নূনিয়া


নূনিয়া বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে বসবাসরত একটি জনগোষ্ঠি। এরা মৌলভীবাজার জেলাস্থ চা বাগানের চা শ্রমিক। এদের আদিনিবাস কোথায় এ কথা স্পষ্টভাবে জানা না গেলেও অনেকেই অনুমান করেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত সংলগ্ন বিহারের পূর্বাঞ্চলই ছিল এদের আদিনিবাস, সেখান থেকে তাদের পূর্বপুরুষের দলটি সহজলভ্য জীবিকার সন্ধানে বর্তমান বাংলাদেশের সমভূমিতে প্রবেশ করে এবং কৃষিকাজকে জীবিকার মাধ্যম হিসাবে বেছে নেয়। পরবর্তীকালে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল ও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে চা বাগানের পত্তন শুরু হলে নূনিয়ারা চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে যোগদান করে। চা বাগানের বাইরে এদেরকে দেখা যায় না এবং অন্য কোন পেশাতেও তাদের যোগদান দেখা যায় না। বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থানাধীন মাধবপুর, আলীনগর, আদমপুর প্রভৃতি চা বাগানে প্রায় দু’হাজারের মতো নূনিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা চা শ্রমিক হিসাবে জীবিকা নির্বাহ করছে।

নূনিয়ারা ধর্মবিশ্বাসে সনাতনপন্থী হিন্দু। পুরুষেরা পরিবার এবং সমাজে মূল ভূমিকা পালন করে। পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারীও পরিবারের ছেলে সন্তানদের উপর বর্তায় এবং এক্ষেত্রে পরিবারের মেয়েরা পারিবারিক সম্পত্তির কিছুই লাভ করে না। পরিবার প্রধান হিসাবে পিতাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করে থাকে। নূনিয়ারা বর্ণাশ্রমে বিশ্বাসী এবং তারা নিজেদেরকে শূদ্র বর্ণের বলে দাবি করে এবং সেভাবেই তারা মূল স্রোতধারার হিন্দুসমাজের সঙ্গে মিশে আছে। নূনিয়া সমাজে এখনও যৌথ পরিবার প্রথা চালু রয়েছে এবং পরিবারে পিতার অবর্তমানে জ্যেষ্ঠভ্রাতাই পরিবারের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে। নূনিয়া সমাজে অভিভাবকরাই বিবাহের প্রস্ত্ততি গ্রহণ এবং হিন্দু বিবাহ সম্পন্ন করে। বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যবস্থাও নূনিয়া সমাজে বিদ্যমান এবং পরস্পরের সম্মতিক্রমে বিবাহ বিচ্ছেদ গ্রহণ করা যায়। বিচ্ছেদপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পূনর্বিবাহ করতে পারে। তাদের সমাজে বিধবা বিবাহেরও প্রচলন আছে।

নূনিয়াদের প্রধান ভাষা বাংলা এবং বাংলা ভাষার মাধ্যমেই বিদ্যালয়ের পাঠগ্রহণ করে। নিজেদের মধ্যে তারা এক ধরনের বিকৃত হিন্দী ভাষা ব্যবহার করে থাকে, যেটিকে অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর লোকজনেরা পশ্চিমা ভাষা নামে বলে থাকে।

নূনিয়াদের প্রধান খাদ্য ভাত এবং রুটি। এর সঙ্গে মাছ, মাংস, শাকসব্জি, ডাল খেতে পছন্দ করে। দুধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্যসামগ্রীও তারা পছন্দ করে এবং মহিলারা দুধের ক্ষীর, পরমান্ন প্রভৃতি রান্নায় সিদ্ধহস্ত। নূনিয়া সমাজে চা পানের প্রচলনও ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। তামাক-বিড়ির পাশাপাশি তারা পান-সুপারি ব্যবহারেও অভ্যস্থ। তাদের মধ্যে মদ্যপান প্রচলিত আছে।

নূনিয়া সমাজে শিক্ষার হার খুবই কম। বাল্যাবস্থাতেই নূনিয়া ছেলেমেয়েরা চা-বাগানে কাজ করে এবং নিয়মিত বিদ্যালয়গামী হওয়ার সুযোগ তাদের হয়ে উঠে না।

নূনিয়া সমাজে মৃতদেহকে দাহ করা হয়। মৃতের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে নূনিয়ারা অঘোর বা অকুলীন ব্রাহ্মণের সহায়তা নিয়ে থাকে। মৃতব্যক্তির পরিবারে ষোলদিন পর্যন্ত শোকদিবস পালন করা হয়। শোকপালনের শেষদিনে অর্থাৎ ষোলতম দিবসে মৃতব্যক্তির স্মরণে চূড়ান্ত শ্রাদ্ধকর্ম অনুষ্ঠিত হয়।

সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা প্রবীণরা একত্রে বসে সমাধান করে। সাধারণত তারা আইন-আদালতের দ্বারস্থ হতে অপছন্দ করে। ফলে সমাজে যারা প্রবীণ এবং শ্রদ্ধাভাজনরাই সামাজিক কলহবিবাদ, নানাবিধ অশান্তি নিরসনের জন্য এগিয়ে আসে এবং সমাজের সবাই তাদের দেওয়া রায় মেনে নেয়।  [সুভাষ জেংচাম]