পঞ্চানন তর্করত্ন


পঞ্চানন তর্করত্ন (১৮৬৬-১৯৪০)  সংস্কৃত পন্ডিত। ১২৭৩ বঙ্গাব্দের ৯ ভাদ্র পশ্চিমবঙ্গের চবিবশ পরগনা জেলার ভাটপাড়ায় (ভট্টপল্লী) এক প্রসিদ্ধ পন্ডিতবংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নন্দনাল বিদ্যারত্ন এবং পিতামহ লম্বোদর তর্কবাগীশও ছিলেন  সংস্কৃত পন্ডিত।

পঞ্চানন পিতার নিকট প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৩ বছর বয়সে কাব্যের উপাধি লাভ করেন। অতঃপর ভাটপাড়ার বিখ্যাত পন্ডিত মহামহোপাধ্যায় শিবচন্দ্র সার্বভৌমের নিকট ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন করে তিনি ‘তর্করত্ন’ উপাধি পান। তিনি ভাটপাড়ায় ১৮৯০ সালে ‘পরীক্ষা সমাজ’ নামে একটি সংস্কৃত পরীক্ষা-কেন্দ্র এবং ১৯২৭ সালে একটি সংস্কৃত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পরীক্ষা সমাজের তিনি প্রথম সম্পাদক ছিলেন।

১৮৮৬ সালে যোগেন্দ্রচন্দ্র বসু বঙ্গবাসী কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করলে পঞ্চানন তার শাস্ত্রপ্রকাশ বিভাগে যোগদান করেন। সেখানে থেকে তিনি বহু সংস্কৃত গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন এবং বঙ্গবাসী কার্যালয় কর্তৃক সেগুলি প্রকাশিত হয়। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, সপ্তশতী, রত্নাবলী, ঊনবিংশ স্মৃতিসংহিতা,  পুরাণ, মনুসংহিতা, বেদান্তসূত্রভাষ্য,  রামায়ণ, অধ্যাত্মরামায়ণ, সাংখ্যদর্শন, দশকুমারচরিত ইত্যাদি। পার্থাশ্বমেধ (মহাকাব্য), অমরমঙ্গল (নাটক), দ্বৈতরত্নমালা (দর্শন), মালতীমাধব (উপন্যাস), সর্বমঙ্গলোদয় (কাব্য) প্রভৃতি তাঁর মৌলিক রচনা। এছাড়া নানা পত্রপত্রিকায় তাঁর বহুসংখ্যক গল্প, কবিতা, শিবসঙ্গীত ও সংস্কৃত গদ্যপদ্য রচনা প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবাসী কলেজে এফএ ক্লাস খোলা হলে তিনি সেখানে কিছুদিন অবৈতনিক সংস্কৃত অধ্যাপকের পদেও কাজ করেন।

পঞ্চানন চার বছর জন্মভূমি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া তিনি বঙ্গীয় ব্রাহ্মণসভা ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের যথাক্রমে সভাপতি ও সহসভাপতির দায়িত্ব পালন। ১৯২৩ সালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের চতুর্দশ অধিবেশনে তিনি দর্শন শাখার সভাপতি ছিলেন। ১৯২৯ সালে তিনি ভারত সরকার কর্তৃক ‘মহামহোপাধ্যায়’ উপাধি লাভ করেন, কিন্তু পরে সরকার কর্তৃক হিন্দুবিরোধী সরদা আইন প্রবর্তনের প্রতিবাদে তা পরিত্যাগ করেন।

শাক্তবাদে বিশ্বাসী পঞ্চানন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতি আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল ছিলেন। রাজদ্রোহিতার অভিযোগে একবার তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়, কিন্তু প্রমাণাভাবে তিনি অভিযোগ থেকে মুক্তি পান। বর্ণাশ্রমমূলক জাতীয়তাবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে স্থাপিত বর্ণাশ্রম স্বরাজ্য সঙ্ঘের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৩৪৭ বঙ্গাব্দের ২৫ আশ্বিন তাঁর মৃত্যু হয়।   [দিলীপ কুমার ভট্টাচার্য্য]