পররাষ্ট্রনীতি


পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।

১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে  দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান  বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:

জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-

১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।

২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ  পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:

সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়  একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।

অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন  বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।

অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা  জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে,  ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।

বিশ্বশান্তি  আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রত্যাশা করে। যেহেতু জাতীয় নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন বিশ্বের শান্তিপূর্ণ পরিবেশের সাথে সংশ্লিষ্ট, সেহেতেু বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূলনীতি হিসেবে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ  করে। বাংলাদেশ কর্তৃক অন্বেষিত শান্তির এই মূলনীতির বিশেষ তাৎপর্য হচ্ছে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, যেকোন বিবাদের শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনে বিশ্বাস করে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্ধারকসমূহ  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্দিষ্ট কিছু উপাদান দ্বারা নির্ধারিত হয় যা পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখে। ভৌগেলিকভাবে বাংলাদেশ ভারত এবং মায়ানমারের মতো প্রতিবেশী দ্বারা তিন দিকে বেষ্টিত এবং দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। মূলত ভারত বাংলাদেশকে তিনদিক থেকে বেষ্টন করে আছে, যেখানে বাংলাদেশ বলা যায় বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত। অন্যদিকে, বাংলাদেশ চীন ও ভারতের মতো এশিয়ার দুই শক্তিমান দেশের বলয়ে অবস্থিত হওয়ার কারণে দুই দেশের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষায় বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখিন হতে হয়। ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০২০ জন লোকের বসবাস। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই জনসংখ্যা একটি নেতিবাচক প্রভাব রাখে, যার দরুন সরকার কোনো গতিশীল পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে পারে না। সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখন্ডতার সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জ্বালানী নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ শান্তি ও ঐক্য জাতীয় স্বার্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিকট শান্তিপূর্ণ, নিশ্চিত এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ প্রত্যাশা করে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে এই সম্পর্ক বিদ্যমান না থাকলেও নিদেন পক্ষে শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় না। বাংলাদেশের নিরাপত্তা কাঠামো মূলত  দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রসমূহের সাথে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। এছাড়াও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাংলাদেশের অন্যতম বিবেচনার ক্ষেত্র, যাতে দেশের জনগোষ্ঠীর কাঙ্খিত ন্যূনতম অর্থনৈতিক কল্যাণ অন্তর্ভুক্ত। অর্থনৈতিক কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে  বিবেচনার ক্ষেত্রগুলি হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, রপ্তানি বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ বৃদ্ধি, বৈদেশিক সাহায়্য বৃদ্ধি, বাংলাদেশি পণ্যের জন্য বাইরের বাজার সুবিধা বৃদ্ধি, শিল্পোন্নত রাষ্ট্রসমূহের কাছ  থেকে প্রযুক্তিগত সুবিধা বৃদ্ধি, মানব সম্পদ উন্নয়ন এবং  আরো কিছু ক্ষেত্র। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার এই ক্ষেত্রগুলি সফল করার লক্ষ্যে বাইরের রাষ্ট্রের সাহায্য এবং সহযোগিতা প্রয়োজন এবং এ কারণে বাংলাদেশকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলির সাথে ঘনিষ্ঠ সর্ম্পক বজায় রাখার চেষ্টা করতে হয়। বাংলাদেশ তার মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সহযোগিতা লাভ করে এবং ভারত তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম জোটভূক্ত রাষ্ট্র। স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে দুই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতেই সমাজতন্ত্রের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নতুন সরকারের নীতিতে সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ করার মাধ্যমে বামধারার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করতে দেখা যায়। সমাজতন্ত্রের ধারণা বাংলাদেশের সংবিধানেও সন্নিবেশিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পারমাণবিক শক্তির অক্ষমতার কারণে এবং ভারত ও পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশী দ্বারা বেষ্টিত হবার ফলে পররাষ্ট্রনীতিতে সব সময় প্রতিরোধমূলক নীতি গ্রহণ করতে দেখা যায়। স্বাধীনতা অর্জনের পূর্ব থেকেই আমরা ভারত এবং তার মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে জোটবদ্ধ। এ কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অনেক ক্ষেত্রে ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি সহানুভূতিশীল নীতি গ্রহণ করতে দেখা যায়। যদিও সময়ের পরিবর্তনে জাতীয় স্বার্থের কারণে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখনও দেখা যায় যে অতীত সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই ভারতমুখী নীতি গ্রহণ করে থাকে।

শুরুতে বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, এবং বর্তমানেও তাই। কিন্ত আশির দশকে মুসলিম বিশ্বের নিকট বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি পরিবর্তন করা হয় এবং সংবিধানে সংশোধনী আনা হয় শুধুমাত্র মুসলিম বিশ্বের আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে। অবশ্য বর্তমানে অপর একটি সংশোধনী দ্বারা তা রদ করা হয়েছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম। এই জনগোষ্ঠী অনূভূতিগত দিক দিয়ে মুসলিম উম্মাহ্ বা ভ্রাতৃত্ব বোধে আবদ্ধ এবং এরা চায় মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের বিশেষ সম্পর্ক অব্যাহত থাকুক। তাই ধর্মীয় বিশ্বাস বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সংস্কৃতিগত দিক থেকে বাংলাদেশ একটি শান্তিপ্রিয় দেশ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই শান্তিকামী।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পরিক্রমা  ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভের পূর্ব থেকেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সূচনা। প্রকৃতপক্ষে মুজিবনগর সরকারই প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বাইরের রাষ্ট্রগুলোর সাথে যোগাযোগ শুরু করে। এই পর্যায়ে পররাষ্ট্রনীতির যে কার্যক্রম তা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে। এই পর্যায়ে গৃহীত পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব স্বাধীনতার পরও পরিলক্ষিত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে ইন্দো-সোভিয়েত অক্ষ এবং চীন-আমেরিকা অক্ষের মধ্যে বিরাজমান ক্ষমতার লড়াই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন এবং পরবর্তী সময়ে গৃহীত পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। দেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের যেমন প্রয়োজন ছিল, তেমনি অপরিহার্য ছিল অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বৈদেশিক  ঋণ-সাহায্য লাভের মাধ্যমে ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির সংস্কার সাধন। স্বাধীনতার পর পরই সোভিয়েত ব্লক ভুক্ত কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রগুলি থেকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করা হয়। কিন্তু কম্যুনিস্ট বলয় ভুক্ত পূর্ব-ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর স্বীকৃতি অনেক ধীরগতির ছিল। পশ্চিমের দেশগুলির মধ্যে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দেয়। মুসলিম বিশ্ব এবং আমেরিকা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের সুবিধামত সময় নির্ধারণ করে। একমাত্র নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে তৎকালীন বার্মা বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সাড়ে তিন বছরে অধিকাংশ রাষ্ট্র বাংলাদেশের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারলেও সৌদি আরব, লিবিয়া, চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানে অসম্মত হয়।

রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয়ের পর পরই ১৯৭২ সালে নবগঠিত বাংলাদেশ সরকার শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করার মাধ্যমে বামধারার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে এবং ১৯৭২ সালে গৃহীত বাংলাদেশের সংবিধানে সমাজতন্ত্রের ধারণাকে গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী  তাজউদ্দিন আহমদ যেসব রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে তাদের সাহায্য সহযোগিতা গ্রহণে অপরাগতা প্রকাশ করেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তিনি পররাষ্ট্রনীতির নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করে বলেন, ‘বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ঘোষণা করেন: ‘আমরা একটি ছোট রাষ্ট্র, আমাদের সকলের সাথে বন্ধুত্ব হবে এবং কারো সাথে শত্রুতা নয়’। এরই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য তুলে ধরেন, ‘বাংলাদেশ সকলের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে স্বাধীন জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে, যার ভিত্তি হবে অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সমতা, ভৌগোলিক অখন্ডতা এবং অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি গ্রহণ’।

স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার কর্তৃক গৃহীত পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই দশকেই বাংলাদেশ মূলত বিশ্বের বেশিরভাগ রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন কমনওয়েলথ, ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) এবং জোটনিরপেক্ষ সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। এছাড়া বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রসমূহের নেতৃত্বও দান করে। উন্নত রাষ্ট্রগুলির কাছ থেকে সাহায্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা লাভ এ সময়ের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম সাফল্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে জাপান, ব্রিটেন এবং আরো কিছু উন্নত রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশ এইড কনসোর্টিয়াম গ্রুপ গঠন করে যার যুগ্ম-সভাপতির নেতৃত্বে ছিল বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকার।

পরবর্তী সময়ে জেনারেল  জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। তিনি পূর্ববর্তী সরকারের নীতি অনুসরণ অব্যাহত রাখার সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে কিছু পরিবর্তনও আনয়ন করেন। এই সরকার চীনকে গুরুত্ব দিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বলয়ের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নে উদ্যোগী হয়। কৌশলগত সহযোগিতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এবং চীন ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তোলে। বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা এক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে। এছাড়া চীনের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা সেসময়ের বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্ব এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের ভূমিকাকে তুলে ধরতে প্রয়াসী ছিলেন। তিনি আঞ্চলিক সংস্থার যে ধারণা দান করেন তার বাস্তবতার ভিত্তিতে ১৯৮৫ সালে  সার্ক গঠিত হয়। মূলত এই সরকারের উদ্যোগের ফলেই জাপানের মতো প্রতিযোগীকে পরাজিত করে বাংলাদেশ ১৯৭৯-৮০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ করে।

মুজিব এবং জিয়া সরকারের পররাষ্ট্রনীতির তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এক থাকলেও তাদের মতাদর্শিক প্রবণতা এবং অগ্রাধিকার নির্ণয়ে ভিন্নতা ছিল। মুজিব সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে যে ‘সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ বিরোধীতার’ নীতি সংবিধানে সন্নিবেশিত করে, জিয়া সরকার তা ত্যাগ না করলেও নতুন ধারা ২৫(২) যোগ করে ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকে নীতি হিসেবে গণ্য করে মতাদর্শিক চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটায়। জিয়া সরকার সংবিধানের ১২ নং অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যোগ করেন।

পরবর্তীকালে জেনারেল  হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। জনগণের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্য ছাড়াও এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম বিশ্ব বিশেষ করে আরব রাষ্ট্রসমূহের আস্থা অর্জন। বিএনপি শাসনের শেষদিকে গৃহীত দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা উদ্যোগের আওতায় অনুসৃত আঞ্চলিক সহযোগিতার নীতি দ্বারা প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে পূর্বের উত্তেজনা হ্রাস পায় এবং তা জাতীয় পার্টির সরকারের সময় অক্ষুন্ন থাকে। এরশাদ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম একটি ক্ষেত্র হচ্ছে আশির দশকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সদস্য প্রেরণ।

এরশাদ সরকারের পতনের পর  খালেদা জিয়া সরকার ক্ষমতায় আসে এবং এই সরকার তার পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে জিয়া সরকারের গৃহীত নীতিই অনুসরণ করেন। এই সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে চীন এবং পশ্চিমের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি এবং স্নায়ু-যুদ্ধ পরবর্তী ভূ-অর্থনৈতিক গুরুত্বকে উপলদ্ধি করার প্রবণতা দেখা যায়। উদারীকরণ, বিশ্বায়ন এবং বেসরকারীকরণের যুগে বাংলাদেশও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের উদারীকরণের পথে এগিয়ে চলে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে এবং পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়ন করে। এই সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতির সূচনা করে। আওয়ামী শাসনামলে ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে বিশেষ করে ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আঞ্চলিক চুক্তির উপর জোর দেয়া হয় এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন ফোরামে (বিমসটেক, ডি-এইট) কার্যকরভাবে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে। এ সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম সফলতা হচ্ছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দ্বিতীয়বারের মতো সদস্যপদ লাভ।

২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকার দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় আসে। এই মেয়াদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি’ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এছাড়াও চীন, মায়ানমার, থাইল্যান্ডের সাথে সম্পর্ক তৈরি করার প্রবণতা দেখা যায়। এই সরকার মুসলিম বিশ্বের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক স্থাপনে প্রয়াসী হয়।

২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে।  [ঊর্মি হোসেন]