নারীবাদ


নারীবাদ  ১৮৮০ সালে বৈশ্বিক আন্দোলন হিসেবে ফ্রান্সে, ১৮৯০ সালে যুক্তরাজ্যে এবং ১৯১০ সালে  যুক্তরাষ্টে নারীবাদ শব্দটির প্রচলন হয়। নারীবাদ হলো নারী ও পুরুষের মধ্যকার সমতার একটি মতবাদ, যাতে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য বিস্তার রোধে নারীদের সংগঠিত হওয়ার উপর এবং সামাজিক জীব হিসেবে সমঅধিকার ও দায়িত্বের ভিত্তিতে নারী-পুরুষের জন্য সমাজকে নিরাপদ আবাসস্থলে রূপান্তরিত করার উপর গুরুত্ব দেয়। নারীবাদ মতাদর্শ হলো নারীরা রাজনৈতিক, সামাজিক, লৈঙ্গিক, বৌদ্ধিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে  পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবে। নারীবাদের কর্মকান্ড বৃহৎ পরিসরে নারীদের অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত। নারী যেখানে বৈষম্যের শিকার, পুরুষের অধস্তন, সেখানে নারীবাদ এ অবস্থার পরিবর্তন সাধনে পরিচালিত। নারী আন্দোলনকারীরা নারীর আইনগত অধিকার (চুক্তির অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, বৈবাহিক অধিকার, ভোটাধিকার), দৈহিক স্বাধীনতা ও অখন্ডতা রক্ষার অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা, প্রজনন অধিকার (যথেচ্ছা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করার অধিকার, সন্তানের সংখ্যা নির্ধারণের অধিকার, উন্নতমানের প্রসূতি চিকিৎসা লাভের অধিকার) অর্জনের জন্য, পারিবারিক সহিংসতা, শারীরিক ও মানসিক হয়রানি ও নিগ্রহ থেকে নারী ও কিশোরীর নিরাপত্তার জন্য; সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য, বেসরকারি খাতে চাকরিক্ষেত্রে, ব্যবসা বানিজ্যে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য; কর্মস্থলে নারীর অধিকার, যার মধ্যে মাতৃত্ব ছুটি, সমান মজুরি ও বেতন প্রভৃতি অন্তর্ভূক্ত; সকল মানবাধিকার লাভ করার সুযোগ নিশ্চিত করা, এবং শিক্ষার সকল স্তরে নারীর অধিকার  নিশ্চিত করার প্রতি গুরুত্ব দেয়। বস্ত্তত যেখানে নারীর প্রতি বৈষম্য বিদ্যমান, নারী আন্দোলনকারীরা সেসব জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্যের প্রতি গুরুত্ব দেয়।

নারীবাদী আন্দোলন পশ্চিমা বিশ্বে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, ভোটদানের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, শ্রম অধিকার ও কাজের জন্য পুরুষের সমান মজুরি ও বেতন লাভের অধিকার; বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার, প্রজনন অধিকার (জন্মনিয়ন্ত্রণ ও গর্ভপাতের অধিকার) এবং সর্বোপরি সম্পত্তির অধিকার লাভ করা। এতদসত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, নারী-পুরুষ অসমতা ও বৈষম্য কেবলমাত্র উন্নয়নশীল বিশ্বে নয়, উন্নত বিশ্বেও প্রচলিত রয়েছে।

নারীবাদী আন্দোলন তিনটি ধারায় পরিচালিত হয়েছে। নারীবাদের প্রথম ধারাটি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে সক্রিয় ছিল। এ পর্যায়ে বৈবাহিক চুক্তিতে সমঅধিকার এবং সম্পত্তি লাভ ও ভোগ করার অধিকার অর্জনের দাবি উত্থাপনের মাধ্যমে প্রথম ধারা যাত্রা শুরু করে। তবে উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ প্রধান দাবিতে পরিণত হয় এবং নারীবাদী আন্দোলন নারীর ভোটাধিকারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। ঐ আন্দোলনে  যুক্তরাজ্যে গৃহসম্পত্তির মালিক ত্রিশোর্ধ মহিলারা ১৯১৮ সালে ভোটাধিকার অর্জন করে। ১৯২৮ সালে ২১ বছরের ঊর্ধ্বে সকল নারী ভোটাধিকার লাভ করে। ভোটাধিকার প্রাপ্তি প্রথম ধারার নারীবাদের উল্লেখযোগ্য অর্জন।

দ্বিতীয় ধারায় এসে নারীবাদী আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে সকল বৈষম্য দূর করে সমতা প্রতিষ্ঠা নারীবাদের লক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয়। দ্বিতীয় ধারার নারীবাদের মধ্যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয় যে, সাংস্কৃতিক অসমতা ও রাজনৈতিক অসমতা পরস্পর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এই বিশ্বাসে উজ্জীবিত হয়ে তারা সকল নারীকে বোঝাতে সচেষ্ট হন যে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তার ক্ষমতার কাঠামোয় নারীর ব্যক্তিগত জীবনকে পুরুষের চাহিদা মতো গড়ে তুলেছে। এই অনুভূতি থেকে জন্ম নেয় দ্বিতীয় ধারার নারীবাদী শ্লোগান ‘যা ব্যক্তিগত তা-ই রাজনৈতিক’।

১৯৬৩ সালে বেটি ফ্রাইডেন  তাঁর The Feminine Mystique  গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এ গ্রন্থে তৎকালীন কলেজ-শিক্ষিত নারীদের অসন্তোষ ও স্বপ্নভঙ্গকে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেসব শিক্ষিত নারী আশানুরূপ চাকরি পাননি তাদের গৃহের কাজে (রান্না করা ও ঘরগোছানোর কাজ) বাধ্য করা হয়েছে। বেটি ফ্রাইডেন  নারীর জীবনে পরিপূর্ণতা আসে ‘সন্তান প্রতিপালনে এবং গৃহকর্ম সম্পাদনে’, এ মতাদর্শের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর মতে নারী একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস ব্যবস্থার শিকার, যে ব্যবস্থা নারীকে স্বামী ও সন্তানের মাঝে নিজ জীবনের পরিচয় ও অর্থ খুঁজতে বাধ্য করে এবং নারীকে পরিবারের পরিচিতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজের পরিচিতি বিসর্জন দিতে বাধ্য করে। সমাজে নারীর ভূমিকার এই নতুন ব্যাখ্যা নারীমুক্তি আন্দোলনের পথ দেখায় এবং ‘মুক্তি’ নারীর আকাঙ্খার  রূপায়ন হিসেবে পরিগণিত হয়। ‘নারীমুক্তি’ শ্লোগানটি প্রথম ব্যবহূত হয় ১৯৬৪ সালে। ১৯৬০ এর দশক থেকে নারীমুক্তি আন্দোলন সমতার দাবি তোলে। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল পুরুষের সমান পারিশ্রমিক, পুরুষের সঙ্গে সমান আইনগত অধিকার, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের স্বাধীনতা ইত্যাদি। নারীমুক্তি আদর্শের সঙ্গে যে সকল বিষয় জড়িত হয়, তার মধ্যে রয়েছে দেহের অখন্ডতা, স্বাধীনতা ও চলাফেরার অধিকার; সার্বজনীন ভোটাধিকার; সরকারি পদলাভের অধিকার; কাজ করার অধিকার: ন্যায্য ও সমান বেতনের অধিকার; সম্পত্তির মালিকানা; শিক্ষা; সামরিক বাহিনীতে কর্ম; আইনগত চুক্তি করার অধিকার; সর্বোপরি, বৈবাহিক, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব ও ধর্মীয় অধিকার। যদিও নারী মুক্তি প্রত্যয়টি জনমনে গৃহীত হয়েছে, তথাপি নারী আন্দোলন প্রত্যয়টি নারীমুক্তি প্রত্যয়ের সমার্থক হিসাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও বিভিন্ন দেশে ব্যবহূত হয়। দ্বিতীয় ধারার নারীবাদের দুটি মূল শ্লোগান হলো ‘যা ব্যক্তিগত তা-ই রাজনেতিক’ এবং ‘নারীমুক্তি’।

তৃতীয় ধারা শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকে। দ্বিতীয় ধারার নারীবাদে শ্বেতাঙ্গ নারীদের প্রতিচ্ছবি রূপায়ন করাকে তৃতীয় ধারার নারীবাদ চ্যালেঞ্জ করেছে এবং ঐ ধারার মধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গ নারীর অভিজ্ঞতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ এবং শ্বেতাঙ্গ মহিলার অভিজ্ঞতাকে বিশ্বজুড়ে সকল নারীর অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করার প্রবৃত্তিকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখান করেছে। দ্বিতীয় ধারার মতবাদের বিরোধিতা এসেছে মূলত পূর্বের উপনিবেশ ও তৃতীয় বিশ্ব থেকে। তৃতীয় ধারার নারীবাদ বিশ্বাস করে যে, ঔপনিবেশিক পাশ্চাত্য দেশগুলোর হাতে বর্ণগত, শ্রেণিগত ও নৃগোষ্ঠীগত শোষণ ঔপনিবেশিকউত্তর সমাজে নারীকে প্রান্তিক করে রেখেছিল। এ ধারা মতে, ঔপনিবেশিক সমাজে পিতৃতন্ত্রই জেন্ডার বৈষম্যর একমাত্র কারণ নয় বরং ঐ সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্যের অন্যতম কারণ হলো উপনিবেশবাদ। ঔপনিবেশিকউত্তর নারীবাদীরা উপমহাদেশের শিক্ষিত নারীদের নিস্ক্রিয় ও নির্বাক প্রতিরূপ এবং পশ্চিমা আধুনিক শিক্ষিত এবং ক্ষমতাশীল নারীর চিত্রকে সমালোচনা করেন। তৃতীয় ধারার নারীবাদ মূলত স্থান ও সংস্কৃতি ভেদে নারীদের পরস্পর থেকে ভিন্ন বলে মনে করে।

তৃতীয় বিশ্বের নারীবাদীরা ‘আত্মপরতন্ত্র বর্ণবাদ, শ্রেণিবাদ, জাতিবিদ্বেষ’ এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নারীদের বিচিত্র অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করার জন্য পশ্চিমা নারীবাদীদের সমালোচনা করে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে যে নারীবাদ বিকাশ লাভ করেছে, পশ্চিমা নারীবাদীরা সে নারীবাদকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করায় সমালোচিত হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ নারীবাদ অ-শ্বেতাঙ্গ বিশ্বের নারীদের সমস্যা বুঝতে পারে নি। বাংলাদেশে বেগম রোকেয়ার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে নারীবাদী অভিজ্ঞতার উদ্ধৃতি দেওয়া যায়, যা পশ্চিমা নারীবাদী অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন। এখন ক্রমেই উপলব্ধি জোরদার হচ্ছে যে, পাশ্চাত্যের চাপিয়ে দেয়া মডেল দিয়ে নয়, প্রত্যেক দেশ ও প্রত্যেক অঞ্চলকে নিজ নিজ সমাজের সাংস্কৃতিক মডেলের আওতায় নির্যাতন, অসমতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজস্ব সংগ্রাম ও আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে।

তৃতীয় ধারার নারীবাদের মূল যুক্তি হলো নারীরা বর্ণ, জাতি, দেশ, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন। তৃতীয় ধারার নারীবাদ সকল স্ববিরোধিতা ও দ্বন্দ্বকে গ্রহণ করে এবং সকল বৈচিত্র্য ও পরিবর্তনকে স্থান করে দেয় এবং নারীর জন্য কি মঙ্গলকর, কি মঙ্গলকর নয়, সে সম্পর্কে দ্বিতীয় ধারার মডেলকে চ্যালেঞ্জ করে। উন্নত ও উন্নয়নশীল সমগ্র বিশ্বে স্কুল কলেজে মেয়েদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, তারা শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করছে, তারা শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করছে। তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করছে, পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে। চলাফেরার স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশ নিচ্ছে। তারা বিচিত্র অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে বিগত দশকের নারীবাদের মতাদর্শকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তারা সত্তর দশকের নারীবাদীদের বিশ্বাস ও কর্মকান্ডকে অনুসরণ করতে সম্মত নয়। নতুন অর্জিত স্বাধীনতা তাদের অতীতের অবস্থায় আবদ্ধ থাকতে সম্মত নয়। তারা অগ্রসর হতে চায় এবং স্বাধীন নারী প্রজন্মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা নতুন ও অভিনব পরিপূর্ণতা লাভ করতে চায়। তৃতীয় ধারার নারীবাদের আর একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে সহিংসতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। তৃতীয় ধারা পারিবারিক সহিংসতা এবং কর্মস্থলে হয়রানির বিরোধিতা করে।

জাতিসংঘ-ব্যবস্থায় নারীবাদ নারীবাদী আন্দোলন জাতিসংঘ কর্তৃক সমর্থিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে।  ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ নারীদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহবান করেছে। মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব সম্মেলনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৭৫-১৯৮৪ পর্যন্ত জাতিসংঘ নারী উন্নয়নের দশক হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ  সম্মেলন ও দশকব্যাপী কর্মকান্ডের দরুন পরবর্তী সময়ে কোপেন হেগেন (১৯৮০) ও নাইরোবিতে (১৯৮৫) অনুষ্ঠিত সম্মেলনে নারী উন্নয়নের বৃহৎ সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং নারীর লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়। এ সব সম্মেলনের ফলে বিশ্বব্যাপী নারীরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, নারীবাদ একটি অভিন্ন ও সমসত্ত্ব মতবাদ নয়; নারীবাদে বিভিন্ন অঞ্চল, শ্রেণি, জাতি ও দেশের নারীর ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ও উদ্বেগকে স্বীকার করতে হবে এবং মূল্য দিতে হবে। নারীর বিভিন্ন চাহিদা ও উদ্বেগের প্রতি সাড়া দিয়ে নারীবাদকে বৈচিত্র্য প্রাধান্য দিতে হবে এবং এর বিভিন্নতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

১৯৯৫ সালে বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বিশ্ব নারী সম্মেলনে প্লাটফর্ম অফ অ্যাকশন (পিএফএ) নামে কর্মপন্থা স্বাক্ষরিত হয়, যাতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ‘জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন’-এর লক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলের নাম দেয়া হয় ‘জেন্ডারকে মূলধারায় আনয়ন’, যার অর্থ হলো সকল নারী ও পুরুষ ‘পূর্ণ মানবাধিকার অর্জনের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে এবং জাতীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগও লাভ করবে।’ এরই প্রেক্ষাপটে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নারীর প্রতি সকল ধরণের বৈষম্য বিলোপের সনদ (সিডও) গৃহীত হয় (১৯৭৯) এবং নারীর জন্য আন্তর্জাতিক  মানবাধিকার বিল আকারে ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হয়।

বৈশ্বিক পর্যায়ে গৃহীত উপরোক্ত নীতি ও কর্মকান্ড নারীবাদ ও নারীবাদী আন্দোলনকে জোরদার করেছে। মত পার্থক্য সত্ত্বেও সকল নারী ও নারী তাত্ত্বিকগণ একমত হন যে, নারী বৈষম্য, অসমতা, ও অন্যায়ের শিকার এবং এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম ও আন্দোলন  তাদের ন্যায়সঙ্গত অভিযান, সত্য প্রতিষ্ঠার অভিযান।

২০০৪ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘ মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেতনভূক্ত কর্ম এবং বেতনহীন গৃহকর্মে অংশগ্রহণ করলেও নারীরা গড়ে পুরুষের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর গ্রামাঞ্চলে নারীরা পুরুষের চেয়ে গড়ে ২০ শতাংশ বেশি কাজ করে। ২০০১ সালে জাতিসংঘের প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নারী সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তথ্য প্রদান করা হয় যে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ হলো নারী এবং মোট নারী-পুরুষ মিলিত শ্রমের ৬৬ শতাংশ শ্রম দান করে নারীরা। এতদসত্ত্বেও নারী পায় বিশ্বের মোট আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট সম্পদের মাত্র ০১ শতাংশের মালিক হয় নারী। নারীবাদ এ স্বচ্ছ অসমতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং সকল বৈষম্য দূর করে নারী-পুরুষ সমতা অর্জনের জন্য কাজ করে।

বাংলাদেশে নারীবাদ বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ। সংস্কৃতি, ঐতিহ্য প্রথা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের নারীরা পাশ্চাত্য নারীদের চেয়ে পরস্পর ভিন্ন এবং পাশ্চাত্য নারীর অবয়ব বাংলাদেশী নারীদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং বাংলাদেশী নারীদের জন্য প্রযোজ্যও নয়। পাশ্চাত্যকে যদি নারীবাদের উৎপত্তিস্থল হিসেবে দাবি করা হয়; তবে বাংলাদেশে সহজাত নারীবাদের সৃষ্টি হয়েছে,  যা পাশ্চাত্যের নারীবাদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মনে করতেন নারী সামাজিক জীব; নারীকে নিজের কথা নিজেকে সমস্বরে বলতে হবে, অন্য কেউ নারীর হয়ে বলবে না। রোকেয়া পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না এবং পশ্চিমা নারীবাদ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না; শ্বেতাঙ্গ নারীবাদীদের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল না। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তার সুলতানার স্বপ্ন (১৯২৪) বইয়ে নারী পরিচালিত বৈচিত্র্যপূর্ণ, সমতাভিত্তিক কাল্পনিক নারীবিশ্বের চিত্র তুলে ধরেছেন, যা হবে শোষণ থেকে মুক্ত। অস্তিত্বের জন্য সুলতানার সংগ্রাম এবং নারীমুক্তির জন্য তার কাজ প্রভৃতি ছিল নারীবাদের উদাহরণ। রোকেয়া তার লেখনীর মধ্য দিয়ে সমাজের কুসংস্কার, অবরোধ প্রথার অতিরিক্ত প্রভাব, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, নারী শিক্ষা, নারীর প্রতি সামাজিক অবমাননা, নারীর অধিকার এবং নারী জাগরণের প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছেন। তিনি বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রথার বিরোধিতা করেছেন। নারী অধিকারের সর্বপ্রথম প্রবক্তা ছিলেন মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দঃ)। কতিপয় ঐতিহাসিক তাঁকে ‘বিশ্বের প্রথম নারীবাদীদের অন্যতম’ আখ্যা দিয়েছেন। সপ্তম শতাব্দীতে তিনি আরবদেশের নারীকে বিবাহ, তালাক এবং উত্তরাধিকারের যে অধিকার প্রদান করেছিলেন, তাঁর সময়কালে বিশ্বের কোথাও নারীর এসব অধিকার ছিল না।

বিগত শতাব্দীতে জাতিসংঘের ভূমিকার দরুণ নারীবাদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।  বাংলাদেশের নারীরা এই অগ্রযাত্রায় পিছনে পড়ে থাকে নি। ১৯৭৩ সালের শুরুর দিকে কতকসংখ্যক নারী বাংলাদেশের নারীদের সমস্যা, অসমতা ও বৈষম্য নিয়ে গবেষণা করার জন্য Women For Women: Research and Study Group নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। উক্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নারীবিষয়ক প্রকাশনার পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে এবং বাংলাদেশের নারী সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রন্থ ও রচনা প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটি একটি তথ্যকেন্দ্র গড়ে তুলেছে যেখানে নারীবাদ বিষয়ক গ্রন্থ ও তথ্যাদি সংরক্ষিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশের নারীর বিশেষ সমস্যা তুলে ধরা এবং প্রচার-প্রচারণা চালানো।

নারীবাদী গবেষণায় প্রভাবিত হয়ে ইতোমধ্যে বেশ কিছু সংগঠন নারী আন্দোলন ত্বরান্বিত করেছে।  ১৯৭০ সালের গোড়ার দিক থেকে মহিলা পরিষদ নারীর সমস্যা ও স্বার্থ নিয়ে কাজ করে চলেছে।  অধিকন্তু ১৯৮০ সাল থেকে বেশ কিছু সংগঠন নারী উন্নয়নের কর্মকান্ডে যোগ দেয়। এদের মধ্যে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি,  মহিলা আইনজীবী সমিতি, নারীপক্ষ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, নিজেরা করি, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি, আমরাও পারি, নারী প্রগতি সংঘ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এসব প্রতিষ্ঠান নারীর অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে, অসমতা বিলোপের জন্য আন্দোলন করে এবং নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য প্রতিহত করে।

পাশ্চাত্যের দ্বিতীয় ধারার নারীবাদ নারীমুক্তি এবং নারী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম। বাংলাদেশের নারীবাদী সক্রিয় কর্মীরা নিজেদের নারী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। তবে নারী আন্দোলন ও নারীমুক্তির মধ্যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে কোনও প্রভেদ নেই। বাংলাদেশে নারী মুক্তির পরিবর্তে নারী আন্দোলনের প্রতি প্রাধান্যের কারণ, এ দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং তৃতীয় ধারার নারীবাদ এ অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ তৃতীয় ধারা বিভিন্ন অঞ্চল, শ্রেণি, দেশ জাতি ও সংস্কৃতির নারীদের উদ্বেগ ও স্বার্থের বিভিন্নতা স্বীকার করে। সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশের নারী আন্দোলন পাশ্চাত্যের নারীবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের নারীবাদীরা বাংলাদেশের পরিস্থিতির নিরিখে সর্বোত্তম উপায় অবলম্বন করে নারীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন করে চলেছে।  [মাহমুদা ইসলাম]

গ্রন্থপঞ্জি  Nancy F. Cott, The Grounding of Modern Feminism, Yale University Press, 1987; Kathie Sarachild, Consciousness-Raising: A Radical Weapon (1978); Chandra Talpade Mohanty, Third World women and the politics of feminism, Indiana University Press 1991; Hunt Robert A and Aslandogan, Yuksel A. (ed.), Muslim Citizens of the Globalized World: Contributions of the Gulen Movement,  2007.