনুমানিক ৬২% ভারতে, ১৮% চীনে, ৮% নেপালে, ৮% বাংলাদেশে ও ৪% ভুটানে অবস্থিত। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়। এ প্রবাহ কেবল দক্ষিণ আমেরিকার আমাজান নদী ব্যবস্থার পর দ্বিতীয়। প্রশস্ত ও বার্ষিক প্রবাহের মোট পরিমাণ উভয় দিক থেকে পদ্মা-নিম্ন মেঘনা নদী বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম। সম্মিলিত গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী সমুদ্রে পতিত হয়েছে শেষ ১০০ কিমি একক প্রবাহে মিলিত হয়ে যার পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদী থেকে আড়াই গুণ বেশি। দক্ষিণ এশীয় বৃষ্টিবহুল এলাকার মোট আয়তন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অববাহিকার আয়তনের অর্ধেকের চেয়ে কিছুটা কম হলেও এখানে বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ চার গুণ বেশি।

বাংলাদেশে ২৫০টিরও বেশি বড় নদ-নদী রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান নদ-নদীগুলি ‘পরিবর্তনশীল’ মেঘনা অথবা ‘খুবই পরিবর্তনশীল’ পদ্মা ও যমুনা হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা যায়। এতে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের উন্নয়নে পানি ও বন্যা প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

বাংলাদেশে তিন ধরনের বন্যা দেখা যায়: ১. আকস্মিক বন্যা হয়ে থাকে উজানে ভারি বৃষ্টিপাত থেকে যা নদীকে প্লাবিত করে। নদীর তীর ভাঙা, জমি বিলীন হওয়া ও ফসলহানি এক্ষেত্রে সাধারণ সমস্যা। ২. মৌসুমি বন্যা সৃষ্টি হয় ভারি অবিরাম বৃষ্টিপাত থেকে আবদ্ধ বা নিম্নমানের নিষ্কাশনসম্পন্ন স্থানে যেখানে পানি চুয়ানো অপেক্ষা বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অধিক। এ ধরনের বন্যা বার্ষিক এবং প্রত্যাশিত ঘটনা যার উপর দেশের কৃষি জমির ক্ষয়পূরণ এবং জলজ পরিবেশের ধান ও পাট চাষের প্রয়োজনীয় পানির জন্য ঐতিহ্যগতভাবে নির্ভর করে। ৩. ঘূর্ণিঝড়জনিত বন্যা বিভিন্ন ধরনের বন্যার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক। এসব বন্যা ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটাতে পারে এবং প্রধানত উপকূল অঞ্চলে দেখা যায়।

ভূপ্রকৃতি (Physiography)-  বাংলাদেশকে তিনটি প্রধান ভূপ্রাকৃতিক এলাকায় ভাগ করা যায়: টারশিয়ারি পার্বত্য এলাকা (Tertiary hill area), প্লেইসটোসিন সোপান (Pleistocene terraces) ও নবগঠিত সমভূমি (Recent plains)।

টারশিয়ারি পাহাড়সমূহ রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। এসব পাহাড় প্রধানত চুনাপাথর, শেল (shale) ও কাদামাটির তৈরি। এসব পাহাড়ের গড় উচ্চতা ৪৫০ মিটার।

প্লেইসটোসিন সোপান প্রধানত মধুপুর ও বরেন্দ্র অঞ্চল, ভাওয়ালের গড় ও লালমাই-এর পাহাড়ি এলাকা নিয়ে গঠিত। এসব সোপান ২৫,০০০ বছর আগে গঠিত হয়। বরেন্দ্র অঞ্চলের আনুমানিক আয়তন ৯,৩২০ বর্গ কিমি। পার্শ্ববর্তী প্লাবনভূমি থেকে এ অঞ্চলের গড় উচ্চতা ৬ থেকে ১২ মিটার। মধুপুর ও ভাওয়াল ৪,১০৩ বর্গ কিমি এর অধিক এলাকা নিয়ে বিস্তৃত, পার্শ্ববর্তী প্লাবনভূমি থেকে যার গড় উচ্চতা ৩০ মিটার। কুমিল্লা জেলার লালমাই পাহাড়ি এলাকা ৩৪ বর্গ কিমি নিয়ে গঠিত এবং পার্শ্ববর্তী প্লাবনভূমি থেকে গড়ে ১৫ মিটার উঁচুতে অবস্থিত।

নবগঠিত সমভূমি দেশের ১,২৪,২৬৬ বর্গ কিমি (৮৬%) জুড়ে বিস্তৃত। এ সমভূমিকে আরও পাঁচটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়: পাদভূমি, প্লাবন ভূমি, ব-দ্বীপ সমভূমি, জোয়ার প্লাবিত ভূমি (tidal plains) ও উপকূলীয় ভূমি। পাঁচ ধরনের ভূমিকে একটি সাধারণ নাম ‘প্লাবন ভূমি’ দ্বারা সাধারণত প্রকাশ করা হয়।

বন্যা সমভূমির উচ্চতা শূন্য থেকে ১০ মিটার এবং বন্ধুরতা (relief) কম। উত্তর-পূর্ব থেকে উপকূল পর্যন্ত গড় ঢালের মাত্রা প্রতি কিলোমিটারে ২০ সেমি এর কম। ঢাকার দক্ষিণে ঢালের গড় ১.৬ সেমি/কিমি। স্থলভাগের শতকরা প্রায় ৫০ ভাগের উচ্চতা (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা) ১২ মিটারের কম এবং শতকরা ৭৫ ভাগ ২৯ মিটারের কম।

বাংলাদেশের প্লাবন ভূমি মূলত ব-দ্বীপ আকৃতির পলিঘটিত সমভূমি যা পাললিক ও সামুদ্রিক উপাদান থেকে গড়ে উঠেছে। ভূমির নিম্ন উচ্চতা ও বন্ধুরতার কারণে পানি অত্যন্ত ধীরে গড়ায় এবং নদ-নদীগুলির সর্পিলপথে এঁকেবেঁকে চলার প্রবণতা থাকে। ভাঙাগড়া ও বারবার বন্যা বা বিভিন্ন ধরনের প্লাবন দ্বারা নবগঠিত ভূমি গড়ে উঠছে এবং অনবরত পরিবর্তিত হচ্ছে।

মৃত্তিকাসমূহের ধরন ও বৈশিষ্ট্য-  প্রবাহমান নদীসমূহ দ্বারা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জমানো পলির পুরু স্তর দিয়ে সাধারণত দেশটি গঠিত। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বছরে ২.৪ বিলিয়ন টন পলি বাহিত হয়। ভূমিরূপ বিভাগসমূহ (physiographic divisions) বিভিন্ন ধরনের মৃত্তিকা দ্বারা গঠিত। টারশিয়ারি পার্বত্য এলাকা গঠিত হয়েছে পাহাড়ি মাটি দ্বারা যা প্রধানত টারশিয়ারি শিলা ও অজমাটবদ্ধ টারশিয়ারি ও প্লেইসটোসিন পলি দ্বারা গঠিত। মৃত্তিকা সাধারণত অম্লীয়, অম্লমানের তারতম্য ৪.০ থেকে ৪.৫। মৃত্তিকার বুনটের কারণে পানির প্রবেশ্যতা (infiltration) তুলনামূলকভাবে কম। উচ্চ-রন্ধ্রতা (high porosity) আর্দ্রতা ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

প্লেইসটোসিন যুগের পলি থেকে গঠিত ‘পুরাতন পাললিক মৃত্তিকা’ দ্বারা প্লেইসটোসিন সোপানসমূহ গঠিত। বন্যা সীমার উপর উঁচুভূমিতে সেগুলি অবস্থিত। তাদের বুনট এঁটেল ধরনের এবং লৌহ ও এলুমিনিয়ামের উপস্থিতির কারণে বর্ণ লালচে থেকে হলুদাভ। এসব মৃত্তিকা দৃঢ়ভাবে জমাটবদ্ধ এবং উচ্চ ফসফেট আবদ্ধ করার ক্ষমতা (phosphate fixing capacity) সম্পন্ন। মৃত্তিকা অম্লীয়, pH ৬ থেকে ৬.৫।

নবগঠিত ভূমি ‘নবগঠিত পলিমাটি’ দ্বারা তৈরি। যেহেতু ভাটি অঞ্চলের মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে উজান অঞ্চলের মৃত্তিকার গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, বিভিন্ন নদীর অববাহিকায় মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা সাধারণভাবে দেখা যায়। গঙ্গা পলিভূমিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম রয়েছে। এতে মুক্ত ক্যালসিয়াম কার্বনেটও রয়েছে। মৃত্তিকার নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের ঘাটতি ও ক্ষারীয়তা রয়েছে।

তিস্তা পলি অঞ্চলের মৃত্তিকা বেলে থেকে বেলে-দোঅাঁশ বুনট বিশিষ্ট, সুষম স্তরবিহীন। এসব মৃত্তিকা প্রতি বছর প্লাবিত হয়, ফলে প্রতি বছর নতুন পলি দ্বারা ক্ষয়পূরণ হয়। pH ৬ থেকে ৬.৫। উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চল সক্রিয় প্লাবনভূমির অংশ, কিন্তু জোয়ারের সময় লবণাক্ত পানি দ্বারা প্লাবিত হয়। এ অঞ্চলের একটি বিরাট অংশ নিয়ে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন যেখানে কতিপয় মৃত্তিকা তাদের স্তরে ব্যাপক পরিমাণ সালফাইড বহন করে। মৃত্তিকা সাধারণত নিরপেক্ষ কিন্তু কিছুটা ক্ষারীয়তা প্রদর্শনের প্রবণতা আছে।

মৃত্তিকার ব্যবহারযোগ্যতা এবং শস্যবিন্যাসের উপর এর প্রভাব-  প্লাবনভূমি মৃত্তিকার কৃষি সম্ভাবনা পানি পরিস্থিতি ও একইভাবে মৃত্তিকার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দ্বারা নির্ধারিত হয়। মৌসুমি বন্যার গভীরতা ও ব্যাপ্তি এবং বন্যায় ফসলহানির আপেক্ষিক আশঙ্কা শস্য বিন্যাসের প্রধান নির্ধারক। মৃত্তিকার উর্বরতার (গৌণ উপাদানের প্রাপ্যতা) ন্যায় মৃত্তিকার ভেদ্যতা ও আর্দ্রতা ধারণ ক্ষমতা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ প্লাবনভূমি নিম্ন উচ্চতা সম্পন্ন (প্রায় ১ মি), অপেক্ষাকৃত উচ্চ ভূমিতে ভেদ্য দোঅাঁশ মৃত্তিকা এবং নিচু স্থানে অভেদ্য কর্দম রয়েছে। ভূমির উচ্চতার এ পার্থক্য মৌসুমি বন্যার গভীরতা ও ব্যাপ্তির স্থানীয় পার্থক্য নির্ধারণ করে। ভূমির উচ্চতার ক্ষেত্রে ৩০ সেমি এর মতো স্বল্প পার্থক্যও বিভিন্ন ফসল, ফসলের জাত ও প্লাবনের বৈশিষ্ট্য ভেদে মৌসুমি আবর্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

টারশিয়ারি মৃত্তিকার কৃষি সম্ভাবনা নিম্ন-নিষ্কাশিত মৃত্তিকায় ও গভীর উচ্চভূমি মৃত্তিকায় মাঝারি ধরনের। অগভীর উচ্চভূমি মৃত্তিকায় এ সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত অনেক কম। ভূমিক্ষয় (যা ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে গুরুতর রূপ ধারণ করে) ও বারবার জুম চাষের (পাহাড়ি অঞ্চলে জঙ্গল পরিষ্কার ও পোড়ানোর মাধ্যমে স্থানান্তর কৃষি) ফলে উর্বরতা হারিয়ে বেলে পাহাড়ি মৃত্তিকার কৃষি সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এ মৃত্তিকা বৃক্ষফসল বা বন উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।

জীবজ পরিবেশ  বনসম্পদ-  গত তিন দশকে বনজ বৃক্ষের পরিমাণ ব্যাপকহারে হ্রাস পেয়েছে। কৃষিজমির প্রসার এবং বনজ দ্রব্যের বর্ধিত চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপক বনভূমি অবৈধভাবে ফসলি জমিতে পরিণত করা হয়েছে। যদিও বন সম্পর্কিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না, হিসাবে দেখা যায়, সত্তরের দশক থেকে বনভূমির পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগেরও অধিক হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭০ সালে মধুপুর অঞ্চলে ২০,০০০ একরেরও অধিক শালবন ছিল; বিশ বছর পর অবশিষ্ট থাকে আনুমানিক ১,০০০ একর। ১৯৯০ সালের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে মাথাপিছু বনের পরিমাণ ০.০২ হেক্টরেরও কম; বিশ্বে জনসংখ্যা অনুপাতে সর্বনিম্ন বনের পরিমাণগুলির একটি।

অবস্থান বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে বনসমূহকে ৩ শ্রেণীতে ভাগ করা যায় ১. পাহাড়ি বন, ১১ লক্ষ ৫০ হাজার একর জুড়ে যার মধ্যে রয়েছে তৈরি করা বন ২,৯৬,৩০০ একর, প্রধানত রাঙ্গামাটি ও সিলেট অঞ্চলে অবস্থিত; ২. ম্যানগ্রোভ বন, ১৪ লক্ষ ৫০ হাজার একর প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ (সুন্দরবন) এবং বন্যা প্রতিরোধের জন্য উপকূল এলাকা ও উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহে কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা ২,৫০,০০০ একর ম্যানগ্রোভ বন; এবং ৩. সমতলভূমি শালবন প্রায় ৩ লক্ষ একর জুড়ে গাজীপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলায় বিস্তৃত। বন বিভাগ এসব এলাকায় ৩৬ লক্ষ ১৭ হাজার একর জমি নিয়ন্ত্রণ করছে।

জলাভূমি-  বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ মৌসুমি জলাভূমি রয়েছে। বস্ত্ততপক্ষে দেশের অর্ধেককেই এ ধরনের ভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বহু বছর ধরে পানির নিচে থাকে এ ধরনের জলাভূমির পরিমাণ অনেক কম। বহুবর্ষীয় জলাভূমির মধ্যে রয়েছে মূলত স্থায়ী নদ-নদী ও ঝর্ণা, অগভীর স্বাদুপানির হ্রদ ও জলাশয় (হাওর, বাঁওড় ও বিল), মাছের পুকুর এবং বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ জলাভূমিতে মোহনা পরিবেশ।

জলাভূমি সম্পদ বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বহুবর্ষীয় ও মৌসুমি জলাভূমি উভয় বিপুল সংখ্যক প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। জলাভূমি মৎস্য সম্পদের উপর টিকে আছে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ। বাংলাদেশের জেলেরা ঐতিহ্যগতভাবে গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। জলাভূমির অসংখ্য উদ্ভিদ ঔষধ, খাদ্য, পশুখাদ্য ও নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করা হয়। মানুষের আগ্রাসন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ স্কীমের ফলে জলাভূমির আবাসস্থল দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন।

জীববৈচিত্র্য-  বাংলাদেশের রয়েছে একটি সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে বন ও জলাভূমি এলাকায়। আনুমানিক ৫,০০০ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ বাংলাদেশে পাওয়া যায়। এদেশে বাস করছে ২৬৬ ধরনের স্বাদুপানির ও ৪৪২ ধরনের সামুদ্রিক মাছ, ২২ উভচর, ১০৯ অভ্যন্তরীণ ও ১৭ সামুদ্রিক সরীসৃপ, ৩৮৮ স্থায়ী ও ২৪০ পরিযায়ী পাখি, ১১০ অভ্যন্তরীণ ও ৩ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী। কিছু প্রজাতিকে হুমকির সম্মুখীন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের জানা মেরুদন্ডী প্রাণীদের মধ্যে ১৩টি সম্প্রতি এদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ মৎস্য প্রজাতিসমূহের মধ্যে ৫৪টি হুমকির সম্মুখীন। বিপন্ন উভচর, অভ্যন্তরীণ সরীসৃপ, স্থায়ী পাখি ও অভ্যন্তরীণ স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজাতি সংখ্যা যথাক্রমে ৮, ৫৮, ৪১ ও ৪০।

এদেশ থেকে কি পরিমাণ উদ্ভিদ প্রজাতি ইতোমধ্যে অবলুপ্ত হয়েছে তা এখনও বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় নি। বিপদাপন্ন উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্ত করতে কতিপয় বিচ্ছিন্ন গবেষণা চালানো হয়েছে এবং এতে দেখা যায় প্রায় ১০০ প্রজাতির উদ্ভিদ হুমকির সম্মুখীন।

জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ-  মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে প্রাণীর বিচরণ পথ ও জলাভূমি আবাসস্থলের ক্ষতি; কৃষি, বাসস্থান ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মানুষের বনভূমি দখল; জ্বালানি ও নির্মাণের জন্য নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে বৃক্ষ আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ হ্রাস; কতিপয় বনজসম্পদ যেমন ভেষজ উদ্ভিদ, বাঁশ ও বেতের অতিরিক্ত আহরণের ফলে রক্ষামূলক বাসস্থান লোপ; অতিরিক্ত বন্যপ্রাণী শিকার; উফশী জাতসমূহের একক চাষ, বা বহুমুখী শস্য চাষ হ্রাস পাওয়ায় কৃষি রাসায়নিক দ্রব্যসমূহের ব্যবহার বৃদ্ধি; ৭. ম্যানগ্রোভ বন উজাড় এবং ৮. জুমচাষ।

আর্থ-সামাজিক পরিবেশ জনসংখ্যা-  বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রতি বছর প্রায় ২% হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি।

১৯৯৫ সালে জনসংখ্যার গড় ঘনত্ব ছিল প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৮৩৪ জন। দেশকে টিকিয়ে রাখার জন্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও অবশ্যই একটি প্রধান প্রচেষ্টা হবে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা এবং যৌক্তিক ভূমিসম্পদ ব্যবস্থাপনা।

ভূমি ব্যবহার  জনসংখ্যার ঘনত্ব ও কৃষিভিত্তিক জীবিকার প্রভাবে দেশের সীমিত ভূমির ওপর প্রচন্ড চাপ পড়ছে। এমনকি মানুষ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস প্রবণ উপকূলীয় নিম্নভূমিতেও বসবাস ও চাষাবাদ করছে। বাংলাদেশের মোট ভূমির শতকরা ৬৩ ভাগের কিছুটা বেশি কৃষির অধীনে রয়েছে: অধিকাংশ জমি ব্যবহূত হচ্ছে ধান চাষে। বন (সামাজিক ও গ্রাম্য বনসহ) রয়েছে মোট ভূমির প্রায় ২০%। মানুষের বসতবাড়ি রয়েছে ১৬% জুড়ে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বর্ধিত বনজ দ্রব্যের আহরণ এবং বসতবাড়ি ও চাষাবাদের জন্য বনভূমির সরাসরি পরিবর্তনের ফলে বন ও জলাভূমি দ্বিমুখী হুমকির সম্মুখীন। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যায়। ফলে বন এলাকা ব্যাপকভাবে দখল করে কৃষি ভূমি সম্প্রসারিত হয়।

আশির দশকে ধানের উচ্চফলনশীল জাতের মতো উন্নত প্রযুক্তির প্রবর্তন প্রচলিত শস্য বিন্যাসকে বদলিয়ে দেয়। এর ফলে অধিক জমি ব্যবহার না করে ফসলের সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়। এই উল্লম্ব সম্প্রসারণ (একই পরিমাণ জমিতে অধিক ফসল ফলানো) প্রায় এর সীমায় পৌঁছেছে। অনুভূমিক সম্প্রসারণ বনাঞ্চলে ও বর্ধিত হারে জলাভূমিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন জলাভূমি চাষাবাদের অধীন চলে আসছে। জলাভূমির পানি সরে গেলে ভূমির উর্বরতা রক্ষাকারী নাজুক বাস্তুসংস্থান বদলে যায়। এর ফলে উৎপাদন হ্রাস পুষিয়ে নেওয়ার জন্য আরও নতুন কৃষি জমির প্রয়োজন হয় বা সারের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হয়।

চিংড়ি চাষীরা ক্রমান্বয়ে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় কৃষি জমি দখল করেছে। সেখানে অর্থকরী চিংড়ির জন্য জমিতে বাঁধ দিয়ে লবণ-পানির পুকুর তৈরি করা হয়। চিংড়ির পুকুর হিসেবে ব্যবহার করা মাটি এতই লবণাক্ত হয়ে যায় যে সেখানে ফসল ফলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অধিক কৃষি জমি বড় বড় চিংড়ির ঘেরে পরিবর্তিত করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।  [মামুনুল হক খান]

পরিবেশ দূষণ  মানুষের কর্মকান্ডের ফলশ্রুতিতে পরিবেশের উপাদানে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন। দূষণ বলতে সাধারণভাবে বোঝায় মানুষের নিজস্ব স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করা যা প্রধানত বর্জ্য বা ক্ষতিকর পদার্থ দ্বারা বায়ু, পানি ও মৃত্তিকা দূষণের মাধ্যমে হয়ে থাকে। গত কয়েক দশকে জনসংখ্যা বিষ্ফোরণ দূষণ সমস্যা গুরুতর করে তুলেছে। অধিক জনসংখ্যা মানে প্রাকৃতিক সম্পদের অধিক ব্যবহার, যার পরিণাম অধিক দূষণ।

কঠিন বর্জ্যজনিত দূষণ বাংলাদেশের একটি প্রধান সমস্যা। বিভিন্ন শহরে বিপুল পরিমাণে কঠিন বর্জ্য জমা হয়। বর্তমানে কেবল ঢাকা নগরীতেই প্রতিদিন প্রায় ১,৫০০ মে টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। প্রতি বছর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এর পরিমাণও বাড়ছে। বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে খাদ্যের উচ্ছিষ্ট, ঘাস, গাছপালা, কাগজ, কাঠের টুকরা, কাপড়, প্লাস্টিক, পলিথিন জাতীয় পদার্থ, কাঁচ এবং নির্মাণ সামগ্রীর অবশিষ্ট।

ঢাকায় প্রায় ১,০০০ ছোট বড় শিল্প-কারখানা রয়েছে, যেখানে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত এবং ক্ষতিকর বর্জ্য তৈরি হয় এবং পরিবেশের উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটায়। ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায় ১৪৯টি চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৮,০০০ লিটার তরল এবং ১১৫ মে টন কঠিন বর্জ্য জমা হয় এবং এসব বর্জ্য নিকটবর্তী নালা-নর্দমা ও বুড়িগঙ্গা নদীতে নিক্ষেপ করা হয়। এসব বর্জ্যের মধ্যে সালফিউরিক এসিড, ক্রোমিয়াম, অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড, অ্যামোনিয়াম সালফেট, ক্যালসিয়াম অক্সাইড ইত্যাদি রয়েছে। এগুলি মাটিতে শোষিত হয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানির দূষণ ঘটাতে পারে। এছাড়াও তীব্র দুর্গন্ধ আশেপাশের মানুষের স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

পরিবেশ দূষণের অন্যতম উৎস : বর্জ্য পদার্থ

বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের ফলে জমির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে, হ্রাস পেয়েছে মাটির স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা। এসব স্থানের চারপাশের এলাকায় এখন আর তেমন কিছুই জন্মে না।

বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকা মহানগরীর শব্দদূষণ মাত্রা নিরূপণে ২০টি বিদ্যালয় ও হাসপাতালে (এ জায়গাগুলির গ্রহণীয় শব্দমাত্রা ৪৫ ডিবি) ১৯৯৭ সালের ৯ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। এই জরিপে ভিকারুন নেসা নুন স্কুলের সামনে সর্বোচ্চ ৮৪ ডিবি মাত্রা, শাহবাগস্থ বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির কাছে ৮২ ডিবি ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছে ৮০ ডিবি রেকর্ড করা হয়। মোহাম্মদপুরের রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের কাছে ৮২ ডিবি শব্দ রেকর্ড করা হয়। ১৯৯৯ সালের মে মাসে পরিবেশ অধিদপ্তর আরও একটি জরিপ পরিচালনা করে শিল্প, বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায়। এ জরিপে তেজগাঁও এবং হাজারীবাগ এলাকায় ৭৫ ডিবি শব্দমাত্রা রেকর্ড করা হয়। অন্যদিকে ফার্মগেট, শাপলা চত্বর, মহাখালী ও বাংলামটর এলাকায় রেকর্ডকৃত শব্দমাত্রা ছিল ৮৫ ডিবি থেকে ৯০ ডিবি। ধানমন্ডি, ক্যান্টনমেন্ট, বনানী এবং গুলশান আবাসিক এলাকাসমূহে পরিমাপকৃত গড় শব্দমাত্রা ৬৫ ডিবি। মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ৬০ ডিবির সামান্য বেশি শব্দমাত্রা ধরা পড়ে। টিকাটুলি ও শাখারিপট্টিতে সর্বোচ্চ ৯০ ডিবি শব্দমাত্রা রেকর্ড করা হয়।  [এম শামসুল ইসলাম ও কামরুন নেসা বেগম]

শিল্পদূষণ  কারখানা ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে নির্গত দ্রব্য বা বিষাক্ত বর্জ্য থেকে পরিবেশের অবক্ষয়। বাংলাদেশে শিল্পখাত থেকে অর্জিত জিডিপির ২০ শতাংশের মধ্যে কারখানা শিল্পের অংশ ১১%। প্রধানত তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পপণ্য উৎপাদক খাতসমূহে এ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। শক্তিশালী শিল্পখাতের বিকাশ কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির নিরিখে লাভজনক হলেও এগুলি পরিবেশের অবক্ষয়ও ঘটায়।

বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত একটি সমীক্ষা বাংলাদেশে সর্বাধিক কলুষিত এলাকাগুলি শনাক্ত করেছে। পরিবেশগতভাবে সর্বাধিক দূষিত ৬টি জেলা হলো: ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বগুড়া। সারা দেশের মোট দূষণে এই জেলাগুলির অংশভাগ: ৬টি দূষকপুঞ্জের মধ্যে ৪টিতে ৫০ শতাংশের বেশি এবং মোট ধুলাবালি ও জৈব অক্সিজেন চাহিদার (BOD) ৩৫%। দূষকপুঞ্জের ৬টি শ্রেণী: ভূমিতে নিক্ষিপ্ত বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ (প্রায় ৩০০ রাসায়নিক দ্রব্য একত্রে); বায়ুতে উৎক্ষিপ্ত বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ; বায়ুতে মিশ্রিত মোট কণাপুঞ্জ; সালফার ডাই অক্সাইডের নির্গমন; পানিতে বিদ্যমান জীবসঞ্চিত (bio-accumulative) বিষাক্ত ধাতুসমূহ (আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, সীসা, পারদ ও দস্তা); এবং পাঁচ দিনের জৈব অক্সিজেন চাহিদা।

জাতীয় দূষণ তথ্যচিত্র থেকে জানা যায় যে, শিল্প-উপখাতসমূহের একটি ক্ষুদ্র অংশ দেশে দূষণ সমস্যার একটি বড় অংশের জন্য দায়ী। বাংলাদেশের সেসব শিল্প-উপখাতকে সর্বাধিক দূষণপ্রবণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে যেগুলি দেশের এক বা একাধিক দূষক দ্রব্যাদির মোট অংশভাগের অন্তত ৫% ছড়ায়।

সর্বমোট ১২টি সর্বাধিক দূষণপ্রবণ শিল্প উপখাত ছড়ায় ৩টি (ভূমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক, পানিতে বিষাক্ত ধাতু ও SO2) দূষকের ৮৫ শতাংশের বেশি, আরও ২টি দূষকের (বাতাসে বিষাক্ত রাসায়নিক ও জৈব অক্সিজেনের চাহিদা) ৭০ শতাংশের বেশি এবং ৬ষ্ঠ দূষকের (মোট কণাপুঞ্জ) ৫০ শতাংশের বেশি।  [এম আমিনুল ইসলাম]

বায়ুদূষণ  বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানি দহন ছাড়াও বায়ুদূষণের অন্যান্য উৎসের মধ্যে রয়েছে ইটের ভাটা, সার কারখানা, চিনি, কাগজ, পাট ও বস্ত্র কারখানা, সুতা কল, চামড়া শিল্প, পোশাক, রুটি ও বিস্কুট কারখানা, রাসায়নিক ও ঔষধ তৈরি শিল্প, সিমেন্ট উৎপাদন ও প্রসেসিং কারখানা, দালানের জন্য গ্রিল ও দরজা-জানালা নির্মাণ ওয়ার্কশপ, করাত কলের কাঠের গুঁড়া, চাষকৃত জমির ধুলাবালি, উপকূলবর্তী দ্বীপ ও উপকূলাঞ্চলে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের লবণকণা ইত্যাদি। এসব উৎস থেকে প্রচুর পরিমাণ ধোঁয়া, বাষ্প, গ্যাস ও ধূলিকণা ইত্যাদি বাতাসে মিশে ধোঁয়া সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করে।

বাংলাদেশের কোন কোন শিল্প কারখানা হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S), অ্যামোনিয়া, ক্লোরিন এবং আরও কিছু দুর্গন্ধযুক্ত, বিষাক্ত বা বিরক্তিকর রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদন করে যেগুলি সর্বসাধারণের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ঢাকা ও অন্যান্য শহরের মানুষ কখনও কখনও এ ধরনের গন্ধের ব্যাপারে এতটা অভ্যস্ত যে তারা এগুলিকে আর অনেক সময় বায়ুদূষক হিসেবে বিবেচনা করে না। উদাহরণ হিসেবে ঢাকার হাজারীবাগের চামড়ার কারখানাগুলির কথা বলা যায়। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ক্লোরিন, SO2, H2S ও অ্যামোনিয়ার মতো বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়। কোন কোন ভবন তৈরির পরিকল্পনা নিম্নমানের এবং সেগুলিতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ব্যবস্থা না থাকায় তামাকের ধোঁয়া, চুল্লি ও উনুনের গ্যাস, প্রাত্যহিক গৃহস্থালির কর্মকান্ডে তৈরি বিভিন্ন গ্যাসীয় বর্জ্য বেরিয়ে আসতে পারে না। এভাবে অনেক সময় বাইরের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর তুলনায় ঘরে অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ ৫-১০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে মাথা ব্যথা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দেয়।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা (প্রায় ১ কোটি বাসিন্দা) পৃথিবীর সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ নগর। তাদের প্রাত্যহিক পরিবহণ হলো মোটরগাড়ি, বেবিট্যাক্সি ও টেম্পো, যাদের সিংহভাগই ২-স্ট্রোক ইঞ্জিনচালিত। নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহার দক্ষতাসম্পন্ন এসব ইঞ্জিন ৪-স্ট্রোক ডিজেল ইঞ্জিনের তুলনায় ৪০ গুণ বেশি হাইড্রোকার্বন ও অধিক কার্বন মনোঅক্সাইড বায়ুতে ত্যাগ করে। বর্তমানে সরকার ২০০২ সালের মধ্যেই সব ২-স্ট্রোক ইঞ্জিনচালিত পরিবহণ ঢাকা শহর থেকে অপসারণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বাংলাদেশের জন্য বায়ুর নিম্নোক্ত মান নির্ধারণ করেছে। সারণিতে উল্লিখিত স্থানসমূহে বায়ুদূষণের ঘনত্ব এই মাত্রার অধিক (মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার) বাঞ্ছনীয় নয়।

সারণি  সর্বোচ্চ সহনীয় বায়ুদূষণের মাত্রা (মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার)।

স্থান SPM SO2 CO NO
শিল্পাঞ্চল ও মিশ্রএলাকা ৫০০ ১২০ ৫০০০ ১০০
বাণিজ্যিক এলাকা ৪০০ ১০০ ৫০০০ ১০০
আবাসিক এলাকা ও গ্রামাঞ্চল ২০০ ৮০ ২০০০ ৮০
স্পর্শকাতর এলাকা  (হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) ১০০ ৩০ ১০০০ ৩০

[এম শামসুল ইসলাম ও কামরুন নেসা বেগম]

শব্দদূষণ (Noise pollution)  শব্দদূষণের প্রকোপ বাংলাদেশের জন্য এক সুদূরপ্রসারী পরিণতিবহ সমস্যা হয়ে উঠছে। গাড়ির হর্ন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কোন ট্রাফিক আইন না থাকায় শহরের অনেক অংশে শব্দসমস্যা অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করেছে। শব্দদূষণের উৎস হচ্ছে মোটরগাড়ি, ট্রাক, বাস, উড়োজাহাজ, মোটর সাইকেল, রেলগাড়ি, নির্মাণকাজ ও শিল্পকারখানা।

বস্তি এলাকার কারণে পরিবেশ দূষণ

শব্দ পরিমাপের একক হলো ডেসিবেল। ডেসিবেল মাত্রা হতে পারে ১ থেকে ১৬০ পর্যন্ত। এক থেকে ৬০ ডেসিবেল পর্যন্ত সহনীয়, ৬০ থেকে ১০০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ বিরক্তিকর এবং ১০০ থেকে ১৬০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ শ্রবণশক্তির জন্য ক্ষতিকর। উত্তর আমেরিকায় শব্দের গড়মাত্রা প্রতি ১০ বছরে প্রায় দ্বিগুণ বাড়ছে বলে জানা যায়। বাংলাদেশেও শব্দের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।  [এম আমিনুল ইসলাম]

তেজস্ক্রিয়তাজনিত দূষণ (Radiation pollution)  মানুষের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর এক ধরনের অদৃশ্য দূষণ। তেজস্ক্রিয়তার উৎস সূর্য ও মহাশূন্য যেখান থেকে তা পৃথিবীতে পৌঁছয়। ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়তার অধিকাংশ বিকরিত হয় বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ, বিশেষত পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ (তেজস্ক্রিয় ভস্ম বা ধূলিকণা), পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক সামগ্রী থেকে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য লেজার রশ্মি, এক্সরে মেশিন, রঙিন টেলিভিশন সেট, মাইক্রো-ওয়েভ ওভেন ইত্যাদি।

স্বল্পমাত্রার তেজস্ক্রিয়তা মানবদেহের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে তা এখনও জানা যায় নি। তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা রেম (rem) একক দ্বারা পরিমাপ করা হয়: ১ রেম = ১০,০০০ জনের মধ্যে ১ জনের সম্ভাব্য ক্যান্সারজনিত মৃত্যু; শূন্য থেকে ২০০ রেম = ক্যান্সারের ঝুঁকি অধিক; ৩০০ থেকে ৫০০ রেম = তেজস্ক্রিয়তাজনিত রোগে মৃত্যু।

তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকর প্রভাব ভালভাবে লক্ষ্য করা যায় কোষ গঠনের ক্ষেত্রে। তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত কোষ মরে গেলে বা আপনা আপনি সুস্থ হয়ে উঠলে পরবর্তী সময়ে কোন সমস্যা ঘটে না। কিন্তু একটি ক্ষতিগ্রস্ত কোষ পরবর্তী পর্যায়ে ক্যানসার প্রবণ হয়ে ওঠে। মানুষের জননকোষ তেজস্ক্রিয়তায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেগুলি বন্ধ্যা হয়ে পড়ে, নবজাতক বিকলাঙ্গ বা মানসিকভাবে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

বিশ্বজুড়ে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য অপসারণের সমস্যা জনসমাজে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য গভীর সমুদ্রে নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে যা সমুদ্রের চারপাশে বসবাসরতদের জন্য একটি বড় আতঙ্কের বিষয়।

বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিক্ষেপের ঘটনায় দক্ষিণ এশিয়াসহ ভারত উপমহাদেশের জনগণের উদ্বেগ বেড়েছে। অধুনা পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের ফলে সৃষ্ট দূষণ বিশ্বব্যাপী মানুষের আতঙ্ক ও উদ্বেগের কারণ হয়েছে এবং মানবজাতি ও সামগ্রিকভাবে প্রাণিজগতের নিরাপত্তার স্বার্থে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।  [এম আমিনুল ইসলাম]

মৃত্তিকাদূষণ (Soil pollution) মৃত্তিকা বা মাটি ভূত্বকের উপরিভাগের একটা পাতলা আবরণ। মাটির বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে কৃষি ব্যবস্থা। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় কৃষিকাজের উপযুক্ত মৃত্তিকা গঠনে দীর্ঘ সময় লাগে। বাংলাদেশের মাটি স্তরে স্তরে গঠিত, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলি অবলয়িত (azonal) বৈশিষ্ট্যের। প্রতি বছর বন্যার ফলে মাটিতে নতুন নতুন স্তর সঞ্চিত হতে থাকে, আবার পুরানো স্তরগুলির বিন্যাসের বৈশিষ্ট্যেও পরিবর্তন বা রূপান্তর আসে। ব্যবস্থাপনার অভাবে ইদানিং বাংলাদেশে মৃত্তিকাদূষণ একটি গুরুতর বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

মাটির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস ছাড়াও মৃত্তিকা দূষণের আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে ভূমিক্ষয় যা মাটির গুণগত পরিবর্তন ঘটায় এবং বন্ধনকে দুর্বল করে। উপরন্তু, বৃক্ষ, মাটির উপরের ঘাস ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ আবরণ (যা মাটিকে নির্দিষ্ট জায়গায় ধরে রাখে) সেগুলি অপসারিত বা ধ্বংস হলে মৃত্তিকা ক্ষয়ের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় এবং বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টির পানিতে মাটি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। বন্যার ফলেও মাটি স্থানান্তরিত হয়, এতে মাটির গঠনের গুণগত পরিবর্তন দেখা দেয়।

ভূমিক্ষয় ও ভূমি অপসারণ দুটি প্রক্রিয়াই মাটিকে ক্রমশ অনুর্বর করে তোলে যা ঐ অঞ্চলের প্রাকৃতিক বাস্ত্তসংস্থানের ভারসাম্যও বিনষ্ট করে। অপরিকল্পিত ও অসমন্বিত ভূমি ব্যবহার এবং চাষাবাদ পদ্ধতি পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণ। একইভাবে রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য জমি পরিষ্কার, গাছকাটা, বন-উজাড়ের জন্যও মৃত্তিকাক্ষয় ঘটে।

উন্নত জাতের নানা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সার ও বালাইনাশক ব্যবহার প্রয়োজন। সার মাটিতে অতিরিক্ত উর্বরতা যোগায় এবং অধিক ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে। কিন্তু অধিক পরিমাণে সার প্রয়োগের ফলে হিউমাস ভেঙ্গে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানে পরিণত করতে ব্যাকটেরিয়ার কার্যকারিতা হ্রাস পায়।

বিভিন্ন ফসল, বিশেষত খাদ্যশস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে অধিক ফলন লাভের জন্য অধুনা বালাইনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফসলের ক্ষতিকর আগাছা ও কীটপতঙ্গ দমনে বালাইনাশকের প্রয়োগ প্রায়ই প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু এগুলির অত্যধিক ব্যবহারের ফলে মাটির ব্যাকটেরিয়া ও উপকারী অণুজীব ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে ফসলের পরিমাণ হ্রাস পায়।  [এম আমিনুল ইসলাম]

পানিদূষণ  পানির গুণাগুণের যে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ও ক্ষতিকর পরিবর্তন। গৃহস্থালির আবর্জনা, শিল্প ও কৃষিখামারের বর্জ্য এবং মানুষ ও পশুর মলমূত্র থেকে পানিদূষণ ঘটে। শিল্পে ব্যবহূত এসিড, বালাইনাশক, তেল ও বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পদার্থ জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ ধ্বংস করতে পারে। ফসফেট, রাসায়নিক সার, সাবানজাতীয় দ্রব্য (detergent) ও বিষ্ঠা জলজ প্রাণী এবং উদ্ভিদকে মাত্রাতিরিক্ত পুষ্টি যোগানোর মাধ্যমে পানি দূষিত করে। অধিক পুষ্টির ফলে জলজ শেওলার অত্যধিক বৃদ্ধি ও পরবর্তী সময়ে মৃত্যু ঘটে, ব্যাকটেরিয়া এসব মৃত শেওলার পচন ঘটাতে অত্যধিক পরিমাণে পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করে। যার ফলে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। এ ধরনের দূষণকে সুপুষ্টিকরণ (eutrophication) বলে।

শিল্প বর্জ্যের কারনে বায়ু ও পানি দূষণ

শিল্প ও পৌর বর্জ্য বাংলাদেশের নদী ও জলাশয়গুলিকে দূষিত করছে। পরিবেশ অধিদপ্তর উল্লেখ করেছে যে চট্টগ্রামের টিএসপি সার কারখানা থেকে সালফিউরিক ও ফসফরিক এসিড এবং চন্দ্রঘোনার কর্ণফুলি কাগজ মিল, সিলেট কাগজ মিল, দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানি, খুলনার শিপাইয়ার্ড ও মাছ-প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, ঢাকার অলিম্পিক ও কাদেরিয়া টেক্সটাইল মিলস লক্ষ লক্ষ গ্যালন তরল বর্জ্য পার্শ্ববর্তী নদী ও জলাশয়ে নিক্ষেপ করে পানিদূষণ ঘটাচ্ছে।

চট্টগ্রামের কালুরঘাট, নাসিরাবাদ, পতেঙ্গা, কাপ্তাই, ভাটিয়ারি, বাড়বকুন্ড, ফৌজদারহাট ও ষোলশহরের প্রায় ১৪০টিরও অধিক শিল্পকারখানার বর্জ্য কর্ণফুলি নদী ও বঙ্গোপসাগরে নিক্ষিপ্ত হয়। চট্টগ্রামে ১৯টি চামড়া শিল্প, ২৬টি বস্ত্রকল, ১টি তেলশোধনাগার, ১টি টিএসপি সারকারখানা, ২টি রাসায়নিক কারখানা, ৫টি মাছ-প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, ২টি সিমেন্ট কারখানা, ১টি পেপার রেয়ন মিল, ১টি ইস্পাত মিল, ২টি সাবান কারখানা, ২টি কীটনাশক কারখানা, ৪টি রঙের কারখানা ও প্রায় ৭৫টি অন্যান্য ছোট শিল্প কারখানা রয়েছে।

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর পানি পোস্তগোলা ও ফতুল্লার ৫৩টি কারখানা এবং হাজারীবাগের ১৫১টি চামড়া শিল্প দ্বারা দূষিত হচ্ছে। চামড়া শিল্পের বর্জ্যে সালফিউরিক এসিড, ক্রোমিয়াম, অ্যামোনিয়াম সালফেট, ক্লোরাইড ও ক্যালসিয়ামের অক্সাইড থাকে। এগুলি চুয়ানোর মাধ্যমে ভূগর্ভের পানিতে মিশে মাটির উপরের ও নিচের উভয় পানির উৎসকে দূষিত করতে পারে। ট্যানারির দুর্গন্ধ আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। অন্তত ২৯টি শিল্পকারখানা টঙ্গী অঞ্চলের তুরাগ নদী এবং ৪২টি বৃহৎ শিল্প শীতলক্ষ্যা নদীতে বর্জ্য নিক্ষেপ করে।

খুলনার রূপসা শিল্পনগরীর বেশ কয়েকটি শিল্প ও দিয়াশলাই কারখানা রূপসা নদীতে বর্জ্য নিক্ষেপ করে দূষণ ঘটাচ্ছে। খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল, গোয়ালপাড়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, খালিশপুরের পাট ও লোহাশিল্প কারখানাগুলি তাদের উৎপাদিত যাবতীয় বর্জ্য ভৈরব নদীতে ফেলছে। খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল ঘণ্টায় প্রায় ৪,৫০০ ঘনমিটার বর্জ্যমিশ্রিত পানি ভৈরব নদীতে ফেলে। শহরাঞ্চলের শিল্পবর্জ্য ছাড়াও গঙ্গার উজানের নিক্ষিপ্ত বর্জ্যমিশ্রিত পানিতে পদ্মাও দূষিত হয়ে পড়ছে। গঙ্গা ভারত থেকে প্রায় ৮,৬২,০০০ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত গঙ্গা অববাহিকার বর্জ্য বয়ে নিয়ে আসে। তীরবর্তী ৭০০ শহরের প্রায় ১২০ কোটি লিটার বর্জ্য প্রতিদিন গঙ্গানদীর প্রবাহে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে এবং ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের মানুষ সেই দূষিত পানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে।

চট্টগ্রামে কর্ণফুলি নদীতে মাছের বংশবৃদ্ধি পানি দূষণের ফলে হ্রাস পেয়েছে এবং রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা উপজেলার অনেক মৎস্যজীবী বেকার হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার উপকূল জুড়ে রয়েছে ‘জাহাজ ভাঙা শিল্প’। জাহাজ ভাঙার সময় প্রচুর পরিমাণ অব্যবহূত ইঞ্জিন তৈল ও তলায় সঞ্চিত তৈল বঙ্গোপসাগরে পড়ে এবং বিস্তৃত অঞ্চলের পানি দূষিত হয়। বিভিন্ন ধরনের ধাতু সমুদ্রের পানিতে মিশে পানি আরও দূষিত হয়। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলি কঠিন ও তরল বর্জ্য নির্বিচারে সাগরে ফেলে নিয়মিত পানির দূষণ ঘটাচ্ছে। মংলা বন্দর অভিমুখী জাহাজগুলি সুন্দরবনের ভিতর পশুর নদী দিয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার সময় পানিতে তরল ও কঠিন বর্জ্য নিক্ষেপ করে বনাঞ্চলে দূষণ ঘটায়।

বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আর্সেনিক দূষিত পানির মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি। ১৯৮৩ সালে এ সমস্যা প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ (SOES) ১৯৯৫ সালে কলকাতায় এ বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহবান করে যা বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর জরুরি ভিত্তিতে গবেষণা পরিচালনার উপর গুরুত্ব আরোপ করে। পরে পশ্চিমবঙ্গের আরও কয়েকটি জেলায় আর্সেনিক দূষণ দেখা দেয়। ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল ও পশ্চিমবঙ্গের SOES ১৯৯৫ সালের আগষ্ট থেকে ২০০০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণ নিরূপণে মাঠপর্যায়ে জরিপ পরিচালনা করে। প্রায় ২৪০ দিন ধরে এই জরিপ চলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, পানিতে আর্সেনিকের নিরাপদমাত্রা ০.০১ মিলিগ্রাম/লিটার এবং অনুমোদনযোগ্য সর্বোচ্চসীমা ০.০৫ মিলিগ্রাম/লিটার। গত ৫ বছরে মোট ৬৪টি জেলায় পরিচালিত জরিপ থেকে জানা যায় ৫৪টি জেলার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকমাত্রা ০.০১ মিলিগ্রাম/লিটার এর অধিক, এর মধ্যে ৪৭টি জেলায় ০.০৫ মিলিগ্রাম/লিটারের অধিক। অবশিষ্ট ১০টি জেলা এখনও নিরাপদ।

ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভে ও বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ কর্তৃক ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে যৌথভাবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে ১.৮৫ থেকে ২.২৭ কোটি মানুষ ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক দূষণযুক্ত পানি ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণ সমস্যা এতটাই জরুরি হয়ে উঠেছে যে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করছে। আর্সেনিক দূষণের সমাধান ও বিষক্রিয়ার প্রকোপ হ্রাসের কৌশল উদ্ভাবনই এ গবেষণার লক্ষ্য। অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া ও অন্যান্য স্থানে বর্জ্য খনিজ স্ত্তপীকরণ এবং বালিখননকে মাটিতে আর্সেনিক দূষণের কারণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল ও SOES-এর নিকট বাংলাদেশের ০.০৫ মিলিগ্রাম/লিটার মাত্রার আর্সেনিক দূষণ সম্পন্ন ৪৭টি জেলার ১৫,৯৬৯ নলকূপের (৬.৪ মিটার থেকে ৪০ মিটার গভীর) বিশ্লেষণমূলক তথ্য রয়েছে। নলকূপের পানি পরীক্ষা ও আর্সেনিক আক্রান্তদের শনাক্তকরণসহ কর্মসূচির স্বাস্থ্যবিষয়ক দিকগুলি দেখাশোনার দায়িত্ব ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল পালন করে।  [এম শামসুল ইসলাম ও কামরুন নেসা বেগম]

পরিবেশের অবক্ষয় (Environmental degradation) ভৌত-পরিবেশীয় সমস্যাগুলি উন্নয়ন সমস্যার সঙ্গে অদৃশ্যভাবে মিশে যাওয়ার দরুন প্রকৃতির অসতর্ক ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বিকাশ আরও বিঘ্নিত হয়েছে, সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবহারের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে অসাম্য। অনেক জমির অপব্যবহার হচ্ছে, অতি ব্যবহারের ফলে অনেক জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। সমস্যাটি অবশ্য জমির প্রকৃষ্ট ব্যবহারের নীতি বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত। জমির ব্যবহার ও আচ্ছাদন পরিবর্তনের ফলে দেখা দিচ্ছে সম্পদহানি, গ্রামীণ ভূমিহ্রাস, ভূমি অবক্ষয়, বনউজাড়, মরুকরণ, ভূমিক্ষয়, লবণাক্ততা, জলাভূমি, হ্রদ ও জীববৈচিত্র্য লোপ। মূল বিষয় হলো ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনজনিত অবস্থান্তরের বিস্তার। পরিবেশগত চাপের ফলে উদ্ভূত পরিবেশের অবক্ষয়, যেমন পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল, বিশেষত রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, কুষ্টিয়া ও যশোর জেলার কিছু এলাকায় ক্রমবর্ধমান শুষ্কতা আজ বাংলাদেশে একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয়।

এ অঞ্চলের মানুষের কর্মকান্ড ও ভূমির ব্যবহার জীবপরিবেশে নানাভাবে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ভূমিক্ষয়, লবণাক্ততা ও মরুপ্রবণতার আশঙ্কা বৃদ্ধি করেছে। সাম্প্রতিক জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে ক্রমবর্ধমান শুষ্কতা ও বালুময় অঞ্চলের প্রসার উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। জলবায়ু শুষ্ক হওয়ার দরুনই মরুপ্রবণতার এই বিস্তার বলে ধারণা করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রকট বর্ধমান শুষ্কতার মূলে রয়েছে প্রধানত ভূমিরূপের পরিবর্তন, চরভূমি গঠন, নদীর পানিশূন্যতা ও নাব্যতা হ্রাস যার কারণ গঙ্গার পানি অপসারণ, গাছপালার আচ্ছাদন হ্রাস (বনসম্পদ উজাড়), ভূমিক্ষয়, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা (দেশের আরও অভ্যন্তরে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ)। পরিবেশের এ ধরনের গুণমানের দ্রুত অবনতির ফলে ইতোমধ্যেই জমির উৎপাদনশীলতা  হ্রাস পেয়েছে।

ভূমি অবক্ষয়ের আরেকটি কারণ চাষাবাদ ও বসবাসের জন্য জলাভূমির পরিবর্তন। কয়েক’শ জলাভূমি ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে এবং আরও বড় বড় কয়েকটি বিলীন হওয়ার পথে। বর্তমানে বাংলাদেশে জলাভূমির মোট পরিমাণ ৭০-৮০ লক্ষ হেক্টরের মতো। এতে রয়েছে নদী, হ্রদ, মোহনা, পুকুর অন্যান্য ভূমি যা বর্ষা মৌসুমে ৩০ সেমি বা আরও অধিক গভীরতায় প্লাবিত হয়। ঐতিহ্যগত ও সাংস্কৃতিকভাবে জলাভূমি বাংলাদেশের মনুষ্যবসতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে জলাভূমির সম্পদ, বিশেষত মাছ, বনভূমি ও বন্যপ্রাণী অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অত্যধিক জনসংখ্যার চাপে পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনাঘটিত পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত কৃষি সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশের জলাভূমি-সম্পদ মান ও পরিমাণ উভয় দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত।

নগরায়ণ প্রক্রিয়া পরিবেশের ওপর ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশে নগরায়ণের প্রসার নিম্নগতিতে হলেও গত কয়েক দশকে শহরে জনসংখ্যা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে শহরের সীমিত অবকাঠামোর উপর অত্যধিক চাপ পড়ছে। অধিকন্তু, অধিকাংশ শহরের ৩০ শতাংশের বেশি মানুষ বসবাস করছে বস্তিতে, যেখানে সেখানে। বায়ু ও পানি দূষণ, বর্জ্য নিষ্কাশন ও স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকটরূপ ধারণ করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিচালিত শিল্প কারখানা থেকে নির্গত বায়ু ও পানি লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দেখা দিচ্ছে। কর্মসন্ধানী গ্রামীণ মানুষের শহরমুখী অভিযাত্রা শহরের দুর্বল অবকাঠামো ও পরিবেশের অবক্ষয় বাড়িয়েই চলেছে।

বন্যা (উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ) এবং উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড়ও পরিবেশের অবক্ষয় ঘটায়। বিশাল সামাজিক সমস্যা ছাড়াও বন্যার ফলে জনসাধারণের জীবনযাত্রার মান ও পরিবেশের গুণগত অবনতি ঘটে। খরাও পরিবেশের অবনতি ও জীবনযাত্রার মানের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এছাড়া ভূমি ব্যবহারের নানা রূপান্তরজনিত প্রক্রিয়া জীব-ভূরাসায়নিক চক্র, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু প্রণালীতে পরিবর্তন ঘটায়। [এম আমিনুল ইসলাম]

প্লাবন ও বন্যা (Inundation and flood)  বন্যা বাংলাদেশের আরেকটি ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়। প্লাবনভূমিতে নদীর প্রবাহ বৃদ্ধি ও নদীপৃষ্ঠ উঁচু হওয়ার ফলে বন্যার সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বন্যার স্থায়িত্বকাল, বিস্তার, পরিধি ও মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায় দেশের মোট এলাকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্বভাবত বন্যাপ্রবণ, যেখানে সাড়ে তিন কোটির অধিক লোকের বাস।

জলমগ্নতার দুটি বিশেষ দিক আছে। একটি বর্ষা, অন্যটি বন্যা। বর্ষা (জুন-অক্টোবর) স্বাভাবিক প্লাবনের মৌসুম। কৃষিকাজের জন্য বর্ষা উপকারী। পানি বসতবাড়িতে না উঠা পর্যন্ত এবং বিশেষত ফসলের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অবস্থাকে স্বাভাবিক প্লাবন বলা হয়। প্লাবনের সময়, স্থায়িত্ব ও বিস্তার অস্বাভাবিক হলে, বসতবাড়ি ও সংলগ্ন ভূমিতে পানি উঠলে এবং ফসলের ক্ষেত পানির কয়েক সেন্টিমিটার নিচে তলিয়ে গেলে যে অবস্থা দেখা দেয় তাই বন্যা এবং এই পরিস্থিতি দুর্যোগপূর্ণ ও ক্ষতিকর। প্রাচীনতম বন্যা হিসেবে ১৭৬৯ সালের বন্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে বড় বড় বন্যা হয়েছে ১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৫৬, ১৯৬২, ১৯৬৩, ১৯৬৮, ১৯৭০, ১৯৭১, ১৯৭৪, ১৯৭৬, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৭ ও ২০০০ সালে।  [এম আমিনুল ইসলাম]

মানচিত্রের জন্য দেখুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ; বন্যা

পরিবেশের উদ্বেগজনক স্থান (Areas of environmental concern)  বাংলাদেশের কয়েকটি নাজুক পরিবেশীয় অঞ্চল নিচে আলোচিত হলো।

উপকূলীয় পরিবেশ ভৌত ও চাষাবাদ উভয় ধরনের কর্মকান্ডের জন্য ঝুঁকিপ্রবণ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল খুবই নাজুক পরিবেশীয় অবস্থায় রয়েছে। ব্যাপক প্রাকৃতিক ও চাষাবাদ প্রক্রিয়ার প্রভাবে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বৈচিত্র্যময় এই উপকূলের প্রাকৃতিক পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। ফলে ভূমিক্ষয় ও পলি জমা হওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমির গঠন পাল্টে যাচ্ছে। নদী ভাঙন, নতুন নতুন চর জেগে ওঠা এবং ফলশ্রুতিতে ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন থেকে তা লক্ষ্য করা যায়। দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-প্রকৃতিসহ চরম অবস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে উজান থেকে আসা উচ্চ প্রবাহের সঙ্গে বিপুল পলি, বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী প্রবল জোয়ারভাটা ও বর্ষাকালের প্রবল পানিপ্রবাহ।

Environment.jpg

বিগত ২০০ বছরেরও অধিক সময়কালে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপসমূহের জেগে ওঠার ফলে মোহনার পরিবর্তন হয়েছে। নদীখাতের স্থান বদল ও দক্ষিণে কতক দ্বীপের উদ্ভব ঘটেছে। পরিবেশ পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে প্রবল ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। অধিকন্তু, উপকূলে রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম এক অনন্য বাস্ত্ততন্ত্র (ecosystem) সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য। এ অঞ্চল উন্নয়নে মানুষের প্রয়াস অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নাজুক বাস্ত্ততন্ত্রের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা সমস্যা  পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার সম্মিলিত প্রবাহ কয়েকটি মোহনার মাধ্যমে উপকূল অঞ্চলে স্বাদুপানি বয়ে নিয়ে আসে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পলিবাহী নদীগুলির মধ্যে গরাই ও তার শাখানদীগুলির ভূমিকাই প্রধান। গঙ্গার প্রধান শাখানদী গরাই দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বৃহদাংশের পানির সিংহভাগ যোগায়। গরাই-মধুমতী দিয়ে বাহিত উজানের স্বাদু পানির প্রবাহ এই অঞ্চলের লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করে।

ফারাক্কা (ভারত) বাঁধের উজানে পানি প্রত্যাহার করার ফলে ভাটিতে পানির প্রবাহ ও স্বাদুপানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। গরাই নদীর মুখ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবং শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির স্তর নেমে যাওয়ায় ভাটিতে যথেষ্ট পানি পৌঁছয় না। পানিপ্রবাহ হ্রাস পাওয়ার ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমে উজানের দিকে ক্রমেই লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে এবং গোটা অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা সমস্যা দেখা দিয়েছে।

শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৫০০ মাইক্রোমো (micromho) অধিকমাত্রার লবণাক্ততা দেশের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ার ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। অধিকন্তু, লবণাক্ত পানি নদীর আরও উজানে পৌঁছনোর ফলে গোটা মোহনার বাস্ত্তসংস্থান পাল্টে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২০,৭০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা দাঁড়িয়েছে ২০০০ মাইক্রোমেরও অধিক। সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, বাগেরহাট ও গোপালগঞ্জ লবণাক্ততায় বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

পদ্মার পানি প্রবাহের ঘাটতির ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের একটি বড় অংশ রয়েছে বঙ্গোপসাগরের জোয়ার-ভাটার অধীন। এই অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের বাস্ত্তসংস্থানে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের প্রাধান্য রয়েছে। ফারাক্কায় পানি প্রত্যাহারের আগে গঙ্গার প্রবল পানি প্রবাহ সমুদ্র থেকে উজানমুখী লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ রোধ করত। এভাবে বিশাল একটি অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা বিরূপ প্রভাব ফেলছে এবং তাতে কৃষি, মৎস্যচাষ, বনায়ন, শক্তি উৎপাদন, শিল্প ও অন্যান্য কার্যক্রম বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এইসঙ্গে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব ও বিস্তার পরিবেশীয় বিপর্যয়ের পরিস্থিতিও সৃষ্টি করছে।

সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার প্রায় ৫ লক্ষ ৭০ হাজার বর্গ হেক্টরের সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বাস্ত্ততন্ত্র। মোট এলাকার প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার হেক্টর জুড়ে রয়েছে নদীনালা ও অন্যান্য জলস্রোত।

কয়েক দশক আগেও গোটা উপকূলে, বিশেষত কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী ও খুলনা জেলায় নিবিড় ম্যানগ্রোভ অরণ্য ছিল। বর্তমানে প্রায় ১৫ লক্ষ একরের ম্যানগ্রোভ বন তথা সুন্দরবন টিকে আছে। চিংড়িচাষ, লবণ উৎপাদন ও স্রেফ অস্তিত্বনির্ভর (subsistence) চাষাবাদের দরুন আগের তুলনায় সুন্দরবনের আয়তন অনেকটা হ্রাস পেলেও এটি আজও পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র (ecosystem) হিসেবে বিবেচিত। বসতি নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকলেও সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ চলছে স্মরণাতীতকাল থেকেই। এসব কর্মকান্ডের মধ্যে রয়েছে কাঠ কাটা, মাছ ধরা এবং মধু ও মোম, ঝিনুক ও খোলক আহরণ।

মানুষের কার্যকলাপের ফলে সুন্দরবনের ব্যাপক বাস্ত্তসংস্থানিক পরিবর্তন ঘটছে। ভূমিব্যবহারের পরিবর্তনে জীববৈচিত্র্য ও জৈব ভূরাসায়নিক চক্র বদলে যাওয়ায় গোটা আবহাওয়ার ধরনও বদলাচ্ছে। সুন্দরবনের প্রধান অর্থকরী বৃক্ষ প্রজাতি সুন্দরি গাছের ব্যাপক আগামরা রোগ অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। জাহাজ থেকে নির্গত তেল, লবণাক্ততা, নদীপ্রবাহ হ্রাস ও বেআইনী কার্যকলাপ এখানকার বাস্ত্তসংস্থানিক ভারসাম্য ধ্বংসের প্রধান কারণ। বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে সুন্দরবন অঞ্চলের একটা সম্পর্ক রয়েছে। সুন্দরবনের আবহাওয়ার কোন পরিবর্তন হলে গোটা দেশের জলবায়ু ও জনজীবনের উপর তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। মানবজাতির স্বার্থে এবং বিশেষত পরিবেশের গুণগতমান রক্ষার্থে বিশ্বের এ অনন্য বাস্ত্ততন্ত্র ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে। এই লক্ষ্যে ইউনেস্কো কর্তৃক সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যের (World Heritage Site) অন্তর্ভুক্তি ঘোষণা পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চল সুরক্ষার একটি পদক্ষেপ।

উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্প  দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের লবণাক্ত এলাকার উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্প এবং স্বাদুপানি অঞ্চলের চলনবিল প্রকল্প হলো বর্তমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন (FCD) কর্মকান্ডের মারাত্মক ফলাফলের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভূমির শ্রেণীবিন্যাস না হওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশনের অসংখ্য নিয়ন্ত্রণ কাঠামো থাকা সত্ত্বেও অনেকগুলি উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্পের অধিকাংশ নিচু এলাকা জলায় পরিণত হয়েছে। বাঁধের ভিতর ও বাইরের খালগুলি ধীরে ধীরে পলি ভরাট হয়ে পড়েছে। তদুপরি, দ্রুত পলি পতনের দরুন খালের মুখ ও নালী বন্ধ হয়ে গেছে এবং উঁচু এলাকাগুলিতেও ধীরে ধীরে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। অসংখ্য কাঠামো নির্মাণের ফলে খালগুলির পানি পরিস্থিতির অপরিবর্তনীয় রূপান্তর ঘটেছে।

চিংড়িচাষ  এটি উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একটি বড় ধরনের পরিবেশীয় সমস্যা সৃষ্টি করেছে। কোন কোন অঞ্চলে, বিশেষত সাতক্ষীরা ও খুলনা এলাকায় দেশের প্রায় ৮০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে চিংড়ি চাষের ফলে সেখানে লবণাক্ততার সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে গাছগাছালি উজাড় ও উর্বর কৃষি জমি ধ্বংস হচ্ছে।

চিংড়ি চাষের জন্য বছরে অন্তত ৮-৯ মাস আবদ্ধ লোনাপানি ধরে রাখা আবশ্যক হয়। এতে উপকূলীয় নিম্নভূমিতে লোনাপানি ঢুকানোর দরুন ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তিত ধারা অর্থনীতি ও পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। চিংড়ি চাষ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি প্রধান উৎস বিধায় প্রতি মৌসুমে বিশাল এলাকা, বিশেষত খামার ও চারণভূমি লোনাপানিতে প্লাবিত করা হয়।

শুষ্ক মৌসুমে স্বল্পলোনা পানির চিংড়ি চাষের সঙ্গে বর্ষাকালের ধানচাষ সঙ্গতিপূর্ণ। চিংড়ি চাষে জমিতে লোনাপানি ঢুকানোর জন্য উপকূলীয় বাঁধ স্থানে স্থানে কেটে ফেলা হয়। এভাবেই কৃষি জমি চিংড়ি চাষের পুকুরে পরিণত হচ্ছে এবং লবণাক্ততা ও মাটির পরিবর্তনের ফলে উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বর্ষাকালীন ধানের ফলন ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।

চকোরিয়া সুন্দরবন  চট্টগ্রামের চকোরিয়া ও নাফ নদী এলাকার প্রাচীনতম ম্যানগ্রোভ বনের পুরোটাই ইতোমধ্যে চিংড়িচাষ, লবণ উৎপাদন ও কৃষি কাজের জন্য ধ্বংস হয়ে গেছে। চকোরিয়া ম্যানগ্রোভ বনে চিংড়িচাষ আর্থসামাজিক ও বাস্তসংস্থানিক ব্যবস্থার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। ম্যানগ্রোভ বনের বিলুপ্তির ফলে গোটা এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে। এইসঙ্গে ভূমিক্ষয়, পরিবেশীয় বিপর্যয় ও জীববৈচিত্র্যর অবলুপ্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত চিংড়িচাষই চকোরিয়া সুন্দরবন ধ্বংসের জন্য দায়ী।

নাফ নদীর মোহনা  চকোরিয়া সুন্দরবনের মতো নাফ নদীর মোহনায়ও এক সময় ছিল একটি নিবিড় ম্যানগ্রোভের জলাভূমি। জোয়ারধৌত কর্দমভূমিতে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে চিংড়িচাষ, লবণ-উৎপাদন ও মৌসুমি ধানচাষ সেখানে ক্ষতিকর পরিবেশীয় প্রভাব ফেলেছে। ম্যানগ্রোভ বনকে কৃষি জমি ও চিংড়ি চাষের পুকুরে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় পাশের এলাকার মাটি ও পানির উপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে, তাতে গোটা অঞ্চলের স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টেকনাফের অদূরবর্তী নাফ নদী বরাবর পুরানো ম্যানগ্রোভ বনে চিংড়ি চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি জমিকে চিংড়ির পুকুরে পরিণত করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় লোকদের জীবনযাত্রার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

উপকূলীয় দূষণ  উপকূলীয় দূষণের বিবিধ উৎসের মধ্যে রয়েছে নদীর উজানে অবস্থিত কাগজের কল ও অন্যান্য কারখানা থেকে নির্গত তরল বর্জ্য। অধিকাংশ কারখানায় বর্জ্য শোধনের কোন ব্যবস্থা না থাকায় অশোধিত বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলি নদী বা বঙ্গোপসাগরে ফেলা হয়, এতে জলজ প্রাণী ও মোহনার বাস্ত্ততন্ত্র (ecosystem) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে গৃহস্থালির আবর্জনাও নদী ও সাগরে ফেলার ফলে পানিতে অক্সিজেনঘাটতি দেখা দেয় এবং স্থানীয় মাছের উৎপাদন হ্রাস পায়। পানি সম্পদ উন্নয়ন কর্মকান্ডের দরুন উপকূল অঞ্চলে মাছচাষের পরিবেশ, জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব, জীববৈচিত্র্য ও জীবন ধারণ ব্যবস্থা বর্তমানে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

সামুদ্রিক দূষণ  পরিবেশীয় দূষণ সংক্রান্ত অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো বঙ্গোপসাগরের দূষণ। সাগর দূষণের প্রধান উৎস শহরের শিল্পবর্জ্য, নদীবাহিত আবর্জনা এবং চট্টগ্রাম ও মঙ্গলা বন্দরের জাহাজ থেকে নির্গত তেল। জাহাজের বর্জ্য তেল ফেলার ফলে সামুদ্রিক পরিবেশের মারাত্মক দূষণ এবং পানির গুণমানের অবনতি ঘটে, ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণী প্লাঙ্কটোনের বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় গলদা ও বাগদা চিংড়ির প্রজননস্থল।

চলনবিল  উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল সমৃদ্ধ এককালের চলনবিল এখন বিধ্বস্ত এবং একটি প্রধান পরিবেশীয় সমস্যা। বাঁধ নির্মাণের ফলে সেখানে পানি নিষ্কাশনে বাধা ও বন্যার সমস্যা দেখা দিয়েছে। পলি জমা ও চাষাবাদের প্রসারে বিলের আয়তন হ্রাস পেয়ে এখন ২৬-৪০ বর্গ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। এইসঙ্গে রয়েছে বর্ষার পানি জমা হয়ে মারাত্মক জলাবদ্ধতা সমস্যা। বরেন্দ্র অঞ্চল ও গঙ্গার প্লাবনভূমির মধ্যবর্তী এলাকায় আরও কয়েকটি বিল রয়েছে যেগুলি অভিন্ন ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে বস্ত্তত চলনবিলেরই অংশ। বর্ষাকালে এসব বিলে ৪.৫ মিটারের অধিক গভীর পানি জমে এবং এগুলি সারা বছর পানির নিচেই থাকে।

বিল ডাকাতিয়া  বাঁধবেষ্টিত নিম্নভূমিতে পলি জমা ও ভূমিগঠন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিল ডাকাতিয়ায় বাস্ত্তসংস্থানিক বিপর্যয় ও মারাত্মক আর্থ-সামাজিক সংকট দেখা দিয়েছে। দেখা গেছে, বাঁধ নির্মাণের ফলে সংরক্ষিত এলাকার দু’পাশে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় খালগুলি ভরাট হয়ে গেছে। বাঁধের বাইরে পলি জমার ফলে ভিতর থেকে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হওয়ায় স্বাভাবিক নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে এবং এককালের সুফলা ফসলি জমির বৃহৎ এলাকায় স্থায়ী বন্যা দেখা দিচ্ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক লোক বাস্ত্তহারা হয়েছে, পরিবেশ হয়েছে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এখনও যারা এই অঞ্চলে বসবাস করছে তারা স্বচ্ছ খাবার পানির অভাবে ভুগছে।

আকস্মিক বন্যা  আকস্মিক বন্যায় পানি দ্রুত হ্রাস-বৃদ্ধি হয়, কোন কোন ক্ষেত্রে তা দিনে প্রায় ৪ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। মেঘালয় ও ত্রিপুরার পাহাড়ে এপ্রিল-মে মাসে প্রবল প্রাক-মৌসুমি ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতে এই বন্যা দেখা দেয়। এই ধরনের বন্যায় সিলেট অববাহিকার, বিশেষত হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

ব্যাপকভাবে বন উজাড়, বিশেষত পার্বত্য অঞ্চলের বনধ্বংসের ফলে অত্যধিক ভূমিক্ষয় ও ভূমিধ্বস দেখা দেয়, তাতে নদীতে পলি জমে। এদিকে আনারস চাষ থেকে ভূমিক্ষয় বৃদ্ধির ফলে কাপ্তাই বহুমুখী প্রকল্প বিপন্ন হয়ে পড়ছে এবং মনু নদীতে পানি সেচ প্রকল্পের দরুন আশপাশের নদীগুলিতে পলি জমছে এবং আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বাড়ছে। একইভাবে কক্সবাজার অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ উষ্ণমন্ডলীয় বনে চাষাবাদ ও চিংড়িচাষ পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, বিশেষত জুমচাষজনিত ব্যাপক ভূমিক্ষয় ও আকস্মিক বন্যা উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য এলাকাগুলিকে ভৌত কার্যক্রম ও চাষাবাদের জন্য অত্যন্ত নাজুক করে তুলেছে।

সিলেট অববাহিকা  সিলেট অববাহিকা ময়মনসিংহের পূর্বের ও সিলেটের পশ্চিমের নিচু অঞ্চলে অবস্থিত যা মেঘনা অববাহিকারও কেন্দ্র। বাংলাদেশের সবচেয়ে নিম্নাঞ্চল এই সিলেট অববাহিকা বছরে ৬ মাসের অধিককাল পানির নিচে থাকে। এখানে রয়েছে বিশাল জলাভূমি যেগুলি চাষাবাদের সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। আগাম বন্যা ও আকস্মিক বন্যা হলো এক্ষেত্রে পরিবেশীয় প্রতিবন্ধ। এখানকার বড় বড় জলাশয়গুলিকে হাওর বলে।

বরেন্দ্র অঞ্চল  রাজশাহী, বগুড়া ও দিনাজপুর জেলা জুড়ে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম প্লাইস্টোসিন এলাকা। এই অঞ্চলের পৃষ্ঠতল প্লাবনভূমি থেকে ৬-১২ মিটার উঁচু। প্লাইস্টোসিন মৃত্তিকা লালচে, বাদামি বা তামাটে রঙের এবং চিত্রবিচিত্র। এতে রয়েছে লৌহ বা ক্যালসিয়ামযুক্ত গুটি। পানির ভাগ কম থাকায় মাটি শক্ত ও ঘনবদ্ধ। এখানকার মৃত্তিকার কেবল উপরের স্তরেই জৈব পদার্থ রয়েছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি গ্রীষ্মকালে রোদে পুড়ে অত্যন্ত শক্ত হয়ে ওঠে আর শীতকালে দেখা দেয় খরা। মৌসুমি বৃষ্টিপাতেও চরম বিষমতা দেখা যায়। এই বিষমতা স্থান ও কাল উভয়ক্ষেত্রে। বছরের অন্তত অর্ধেক সময় (নভেম্বর-মার্চ) থাকে চরম খরা।

মৃতপ্রায় বদ্বীপ  পূর্বে মধুমতি থেকে বিস্তৃত সমতলের পশ্চিমাংশের এই মৃতপ্রায় বদ্বীপ খুলনা জেলার উত্তর সীমানা থেকে যশোর ও কুষ্টিয়া জেলার একাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ে গঠিত। এখানে গঙ্গার প্লাবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব নেই, মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এখানকার নদীগুলি মৃতপ্রায়। এগুলি এখন এমনকি বর্ষাকালেও পর্যাপ্ত পানি ও পলি বয়ে আনতে পারে না। নদী তীরের বাঁধের জন্য গোটা এলাকা প্লাবিত হয় না। ফলে ভূমি গঠন থেমে গেছে এবং গোটা বদ্বীপ ধ্বংসের সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে। এ অঞ্চলে বহুকাল থেকেই কৃষির অবনতি ও নানা রোগ, বিশেষত ম্যালেরিয়ার প্রকোপ লক্ষ্যণীয়। [এম আমিনুল ইসলাম]

নদীভাঙন ও পলিসঞ্চয় (River erosion and siltation)  নদীভাঙন বাংলাদেশের একটি প্রধান পরিবেশগত সমস্যা। বর্ষা মৌসুমে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের বিশাল এলাকা জুড়ে এই সমস্যা দেখা দেয়, ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। কৃষি জমি, জনবসতি, হাট-বাজার এবং শহর-বন্দর নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য (১৯৮৪-১৯৮৫) অনুসারে দেশের ১৬টি প্রধান নদ-নদীর ২৫৪টি স্থানে নদী ভাঙনের ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। ফলে অনেক স্থানে বেশ কিছু পুরানো শহরের  অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। পদ্মা-মেঘনা মিলনস্থলে চাঁদপুর শহর এই পরিস্থিতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে নদীভাঙন দেখা গেলেও দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটি নদী পদ্মা ও যমুনার তীর ভাঙনই সবচেয়ে বেশি। প্রতি বছর ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও পদ্মা নদীর তীর ভাঙার ফলে নিম্নভূমিতে বসবাসরত হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়ে পড়ে এবং গৃহস্থালি ও কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীর তীর ভাঙার পাশাপাশি ব্যাপক প্লাবন ঘটলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাংলাদেশে নদীভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি মার্কিন ডলারের অধিক।বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদীভাঙনের আর্থ-সামাজিক ও জনসংখ্যাগত প্রভাব জনজীবনে দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের কারণ হয়েছে, মানুষ নিঃস্ব ও অসহায় অবস্থায় পতিত হয়েছে।

নদীভাঙন

পলিসঞ্চয় বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীগুলির গতিপথ পরিবর্তনের মতো পলিসঞ্চয়ও একটি জটিল সমস্যা। প্রায় প্রত্যেক বছর বাংলাদেশের দুটি প্রধান নদী তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে এবং সেই প্রক্রিয়ায় নদীবক্ষে চর জেগে ওঠে। কখনও কখনও রাতারাতি চর জেগে উঠতেও দেখা যায়। অন্যদিকে প্রতি বছর প্রায় ২৭০ মিটার পর্যন্ত উপকূল ভাঙে। দেশে প্রতি বছর নদীপ্রবাহের সঙ্গে প্রায় ৩০ লাখ মে টন পলি জমা হয়। একদিকে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলির তীর ভাঙা ও নদীবক্ষে পলি জমা যেমন একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ব্যাপার, অন্যদিকে অনেক নদী মরে যাচ্ছে এবং নৌ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে উজান অঞ্চলে বনউজাড় ও ভূমিধ্বসের ফলে বাংলাদেশের নদীগুলিতে পলি জমার সমস্যাটি গুরুতর আকার ধারণ করেছে।

নদীগর্ভে পলি জমার প্রক্রিয়াটি অবিরাম চলছে। বাংলাদেশের পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ইত্যাদি নদী বর্ষা মৌসুমে প্রতি বছর প্রায় ১৪৮ কোটি মে টন পলি বহন করে আনে এবং এই প্রক্রিয়ায় এই বদ্বীপের সম্প্রসারণ ঘটছে। একদিকে দেশের ৩০ শতাংশের বেশি ভূখন্ড স্বাভাবিক বন্যায় প্লাবিত হয়, অন্যদিকে পানিবাহিত বিপুল পরিমাণ পলি জমা হয়। ভূমিক্ষয় ও পলিসঞ্চয়ের ফলে ভূমির গঠন পরিবর্তিত হচ্ছে। নদীভাঙন, নতুন চর জাগা ও পরিবেশের ভিন্নতার মধ্য দিয়ে এসব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।  [এম আমিনুল ইসলাম]

পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা (Environmental protection agency)  আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণের কিছু কর্মসূচি শুরু হয়। ১৯৭২ সালে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো পরিবেশ সংক্রান্ত কর্মসূচি শুরু করলে ১৯৭৪ সালে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ গঠন এবং ১৯৭৭ সালে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করে। ১৯৮৯ সালে বন বিভাগ এবং নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। সাবেক দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড অতঃপর বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় হিসেবে নতুন নাম লাভ করে। ১৯৯০ সালকে পরিবেশ বর্ষ ও ১৯৯০-৯১ সালকে পরিবেশ দশক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ইতোমধ্যে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো দুর্যোগ পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করার পর ‘দুর্যোগ সম্পর্কে স্থায়ী নির্দেশাবলি’ ঘোষণা করে। দুর্যোগ মোকাবিলা ও দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি সাফল্যের সঙ্গে কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে সকলের জন্য একটি নির্দেশ পুস্তিকা হিসেবে ‘দুর্যোগ সম্পর্কে স্থায়ী নির্দেশাবলি’ ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিতরণ করা হয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আরও একটি দিক আছে। বাংলাদেশে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীই পরিবেশ সংকটের শিকার। এখানে সম্পদ আহরণের সঙ্গে জড়িত পরিবেশ বিষয়টি সম্পর্কে অজ্ঞতার দরুন পরিবেশ সংকট তীব্রতর হয়েছে যা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, অত্যন্ত ঝুঁকিপ্রবণ একশ্রেণীর মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত কর্মকৌশল প্রণয়নের উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৮৪ সালে এবং তখন থেকে এক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। গুরুতর পরিবেশগত সমস্যাবলি মোকাবিলার ও পরিবেশের আরও অবনতি রোধের লক্ষ্যে বাংলাদেশের জন্য জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা (নিম্যাপ, ১৯৯১) প্রণয়ন করা হয়েছে।  [এম আমিনুল ইসলাম]

পরিবেশ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা (Environmental planning and management) পৃথিবীর অন্যতম বড় দুটি নদী (পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র) বেষ্টিত ভয়াবহ বন্যা ও সাইক্লোনপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থান হওয়ায় বাংলাদেশে এক অনন্য পরিবেশ বিরাজমান। সীমিত সম্পদ এবং জনসংখ্যার চাপ মানুষ ও জমির অনুপাতকে ভীষণ জটিল করে তুলেছে। অতীতে এখানে পরিবেশসম্মত পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় নি।

বিলম্বে হলেও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলি পর্যাপ্ত গুরুত্বসহ এখন সামনে এসেছে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় পরিবেশ নীতি (১৯৯২), জাতীয় পরিবেশ অ্যাকশন প্ল্যান (১৯৯২), বননীতি (১৯৯৪), বনায়ন মাস্টার প্লান (১৯৯৩-২০১২) ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (১৯৯৫) উল্লেখযোগ্য। জাতীয় সংরক্ষণ কৌশল (National Conservation Strategy) এবং বিশেষত জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা অ্যাকশন প্ল্যান সকলের সহযোগিতায় প্রণীত হয়েছে। উপরন্তু ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি ও অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে বিভিন্ন সামাজিক শক্তিসহ সরকারি বিধি ও নিয়ন্ত্রণের ন্যায় বিভিন্ন নীতিগত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে যদিও সবক্ষেত্রে ফলাফল মিলছে এমন নয়। অন্যান্য বিবেচনা ছাড়াও নীতিমালার লক্ষ্য পরিবেশের উন্নয়ন যেমন শহর সৌন্দর্যকরণ কর্মসূচি, বিনোদন, এবং প্রতিবেশ ল্যান্ডস্কেপ, বন্যপ্রাণী ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ।

পরিবেশ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা  উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশের ভূমিকা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ বিষয়টি অনুধাবন করে জাতীয় লক্ষ্যসমূহের সাথে মিল রেখে উন্নয়ন নীতি প্রণয়নে সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত উদ্বেগ বৃদ্ধি প্রকৃত অর্থে জীবনমরণ সমস্যা। একইভাবে মানুষের উন্নয়ন ছাড়া ভৌত পরিবেশের গুণগত মান উন্নয়ন একটি অস্বাভাবিক দাবি। পরিবেশের সংকট সবচেয়ে বেশি অনুভব করে গ্রামের গরীব মানুষ, কেননা তারা পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে না বুঝে সম্পদ আহরণ করে পরিবেশের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। এতে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নই ব্যাহত হচ্ছে না, মানুষের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে পড়ছে। কেবল স্বাভাবিক পেশাগত দক্ষতার প্রয়োগ না করে দরিদ্র মানুষের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাকে সমন্বিত করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, টেকসই সম্পদ আহরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পল্লি উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করাই সর্বোত্তম।  [এম আমিনুল ইসলাম]

গ্রীনহাউজ প্রতিক্রিয়া ও বিশ্বউষ্ণায়ন (Green house effect and global warming) গ্রীনহাউজে যেমন ঘটে তেমনিভাবে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের নিচের স্তরে ধীরে ধীরে তাপমাত্রার বৃদ্ধি হয়। গ্রীনহাউজ বলতে প্রধানত নাজুক (ফুল ও সবজি) উদ্ভিদ ফলানোর জন্য শীতপ্রধান দেশের ব্যবহূত কাঁচের ঘরকে বোঝানো হয়। বিকিরিত সূর্যের তাপ কাঁচের ভেতরের জিনিসপত্র, কাঠামো এবং মাটি তপ্ত করে। তপ্ত হয়ে পরবর্তী সময়ে কাঁচের ঘরের ভিতরের জিনিসপত্র অবলোহিত (infrared) বিকিরণ ঘটায় (তাপ বিকিরণ)। এসব দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘের বিকিরণ কাঁচের বাধা অতিক্রম করতে না পেরে গ্রীনহাউজের ভিতরেই থেকে যায়। এভাবে বিকিরিত শক্তি গ্রীনহাউজের ভিতরে প্রবেশ করে ভিতরের উপাদানসমূহকে তপ্ত করলেও সহজে বেরিয়ে যেতে না পারায় গ্রীনহাউজ সহনীয় মাত্রায় উষ্ণ থাকে এবং ভিতরে উদ্ভিদ জন্মাতে পারে।

প্রায় একই প্রক্রিয়ায় বায়ুমন্ডলও গ্রীনহাউজের ভূমিকা পালন করে এবং পৃথিবীর জন্য কাঁচের প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। সূর্য কিরণ বাতাসের দীর্ঘ আবরণ ভেদ করে পৃথিবী পৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে। পরবর্তীতে পৃথিবী তার দীর্ঘতরঙ্গের অবলোহিত বিকিরণ করলেও প্রধানত তা বায়ুমন্ডলের নীচের স্তরেই আটকা পড়ে। এই প্রক্রিয়াকেই গ্রীনহাউজ প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বায়ুমন্ডলের স্বল্পমাত্রার যেসব গ্যাস প্রধানত প্রতিবিকিরিত অবলোহিত রশ্মি শোষণ করে তাদের গ্রীনহাউজ গ্যাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। জলীয় বাষ্প, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ওজোন এবং ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (সিএফসি) হলো গ্রীনহাউজ গ্যাস। গ্রীনহাউজ প্রভাবের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রার বৃদ্ধিকে বিশ্বের উষ্ণায়ন বলা হয়।

বায়ুমন্ডল অনুপস্থিত থাকলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বর্তমানের ১৫° সে-এর স্থলে ১৮° সে হতো। পৃথিবীপৃষ্ঠে সূর্যালোক হিসেবে আসা সকল শক্তি এক বিশাল বিকিরণ যন্ত্র হিসেবে পৃথিবী পৃষ্ঠকে অবলোহিত রশ্মি বিকিরণে উজ্জিবীত করছে। এই তাপমাত্রার মাত্র একাংশ মহাকাশে ফেরত যেতে পারে এবং অবশিষ্ট বিকিরণ বায়ুমন্ডলের ভেতরেই আটকা পড়ে। আগেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রীনহাউজ গ্যাস তপ্ত হয়ে তার খানিক উত্তাপ পৃথিবী পৃষ্ঠে বিকিরণ করে পৃথিবীকে উষ্ণ করে তোলে।

গ্রীনহাউজ গ্যাসের প্রধান উপাদান জলীয় বাষ্প এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে পৃথিবীর সাগর, মহাসাগর, নদী, হ্রদ এবং মাটি থেকে বেশি পরিমাণে পানি বাষ্পীভূত হয়। এভাবে গ্রীনহাউজ প্রভাবে তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে চলেছে।

বাংলাদেশে গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ  বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে (Global Climate Change, Bangladesh Episode, June 1997) উল্লেখ করা হয়েছে ধনী দেশগুলি অতিমাত্রায় পরিবেশদূষক প্রযুক্তি নির্ভর জীবনযাপনের কারণে বেশি মাত্রায় গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করছে। অপরদিকে দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশগুলির বিপুল জনসংখ্যার কর্মকান্ডেও গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরিত হচ্ছে তবে তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। শিল্পোন্নত দেশসমূহের মাথাপ্রতি গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ পৃথিবীর গড়ের তুলনায় প্রায় ৬ গুণ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ পৃথিবীর মোট নিঃসরণের প্রায় ২০%।

রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৯০ সালে (ভিত্তিবছর) বাংলাদেশে সব ধরনের মুখ্য জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারজনিত মোট কার্বন ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ মাত্রা ছিল ১৩,৪৪৩ Gg অর্থাৎ কার্বন (অক্সিডাইজড) এর পরিমাণ ৩,৬৬৬ Gg। মাথাপিছু (১৯৯০ সালে জনসংখ্যা ১০৯ মিলিয়ন ধরে) এই পরিমাণ যথাক্রমে প্রায় ১২৩.৩ এবং ৩৩.৬ কিলোগ্রাম। ১৯৯০ সালে বায়োমাস ব্যবহারের ফলে ৬১,২৮৩.৭ Gg CO2 নিঃসরিত হয়েছে। কৃষি বর্জ্য থেকে এসেছে মোট বায়োমাস জ্বালানি দহনের প্রায় ৫৯%।

জ্বালানি উৎপাদন ও মাটিভরাটকরণ  বাংলাদেশে ১৯৮৭ সালে আবিষ্কৃত সামান্য তেল এবং অনুত্তোলিত কয়লা ছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাসই হলো প্রধান বাণিজ্যিক জ্বালানি। সুতরাং মিথেন নিঃসরণের পরিমাপও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকেই করতে হবে। অনুমান করা হয় যে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে শক্তি উৎপাদনের জন্য ৬.১ Gg মিথেন (ওজনের নিরিখে) নিঃসরিত হয়।

জমিভরাটকরণ (জমিভরাট করতে পৌর আবর্জনার ব্যবহার)  বাংলাদেশের পৌর বর্জ্যের পরিমাণ সম্পর্কে সামান্য তথ্য পাওয়া যায়। দেশের প্রধান ৬টি নগরীর (ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ) জমিভরাট করার প্রক্রিয়ায় বছরে আনুমানিক ৭৩.৬ Gg মিথেন নিঃসরিত হয়।

কৃষি, পশুপালন এবং বর্জ্য পানি থেকে নিঃসরণ  বন্যা প্লাবিত ধানক্ষেত, পশুপাখির বিপাক প্রক্রিয়া, গোবর ও বিষ্ঠা এবং বর্জ্যপানি থেকে মিথেন নিঃসৃত হয়। বাংলাদেশে ধানচাষে মিথেন নিঃসরণ হার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম বলে ধারণা করা হয়। জলমগ্ন ধান ক্ষেত থেকে মিথেন নিঃসরণের পরিমাণ আনুমানিক ২৫৭ থেকে ৬২২ Gg। ধানচাষ থেকে বছরে গড়ে প্রায় ৪৬৮ Gg মিথেন গ্যাস নিঃসরিত হয় বলে ধারণা। সমগ্র নিঃসরণের মধ্যে উচ্চফলনশীল বোরো ধান থেকে আসে প্রায় ৪২% এবং উচ্চফলনশীল রোপা আমন থেকে আসে প্রায় ৩১%।

বাংলাদেশের পশুর অল্প ওজনের কারণে এদের বিপাক প্রক্রিয়ায় (৪৪৬.৮ Gg) মিথেন গ্যাসের স্বল্প পরিমাণ নিঃসরণ ঘটে। দেশের গবাদি পশুর পরিত্যাগকৃত মিথেন গ্যাসের ৬৭.৫% খামার বহির্ভূত গবাদি পশু থেকে সৃষ্ট। উৎপাদিত মিথেনের প্রায় ৭৩.০৭ কিলোগ্রাম জৈব সার ব্যবস্থাপনা থেকে আসে যার বড় অংশই আবার খামার বহির্ভূত গবাদি পশুর বর্জ্য।

কৃষি বা অন্য প্রয়োজনে গাছ কেটে বন পরিষ্কার করার পর গাছের অবশিষ্টাংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করলে কার্বন নিঃসরিত হয়। সাধারণত জমি পরিষ্কার করা হয় গাছ কেটে বা পুড়িয়ে ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাটিতে জমা হয়ে থাকা কার্বন এ প্রক্রিয়াতেও নিঃসরিত হয়। অপরদিকে বন বা গাছপালার আচ্ছাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কার্বন ধারণ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

১৯৯০ সালের ভিত্তি বছরে বাংলাদেশে ৫,৪৫৬ Gg কার্বন বনাঞ্চল থেকে অপসারিত হয়েছে। পক্ষান্তরে একই সময়ে বাংলাদেশের অবশিষ্ট বনভূমি দ্বারা ১২,৩১৫ Gg কার্বন শোষিত হয়েছে। বছরে নিট কার্বন প্রবাহ ছিল প্রয় ৬,৮৫৯ Gg। এই পরিমাণ কার্বন অন্যান্য উৎস থেকে ২৫,১৫১ Gg কার্বন ডাই অক্সাইড প্রতিস্থাপনে সক্ষম।

সারণি  বাংলাদেশে বাৎসরিক  গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের সারসংক্ষেপ

গ্রীনহাউজ গ্যাসের উৎস নিঃসরিত গ্রীনহাউজ গ্যাসের মান (Gg)
জীবাশ্ম জ্বালানির দহন ১৩,৪৪৩ কার্বন ডাইঅক্সাইড রূপে
জ্বালানি উৎপাদন ৭৯.৭ মিথেন গ্যাস রূপে
জলমগ্ন ধানক্ষেত ৪৬৮ মিথেন গ্যাস রূপে
গবাদি পশু (বিপাক ও গোবর থেকে) ৫২০ মিথেন গ্যাস রূপে
কৃষিজ বায়োমাস পোড়ানো ৪.৭ মিথেন গ্যাস রূপে
৯৭.৩ কার্বন মনোক্সাইড রূপে
০.১১ নাইট্রাস অক্সাইড রূপে
৩.৮৪ নাইট্রিক অক্সাইড রূপে
বন কোন নিট নিঃসরণ নেই
বায়োমাস পোড়ানো ১৮৯.৫ মিথেন গ্যাস রূপে
২৩৪০ কার্বন মনোক্সাইড রূপে
২.৪ নাইট্রাস অক্সাইড রূপে
৮৬ নাইট্রিক অক্সাইড (NO) রূপে

বায়োমাস জ্বালানোর ফলে নিঃসরণ  বাংলাদেশের পল্লি অঞ্চলে প্রতিবার ফসল কাটার পর্যায়ে বায়োমাস উপাদানের একাংশ মাঠে থেকে যায়। খোলামাঠে সেসব বায়োমাস পোড়ানোর ফলে CO2, CH4, N2O এবং NOx গ্যাস নিঃসরিত হয়। অনুমান করা হয় যে বছরে বায়োমাস পোড়ানোর ফলে ৬৯৫.৪ Gg কার্বন এবং ৯.৭ Gg নাইট্রোজেন নিঃসরিত হয়। বাংলাদেশের পল্লি অঞ্চলে জ্বালানির প্রধান উৎস ধানের খড়, তুস, গোবর, গাছের ডাল, পাতা, ছোবড়া, পাটখড়ি, জ্বালানি কাঠ ইত্যাদি। অনুমান করা হয় যে খোলা হাওয়ায় সাধারণ বায়োমাস জ্বালানি পোড়ালে ১৮৯.৫ Gg মিথেন, ২,৩৩৯.৯ Gg কার্বন মনোক্সাইড, ২.৪ Gg নাইট্রাস অক্সাইড এবং ৮৫.৯ Gg নাইট্রোজেনের অন্যান্য অক্সাইড (NOx) গ্যাস উৎপাদিত হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর বাংলাদেশের সব গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণকে সারসংক্ষেপ আকারে প্রকাশ করেছে।

আনুমানিক এ পরিমাপ থেকে দেখা যায় যে বিশ্ব উষ্ণায়নের অর্ধেকের বেশি মিথেন থেকে ঘটছে আর প্রায় ৩০% ঘটছে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে।  [এম শামসুল ইসলাম এবং কামরুন নেসা বেগম]

পরিবেশ শিক্ষা (Environmental education)  জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার চাহিদা এবং পরিবেশ বিপর্যয় ঘটার সঙ্গে সঙ্গে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের দাবির নিরিখে অনেকদিন থেকেই বাংলাদেশে বিভিন্ন স্নাতকোত্তর ইনস্টিটিউটে, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা সংস্থাগুলিতে পরিবেশ শিক্ষাক্রম প্রচলন ও উন্নয়নের পক্ষে জোর দাবি উঠছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রম অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে জড়িত, যাতে রয়েছে ১. বিদ্যমান দুর্যোগগ্রস্ত ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলগুলিতে সতর্ক নজরদারি এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে আসন্ন দুর্যোগ পরিস্থিতি, পরবর্তী চাহিদা ও ব্যবস্থাপনা কর্মকৌশল সম্পর্কে পূর্বাভাস প্রদান যা এই ধরনের বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে সহায়ক; ২. দুর্যোগ সম্পর্কে পূর্বাভাস, দুর্যোগের আশু ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে গবেষণার জন্য আন্তঃবিষয়ক একটি ফোরাম গঠন; ৩. পরিবেশ সমস্যা মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনায় কর্মরত সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সম্প্রসারণের কার্যক্রমের ব্যবস্থা; এবং ৪. বিদ্যমান বিভাগ ও আন্তঃবিষয়ক কার্যক্রমের মাধ্যমে স্কুলপর্যায় থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত পরিবেশবিদ্যার পাঠ্যক্রম প্রণয়ন।

বাংলা ভাষায় পরিবেশ সম্পর্কিত শিক্ষা উপকরণ উন্নয়নের বিষয়টি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরোসহ অনেকগুলি বেসরকারি ও সরকারি সংস্থার কাছে অগ্রাধিকার লাভ করেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা বিষয় পাঠদান ইতোমধ্যেই চালু হয়েছে। অন্যান্য কার্যক্রমে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচি তৈরি এবং প্রায়োগিক কার্যক্রম প্রস্ত্ততের লক্ষ্যে সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন। অধিকন্তু, শিক্ষা যোগাযোগ উদ্ভাবন এবং শিক্ষা নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা ছাড়াও কর্মিপ্রশিক্ষণ, বিশেষজ্ঞ বিনিময় কার্যক্রমও প্রণয়ন হয়েছে।  [এম আমিনুল ইসলাম]

নিম্যাপ  বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা (National Environment Management Action Plan/NEMAP)। সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। নিম্যাপ তথ্যাদি ১৯৯৫ সালে ৫ খন্ডে প্রকাশ করা হয়, যেমন সারসংক্ষেপ, প্রধান প্রতিবেদন, প্রকল্প ধারণাপত্র, পদ্ধতিগত বিষয়াবলি (methodology) এবং কারিগরি পরিশিষ্ট।

অধিকতর কার্যকর সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা ও পরিবেশ অবক্ষয়ের বর্তমান ধারাকে পরিবর্তন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি ও পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে নিম্যাপ প্রণয়ন করা হয়। পরিবেশগত অবস্থার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, টেকসই উন্নয়নে সহায়তা প্রদান, মানুষের জীবনমান বৃদ্ধিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পরিবেশগত বিষয় নিম্যাপ শনাক্ত করবে বলেও আশা প্রকাশ করা হয়। যদিও এসব পরিবর্তনে সময়ের প্রয়োজন হবে, আশা করা হয় যে, এসব পরিবর্তনের সঙ্গে নিম্যাপও পরিবর্তিত হবে।  [মামুনুল হক খান]

পরিবেশনীতি  সুস্থ পরিবেশগত পরিস্থিতি সুরক্ষা বা সংরক্ষণে সরকার গৃহীত ও পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত অবক্ষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সুষ্ঠু পরিবেশনীতি প্রণয়ন ও নীতিসমূহের কার্যকর বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। শিল্পোন্নত দেশগুলি তাদের পরিবেশ সমস্যাগুলি ব্যবস্থাপনায় জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশে পরিবেশনীতি প্রণয়নের কৌশল অভিজ্ঞতাহীন একটি নতুন বিষয়। উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রশাসন প্রক্রিয়া ও পরিবেশগত অগ্রাধিকারসমূহ শিল্পোন্নত বিশ্বের অনুরূপ বিষয়গুলি থেকেও অনেকটাই ভিন্ন। অধিকন্তু নীতি প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য এবং আন্তঃ/বহুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের তীব্র অভাব কাজটিকে কঠিনতর করেছে।

ভৌত ও আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখে বাংলাদেশকে টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনার একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হিসেবে অভিহিত করা যায়। অত্যন্ত সীমিত সম্পদের উপর প্রায় ১৩ কোটি জনসংখ্যার মাত্রাতিরিক্ত চাপ বস্ত্তত সম্পদ ও পরিবেশের সহনশীলতা উভয় বিবেচনায় দেশের ধারণ ক্ষমতাকে অতিক্রম করেছে। এমন অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে পরিবেশগত নীতিপ্রণয়নের গুরুত্ব অত্যধিক।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পরিবেশ সুরক্ষা বাংলাদেশ সরকারের একটি অগ্রাধিকারী বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শহুরে ও গ্রামীণ পরিবেশের দ্রুত অবক্ষয় নিয়ে সরকার ও সুশীল সমাজের উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল একটি সুষ্ঠ জাতীয় নীতির মাধ্যমেই পরিবেশের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং পরিবেশ সম্পর্কিত অন্যান্য সমস্যা সমাধান সম্ভব। সরকার ১৯৯২ সালে পরিবেশ নীতিগ্রহণসহ বেশকিছু নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে।

পরিবেশনীতির লক্ষ্যসমূহ হলো: পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে বাস্ত্তসংস্থানিক ভারসাম্য ও সা©র্র্বক উন্নয়ন সুরক্ষা; প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশকে রক্ষা; পরিবেশ দূষক ও ক্ষতিকারক কর্মকান্ড শনাক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণ; সকল খাতে পরিবেশসম্মত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ; সকল জাতীয় সম্পদের টেকসই, দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশ অনুকূল ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশ সম্পর্কিত সকল আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাত্রায় কার্যকর সংযোগ রক্ষা।

পরিবেশ কার্যক্রম দেশের সকল ভৌগোলিক অঞ্চল ও উন্নয়ন খাতে বিস্তৃত হয়েছে। তদনুযায়ী ১৯৯২ সালে পরিবেশনীতির সামগ্রিক লক্ষ্যসমূহ অর্জনে গৃহীত বিভিন্ন কর্মকৌশলে ১৫টি খাত অন্তর্ভুক্ত হয় কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন, শক্তি ও জ্বালানি, পানিসম্পদ উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ, ভূমি, বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য, মৎস্য ও পশুসম্পদ, খাদ্য, উপকূলীয় ও সামুদিক পরিবেশ, পরিবহণ ও যোগাযোগ, গৃহায়ণ ও নগরায়ণ, জনসংখ্যা, শিক্ষা ও জনসচেতনতা, এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণা।

পরিবেশনীতির ৪নং অনুচ্ছেদে রয়েছে আইনগত রূপরেখা যাতে বর্তমান সময়ের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কিত নতুন আইন প্রণয়ন এবং সকল আইন ও বিধান সংশোধন, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ দূষণ ও অবক্ষয়রোধ প্রভৃতি বিষয় শর্তাবদ্ধ হয়েছে।

পরিবেশনীতির সর্বশেষ অনুচ্ছেদে (অনুচ্ছেদ ৫) রয়েছে নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাবলী: ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় পরিবেশ নীতি বাস্তবায়ন সমন্বয় করবে; সার্বিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য সরকার প্রধানের সভাপতিত্বে একটি জাতীয় পরিবেশ কমিটি গঠিত হবে এবং পরিবেশ অধিদপ্তর সকল পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন চূড়ান্তভাবে পর্যালোচনা ও অনুমোদন করবে।  [মিজান আর খান]