পথনাটক

পথনাটক  প্রসেনিয়াম আর্চের বাইরে পথে-প্রান্তরে অর্থাৎ উন্মুক্ত স্থানে অভিনীত নাটক। উন্মুক্ত স্থানে নাটকগুলি অভিনীত হয় বলে এগুলির দর্শকরা হয় সাধারণ শ্রেণীর। নিতান্তই অনাড়ম্বরভাবে শিল্পীরা অভিনয় করেন এবং দর্শকরা মাটিতে বসে বা দাঁড়িয়ে অভিনয় উপভোগ করেন। অভিনেতা-অভিনেত্রী ও দর্শকদের মধ্যে এই সরাসরি সংযোগের কারণে পথনাটকের অভিনয় অনেকটা দুরূহ; এতে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়।

পথনাটক পরিবেশনা

পথনাটকের সময়সীমা হয় মঞ্চনাটকের চেয়ে কম, সাধারণত আধ ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা। স্বল্পদৈর্ঘ্য এই নাটকের মুখ্য উদ্দেশ্য বিনোদন নয়; জনসাধারণের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করা এবং কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলন এর প্রধান লক্ষ্য। হাটে-বাজারে, পথে-ঘাটে কোনরূপ মঞ্চব্যবস্থা ছাড়াই সমাজে বিরাজমান যেকোনো সমস্যা অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে তার সমাধানও নির্দেশ করা হয়।

পথনাটকের প্রচলন বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ছিল এবং আছে। চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, ভিয়েতনামসহ পৃথিবীর নানা দেশে রাজনৈতিক প্রয়োজনের পাশাপাশি সামাজিক আনন্দ-বিনোদনের প্রয়োজনেও পথনাটক অভিনীত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ও যুদ্ধোত্তর সময়ে ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষ, নিপীড়ন ও নির্যাতন প্রতিরোধ এবং কালোবাজারি ও মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে জনগণকে জাগিয়ে তোলা এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে স্বাধীনতার চেতনাকে বেগবান করার ক্ষেত্রে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের পথনাট্যচর্চা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীকালে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পথনাটক একটি সফল ও শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হয়।

এদেশে পথনাটকের উৎপত্তি, বিকাশ ও চর্চার ইতিহাস মূলত ঐতিহ্যবাহী  লোকসঙ্গীতলোকনৃত্য ও  লোকনাট্য দ্বারা প্রভাবিত। বহুকাল পূর্ব থেকেই গ্রামবাংলার পূজা-পার্বণ, মেলা,  উৎসব ইত্যাদি উপলক্ষে খোলা জায়গায় যেসব নাট্যানুষ্ঠান হতো, বর্তমান কালের আধুনিক পথনাটকের কাঠামো নির্মাণে সেসবের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটারভিত্তিক নাট্যচর্চা শুরু হওয়ার পর মঞ্চনাটকের পাশাপাশি পথনাট্যচর্চায় নাট্যদলসমূহ এগিয়ে আসে।

স্বল্প ব্যয়ে, স্বল্প পরিশ্রমে এবং স্বল্প সময়ে পথনাটক প্রস্ত্তত করার সুযোগ থাকায় নতুন নতুন নাট্যদল এবিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এর ফলে নাট্যদলগুলির অভিনয়-কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং অভিনয়কুশলতা বৃদ্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

১৯৭৭ সালে  ঢাকা থিয়েটার সেলিম আল-দীন রচিত চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারী নামে প্রথম পথনাটক ঢাকায় প্রদর্শন করে। পরে  পদাতিক নাট্য সংসদ এস.এম সোলায়মান রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মঞ্চস্থ করে। ঢাকা পদাতিকও পরবর্তীতে নাটকটির প্রদর্শনী করে। নাটকটির মোট মঞ্চায়ন সংখ্যা প্রায় চারশ। বাংলাদেশে পথনাট্যচর্চার ক্ষেত্রে চারণ নাট্যগোষ্ঠীর অবদানও উল্লেখযোগ্য।

আশির দশকে  বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পথনাটক উৎসব পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৮৭ সালে ঢাকার নাট্যদল মহাকাল, সুবচন, গণছায়া, মহানগরী ’৭৭ একত্রিত হয়ে নিয়মিত পথনাটক প্রদর্শনীর উদ্যোগ নেয়। সে সময় ঢাকা মহানগর ও সিলেটের একটিসহ মোট ২৫টি নাট্যদল  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সাতদিনব্যাপী পথনাটক প্রদর্শনীতে অংশ নেয়। পরে ঢাকার মোহাম্মদপুরে অনুষ্ঠিত হয় ২১টি নাট্যদলের অংশগ্রহণে সপ্তাহব্যাপী পথনাটক প্রদর্শনী। ১৯৯২ সালে পথনাটকচর্চার গতিকে আরও বেগবান করার অভিপ্রায়ে মহাকাল, ঢাকা নাট্যম ও দেশ নাটক সমন্বিতভাবে পথনাটকের প্রদর্শনী শুরু করে। এদের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের পথনাট্যচর্চারত নাট্যদলসমূহ’ শিরোনামে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রবেশপথে প্রতি শুক্রবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হতে থাকে পথনাটকের প্রদর্শনী। এসব কর্মকান্ডের ওপর ভিত্তি করে ১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পথনাটক পরিষদ’। পরে প্রতিবছর শীতকালে অনুষ্ঠিত হতে থাকে পথনাটক প্রদর্শনী। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদের যৌথ উদ্যোগে ১৯৯৬ সালের ১-৭ ফেব্রুয়ারি ‘মুক্তিযুদ্ধের ২৫ বছর’ শীর্ষক সপ্তাহব্যাপী নবম জাতীয় পথনাটক উৎসব অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে। একইভাবে ‘মঞ্চে ও পথে অধিকার চাই’ শীর্ষক দ্বাদশ জাতীয় সপ্তাহব্যাপী পথনাটক উৎসব অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৯-র ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। দেশের ২৩টি নাট্যদল এই উৎসবে যোগ দেয়। উৎসবে প্রদর্শিত নাটকগুলির বিষয়বস্ত্ত হিসেবে  মুক্তিযুদ্ধ এবং অসম্প্রদায়িক চেতনা প্রাধান্য পায়।

বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং মে দিবসে শিল্পাঞ্চলে পথনাটক প্রদর্শিত হয়। ২০০০ সালের ২৫-২৯ ফেব্রুয়ারি পথনাটক পরিষদের একক উদ্যোগে প্রথম পথনাটক উৎসব অনুষ্ঠিত হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এতে ২৮টি নাট্যদল অংশগ্রহণ করে।  [জিল্লুর রহমান জন]