নিজেরা করি


নিজেরা করি  একটি বেসরকারি সংস্থা। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিতে গ্রামের অনেক মহিলার খাদ্য ও কাজের খোঁজে শহরে অভিবাসনের প্রেক্ষাপটে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। দুস্থ মহিলাদের পুনর্বাসনের কার্যক্রম নিয়ে এই সংস্থাটি কাজ শুরু করে। সংস্থাটি সে সময় মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীদের সমন্বয়ে বিভিন্ন টিম গঠন করে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের ধারণা হয় যে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবাভিত্তিক পদক্ষেপ তাদের ক্লায়েন্টদের মধ্যে এক ধরনের পরনির্ভরশীলতা সৃষ্টি করছে। এই প্রবণতার বিপরীতে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে একটি দারিদ্র্যমুক্ত আত্মনির্ভরশীল সমাজ প্রতিষ্ঠাকে সংস্থাটি এর মূল লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজেরা করি সংস্থাটি জনগণকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলছে এবং সমষ্টিগত শক্তি অর্জনে তাদেরকে সহযোগিতা করে আসছে। সংস্থাটির উদ্দেশ্য হচ্ছে যেসব নারী-পুরুষ কায়িক শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে তাদেরকে সহযোগিতা করা। ভৌগোলিকভাবে গ্রামই হচ্ছে এই সংস্থার কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু।

বর্তমানে এই সংস্থার মোট সদস্য সংখ্যা ১৯২৬৬৭, যাদের অর্ধেকই নারী। সংস্থার প্রধান কার্যালয়ের কর্মীসংখ্যা ৩৪ এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মীসংখ্যা ৩০৬ জন। কর্মীদের এক-তৃতীয়াংশ মহিলা। ১৮টি জেলায় পরিচালিত গ্রামীণ উন্নয়নই এর মূল কর্মসূচি। সংস্থাটি যেসব গ্রামীণ জনগণকে একতাবদ্ধ করে তারা বহুদিন থেকেই বঞ্চনা, নিপীড়ন, শোষণ ও দারিদ্রে্যর শিকার। সংস্থাটি জনগণকে তাদের অধিকার ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন করে এবং একটি অর্থবহ ও উন্নততর জীবন সৃষ্টিতে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে থাকে।

নিজেরা করি সংস্থা তৃণমূল পর্যায়ের ভূমিহীন নারী-পুরুষদের সংগঠিত করে এবং বিভিন্ন ধরনের কর্মশালা, দলগত সভা, প্রতিনিধিত্বমূলক সভা, যৌথসভা ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করে। সামাজিক অন্যায়-অবিচার, নারী নির্যাতন ইত্যাদির বিরুদ্ধেও সংস্থাটি সোচ্চার।

গ্রাম, ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে সংস্থাটি ভূমিহীন সমিতি গঠন করে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে কমিটি তৈরির মাধ্যমে স্থানীয় নেতৃত্ব উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, পুকুর লিজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ নিশ্চিত করে সংস্থাটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে থাকে।

দুই বছরের জন্য নির্বাচিত ১৩ সদস্যের পরিচালনা কমিটি সংস্থাটির কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই কমিটি একজন সমন্বয়কারীকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে থাকে। এক বছর পরপর সংস্থাটির কর্মী কনভেনশন ও কর্মী কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কর্মীদের সাধারণ সভায় তারা তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম আলোচনা করে, নিজেদের দুর্বলতা (যদি থাকে) চিহ্নিত করে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এবং পরবর্তী দুই বছরের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করে। কেন্দ্রীয় সংস্থা এবং প্রশিক্ষণ সেলের জন্য ৬ জন প্রতিনিধিকেও তারা নির্বাচন করে।

নিজেরা করি সংস্থার কোন উপার্জনমূলক কার্যক্রম নেই। দাতাগোষ্ঠীর চাঁদাই হচ্ছে সংস্থাটির তহবিলের একমাত্র উৎস। বর্তমানে বাংলাদেশের ১৭টি জেলায় ভূমিহীন জনগণের জন্য সংস্থাটি গ্রামীণ উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। ২০০৮ সালের মার্চ মাসে এর সদস্য সংখ্যা ছিল ২,৭৫,৭৮২ জন যার মধ্যে অর্ধেকই ছিলেন মহিলা। এ সময় সংস্থাটিতে ৩৪৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন যার মধ্যে পুরুষ ও নারীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২২২ ও ১২৬ জন। নারী-পুরুষ মিলে স্টাফ সহকারি সংখ্যা ১১১।  [শামসুল হুদা]