পঞ্চায়েত প্রথা


পঞ্চায়েত প্রথা  বাংলার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। পঞ্চায়েত বলতে পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তি সমন্বয়ে গঠিত পর্ষদকে বোঝায়। স্মরণাতীত কাল থেকে পঞ্চায়েত শব্দটি বাংলাসহ উত্তর ভারতের সমগ্র অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। প্রাচীনকালে গ্রাম-সংসদ অথবা পঞ্চায়েত রাজা কর্তৃক মনোনীত বা কোন গ্রামের জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হতো এবং গ্রাম প্রশাসনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এ সংসদ ছিল বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত। পঞ্চায়েতগুলিতে সকল শ্রেণি ও বর্ণের লোকদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। পঞ্চায়েতগুলি গ্রামবাসীদের মধ্যে ভূমি বন্টন করত এবং তাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করে সরকারের প্রাপ্য অংশ পরিশোধ করত। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে গ্রাম-বৃদ্ধ বা গ্রামের প্রবীণদের বিষয় উল্লেখ আছে। তারা ছিলেন গ্রাম-সংসদের সম্মানিত সদস্য এবং তাদের দায়িত্ব ছিল গ্রামের ছোটখাটো বিবাদ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের সহায়তা করা।

মুসলিম শাসকগণ এমন এক ধরনের শাসনব্যবস্থায় প্রবর্তন করেন যা বৈশিষ্ট্যগতভাবে ছিল কমবেশি কেন্দ্রাভিমুখী। এমনকি, তখনও জমিদারগণ যতদিন রাজকীয় পাওনা নিয়মিত পরিশোধ করতেন ততদিন গ্রামের প্রশাসনে শাসকরা কোন হস্তক্ষেপ করতেন না। গ্রামগুলিতে বিচারব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব জমিদারদের উপর ন্যস্ত ছিল। বর্ণ-পরিষদ নামে সাধারণ্যে পরিচিত গ্রাম পরিষদ বা পঞ্চায়েত সীমিত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী ছিল। এ পরিষদ শুধু সামাজিক আইন ও প্রথাসমূহের ব্যাখ্যা এবং সামাজিকভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিবিধানের উপায় নির্দেশ করতে পারত।

ব্রিটিশ শাসনের সূচনালগ্নে বাংলার গ্রামীণ শাসনব্যবস্থার প্রচলিত পদ্ধতি বহাল রাখা হয়। জমিদারের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং বর্ণ-কাচারি নামে পরিচিত পঞ্চায়েত কেবল ছোটখাটো দীউয়ানি ও ফৌজদারি মামলা এবং বর্ণবিষয়ক মামলা যেমন বর্ণচ্যূতি বা বিবাহ সংক্রান্ত বিবাদ নিষ্পত্তি করত। পঞ্চায়েত তখনও প্রশাসনের বিচারবিষয়ক রাজনৈতিক ইউনিট হিসেবে গড়ে উঠতে পারে নি, কারণ জমিদারই ছিলেন গ্রামগুলিতে বিচার ও পুলিশ প্রশাসনের একক কর্তৃত্বের অধিকারী। ১৮৭০ সালে ‘বেঙ্গল ভিলেজ চৌকিদারি অ্যাক্ট’ পাস করে গ্রাম্য চৌকিদারদের পঞ্চায়েতের অধীনে ন্যস্ত করে এককালের প্রায় নির্জীব পঞ্চায়েতকে পুনর্জীবিত করার চেষ্টা করা হয়। এ সত্ত্বেও পঞ্চায়েত কোন জনপ্রিয় সংস্থা ছিল না। এটি গ্রামের জনগণ কর্তৃক নির্বাচিতও ছিল না, অথবা গ্রামের কোন কল্যাণমূলক দায়িত্বও এর উপর বর্তায় নি।

বাংলার স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ইতিহাসে ১৮৮৫ সাল এক নবযুগের সূচনা করে। তখন থেকে ব্রিটিশ সরকার গ্রামীণ প্রশাসন পরিচালনার জন্য নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন এবং বাংলার মাটিতে তা বাস্তবায়নের চেষ্টায় রত ছিল। ১৮৮৫ সালের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন আইন দ্বারা প্রতি জেলায় একটি করে জেলা বোর্ড এবং প্রতি মহকুমায় একটি করে লোকাল বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথমদিকে গ্রাম-পঞ্চায়েত সম্পর্কে কোন ব্যবস্থাই নেওয়া হয় নি। কিন্তু গ্রামে কোন কল্যাণমূলক দায়িত্ব ছাড়া গ্রাম-পঞ্চায়েতের সার্থকতা নিয়ে অচিরেই ব্রিটিশ জনগণের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। তদনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার রয়্যাল কমিশনের বিকেন্দ্রীকরণ সুপারিশ গ্রহণ করে। এ সুপারিশ অনুসারে চৌকিদারি ও গ্রামের পুরো দায়িত্ব সমন্বিত করে গ্রাম পর্যায়ে গ্রাম-পঞ্চায়েতের স্থলে ইউনিয়ন বোর্ড নামে একটি নতুন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯১৯ সালের ‘বেঙ্গল ভিলেজ সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট’ পাসের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার পঞ্চায়েত প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়।  [শিবনাথ ব্যানার্জী]