নীলকর


নীলকর  ইংল্যান্ডের বস্ত্রশিল্পের প্রয়োজনে নীলের চাহিদা মেটানোর জন্য নীলকরগণ বাংলায় আসে এবং রায়তদেরকে নীল উৎপাদনে প্রণোদিত করে। স্মরণাতীত কাল থেকে ভারত নীলচাষ ও নীল রপ্তানি করত। পশ্চিম ভারত নীল চাষের কেন্দ্র ছিল। সতেরো ও আঠারো শতকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আমেরিকায় উন্নততর নীল উৎপাদিত হতো। আঠারো শতকের শেষ পর্বে এ অঞ্চলের নীলকরগণ নীলচাষ পরিত্যাগ করে অধিক লাভজনক শস্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ইংল্যান্ডের ক্রমবর্ধমান বস্ত্র শিল্পের প্রয়োজনে তখন নীল-এর জন্য বিকল্প উৎসের সন্ধান শুরু হয়। বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এর রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ও বাংলার অনুকূল জলবায়ু ও সহজলভ্য শ্রমশক্তি সে মুহূর্তে ইপ্সিত বিকল্প হিসেবে উপস্থিত হয়।

চন্দননগরে বসতি স্থাপনকারী ফরাসি নাগরিক লুই বোনার্ড হচ্ছেন প্রথম ইউরোপীয় নীলকর, যিনি ১৭৭৭ সালে বাংলায় আসেন। কারেল ব্লিউম আর এক নীলকর, যিনি ১৭৭৯ সালে কলকাতা থেকে ২৫ মাইল দূরে হুগলি জেলার কোন এক জায়গায় একটি নীল কারখানা স্থাপন করেন। ১৭৮৭ সালের ১২ জুলাই গভর্নর জেনারেল-ইন-কাউন্সিলকে লেখা এক পত্রে ব্লিউম বলেন যে, কৃষির উন্নয়ন ও একটি নতুন বাণিজ্যপণ্য উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি ১৭৭৮ সালেই নীল চাষে উদ্যোগী হয়েছিলেন। কোম্পানি সরকার ঠিক এটিই চেয়েছিল। তাছাড়া, সেই মুহূর্তে কোম্পানি কর্তৃক বাংলা দখলের কারণে বাংলার উৎপাদনশিল্প ও কৃষিক্ষেত্র ব্যাপক ধ্বংসের মুখোমুখি হয় ও বাংলার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। অর্থকরী ফসলের ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া কোম্পানির কর্মকর্তা ও প্রাইভেট ব্যবসায়ীদের অর্থ ভারত থেকে ইংল্যান্ডে স্থানান্তর করার জন্যও ইউরোপে বিপণনযোগ্য পণ্যসামগ্রীর প্রয়োজন ছিল। এসব কারণে কোম্পানি বাংলায় নীলচাষ উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। স্থির হয়, কৃষিজীবী রায়তেরা নীলকরদের দ্বারা নির্ধারিত শর্তে নীল উৎপাদন করবে। ইতিপূর্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিছুসংখ্যক প্রাইভেট ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী এসব ব্যবসায়ী কারখানা স্থাপন না করে কোম্পানিকে আগ্রা ও অযোধ্যা থেকে উচ্চমূল্যে নীল সরবরাহ করত। ১৭৮৮ সালে কোম্পানি এ চুক্তি বাতিল করে এবং তৎপরিবর্তে বাংলায় নীলচাষে উদ্যোগী ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রথমদিকে নীলকরদের জমির মালিক হওয়ার সুযোগ ছিল না। তাছাড়া নীলচাষের জন্য পর্যাপ্ত পুঁজিও তাদের ছিল না। জমিদারেরা নীলকরের দালালদের কাছে নীল চাষের জন্য জমি ইজারা দিত। অন্যদিকে কলকাতার এজেন্সি হাউসগুলি উঁচু সুদে নীলকরদের অর্থ সরবরাহ করতো। জমির জন্য জমিদারের উচ্চ হার দাবির কারণে এ দুই পক্ষের মধ্যে অনেকসময় বিরোধ দেখা দিত। ১৮৩৭ সালে সরকার নীলকরদের জমির মালিক হওয়ার সুযোগ দিয়ে আইন পাস করলে এদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

বাঙালি জমিদারদের মতো ইউরোপীয় নীলকরেরাও জমির ক্ষেত্রে নানাবিধ ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধার অধিকারী হয়। জমিদারি ক্ষমতার অধিকারী হওয়াতে রায়তদের উপর নীলকরেরা পূর্ণ কর্তৃত্ব লাভ করে। এর ফলে জমিদাররা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি আশীর্বাদপুষ্ট এক প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর আবির্ভাব দেখতে পায়। রায়তেরাও নীলকরদের নতুন অধিকার ও নতুন ক্ষমতার বিরূপ প্রভাব বুঝতে পারে। নীলকরেরা বলপ্রয়োগ করে রায়তদের নীলচাষে বাধ্য করতো এবং নীল উৎপাদন বৃদ্ধি না করলে কর বৃদ্ধির হুমকি দিত। নীলকরেরা চাষীদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করতো। এভাবে শুরু থেকেই নীলচাষ আর নিপীড়ন-নির্যাতন সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়।

নীলকরদের নির্যাতনের মুখে তাদেরকে প্রতিরোধ করা ছাড়া রায়তদের কোন গত্যন্তর ছিল না। রায়তেরা নীলচাষ করতে অস্বীকার করে এবং প্রশাসনের কাছে নীলকরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব অভিযোগে কোন ফল হতো না, কারণ স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটগণ ছিলেন নীলকরদের বন্ধু; ক্ষেত্রবিশেষে নীলকরেরা নিজেরাই অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ পেত।

১৮৫৯ সালে বাংলার রায়তেরা নীলচাষ ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলনের মুখে সরকার ১৮৬০ সালে নীলচাষ ব্যবস্থা তদন্ত করে দেখার জন্য ‘ইনডিগো কমিশন’ বা নীল কমিশন গঠন করে। কমিশন কর্তৃক নীলচাষের স্বরূপ উদ্ঘাটনকারী রিপোর্ট প্রকাশের পর ইউরোপীয় নীলকরদের অনেকেই বাংলা ছেড়ে বিহারমুখী হয়। [নূরুল হোসেন চৌধুরী]