নারায়ণগঞ্জ, বন্দরনগরী


নারায়ণগঞ্জ, বন্দরনগরী ঢাকা জেলার সাবেক মহকুমা থেকে ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এটি জেলায় উন্নীত হয়। নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বেশ পুরানো ও গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর হিসেবে গড়ে ওঠে এবং গঞ্জ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৭৬৬ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা বিকন লাল পান্ডে (বেণুর ঠাকুর বা লক্ষমীনারায়ণ ঠাকুর নামেও পরিচিত)  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিকট থেকে এ অঞ্চলের মালিকানা গ্রহণ করেন। তিনি প্রভু নারায়ণের সেবার ব্যয়ভার বহনের জন্য একটি উইলের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত মার্কেটকে দেবোত্তর সম্পতি হিসেবে ঘোষণা করেন। তাই পরবর্তীকালে এ স্থানের নাম হয় নারায়ণগঞ্জ। কালেক্টরেটের প্রারম্ভিক দলিল-দস্তাবেজে নারায়ণগঞ্জের নামোল্লেখ আছে। নারায়ণগঞ্জ জেলার উত্তরদিকে গাজীপুর এবং নরসিংদী জেলা, পূর্বদিকে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া এবং কুমিল্লা জেলা, দক্ষিণে মুন্সিগঞ্জ জেলা এবং পশ্চিমে ঢাকা জেলা। ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে নারায়ণগঞ্জ  মধুপুর গড়-এর কোণাকুণি অবস্থিত এবং এর কিছু অংশ বন্যাবিধৌত পললে আবৃত। সর্বমোট ৭৫৯.৫৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত জেলাটির ৪৮.৫৬ বর্গ কিলোমিটার নদনদী এবং ০.৬০ বর্গ কিলোমিটার গাছগাছালিতে সমৃদ্ধ। নারায়ণগঞ্জ জেলার অবস্থান উত্তরে ২৩°৩৩' এবং ২৩°৫৭' অক্ষাংশ ও পূর্বে ৯০°২৬' এবং ৯০°৪৫'  দ্রাঘিমাংশে।

ঢাকা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় পাললিক মাটি জাতীয় সমতল ভূমিতে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ শহরের জনসংখ্যা ১.৫ মিলিয়ন। শহরের পূর্ব পার্শ্বে শীতলক্ষ্যা নদী এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমে  বুড়িগঙ্গা নদী। শীতলক্ষ্যা নদী পুরো শহরটাকে নারায়ণগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটি এলাকা এবং কদমরসুল মিউনিসিপ্যালিটি এলাকা এই দুভাগে বিভক্ত করেছে। মৌসুমি বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দূর করতে এ এলাকায় অসংখ্য ছোটখাটো কৃত্রিম খাল খনন করা হয়েছে। এখানকার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ২,৩৭৬ মিলিমিটার। ৮০% থেকে ৯০% বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয় মে মাস থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে।

নারায়ণগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটি গঠিত হয় ১৮৭৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। তখন এর লোকসংখ্যা ছিল ২৭,৮৭৬ এবং আয়তন ৪.৫ বর্গমাইল। এর ১২ জন কমিশনারের মধ্যে ৪ জন ছিলেন মনোনীত এবং ৮ জন নির্বাচিত। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন শহরের গুরুত্বপূর্ণ পাট ব্যবসায়ী। তিনিই অতীতে সবসময় চেয়ারম্যান হতেন। দলিল-দস্তাবেজে প্রাপ্ত প্রমাণাদি অনুসারে ধরে নেওয়া যায় যে এই মিউনিসিপ্যালিটিকে বাংলা প্রদেশের মডেল মিউনিসিপ্যালিটি বলা হতো। শহর, বাজার, রাস্তাঘাট এবং চারপাশের সবকিছু ছিল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ছিল চমৎকার। ড্রেনেজ ব্যবস্থাও ছিল সুচারু। মিউনিসিপ্যালিটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সুবিধাদি গ্রহণকারী শহরের ইউরোপীয়ান পাট ব্যবসায়ীরা বছরে ২,০০,০০০ রুপি কর দিতেন। নারায়ণগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটির প্রথম নির্বাচিত বাঙালি চেয়ারম্যান ছিলেন জনাব সৈয়দ মোহাম্মদ মালেহ। ঢাকা জজকোর্টের ঘোষণামতে ১৯৫২ সালে নারায়ণগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটির এলাকা সম্প্রসারণ করে ৭.৫ বর্গমাইল করা হয়। মিউনিসিপ্যালিটিতে পুরানো একটা হাসপাতাল (নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল) ছিল। এটি নির্মিত হয় ১৮৮২ সালে হরকান্ত ব্যানার্জীর সহায়তায়। শুরুতে এর শয্যাসংখ্যা ছিল ৩০ এবং বহুবছর যাবৎ মিউনিসিপ্যালিটি এর তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণ করেছে। ১৮৬৬ সালে নারায়ণগঞ্জে একটি সরকারি ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৭ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ প্রথম টেলিগ্রাম সুবিধা চালু করা হয়। ১৮৮২ সালে ব্যাংক অব বেঙ্গল সর্বপ্রথম নারায়ণগঞ্জে টেলিফোন প্রবর্তন করে। নারায়ণগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটি এলাকার রাস্তা-ঘাটের সমস্ত বাতি কেরোসিন তেলে জ্বলত। ১৯৩১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটি চট্টগ্রাম ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির সহায়তায় শহরে বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। ১৯৪৭ সালের পর শিল্পায়নের ব্যাপক সম্প্রসারণের ফলে অনেক বেশি বৈদ্যুতিক শক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। সিদ্ধিরগঞ্জে ৪০,০০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জে নিজস্ব পাওয়ার হাউজও স্থাপন করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটি বর্তমানে ১৮.৭০ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত। এ মিউনিসিপ্যালিটিতে একটি গণগ্রন্থাগার (প্রতিষ্ঠিত ১৯২৯) আছে। এর সংগ্রহশালায় রয়েছে ১৬,০০০ বই। গ্রন্থাগারটি নিয়মিতভাবে ১৭টি সাময়িকী এবং ৯টি দৈনিক পত্রিকা রাখে। নারায়ণগঞ্জ শহরে জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় নির্মিত একটি ২০০ শয্যাবিশিষ্ট অত্যাধুনিক হাসপাতাল আছে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর নগরী তিনটি পাকা রাস্তা, মিটারগেজ রেললাইন এবং বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার নৌপথ দ্বারা ঢাকার সাথে যুক্ত। ১৮৬২ সাল থেকে নারায়ণগঞ্জের সাথে স্টিমার যোগাযোগ শুরু হয়। সে সময় থেকেই গোয়ালন্দ থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে স্টিমার ও রেলগাড়ি ঢাকা ও  কলকাতা পৌঁছাত। নারায়ণগঞ্জ তখন ঢাকার বন্দর হিসেবে বেশ পরিচিত ছিল। শহরটি যমুনার মুখে অবস্থিত সিরাজগঞ্জের পূর্বদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে গড়ে ওঠে এবং কলকাতা, সিলেট, আসাম ও কাছারের সাথে নৌ যোগাযোগ দ্বারা সংযুক্ত হয়। কলকাতার সাথে বাণিজ্যিক লেনদেনের বিরাট অংশ যথা আমদানিকৃত কাপড়, লবণ ও নিত্যব্যবহার্য পণ্যাদি এবং এদেশে উৎপাদিত সব ধরনের রপ্তানি দ্রব্যসামগ্রী বিশেষত পাট এবং তেলবীজ পরিবহণ নারায়ণগঞ্জ বন্দরের মাধ্যমেই সম্পন্ন হতো। এই বন্দরের সাথে চট্টগ্রাম বন্দরের বাণিজ্যিক আদান-প্রদান চলত। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আনা হতো আমদানিকৃত তুলা, টিম্বার, তেল, চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ইত্যাদি এবং এ বন্দর থেকে রপ্তানি করা হতো তামাক, মৃৎশিল্প সামগ্রী এবং অন্যান্য দেশজ পণ্যসামগ্রী। নারায়ণগঞ্জ বন্দরের সাথে রেঙ্গুন এবং আকিয়াবের বাণিজ্যিক আদান-প্রদান হতো। আমদানি করা হতো টিম্বার, তুলা, খয়ের ইত্যাদি এবং রপ্তানি করা হতো তামাক, পান-সুপারি ইত্যাদি। ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ সরকার নারায়ণগঞ্জ বন্দরকে করমুক্ত বন্দর হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে অনেক ইংরেজ আকৃষ্ট হয়ে নারায়ণগঞ্জে অফিস স্থাপন করে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে।

বর্তমান নারায়ণগঞ্জ বন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ১৯৫৫ সালে। বন্দরে একটি দোতলা টার্মিনাল ভবনসহ সাতটি আরসিসি জেটি এবং ১০টি প্লাটফর্মযুক্ত জেটি আছে। গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে ৬২,০০০ বর্গফুট (৫,৭৬০ বর্গমাইল) এলাকা জুড়ে। অনেক ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্পকারখানায় নিজেদের স্থাপনায় পাট এবং পাটজাত বস্ত্তর প্রস্ত্তত-প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণের সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নিজস্ব ব্যবস্থাদি রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ বন্দরই ঢাকাকে হালকা শিল্পে সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলেছে এবং নারায়ণগঞ্জ এখন বস্ত্র-প্রস্ত্তত শিল্পের জাতীয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শিল্পকারখানাগুলি সুতাকাটা, সুতার রং করা/ব্লিচ করা কাপড় বুননসহ পরিপূর্ণ কাপড় প্রস্ত্ততের সবগুলি ধাপ সম্পাদন করে। তাঁতে কাপড় বুনন এবং তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য কাপড় উৎপাদন করে। অন্যান্য শিল্পকারখানার মধ্যে রয়েছে সাবান তৈরির কারখানা, মোজা এবং অন্তর্বাস বুনন কারখানা, ধাতু উৎপাদন এবং ধাতু ও কাঠের তৈরি আসবাবপত্র প্রস্ত্ততের কারখানা। এর দ্বারা ক্রমে নারায়ণগঞ্জ ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল রূপে গুরুত্ব লাভ করতে থাকে।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পর্তুগিজ এবং ইংরেজ ব্যবসায়ীরা এদেশে আসার পর সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ভাগে মীরজুমলার শাসনামল পর্যন্ত শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরাঞ্চল ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রস্থল। ঊনবিংশ শতাব্দীর আরম্ভকালের পূর্বপর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ খুব বেশি ব্যস্ত এলাকা ছিল না। ১৮৩০ সালে বৈদেশিক কোম্পানি র‌্যালি ব্রাদার্স সর্বপ্রথম নারায়ণগঞ্জে পাটের ব্যবসায় শুরু করে এবং আসামের অনেক কোম্পানিকে এই বন্দরের মাধ্যমে পাশ্চাত্য দেশসমূহে পাট রপ্তানি করতে সহায়তা করে। নারায়ণগঞ্জে পাট বিক্রয়ের কারবার শুরু হওয়ার পূর্বপর্যন্ত পাটের ওপর তেমন বিধিনিষেধ চালু ছিল না, তবে দরদাম করার পর ওজন করার ব্যবস্থা করা হতো, নমুনা হিসেবে একটা কিংবা দুটো বান্ডিল খুলে পাটের মান নিরূপণ করা হতো। নিম্নমানের নমুনা পাওয়া গেলে বিক্রেতা তা কম দামে বিক্রয় করতে বাধ্য হতো। সেখানে কোন নিয়মিত বাজার ছিল না, কিন্তু ব্যাপারীরা পাটবিক্রেতাদের গুদাম থেকে নৌকা বোঝাই করে বিক্রয়ের জন্য পাট নিয়ে আসত। ব্যাপারীরা মাঝেমধ্যে পাট কেনার আগে আধা ডজনের মতো বিভিন্ন আড়ৎ ঘুরে তারপর পাট কেনার সিদ্ধান্ত নিত। তবে নারায়ণগঞ্জই পাট বেচাকেনার একমাত্র কেন্দ্রস্থল ছিল না। ব্যবসায়ীরা তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে মফস্বলের অনেক কেন্দ্র থেকে পাট ক্রয় করত এবং জুলাই মাস থেকে পাট সংগ্রহ করে নৌকা বোঝাই করে নদীপথে নিয়ে আসত।

১৯০৭-০৮ সালে নারায়ণগঞ্জে ২০টি ফার্ম পাট কেনার কাজে নিয়োজিত ছিল। এ ফার্মগুলিই কাঁচাপাট ক্রয় করে গাঁইট তৈরি করে কলকাতার কারখানায় সরবরাহ করত। এর মধ্যে ১৮টির মালিকানা ছিল ইউরোপীয়ানদের এবং দুটির মালিকানা ছিল ভারতীয়দের। ফার্মসমূহ সরাসরি উৎপাদকদের কাছ থেকে পাট ক্রয় করত। যারা ব্যাপারীদের মাধ্যমে পাট ক্রয় করত তারা ফার্মের কাছ থেকে অগ্রিম গ্রহণ করে নিজেদের নৌকায় করে নারায়ণগঞ্জে পাট নিয়ে আসত।

১৯৪৭-এর স্বাধীনতার পর সাধারণ পাটের বাজার নারায়ণগঞ্জ রাতারাতি একটি পাট শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়। সমস্ত পাটজাত শিল্পকারখানা এবং ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতাকেন্দ্রিক ভারতীয়দের মূলধন নিয়ে। পূর্ব পাকিস্তান ‘সোনালি অাঁশ’ পাটে সমৃদ্ধ হলেও এখানে কোন পাটকল ছিল না এবং পাটের গাঁইট বাঁধাইয়েও ছিল দুর্বলতা। সে কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত বৈদেশিক চাহিদা মেটানোর জন্য ব্যবসায়ীরা নতুন কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই পর্যায়ে পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ী পরিবার আদমজী নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নতুন একটি পাট কারখানা। ১৯৫১ সালের ১২ ডিসেম্বর আদমজী পাট কারখানা উৎপাদন শুরু করে। অবশ্য পশ্চিম পাকিস্তানের বাওয়া গ্রুপ শহরের প্রথম পাট কারখানা প্রতিষ্ঠা করে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরবর্তী অঞ্চলে, নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দায়। এই কারখানা ১৯৫১ সালের ১৮ মে উৎপাদন চালু করে।

নারায়ণগঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা  সোনারগাঁও, যা সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে সেরা মানের এবং সুন্দরতম কাপড় প্রস্ত্ততের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল বলে ১৫৮৩ সালে র‌্যালফ ফিচ বর্ণনা করেছেন। সূক্ষ্ম বা মিহি  মসলিন তৈরির জন্য সোনারগাঁও ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এই কর্মকর্তা ১৮৩০-৩১ সালে কমিটি অব দ্য ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্স-এ বলেছিলেন যে, ঢাকার নিকটবর্তী অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের সুন্দর কাপড় প্রস্ত্তত হয়, সেখানেই চমৎকার মসলিন প্রস্ত্তত হয়, এর জন্য প্রয়োজনীয় তুলাও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে স্থানীয়ভাবে আবাদ হয়।

১৯২৭ সালে নারায়ণগঞ্জের ঢাকেশ্বরী কটন মিল সূর্যকুমার বসু কর্তৃক শীতলক্ষ্যার তীরে স্থাপিত হয়। এটাই ছিল ব্রিটিশ আমলে সমগ্র ঢাকা জেলায় প্রথম টেক্সটাইল মিল। চিত্তরঞ্জন কটন মিল স্থাপিত হয় ১৯২৯ সালে। ১৯৩২ সালে জগন্নাথ কলেজের রসায়ন বিষয়ের একজন অধ্যাপক রমেশচন্দ্র রায়চৌধুরী স্থাপন করেন লক্ষমীনারায়ণ কটন মিল। ১৯৩৭ সালে দ্বিতীয় ঢাকেশ্বরী কটন মিল চালু করা হয়। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ অন্তর্বাস-জাতীয় পোশাক প্রস্ত্ততের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মধ্যে প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সতীশচন্দ্র পাল ১৯২১ সালে প্রথম এ ধরনের কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। কারখানাটির নামকরণ করা হয় হংস হোসিয়ারি। এটি টানবাজার এলাকায় অবস্থিত। এটি একসাথে চারটি হস্তচালিত রিবন মেশিনে উৎপাদন শুরু করে। নারায়ণগঞ্জে অন্তর্বাস-জাতীয় পোশাক তৈরির কারখানার সম্প্রসারণ ঘটে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল থাকায় এখানে কাঁচামাল সহজলভ্য হয় এবং এখানে উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রী ও বয়নকৃত পোশাকাদি ধৌতকরণেরও ভাল ব্যবস্থা ছিল। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ তৈরি পোশাক শিল্পের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং অনেক বড় বড় তৈরি পোশাক রপ্তানি কারখানা এখানে স্থাপিত হয়েছে। ডজন খানেকের বেশি সাবান উৎপাদন কারখানা নারায়ণগঞ্জে মানসম্পন্ন সাবান উৎপাদন করে চলছে। এর মধ্যে কিছু কিছু জাতীয়ভাবে সুপরিচিত। এখানে কিছু সিলিকেট তৈরির কারখানাও স্থাপিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শহরে বেশ কয়েকটি বড় ময়দা কল আছে। ১৯৪৭ সালের আগে নারায়ণগঞ্জে ময়দা আসত কলকাতা থেকে।

নারায়ণগঞ্জের নিকটস্থ সিদ্ধিরগঞ্জে একটি সাইলো জাতীয় গুদাম স্থাপিত হয়েছে। এর উচ্চতা ১৯৬ ফুট এবং ধারণক্ষমতা ৫২,০০০ মেট্রিক টন। বিশ্বব্যাংকের ৯ মিলিয়ন ডলার অনুদানে এটির নির্মাণ কাজ শুরু করা হয় ১৯৬৭ সালে এবং তা শেষ হয় ১৯৭১ সালে। গুদামটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতি ঘণ্টায় ২০ মেট্রিক টন গম জাহাজে বোঝাই ও খালাস করতে পারে। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গম সরবরাহ করা হয়। নারায়ণগঞ্জের মূল অবকাঠামো গঠিত হয়েছে ডিএনডি (ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা) বেড়িবাঁধ বেষ্টনীর মাধ্যমে। এই বেড়িবাঁধ এলাকার ভূমিকে বন্যার কবল থেকে রক্ষা করছে এবং প্রকল্প এলাকার প্রায় ১৫,০০০ একর চাষাবাদযোগ্য ভূমিকেও রক্ষা করছে। ১৯২৫ সালে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে সোনাকান্দা অঞ্চলে স্থাপিত হয় বাংলাদেশের একটি বড় ধরনের স্থাপনা ‘বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড শিপ বিল্ডিং কর্পোরেশন’। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের পাশে পাগলা, আলিগঞ্জ এবং ফতুল্লায় অনেক ইটের ভাটা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে নারায়ণগঞ্জে গড়ে ওঠা বিভিন্ন গ্রুপের শিল্পকারখানার সংখ্যা ২,৪০৯টি। এসবের মধ্যে আছে খাদ্য, পানীয় এবং তামাক কারখানার ৩৭৭টি, পাট, তুলা, কাপড় এবং চামড়াজাত কারখানা ১,৩২০টি, কাঠ উৎপাদনের কারখানা ৪৯টি, মন্ড প্রস্ত্তত ও কাগজ উৎপাদনের কারখানা ৩০টি, কেমিক্যাল কারখানা ১০৪টি, অধাতু-জাতীয় সামগ্রীর উৎপাদন কারখানা ১৭০টি, মৌলিক ধাতুসামগ্রী উৎপাদনমূলক কারখানা ১০১টি, জোড়া লাগানোর ধাতু, মেশিনারি এবং যন্ত্রপাতির কারখানা ২৩০টি এবং অন্যান্য পণ্যসামগ্রী প্রস্ততকারক কারখানা ২৮টি।

যে কোন বন্দর নগরীর একটি বৈশিষ্ট্য পতিতালয়। উনিশ শতকের প্রথম দিকে নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে একটি পতিতালয় গড়ে উঠে। ২০০০ সালের এক সময়ে এর বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে জনগণ তা উচ্ছেদ করে দেয়। [মোঃ সোলায়মান]