পদমানক্রম

NasirkhanBot (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ২২:০৩, ৪ মে ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (Added Ennglish article link)

পদমানক্রম বিদেশি কূটনীতিক কোরের সদস্যবর্গসহ রাষ্ট্রের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পদের আপেক্ষিক মানক্রম। রাষ্ট্রীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ ও তাদের আসনের ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী সহ অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিদেশ গমন ও প্রত্যাবর্তনের সময় তাদের বিদায় ও অভ্যর্থনা জানানো এবং সমপর্যায়ের বিদেশি অতিথিদের দেশে স্বাগত ও পরে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রে সাধারণত পদমানক্রম অনুসরণ করা হয়। রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক প্রটোকলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সকল শাসনামলেই এই পদমানক্রম অনুসৃত হয়ে আসছে। মুগল আমলে বাংলায় মানক্রম নির্ধারিত হতো বংশগত ও জাতিগত অবস্থান এবং সামরিক, বিচার বিভাগীয় ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রে পদমর্যাদার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার ভিত্তিতে। ব্রিটিশ শাসনের গোড়ার দিকে বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা নির্বাহী বিভাগের তুলনায় উচ্চতর মর্যাদা লাভ করতেন। ১৮৬১ সালে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের  উর্ধ্বে অবস্থান লাভ করে এবং ফলে এই অনুক্রম বদলে যায়। সেকালে সামরিক বিভাগের অবস্থান ছিল তৃতীয় স্তরে এবং ঔপনিবেশিক আমলের পুরো সময়েই এই অনুক্রম চালু ছিল। স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য মর্যাদার অগ্রাধিকার ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত মহারাজা, রাজা, নওয়াব, স্যার, সুলতান, রায়বাহাদুর, খানবাহাদুর ইত্যাদি উপাধির গুরুত্বের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। আবার উপাধিপ্রাপ্ত এসব গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বংশমর্যাদা, জমিদারির ব্যাপ্তি ইত্যাদিও তাদের অগ্রাধিকারক্রম নির্ধারণ করত। স্থানীয়দের মধ্যে জমিদার নন এমন উপাধিপ্রাপ্তরা ছিলেন পদসোপানের সর্বনিম্ন স্তরে।

পাকিস্তান সরকার ১৯৫০ সালে এক অস্থায়ী আদেশবলে সর্বপ্রথম একটি পদমানক্রম প্রস্ত্তত করে। এই বিশেষ আদেশটি পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা হয়েছিল। এ আদেশে সামরিক ও বেসামরিক আমলাগণ সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করেন।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কয়েকবার এই পদমানক্রম সংশোধন করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৬ অক্টোবর কেবিনেট বিভাগ এক আদেশবলে এ বিষয়ে পূর্বের সকল আদেশ বাতিল করে নতুন পদমানক্রম জারি করে। ১৯৮৩ সালের ২২ নভেম্বর এবং ১৯৮৪ সালের ১ ডিসেম্বর এটি আবারও সংশোধন করা হয়। ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কেবিনেট বিভাগ পূর্বের সকল আদেশ বাতিল করে নতুন পদমানক্রম চালু করে। ১৯৮৭ সালের অক্টোবর, ১৯৮৮ সালের মার্চ, ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর এবং ২০০০ সালের মার্চ মাসে সামান্য কিছু সংশোধন সত্ত্বেও এই পদমানক্রমটি এখনও চালু রয়েছে। দেশে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার পরিবর্তন করে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে পদমানক্রমে বড় ধরনের সংশোধন করা হয়। এই বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে পদমানক্রমে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দ্বিতীয় স্থান নির্ধারণ করা হয়, যেখানে ১৯৮৬ সালের আদেশ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন চতুর্থ স্থানে অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি ও স্পীকারের পর।

সর্বশেষ জারিকৃত পদমানক্রমে ২৫টি স্তরের ক্রমিক অবস্থান নিম্নরূপ:

১.                     প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি

২.                     প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী

৩.                    জাতীয় সংসদের স্পীকার

৪.                     বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি

প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিবৃন্দ

৫.                    প্রজাতন্ত্রের মন্ত্রিবর্গ

প্রধান হুইপ

জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার

সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা

৬.                     মন্ত্রিপরিষদের সদস্য না হলেও মন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ

মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবর্গ

ঢাকার মেয়র

৭.                    বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ও কমনওয়েলথভুক্ত দেশসমূহের হাইকমিশনারগণ

৮.                    প্রজাতন্ত্রের প্রতিমন্ত্রিগণ

সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা

হুইপ

প্রধান নির্বাচন কমিশনার

পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান

সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ (আপীল বিভাগ)

৯.                     প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ

নির্বাচন কমিশনারগণ

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিগণ

১০.                 প্রজাতন্ত্রের উপমন্ত্রিগণ

১১.                  উপমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ

বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি দূতবর্গ

১২.                  কেবিনেট সচিব

সরকারের মুখ্য সচিব

সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানগণ

১৩.                 জাতীয় সংসদ সদস্যবর্গ

১৪.                  বাংলাদেশে নিযুক্ত নন এমন সফররত বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারগণ

১৫.                 এটর্নি জেনারেল

কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেল

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর

ন্যায়পাল

১৬.                  সরকারের সচিবগণ

সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর সমপদমর্যাদার অফিসারগণ

পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল

পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান

১৭.                 সচিব পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ

বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উপাচার্যগণ

জাতীয় অধ্যাপকগণ

জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক

১৮.                পৌর কর্পোরেশনের মেয়রগণ (স্ব স্ব এলাকায়)

১৯.                  সরকারের অতিরিক্ত সচিবগণ

বাংলাদেশে নিযুক্ত সাময়িক দায়িত্বপ্রাপ্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতগণ

সফররত বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত ও হাই কমিশনারগণ

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেকশন গ্রেডের প্রফেসরগণ

রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশনসমূহের চেয়ারম্যান

ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান

দুর্নীতি দমন কমিশনের মহাপরিচালক

২০.                 অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার সরকারি কর্মকর্তাগণ

বাংলাদেশ বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্যগণ

পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্যগণ

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার

২১.                  সরকারের যুগ্ম সচিবগণ

বিভাগীয় কমিশনারগণ (স্ব স্ব দায়িত্বের আওতায়)

পুলিসের অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল

চেয়ারম্যান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)

সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর সমপদমর্যাদার অফিসারগণ

সার্ভেয়ার জেনারেল অব বাংলাদেশ

২২.                 যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার সরকারি কর্মকর্তাগণ

বিভাগীয় কমিশনারগণ (স্বীয় দায়িত্বের আওতা বহির্ভূত)

পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (স্ব স্ব দায়িত্বের আওতায়)

কারা মহাপরিদর্শক

সেনাবাহিনীতে পূর্ণ কর্নেল পদে অধিষ্ঠিত অফিসার এবং সমপদে অধিষ্ঠিত নৌ ও বিমান বাহিনীর অফিসারবৃন্দ

২৩.                 অতিরিক্ত কমিশনারগণ (স্ব স্ব দায়িত্বের আওতায়)

পৌর কর্পোরেশনের মেয়রগণ (স্বীয় দায়িত্বের আওতা বহির্ভূত)

২৪.                 জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান (স্ব স্ব দায়িত্বের আওতায়)

ডেপুটি কমিশনারগণ (স্বীয় দায়িত্বের আওতায়)

পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (স্বীয় দায়িত্বের আওতা বহির্ভূত)

জেলা ও দায়রা জজ (স্বীয় দায়িত্বের আওতায়)

সেনাবাহিনীর লেফটেন্যাণ্ট কর্নেল এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর সমপর্যায়ের অফিসারগণ

২৫.                 সরকারের উপসচিবগণ

প্রথম শ্রেণীর পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান (স্বীয় দায়িত্বের আওতায়)

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (স্বীয় দায়িত্বের আওতায়)

সিভিল সার্জন (স্বীয় দায়িত্বের আওতায়)

পুলিশ সুপার (স্বীয় দায়িত্বের আওতায়)

সেনাবাহিনীর মেজর পদমর্যাদার অফিসার এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর সমপর্যায়ের অফিসারবৃন্দ।

সরকারি এবং নির্বাচিত ব্যক্তিগণকে তাদের পদমর্যাদা অনুসারে প্রতিটি স্তরে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা তাদের পদমান নির্দেশ করে। সাধারণত প্রথমদিকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার ও প্রধান বিচারপতি ছাড়া প্রতিটি স্তরেই একাধিক অন্তর্ভুক্তি আছে। পদমানক্রমের ক্রমিক সংখ্যাগুলোকে স্তর বলা হয়ে থাকে। সরকারপদ্ধতির পরিবর্তনের ভিত্তিতে পদমানক্রমে তালিকাবদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহের পদবিন্যাসেও পরিবর্তন করা হয়। এতে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী কর্মকর্তাদের পদের তূলনামূলক সমতাও বিধান করা হয়। পদমানক্রম স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, প্রতি স্তরে বিভিন্ন কর্মকর্তার ভুক্তি কেবল তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের জন্যই প্রযোজ্য হবে। অবশ্য এভাবে নির্ধারিত কর্মকর্তাদের পদমানক্রম বেসরকারি লোকদের উপর তাদের কোনো অগ্রগণ্যতা দেয় না, যারা প্রচলিত রীতি অনুযায়ীই অগ্রাধিকার পেয়ে থাকবেন। পদমানক্রমে আরও বলা হয়েছে যে (১) কোনো একটি স্তরে অন্তর্ভুক্ত কর্মকর্তারা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত হন নি। একটি স্তরের অন্তর্ভুক্ত কর্মকর্তাগণ ঐ স্তরে অন্তর্ভুক্তির তারিখ অনুযায়ী অগ্রবর্তিতা পাবেন, কিন্তু প্রতিরক্ষা সার্ভিসের কর্মকর্তাগণ নিজ নিজ জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী অগ্রবর্তিতা লাভ করবেন; (২) একজন কর্মকর্তা তালিকায় একাধিক পদাসীন থাকলে তিনি তার সর্বোচ্চ পদানুসারে অগ্রবর্তিতা লাভ করবেন; (৩) একজন কর্মকর্তা যদি পদ পরিবর্তনের কারণে নিম্নতর কোনো স্তরে অন্তর্ভুক্ত হন অথচ নতুন পদে যোগদানের পূর্বে পদমানক্রমে আরও ওপরের স্তরে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, তাহলে তিনি উপরের স্তরে অন্তর্ভুক্তির তারিখ থেকে নিম্নতর স্তরে জ্যেষ্ঠতা লাভ করবেন; (৪) সকল বিবাহিত মহিলা, নিজেরা কোনো পদে অধিষ্ঠিত না থাকলে তালিকায় উচ্চপদমর্যাদার অধিকারী এবং নিজ নিজ স্বামীর পদমানক্রম অনুসারে অগ্রগণ্যতা লাভ করবেন; (৫) অন্যান্য যারা এ স্তরে উল্লিখিত হয় নি তারা সাধারণ রীতি অনুযায়ী অগ্রগণ্যতা পাবেন এবং এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখা দিলে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি তা ব্যাখ্যা ও নির্ধারণ করবেন; (৬) এই পদমানক্রম কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিক কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এবং দৈনন্দিন সরকার পরিচালনার কর্মকান্ডে প্রযোজ্য হবে না।  [এ.কে.এম ফারুক]