ন্যায়দর্শন চর্চা


ন্যায়দর্শন চর্চা  ন্যায়দর্শন হচ্ছে ভারতীয় ষড়দর্শনের অন্যতম। মহর্ষি গৌতম (গোতম বা অক্ষপাদ) এর প্রবর্তক এবং তাঁরই ন্যায়সূত্রের ওপর এ দর্শন প্রতিষ্ঠিত। জীবের মোক্ষলাভের হেতু তত্ত্বজ্ঞান অর্জিত হয় যে তিনটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, তার অন্যতম মননের (অন্য দুটি শ্রবণ ও নিদিধ্যাসন) সাধনই হলো ন্যায়দর্শন। আত্মতত্ত্ব শ্রবণের পর যুক্তির দ্বারা তার স্বরূপ সম্পর্কে যে আলোচনা করা হয় তার প্রধান উপায় ন্যায়। বাৎস্যায়নের মতে বিভিন্ন প্রমাণের সাহায্যে কোন বিষয়ের স্বরূপ বিবেচনা করাই হলো ন্যায়। প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহরণ, উপনয় ও নিগমন এই পাঁচটির সমন্বয়ে গঠিত অনুমান হচ্ছে ন্যায়দর্শনের মূল সূত্র। এর নামান্তর অন্বীক্ষা (অনু-ঈক্ষা), অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ও আগম প্রমাণের দ্বারা যে বিষয়কে পূর্বে জানা হয়েছে তাকেই আবার পরে (অনু) পরীক্ষা করা (ঈক্ষা)। এ থেকে ন্যায়শাস্ত্রের অপর নাম হয়েছে আন্বীক্ষিকী। একে তর্কবিদ্যাও বলা হয়।

ন্যায়দর্শনের প্রাচীনতম গ্রন্থ ন্যায়সূত্র (খ্রি ২০০-৪৫০)। এতে ৫২৮টি সূত্রে অতি সংক্ষেপে আত্মতত্ত্ব ব্যাখ্যাত হয়েছে; ফলে অনেক সময় তার প্রকৃত তাৎপর্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে বিষয়বস্ত্তকে সহজবোধ্য করার জন্য এই সূত্রগ্রন্থের অনেক টীকা-টিপ্পনী রচিত হয় এবং সেসবের মাধ্যমে ন্যায়দর্শনের বিস্তৃতি ঘটে। এর প্রথম বিস্তৃত ব্যাখ্যা হলো বাৎস্যায়নের ভাষ্য। এরপর উদ্দ্যোতকর (ন্যায়বার্তিক, ৬ষ্ঠ-৭ম খ্রি),  বাচস্পতি মিশ্র (তাৎপর্যটীকা, ৯ম খ্রি), উদয়নাচার্য (তাৎপর্যপরিশুদ্ধি, ১০ম খ্রি), জয়ন্ত ভট্ট (ন্যায়মঞ্জরী), বিশ্বনাথ (ন্যায়সূত্রবৃত্তি, ১৭শ খ্রি), রাধামোহন গোস্বামী (ন্যায়সূত্রবিবরণ, ১৮শ খ্রি) প্রমুখ এর টীকা রচনা করে আলোচ্য বিষয়কে আরও সহজবোধ্য করে তোলেন।

ন্যায়মতে ষোলোটি পদার্থের তত্ত্বজ্ঞান থেকে নিঃশ্রেয়স লাভ হয়। সেগুলি হলো: প্রমাণ, প্রমেয়, সংশয়, প্রয়োজন, দৃষ্টান্ত, সিদ্ধান্ত, অবয়ব, তর্ক, নির্ণয়, বাদ, জল্প, বিতন্ডা, হেত্বাভাস, ছল, জাতি ও নিগ্রহস্থান। যে মিথ্যাজ্ঞান এই সংসার ও সর্বদুঃখের কারণ, তত্ত্বজ্ঞান তাকে বিনষ্ট করে। মিথ্যাজ্ঞানের নাশে দোষ (রাগ, দ্বেষ ইত্যাদি) নষ্ট হয়, দোষের নাশে প্রবৃত্তি (ধর্ম, অধর্ম ইত্যাদি) নষ্ট হয়, প্রবৃত্তি নষ্ট হলে আর জন্ম হয় না এবং জন্মের নিবৃত্তিতে দুঃখেরও আত্যন্তিক নিবৃত্তি ঘটে। ন্যায়দর্শন হচ্ছে বস্ত্তবাদী; তা বাহ্য জগতের বাস্তব সত্তা স্বীকার করে। মহর্ষি গৌতম ঈশ্বর মানতেন কি-না বলা কঠিন, তবে তাঁর পরবর্তী সমর্থকরা ঈশ্বর মেনেছেন।

ন্যায়মতে প্রমাণ চারটি প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ। এই প্রমাণের ওপর সমধিক গুরুত্ব আরোপের ফলে পরবর্তীকালে নব্যনায়ের উদ্ভব হয়। নব্যন্যায়ের প্রবর্তক  গঙ্গেশোপাধ্যায় (১২শ খ্রি)। তিনি গৌতম ন্যায়সূত্রের প্রমাণকান্ডের ওপর ভিত্তি করে তত্ত্বচিন্তামণি নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটি চার খন্ডে বিভক্ত: প্রত্যক্ষচিন্তামণি, অনুমানচিন্তামণি, উপমানচিন্তামণি ও শব্দচিন্তামণি। এর ওপর পরবর্তীকালে অনেকে ভাষ্য রচনা করেন, যেমন: বর্ধমান (পুত্র), পক্ষধর মিশ্র (১৫শ শতক),  রঘুনাথ শিরোমণি (১৫-১৬শ শতক),  মথুরানাথ তর্কবাগীশ (১৬শ শতক),  জগদীশ তর্কালঙ্কার (১৬শ-১৭শ শতক), গদাধর ভট্টাচার্য (১৬০৪-১৭০৯) প্রমুখ। ভাষ্যগুলি হলো: মাথুরী, জাগদীশী, গাদাধরী ইত্যাদি। ন্যায়দর্শনের কয়েকটি বিশিষ্ট সিদ্ধান্ত হলো: আরম্ভবাদ বা অসৎকার্যবাদ, পরমাণুকারণবাদ ইত্যাদি। ন্যায়দর্শন ও বৈশেষিক দর্শন প্রায় অনুরূপ। মোটামুটিভাবে দশম শতাব্দী থেকে পারস্পরিক আদান-প্রদানের ভিত্তিতে এ দুটি দর্শন একটি মিলিত ধারায় পরিণত হয়।

বঙ্গে ন্যায়চর্চার প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় দশম শতকে। তখনকার প্রসিদ্ধ মীমাংসক শ্রীধরভট্ট ন্যায়-বৈশেষিক শাস্ত্রে কৃতবিদ্য ছিলেন। ন্যায়দর্শন সম্পর্কে তাঁর রচিত অদ্বয়সিদ্ধি, তত্ত্বপ্রবোধ, তত্ত্বসংবাদিনীসংগ্রহটীকা প্রভৃতি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়; তবে এগুলির  পান্ডুলিপি উদ্ধার হয় নি। কারও কারও মতে খন্ডনখন্ডখাদ্য গ্রন্থের লেখক শ্রীহর্ষও (১১শ শতক) বঙ্গদেশে জন্মগ্রহণ করেন। একাদশ শতাব্দীতে  রাঢ় দেশে রাজা হরিবর্মদেবের মন্ত্রী মীমাংসক ভবদেব ভট্ট ন্যায়শাস্ত্রে অসাধারণ ব্যুৎপন্ন ছিলেন। ভুবনেশ্বরের অনন্ত বাসুদেবের মন্দিরে খোদিত প্রশস্তিতে তাঁর সর্বশাস্ত্রে পান্ডিত্যের কথা আছে।

দ্বাদশ শতকে রাজা লক্ষ্মণসেনের সভা অলঙ্কৃত করেছিলেন বহু মীমাংসক ও নৈয়ায়িক। রায়মুকুট বৃহস্পতি, স্মার্ত  জীমূতবাহন (আনু. ১০৫০-১১৫০),  শূলপাণি (আনু. ১৩৭৫-১৪৬০) প্রমুখের ন্যায়শাস্ত্রে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি ছিল। নবদ্বীপকে কেন্দ্র করে বঙ্গদেশে নব্যন্যায়ের যে চর্চা গড়ে উঠেছিল, ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে তা এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্মার্ত রঘুনাথ ছিলেন বঙ্গে নব্যন্যায়ের শ্রেষ্ঠ পন্ডিত। তাঁকে মধ্যমণি ধরে এদেশে নব্যন্যায়ের চর্চাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়: রঘুনাথ-পূর্ব যুগ, রঘুনাথ-যুগ ও রঘুনাথ-উত্তর যুগ।

রঘুনাথ-পূর্ব যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৈয়ায়িক হলেন  বাসুদেব সার্বভৌম (আনু. ১৪২০/৩০-১৫৪০)। অবশ্য বিভিন্ন মৈথিলী গ্রন্থে যে গৌড়মতের উল্লেখ দেখা যায় তা থেকে বোঝা যায় যে, সার্বভৌমের পূর্বেও বঙ্গদেশে নব্যন্যায়ের চর্চা ছিল। সার্বভৌমের রচিত দুটি গ্রন্থ এ যাবৎ আবিষ্কৃত হয়েছে তত্ত্বচিন্তামণির অনুমানখন্ডের টীকা এবং অদ্বৈতমকরন্দের টীকা। চিন্তামণির টীকার নাম সারাবলী বলে অনুমান করা হয়। রঘুনাথ তাঁর দীধিতি গ্রন্থে সার্বভৌমের সারাবলীর নানা মতের খন্ডন করেছেন। সার্বভৌম তাঁর টীকায় গঙ্গেশপুত্র বর্ধমান উপাধ্যায়ের মতের সশ্রদ্ধ উল্লেখ ও যজ্ঞপতি উপাধ্যায়ের মতের তীব্র ভাষায় খন্ডন করেছেন। সার্বভৌম বেদান্ত-মীমাংসাদি শাস্ত্রেও পারদর্শী ছিলেন। তিনি বহুদিন পুরীতে রাজা পুরুষোত্তমদেব ও রাজা প্রতাপরুদ্রদেবের সভা অলঙ্কৃত করেছিলেন। সার্বভৌমের পিতা নরহরি বিশারদও ছিলেন বিভিন্ন শাস্ত্রে সুপন্ডিত।

রঘুনন্দন ভট্টাচার্য (১৬শ শতক) প্রমুখ স্মার্তদের গ্রন্থে ‘বিশারদ’ নামক স্মৃতিনিবন্ধকারের মত উদ্ধৃত হয়েছে। মৈথিলী নব্যনৈয়ায়িক পক্ষধর মিশ্র তাঁর অনুমানালোক গ্রন্থে বিশারদের মত খন্ডন করেছেন। সার্বভৌমের পুত্র জলেশ্বর বাহিনীপতিও (জ. আনু. ১৫৬০-৬৫) নব্যন্যায়শাস্ত্রে পারঙ্গম ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ শব্দালোকোদ্দ্যোত। জলেশ্বরের পুত্র স্বপ্নেশ্বরাচার্য শান্ডিল্যসূত্রের ভাষ্য রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম সাংখ্যতত্ত্বকৌমুদীপ্রভা। এ গ্রন্থে তাঁরই রচিত ন্যায় ও বেদান্তের ওপর অন্যান্য গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। নরহরি বিশারদের এক কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীনাথ ভট্টাচার্য তত্ত্বচিন্তামণির প্রত্যক্ষ ও অনুমান খন্ডের ওপর টীকা রচনা করেন। এক কথায় বাসুদেব-পরিবারটি ছিল নৈয়ায়িক জ্ঞানের অধিকারী।

বাসুদেবের প্রায় সমসাময়িক পুন্ডরীকাক্ষ বিদ্যাসাগর ভট্টাচার্য (আনু. ১৫শ শতক) ন্যায়াদি নানা শাস্ত্রের গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর টীকা বিদ্যাসাগরী নামে প্রসিদ্ধ। বিভিন্ন উৎস থেকে আরও কয়েকজন নৈয়ায়িকের নাম জানা যায়; তাঁরা হলেন  পুরুষোত্তম ভট্টাচার্য (আনু. ১২শ শতক), কবিমণি ভট্টাচার্য, ঈশান ভট্টাচার্য প্রমুখ। অবশ্য এঁদের রচিত কোন গ্রন্থ পাওয়া যায় নি।

ষোড়শ শতকের দ্বিতীয় ভাগে নৈয়ায়িক সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানে ছিলেন কাশীনাথ বিদ্যানিবাস (১৬শ শতক)। তিনি তত্ত্বচিন্তামণিবিবেচন নামে তত্ত্বচিন্তামণির টীকা রচনা করেন, যদিও সেসবের মধ্যে কেবল প্রত্যক্ষখন্ডের ওপর রচিত টীকাটিই আবিষ্কৃত হয়েছে। স্মৃতি বিষয়ক গ্রন্থ দ্বাদশযাত্রাপদ্ধতি ও সদাচার বিষয়ক গ্রন্থ সচ্চরিতমীমাংসা তাঁরই রচিত বলে অনুমান করা হয়।

বাংলার নব্যন্যায়ের কুলতিলক হচ্ছেন রঘুনাথ শিরোমণি। প্রত্যক্ষমণিদীধিতি তাঁর রচিত প্রথম গ্রন্থ। এতে মুখ্যত প্রামাণ্যবাদের ওপর আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ অনুমানদীধিতি। এ গ্রন্থের অজস্র টীকা রচিত হয়েছে। এতে হেত্বাভাসের বাধপ্রকরণ পর্যন্ত আলোচনা করা হয়েছে। মূলত একে কেন্দ্র করেই নবদ্বীপের নব্যন্যায় সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। রঘুনাথ শব্দমণিদীধিতি নামে তত্ত্বচিন্তামণির শব্দখন্ডের ওপরও টীকা রচনা করেন। এ গ্রন্থের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে। চিন্তামণির আখ্যাতবাদের ওপর রঘুনাথের রচিত টীকা এতই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে, নবদ্বীপের পন্ডিতসমাজে মূল চিন্তামণির আখ্যাতবাদের পঠন-পাঠন প্রায় লুপ্ত হয়ে যায়। রঘুনাথ চিন্তামণির অভাববাদের ওপর বিস্তৃত আলোচনা করেছেন তাঁর নঞ্বাদ গ্রন্থে। পদার্থখন্ডন গ্রন্থে তিনি চিরন্তন পদার্থবিভাগ বর্জন করে নতুন দিগ্দর্শন দান করেন। উদয়নাচার্যের (১২শ শতক) কিরণাবলীর ওপর দ্রব্যকিরণাবলীপ্রকাশদীধিতি ও গুণকিরণাবলীপ্রকাশদীধিতি, আত্মতত্ত্ববিবেকের ওপর আত্মতত্ত্ববিবেকদীধিতি, ন্যায়লীলাবতীর ওপর ন্যায়লীলাবতীপ্রকাশদীধিতি, নব্যস্মৃতির ওপর মলিম্লুচবিবেক নামে রঘুনাথ ভিন্ন ভিন্ন টীকা রচনা করেন। খন্ডনভূষামণি নামে খন্ডনখন্ডখাদ্যের ওপর অপর একটি টীকাও তিনি রচনা করেন বলে কেউ কেউ মনে করেন।

রঘুনাথ শিরোমণির দীধিতি গ্রন্থের ওপর বহু টীকা রচিত হয়েছে এবং সেগুলিতে বাঙালির অসামান্য দার্শনিক প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছে। হরিদাস ভট্টাচার্যকে (১৮৯১-১৯৫৬) দীধিতির প্রথম টীকাকার বলা হয়। তাঁর সর্বাধিক খ্যাত টীকার নাম কুসুমাঞ্জলি। এছাড়া শব্দমণ্যালোকটিপ্পনী ও অনুমানালোকব্যাখ্যা নামক আরও দুটি গ্রন্থ তিনি রচনা করেন।

রঘুনাথের অপর একজন প্রধান টীকাকার হলেন কৃষ্ণদাস সার্বভৌম (আনু. ১৬শ শতক)। তিনি সম্ভবত রঘুনাথের আটখানি গ্রন্থের ওপরই টীকা রচনা করেছিলেন। তাঁর গ্রন্থগুলি হলো প্রত্যক্ষদীধিতিপ্রসারিণী, অনুমানদীধিতিপ্রসারিণী, আখ্যাতদীধিতিপ্রসারিণী, নঞ্বাদটিপ্পনী, গুণদীধিতিটীকা, অনুমানালোকপ্রসারিণী ও ভাষাপরিচ্ছেদমুক্তাবলী। এগুলির মধ্যে একমাত্র দ্বিতীয় গ্রন্থের অংশবিশেষ মুদ্রিত হয়েছে, সামান্য কিছু পুথির আকারে রক্ষিত আছে এবং অবশিষ্টগুলি হারিয়ে গেছে। অবশ্য শেষ গ্রন্থের লেখক হিসেবে বিশ্বনাথ ন্যায়পঞ্চাননের নামও জড়িত আছে।

রঘুনাথের সমকালীন আরও দুজন নৈয়ায়িকের উল্লেখ করা যেতে পারে; তাঁরা হলেন  জানকীনাথ ভট্টাচার্য (১৫শ শতক) এবং  কণাদ তর্কবাগীশ (১৫শ শতক)। জানকীনাথের ন্যায়সিদ্ধান্তমঞ্জরী এক সময় সারা ভারতে বহুল প্রচলিত ছিল। মণিমরীচি নামে চিন্তামণির এবং তাৎপর্য্যদীপিকা নামে উদয়নের তাৎপর্য্যপরিশুদ্ধির টীকাও জানকীনাথ রচনা করেছিলেন। এছাড়া আন্বীক্ষিকীতত্ত্ববিবরণ ও আত্মতত্ত্বদীপিকা গ্রন্থদ্বয়ও তাঁর রচিত বলে অনেকে মনে করেন। কণাদের গ্রন্থের নাম হলো ভাষারত্ন।

রামভদ্র সার্বভৌম (১৬শ শতক) ছিলেন সমকালের অপর এক বিখ্যাত নৈয়ায়িক। তিনি ন্যায়রহস্য (গৌতমসূত্রের ব্যাখ্যা), গুণরহস্য, সিদ্ধান্তসার (বাদসমষ্টি), সময়রহস্য (স্মৃতিগ্রন্থ), সমাসবাদ (ন্যায়মতে সমাসের শক্তি বিচার), শব্দানিত্যবাদ, সুবর্ণতৈজসত্ববাদ, পদার্থতত্ত্ববিবেচনাপ্রকাশ, সিদ্ধান্তরহস্য, নঞ্বাদটীকা, কুসুমাঞ্জলিকারিকাব্যাখ্যা প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থগুলির খুব সামান্যই মুদ্রিত হয়েছে, বাকিগুলি কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। রামভদ্রের চার ছাত্র ন্যায়শাস্ত্রের চার স্তম্ভস্বরূপ ছিলেন; তাঁরা হলেন মথুরানাথ তর্কবাগীশ, জগদীশ তর্কালঙ্কার, গৌরীকান্ত সার্বভৌম (১৬শ শতক) ও জয়রাম ন্যায়পঞ্চানন (১৮শ শতক)। মথুরানাথের পিতা শ্রীরাম তর্কালঙ্কার নৈয়ায়িকদের মধ্যে ‘জগদ্গুরু’ আখ্যা পান। অনুমানদীধিতির ওপর শ্রীরাম টীকা লিখেছেন। আত্মতত্ত্ববিবেকদীধিতিটিপ্পনী গ্রন্থও শ্রীরামের রচিত।

যাঁদের অসাধারণ প্রতিভাবলে নবদ্বীপের ন্যায়চর্চার মহিমা সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল, তাঁদের অন্যতম হলেন মথুরানাথ তর্কবাগীশ। তত্ত্বচিন্তামণির চার খন্ডের ওপরই মথুরানাথ তত্ত্বচিন্তামণিরহস্য নামে টীকা রচনা করেন, যা ‘মাথুরীটীকা’ নামে খ্যাত। যদিও উপমানখন্ডের ওপর মাথুরীটীকা এখনও পাওয়া যায় নি, তবে অন্য তিন খন্ড মুদ্রিত হয়েছে। পক্ষধর মিশ্রের আলোকটীকার ওপর রহস্য নামে টীকা এবং রঘুনাথের গ্রন্থগুলির ওপর অনুমানদীধিতিমাথুরী, গুণদীধিতিমাথুরী, বৌদ্ধাধিকারদীধিতিমাথুরী, লীলাবতীদীধিতিমাথুরী, আখ্যাতবাদটীকা গ্রন্থগুলি মথুরানাথের অসামান্য প্রতিভার পরিচয় বহন করে। এছাড়াও উদয়নাচার্যের গ্রন্থের ওপর দ্রব্যকিরণাবলীটীকা, গুণকিরণাবলীটীকা, বৌদ্ধাধিকারবিবৃতি, বল্লভাচার্যের ন্যায়লীলাবতীর ওপর লীলাবতীমাথুরী, বর্ধমানের দ্রব্যকিরণাবলীপ্রকাশ, গুণকিরণাবলীপ্রকাশ ও ন্যায়লীলাবতীপ্রকাশের ওপর মাথুরীটীকার অংশবিশেষ পাওয়া গেছে। গৌতমসূত্রবৃত্তি ও সুপ্শক্তিবাদ নামে মথুরানাথের আরও দুটি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায় তাঁর অন্য গ্রন্থে। শিবমহিম্নঃস্তব এবং পাণিগ্রহণাদিবিবেক নামে স্মৃতিশাস্ত্রের গ্রন্থের ওপর মাথুরীটীকার অংশবিশেষ পাওয়া যায়। মথুরানাথ একটি মৌলিক গ্রন্থও রচনা করেন যার নাম সিদ্ধান্তরহস্য।

প্রচলিত একটি শ্লোকে বাংলার চারজন মহা নৈয়ায়িকের উল্লেখ আছে; তাঁরা হলেন ভবানন্দ সিদ্ধান্তবাগীশ (১৬শ শতক), গুণানন্দ, মথুরানাথ ও জগদীশ। ভবানন্দের গ্রন্থগুলি হলো প্রত্যক্ষদীধিতিটীকা, অনুমানদীধিতিটীকা, আখ্যাতবাদটীকা, নঞ্বাদটীকা, গুণদীধিতিটীকা, লীলাবতীশিরোমণিটীকা, প্রত্যক্ষালোকসারমঞ্জরী, অনুমানালোকসারমঞ্জরী, শব্দালোকসারমঞ্জরী, শব্দমণিসারমঞ্জরী ও শব্দার্থসারমঞ্জরী। এর মধ্যে কেবল দ্বিতীয় গ্রন্থের অংশবিশেষ মুদ্রিত হয়েছে। ভবানন্দ রচিত ন্যায়গ্রন্থগুলি এক সময় সারা ভারতে পঠিত ও আলোচিত হতো।

ভবানন্দের পুত্র রাম তর্কালঙ্কারও প্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক ছিলেন। ভবানন্দের পৌত্র রুদ্র তর্কবাগীশের লেখায় রাম তর্কালঙ্কারের মতের উল্লেখ দেখা যায়। রাম তর্কালঙ্কারের কারকবিচার গ্রন্থের খন্ডিত  পুথি পাওয়া গেছে। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মধুসূদন বাচস্পতিও (১৯শ শতক) ন্যায়শাস্ত্রবেত্তা ছিলেন। সম্ভবত তিনি দীধিতির টীকাও রচনা করেছেন। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র হলেন রুদ্র তর্কবাগীশ। তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ অনুমানদীধিতিরৌদ্রী। রৌদ্রীটীকা নামে তিনি সিদ্ধান্তমুক্তাবলীরও টীকা রচনা করেন। এছাড়া বিবাহরৌদ্রী নামে তিনি একটি কাব্যগ্রন্থও রচনা করেন। এদিক থেকে ভবানন্দ-পরিবারকেও একটি নব্যন্যায়শাস্ত্রজ্ঞানী পরিবার বলা যায়।

এক সময় সমগ্র ভারতে গুণানন্দ বিদ্যাবাগীশের পান্ডিত্যের খ্যাতি বিস্তৃত ছিল। গুণকিরণাবলীপ্রকাশদীধিতির ওপর গুণানন্দের বিবেক নামক টীকা সর্বত্র সাদরে গৃহীত হয়েছিল। এছাড়া তাঁর রচিত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বৌদ্ধাধিকারদীধিতিবিবেক, অনুমানদীধিতিবিবেক, লীলাবতীদীধিতিবিবেক, প্রত্যক্ষমণিটীকা, ন্যায়কুসুমাঞ্জলিতাৎপর্যবিবেক ও শব্দালোকবিবেক।

তত্ত্বচিন্তামণির ওপর প্রত্যক্ষময়ূখ, অনুমানময়ূখ, উপমানময়ূখ ও শব্দময়ূখ নামে জগদীশ টীকাগ্রন্থ রচনা করেন। দীধিতির ওপর প্রত্যক্ষদীধিতিটীকা, অনুমানদীধিতিটীকা ও লীলাবতীদীধিতিটীকাও জগদীশের অনন্যসাধারণ কীর্তি। বৈশেষিক ভাষ্যের টীকা দ্রব্যসূক্তি ও গণসূক্তি নামেও জগদীশ গ্রন্থ রচনা করেন। জগদীশের শব্দশক্তিপ্রকাশিকা ও তর্কামৃত গ্রন্থদ্বয় বহুল পঠিত। ন্যায়াদর্শ নামেও তাঁর একটি গ্রন্থ ছিল বলে অনুমান করা হয়। রঘুনাথের পর একশ বছরের মধ্যে দীধিতির বিভিন্ন টীকা রচিত হওয়ায় এক বিরাট ন্যায়জগৎ গড়ে ওঠে। কিন্তু জগদীশের গ্রন্থ প্রকাশ হওয়ার পর ঐ টীকাগুলির পঠন-পাঠন প্রায় লুপ্ত হয়ে যায়। এই সময়ে আরও বহু নৈয়ায়িক ছিলেন। গোপীকান্ত ন্যায়ালঙ্কারের অনুমানদীধিতিটীকা, গোবিন্দ ভট্টাচার্যচক্রবর্তীর (১৬শ-১৭শ শতক) সমাসতত্ত্ব, পদার্থখন্ডনব্যাখ্যা, আত্মতত্ত্ববিবেকটীকা, মুক্তিবিবেচনা, রামনাথ বিদ্যাবাচস্পতির (১৬শ-১৭শ শতক) শব্দার্থরহস্য, লীলাবতীবিবৃতিরহস্য, শব্দমণিরহস্য, রামচন্দ্র ন্যায়বাগীশের (১৭শ শতক) আখ্যাতবাদটীকা, নঞ্বাদটীকা, রামগোপাল সিদ্ধান্তপঞ্চাননের (১৭শ শতক) বিবাহতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব, বিধিতত্ত্ব, কারকতত্ত্ব প্রভৃতি গ্রন্থের নামোল্লেখ পাওয়া যায়।

রঘুনাথের দীধিতিকে কেন্দ্র করে নব্যন্যায়ের যে আলো বিচ্ছুরিত হয়েছিল, তার শেষ প্রদীপশিখা হলেন গদাধর ভট্টাচার্যচক্রবর্তী। মূল তত্ত্বচিন্তামণির শব্দখন্ড ও অনুমানখন্ডের ওপর তাঁর টীকা অংশত পাওয়া গেছে। গদাধর রচিত শব্দমণ্যালোকটীকা, প্রত্যক্ষালোকটীকা, অনুমানালোকটীকারও অংশবিশেষ পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদীধিতিটীকা এবং অনুমানদীধিতিটীকা গদাধরের আরও দুটি গ্রন্থ। এ দুটির পুরোটাই উদ্ধার করা গেছে এবং মুদ্রিতও হয়েছে। নঞ্বাদব্যাখ্যা, বৌদ্ধাধিকারদীধিতিটীকা এবং কুসুমাঞ্জলিটীকাও গদাধরের রচনা। গদাধর অনেকগুলি বাদগ্রন্থও রচনা করেন যেগুলির মধ্যে শক্তিবাদ, মুক্তিবাদ, ব্যুৎপত্তিবাদ, বিষয়তাবাদ ও বিধিস্বরূপ বিখ্যাত। এছাড়া ঋগ্বেদোক্ত দশকর্মপদ্ধতি  ও কাব্যপ্রকাশটীকাও গদাধরের রচনা। গদাধরের গুরু হরিরাম তর্কবাগীশও ন্যায়শাস্ত্রে পান্ডিত্যের জন্য ‘জগ্দগুরু’ বিশেষণে ভূষিত হয়েছিলেন। মঙ্গলবাদ, প্রামাণ্যবাদ, বিধিবাদ, অপূর্ববাদ ইত্যাদি তাঁরই রচনা।

গদাধরের সঙ্গেই বাঙালির নব্যন্যায়ের টীকা-ভাষ্যের যুগ শেষ হয়। তাঁর পরবর্তী যুগকে বলা হয় পত্রিকা যুগ। এই পত্রিকাগুলির বিষয়বস্ত্ত হলো মথুরানাথ, জগদীশ ও গদাধরের রচনা বিশ্লেষণ করে নানারকম অনুপপত্তি উত্থাপনপূর্বক সেগুলির সমাধানের চেষ্টা করা। বহু নৈয়ায়িক বিবিধ পত্রিকা রচনা করে তাঁদের ক্ষুরধার বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জয়দেব তর্কালঙ্কার, শ্রীকৃষ্ণ সার্বভৌম (১৮শ শতক), বিশ্বনাথ ন্যায়ালঙ্কার (১৮শ শতক), শিবরাম বাচস্পতি, জয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্য, শঙ্কর তর্কবাগীশ, কৃষ্ণকান্ত বিদ্যাবাগীশ, সাধনচন্দ্র তর্কসিদ্ধান্ত, গোলোকনাথ ন্যায়রত্ন (১৮০৭-১৮৫৫), হরিনাথ তর্কসিদ্ধান্ত, জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন (১৬৯৪-১৮০৭), দুলাল তর্কবাগীশ (১৭৩১-১৮১৫), রাধামোহন বিদ্যাবাচস্পতি (১৮শ শতক), কালীশঙ্কর সিদ্ধান্তবাগীশ (১৭৮১-১৮৩০) প্রমুখ।

বহু বাঙালি নৈয়ায়িক কাশীতে গিয়ে বসবাস করেন এবং কাশীর ন্যায়চর্চাকে মহিমান্বিত করেন। তাঁদের মধ্যে প্রগল্ভাচার্য (আনু. ১৪১৫-?), শ্রীমান ভট্টাচার্য, বলভদ্র মিশ্র (১৬শ শতক),  পদ্মনাভ মিশ্র (১৬শ শতক), রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (ইনি রঘুনাথের সাক্ষাৎ শিষ্য ছিলেন), রঘুনাথ বিদ্যালঙ্কার (আনু. ১৬শ শতক), রুদ্র ন্যায়বাচস্পতি (১৬শ শতক), বিশ্বনাথ সিদ্ধান্তপঞ্চানন (১৬শ-১৭শ শতক), গৌরীকান্ত সার্বভৌম (১৬শ শতক), রঘুদেব ন্যায়ালঙ্কার (১৭শ শতক), জয়রাম ন্যায়পঞ্চানন (১৭শ শতক), রামচন্দ্র সিদ্ধান্তবাগীশ (১৭শ শতক) প্রমুখ  প্রধান ছিলেন। [মৃণালকান্তি গঙ্গোপাধ্যায় এবং নির্মাল্যনারায়ণ চক্রবর্তী]

গ্রন্থপঞ্জি  দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, বাঙালীর সারস্বত অবদান, কলকাতা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ্, ১৯৫৮; ফণীভূষণ তর্কবাগীশ, ন্যায় পরিচয়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ্, ১৯৮৬।