নৃত্যগোষ্ঠী


নৃত্যগোষ্ঠী নৃত্যকলা চর্চাবিষয়ক সংগঠন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে, বিশেষত ঢাকায় সাহিত্য-সঙ্গীত চর্চার পাশাপাশি নৃত্যচর্চাও বিশেষ গুরুত্ব পায়। সে সময়  বুলবুল চৌধুরীগওহর জামিল, সাজেদুর রহমান, মৃন্ময় দাশগুপ্ত প্রমুখ শিল্পী নৃত্যচর্চায় এগিয়ে আসেন। ১৯৪৭ সালে গওহর জামিল প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন ‘শিল্পকলা ভবন’ নামে একটি নৃত্য প্রতিষ্ঠান। বুলবুল চৌধুরীও একটি দল গঠন করেন। রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আত্মসংস্কৃতির বিকাশকল্পে উৎসাহিত হয়ে এবং রক্ষণশীল সমাজের ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে তখন লায়লা সামাদ, রোকেয়া কবির,  রওশন জামিল প্রমুখ মহিলা শিল্পীও নৃত্যচর্চায় এগিয়ে আসেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় মঞ্চস্থ হয় শকুন্তলা, মেঘদূত প্রভৃতি নৃত্যনাট্য। ১৯৫৪ সালে বুলবুল চৌধুরীর মৃত্যু হলে পরের বছর তাঁর স্মরণে প্রতিষ্ঠিত হয়  বুলবুল ললিতকলা একাডেমী (বাফা)। ১৯৫৯ সালে গওহর জামিল প্রতিষ্ঠা করেন  জাগো আর্ট সেন্টার এবং ১৯৬৩ সালে ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়ত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঢাকায় সংস্কৃতিচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এর পর থেকে বিবিধ প্রকার নৃত্যের চর্চার জন্য একের পর এক প্রতিষ্ঠিত হয় আরও কয়েকটি নৃত্যসংগঠন। বিশেষ কয়েকটি সংগঠন হলো:

কথাকলি  ১৯৭১ সালে আলপনা মুমতাজ পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে গাইড হাউজ প্রাঙ্গণে এর যাত্রা শুরু হয়। মার্চ মাসে  মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় দীর্ঘসময় এর কার্যক্রম বন্ধ থাকে, পরে আবার শুরু হয়। উচ্চাঙ্গনৃত্যের চর্চাকে সামনে রেখে গোষ্ঠীটি ছাত্র-ছাত্রীদের নৃত্য শিক্ষা দেয় এবং মঞ্চে পরিবেশন করে। এ পর্যন্ত ২০০ জন ছাত্র-ছাত্রী কথাকলি থেকে উচ্চাঙ্গনৃত্যে শিক্ষালাভ করেছেন। চন্ডালিকা, জনতা যেখানে, সবার ওপরে মানুষ সত্য, উত্তরণের দেশে, নকল সাজে সাজতে মানা, বিদ্রোহী নজরুল, কাবেরী নদীর নীরে, ভানুসিংহের পদাবলী ইত্যাদি  নৃত্যনাট্য ও খন্ডনৃত্য এর উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা। এছাড়া গোষ্ঠীটি বছরে নৃত্যবিষয়ক একটি সংকলন/স্মরণিকাও প্রকাশ করে।

ক্রান্তি  ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যারিস্টার হাসান পারভেজ ও সাংবাদিক কামাল লোহানী ছিলেন যথাক্রমে এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এটি একটি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন। স্বাধীনতাপূর্ব গণআন্দোলনে ক্রান্তি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এই সংগঠনের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার মধ্যে আমানুল হক নির্দেশিত ও শহীদ  আলতাফ মাহমুদ সুরারোপিত জ্বলছে আগুন ক্ষেতে খামারে, এই পথে অভ্যুদয়, দিগন্তে নতুন সূর্য, হরতাল প্রভৃতি গণজাগরণমূলক নৃত্যনাট্য দর্শকদের দ্বারা সমাদৃত হয়েছে।

জাগো আর্ট সেন্টার ১৯৫৯ সালে গওহর জামিল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন মীর কাশেম খান এবং পরে গওহর জামিল নিজে। সুদীর্ঘ চার দশক যাবৎ বিরামহীনভাবে জাগো আর্ট সেন্টার বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছে। নৃত্যশিক্ষা ও পরিবেশনা উভয় ক্ষেত্রেই জাগো আর্ট সেন্টার সফলতা অর্জন করেছে। আনারকলি, ওমর খৈয়ম, হাফিজের স্বপ্ন, মায়ের মুক্তি, সামান্য ক্ষতি, বাংলার নারীর হূদয়, প্রশ্ন সহ অসংখ্য নৃত্যনাট্য ও খন্ডনৃত্য পরিবেশন করেছে জাগো আর্ট সেন্টার। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি নৃত্যশিক্ষার কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘকাল রওশন জামিল এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন।  এই সেন্টারের শিল্পিবৃন্দ নৃত্যজগতে প্রভূত সুনামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।

দিব্য  ১৯৯১ সালে দীপা খন্দকার ও আলী আসগর খোকন এটি প্রতিষ্ঠা করেন। নৃত্য পরিবেশনার পাশাপাশি দিব্য নৃত্য শিক্ষারও ব্যবস্থা রেখেছে। শুরু থেকেই দীপা খন্দকার এর নৃত্য শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই দিব্য এদেশের বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন স্থানে, এমনকি রাজপথেও নানাবিধ অনুষ্ঠান করে দিব্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শূন্য এ বুকে, নিমন্ত্রণ, ভানুসিংহের পদাবলী, নক্সী কাঁথার মাঠ, স্বাধীনতা গোলাপ ফোটানো দিন ইত্যাদি এর উল্লেখযোগ্য পরিবেশনা। সংগঠনটি বাংলাদেশের নৃত্য জগতে অনন্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

ধ্রুপদ কলাকেন্দ্র  ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক কমল সরকার। এখানে প্রধানত ভরতনাট্যম ও  মণিপুরী নৃত্য শিক্ষা দেওয়া হয়। কেন্দ্রের নৃত্যশিক্ষক শুক্লা সরকার। তাঁর নেতৃত্বে ভরতনাট্যম প্রভূত প্রসার লাভ করেছে এবং জনগণের কাছে সমাদৃতও হয়েছে। তারা নিয়মিত বিভিন্ন মঞ্চে নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে ধ্রুপদ নৃত্যের চর্চাকে বিকশিত করছে। ধ্রুপদ কলাকেন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভানুসিংহের পদাবলী, চিত্রাঙ্গদা, মৈয়মনসিংহ-গীতিকার সোনাই মাধব সহ বহু নৃত্যনাট্য সফলতার সঙ্গে মঞ্চায়ন করেছে এবং করছে।

নটরাজ  ১৯৯০ সালে লায়লা হাসান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মূলত নৃত্য সংগঠন হলেও এর একটি নাট্য বিভাগও রয়েছে। দর্শনীর বিনিময়ে নটরাজ প্রায় প্রতিমাসে নৃত্যনাট্য, নৃত্যানুষ্ঠান ও নাটক পরিবেশন করে। এ সংগঠনটি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নৃত্যশিল্পীদের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একবার নৃত্য পরিবেশন নিষিদ্ধ করা হলে সেই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে নটরাজই প্রথম সেখানে বিজয় দিবস পালন করে। এর শিল্পিবৃন্দ রাজপথ, সড়কদ্বীপ, ভ্রাম্যমাণ ট্রাক, বটতলা, বকুলতলা ইত্যাদি মুক্তমঞ্চে নৃত্য ও নাট্যানুষ্ঠান পরিবেশন করে থাকে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত প্রমুখ বরেণ্য কবির নৃত্যনাট্যসহ মুক্তিযুদ্ধ,  ভাষা আন্দোলন, নারীমুক্তি আন্দোলন, নারীহত্যা, শিশু অধিকার, মানবাধিকার, বীরাঙ্গনা, মহিয়সী নারী, বন্যাত্রাণ ইত্যাদি বিষয়ে রচিত নৃত্যনাট্য পরিবেশন করে নটরাজ জনগণকে এসব বিষয়ে সচেতন ও অনুপ্রাণিত করে তুলছে।

বাংলাদেশ ব্যালে ট্রুপ  ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক আমানুল হক অদ্যাবধি একই দায়িত্ব পালন করছেন। এটি একটি নৃত্য সংগঠন ও স্কুল। এর উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার মধ্যে আমানুল হক নির্দেশিত আমার স্বদেশ আমার ভালবাসা, কুসুমের স্বপ্ন ও ব্যাটল অফ বাংলাদেশ নৃত্যনাট্য দর্শকনন্দিত হয়েছে। এটি নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রদর্শনের মাধ্যমে দর্শকদের ভূয়সী প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন।

বেণুকা  ১৯৮০ সালের মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পূর্ব নাম ছিল বেণুকা ললিতকলা কেন্দ্র। মোহাম্মদ গোলাম মুস্তাফা খান ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক এবং অধ্যক্ষ। নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতি দুবছর পরপর এর নির্বাহী কমিটি গঠিত হয়। বর্তমানে সংগঠনের সভাপতি হচ্ছেন আবু সালেহ। এছাড়া ২৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি কার্যকরী কমিটি এবং ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা কমিটিও রয়েছে। বেণুকা নৃত্য ছাড়াও গান ও চিত্রকলাও শিক্ষা দেয়। লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি বয়েজ স্কুলে সপ্তাহে দুদিন বেণুকার ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। বেণুকা  নৃত্যনাট্য বেণুকার সুর, হ্যামিলনের বংশীবাদক, বাংলাভাষা আমাদের বাংলাভাষা, বিশ্বভরা প্রাণ, রক্তলাল অহংকার ছাড়াও অসংখ্য খন্ডনৃত্য মঞ্চায়িত করেছে। খন্ডনৃত্যের মধ্যে শিল্পীর স্বপ্ন, বৃষ্টি আমার বৃষ্টি, তুমি সুন্দর হে বিদ্রোহী, সাহারার সুন্দরী, অভ্যুদয়, চর দখল, বাশরীয়া, কৃষানীর স্বপ্ন, জেলে সাপুড়ে, বেদে-বেদেনী উল্লেখযোগ্য। বেণুকা তার বিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতা অবলম্বনে একটি নৃত্যনাট্য পরিবেশন করে ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। নৃত্যের পাশাপাশি বেণুকা প্রতিবছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একটি সংকলনও প্রকাশ করে।  [লায়লা হাসান]

আরও দেখুন  নৃত্যকলা; নৃত্যনাট্য