নদীভাঙন


নদীভাঙন (Riverbank erosion)  বাংলাদেশের একটি স্থানীয় ও পুনঃসঙ্ঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নদী যত পরিণত পর্যায়ে এগোতে থাকে (যেমন তিন প্রমত্ত নদী– গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার ক্ষেত্রে ঘটেছে) ততই সেগুলি মন্থর ও বিসর্পিল (meander) অথবা বিনুনি  (braid) আকৃতির হতে থাকে, নদীর এ দোলন নদীতীরের ব্যাপক ভাঙন সংঘটিত করে। প্রতি বছর নদীভাঙনের কারণে লক্ষ লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষেতের ফসল, ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট প্লাবনভূমির প্রায় ৫% প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের শিকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ৪৮৯টি থানার মধ্যে প্রায় ৯৪টি থানায় নদীভাঙন ঘটছে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ এর সঙ্গে আরও ৫৬টি থানার সন্ধান পেয়েছেন যেখানে নদীভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে প্রায় ১০০টি থানায় নদীভাঙন ও বন্যার দুর্ভোগ প্রায় নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি থানা সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশ অবজার্ভার পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে ১৯৯৩ সালের জুন মাসে ১৬টি জেলায় ২৫০০০-এর বেশি পরিবার নদীভাঙনের কবলে পড়ে বাস্ত্তভিটাচ্যুত হয়েছে।

নদীভাঙন

নদীর অস্থির প্রকৃতির কারণে বাংলাদেশে ভাঙন এত ব্যাপক ও দ্রুত হারে সংঘটিত হয়। নদীগুলি তাদের গতিপথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চর দ্বারা বিচ্ছিন্ন কয়েকটি চ্যানেলের সৃষ্ট বিনুনি আকার ধারণ করে। বিগত ২০০ বছর ধরে এ চ্যানেলগুলি প্রধান উপত্যকা প্রাচীরে (valley wall) আন্দোলিত হচ্ছে। ফলে বর্ষাকালে ব্যাপকভাবে তীর উপচানো, তীর ভাঙন ও তটরেখার পরিবর্তন একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে বড় বড় নদীর চ্যানেলগুলির ক্রমস্থানান্তর বা পরিবর্তন বছরে ৬০ মিটার থেকে ১৬০০ মিটারের মধ্যে হতে পারে। কোনো বিশেষ বছরে প্রায় ২৪০০ কিমি তটরেখা জুড়ে ব্যাপক ভাঙন ঘটতে পারে। নদীগুলির আচমকা পরিবর্তনমুখী আচরণ ও আগ্রাসন কেবল গ্রামের প্লাবনভূমির জনগোষ্ঠীকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, শহরাঞ্চলের বর্ধিষ্ণু জনপদ এবং অবকাঠামোরও অনিষ্ট সাধন করে।

ভাঙনের তীব্রতায় নদী থেকে নদীতে দারুণ ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। কারণ এ ভাঙন নির্ভর করে কি পদার্থ দিয়ে নদীতীর গঠিত, পানির পৃষ্ঠদেশের ভিন্নতা, তীরবর্তী প্রবাহের তীব্রতা, নদীর পরিলেখ রূপ (planform) এবং নদীতে পানি ও অবক্ষেপের সরবরাহ ইত্যাদির ওপর। উদাহরণস্বরূপ, পলি ও মিহি বালুতে গঠিত আলগা বাঁধাই, সাম্প্রতিক মজুতকৃত তীরের পদার্থসমূহ ভাঙনের পক্ষে খুবই সংবেদনশীল। বন্যার পানির দ্রুত অপসারণ এ ধরনের পদার্থে তীর ভাঙনের হার ত্বরান্বিত করে।

যমুনা নদী  যমুনা একটি বিনুনি আকৃতির নদী যার তীরের উপাদানসমূহ ভাঙনের পক্ষে খুবই সংবেদনশীল। ব্রহ্মপুত্র নদী মধুপুর গড়ের পশ্চিম দিকে যমুনা নদীর ধারায় এসে পড়ার কারণে নদীটির গড় প্রস্থ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে। ১৯১৪ সালে যমুনা নদীর রেকর্ডকৃত নিম্নতম গড় প্রস্থ ছিল ৫.৬ কিমি। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রস্থ ১৫ কিমি ছাড়িয়ে যায় এবং সর্বনিম্ন স্থানীয় প্রস্থ প্রায় ১.১ কিমি সীমিত ছিল। ১৯৭৩-২০০০ সময়কালে নদীটির প্রশস্ত হওয়ার হার বছরে ১২৮ মিটার (বাম তীরে ৬৮ মিটার ও দক্ষিণ তীরে ৬০ মিটার)। ১৯৮৪-৯২ সময়কালে প্রশস্তায়নের বাৎসরিক হার বেড়ে ১৮৪ মিটারে দাঁড়ায় যার মধ্যে বাম তীরে ১০০ মিটার ও দক্ষিণ তীর বরাবর ৮৪ মিটার (সারণি-১)। এ সময়কালে নদীর গড় প্রস্থ ৯.৭ থেকে ১১.২ কিমি বৃদ্ধি পেয়েছে (সারণি-২)।

১৯৮৪-৯২ সময়কালে সর্বোচ্চ তীর ভাঙনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে পূর্ব তীরে, আরিচার ঠিক উজানে। ১৯৭৩ সাল থেকে ৯০-এর দশকের প্রথম পর্যন্ত যমুনা নদী ক্রমাগত চওড়া হতে থাকে। কিন্তু ৯০-দশকের শেষের দিকে চওড়া হওয়ার এ বাৎসরিক হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। বিগত ২৮ বছর সময়কালে নদীর এ প্রশস্তায়নের ফলে নদীটির ২২০ কিমি দীর্ঘ বাংলাদেশ অংশে ৭০,০০০ হেক্টর প্লাবনভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে (গড়ে বছরে প্রায় ২,৬০০ হেক্টর) ১৯৮৪-৯২ সময়কালের মধ্যে যমুনা নদীর ৪০,১৫০ হেক্টর প্লাবনভূমি হ্রাস পেয়েছে এবং ৭,১৪০ হেক্টর উপলেপিত হয়েছে বা জেগে উঠেছে, যার হার বাৎসরিক হিসাবে দাঁড়ায় ভাঙন প্রায় ৫০০০ হেক্টর আর উপলেপ (accretion) প্রায় ৯০০ হেক্টর।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে যমুনা নদীতে মানুষের কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু যমুনা বাঁধ নির্মাণ, সিরাজগঞ্জ, সারিয়াকান্দি ও বাহাদুরাবাদে নদী প্রতিরক্ষা কাঠামো ইত্যাদি যমুনা নদীর প্রস্থের পরিবর্তনে নিঃসন্দেহে প্রভাব ফেলবে। এসব নির্মাণ ও পরিকাঠামো তীর ভাঙনের মাধ্যমে নদীর প্রশস্ত হওয়ার প্রবণতা সংকুচিত করছে।

গঙ্গা নদী গঙ্গা নদীর সক্রিয় অলিন্দের (corridor) মধ্যস্থ তীর উপাদানসমূহ আলগা বালু আর পলিকণায় গঠিত। এইসব পদার্থ অতিমাত্রায় ভাঙনপ্রবণ। গঙ্গা নদী বরাবর তীর ভাঙার প্রক্রিয়া প্রধানত এর ভ্রাম্যমাণ পরিলেখ রূপবৈশিষ্ট্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নদী এর কোঁচানো প্রান্তে (braiding reaches) দুই তীর বরাবর ভাঙন সংঘটিত করতে পারে যেমনটা হার্ডিঞ্জ সেতুর ভাটি অঞ্চলে পরিদৃষ্ট। সর্বোচ্চ তীরভাঙন অবশ্য বিসর্পিল প্রান্তে, যেখানে বহিঃবাঁক করিডোরের ভেতরে পার্শ্বিক স্থানান্তর (migrate) করতে পারে। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে পরিদৃষ্ট সর্বোচ্চ তীরভাঙনের হার ছিল প্রতি বছর ৬৬৫ মিটার। গঙ্গা নদীর ডান ও বাম তীর বরাবর তীরভাঙার হার বাৎসরিক যথাক্রমে ৫৬ মি ও ২০ মি যা যমুনা নদীতে দৃশ্যমান হারের চেয়ে কম (সারণি-১)। নদীর প্রস্থ ১৯৮৪ সালে ১.৭ থেকে ১০ কিমি-এর মধ্যে ছিল যা ১৯৯৩ সালে ১.৯ থেকে ১১.৭ কিমি বৃদ্ধি পায়। নদীর গড় প্রস্থ ১৯৮৪ সালে যেখানে ছিল ৪.৩৭ কিমি তা ১৯৯৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪.৬৯ কিমি (সারণি-২)। নদীর প্রশস্ততা বৃদ্ধির হার প্রতিবছর ৩৬ মিটার যা যমুনা নদীর মাত্র এক পঞ্চমাংশ। গঙ্গা নদীর প্রশস্ততা বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য বলে বিবেচিত নয়।

পদ্মা নদী পদ্মা নদীর তীরভাঙন কোনো বিক্ষিপ্ত নদীর পরিলেখ (planform) বৈশিষ্ট্যসমূহের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নদীটির বিনুনি পরিসর উভয় তীর বরাবর ভাঙছে। কিন্তু বিসর্পিল প্রান্ত শুধু বহিঃতীরকে ভাঙে। পদ্মা নদীর প্রস্থ ১৯৮৪ সালে ৩.৭ কিমি থেকে ৮.৫ কিমি-এর মধ্যে এবং ১৯৯৩ সালে ২.৭ থেকে ১০.৭ কিমি-এর মধ্যে ছিল। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৩ সময়কালে পদ্মা নদীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ ছিল ভাটি দেশের যমুনার সঙ্গমে বারুরিয়ায় যার প্রস্থ ছিল ৩.৭ থেকে ৮.৫ কিমি। নদীটির গড় প্রস্থ ১৯৮৪ সালে ৫.৭ কিমি থেকে ১৯৯৩ সালে ৭.১ কিমি-এর মধ্যে ছিল, যা বছরে ১৫৯ মিটার প্রশস্ততা হারের প্রতিষঙ্গী (উত্তর ও দক্ষিণ তীরের ভাঙনের হার ছিল প্রতি বছর যথাক্রমে ১২১ ও ৩৮ মিটার; সারণি ১ ও ২)। যমুনা নদীতে দৃষ্ট হারের চেয়ে কম হলেও ১৯৮৪-৯৩ সময়কালে পদ্মা নদীর প্রশস্ততা বৃদ্ধির হার বেশ উল্লেখযোগ্য। যমুনা ও মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থলের মধ্যবর্তী পদ্মা নদীর অংশ সাম্প্রতিক দশকগুলিতে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলছে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে পদ্মা নদী কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত হয়েছে। তটরেখাও ব্যাপকভাবে অস্থিত হয়ে উঠেছে। একসময় যে নদীকে প্রধানত বিসর্পিল বৈশিষ্ট্যের মনে করা হতো, সেই পদ্মা ধীরে ধীরে বিনুনি প্রকৃতিতে পর্যবসিত হচ্ছে। পদ্মা নদীতে চড়া পড়ার ক্রমবর্ধমান হার ক্রমবর্ধিষ্ণু প্রলম্বিত অবক্ষেপের ভার বহনের কারণে এবং বিশেষ করে বালুর অংশ বৃদ্ধির কারণে ঘটতে পারে। এটাই পরবর্তীতে তীরের দিকে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বালুর প্রবাহ ঠেলে দিয়ে তীরের ভাঙনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। রামকৃষ্ণপুর ও দোহারের মধ্যে পদ্মা নদী বেশ চওড়া, যেখানে প্রধান তীর ভাঙনের কাজ চলেছে নদীর বাম তীর বরাবর। ফরিদপুরের কাছে এ মোহনার দক্ষিণ তীর এদিক ওদিক সঞ্চরমান ছিল। আর হরিরামপুরের কাছে বাম তীর ১৯৭৩ ও ১৯৯৮ সালের মধ্যে উত্তর-পূর্ব দিকে কয়েক কিমি এগিয়ে গেছে। এ স্থানে প্রচন্ড নদীভাঙন সমস্যা রয়েছে। এটি ইছামতি নিষ্কাশন খালের মুখ, যা পদ্মা নদীর একটি ক্ষুদ্র উত্তরমুখী শাখানদী। দোহার ও মাওয়ার ভাটি অঞ্চলের মধ্যে পদ্মা নদীর অংশ উপরের মতো একই পরিমাণ প্রশস্ত কিন্তু বড় ধরনের তীর ভাঙনের স্থানের ক্ষেত্রে ভিন্ন অর্থাৎ নদীর ডান তীর বরাবর এ ভাঙন ঘটছে। আড়িয়াল খাঁ নদীর মোহনার কাছে বড় চড়া পড়ার কারণে এ অংশের প্রধান প্রবাহ তীরের দক্ষিণ মুখে পরিবর্তিত হয়ে তীব্র ভাঙন কবলিত মঠবারার চরে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। মাওয়া ও লৌহজংয়ের মধ্যে পদ্মা নদী খুব সংকীর্ণ। এখানে তীরের কাছাকাছি কোনো বড় চড়ার অনুপস্থিতি তুলনামূলকভাবে চ্যানেল বরাবর পানির অবাধ প্রবাহের পথ প্রশস্ত করেছে, কিন্তু এটি তীর অভিমুখে প্রবাহের পরিবর্তন সংঘটিত করে না। লৌহজং ও মুন্সিগঞ্জের মধ্যকার ভাটি অঞ্চলে পদ্মা নদী চওড়া এবং এখানে অনেক চ্যানেলমধ্যস্থ চড়া রয়েছে। এ অংশের বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে পদ্মা ও মেঘনা নদীর সঙ্গমের অধিকাংশ অন্তর্ভুক্ত। বৃহত্তম বালুচরের কয়েকটি এখানে অবস্থিত। তাই তীর ভাঙনের তীব্রতা মধ্য চ্যানেলস্থ চরের গঠন এবং প্রধান চ্যানেলের নদী তীরমুখী গতি-পরিবর্তন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

পদ্মা নদী ও এর শাখা নদীগুলির ভৌত বৈশিষ্ট্যসমূহ নদীতীরে দোলায়মান প্রবাহ, উঁচু পাড়ের ফাটল ও মধ্য চ্যানেলস্থ বালুচর গঠনের কারণে পরিবর্তিত হচ্ছে। মোহনায় প্রচুর অবক্ষেপ মজুতের কারণে নদীর তলদেশ কোথাও কোথাও অগভীর হয়ে এসেছে এবং অনেক নিষ্কাশন মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। ভঙ্গুর ও অস্থিত নদীতীর অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ, যেমন- প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু ইত্যাদির জন্য হুমকিস্বরূপ। অথচ এসব নির্মাণ কাজ দেশের সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

আপার মেঘনা নদী  বাংলাদেশের অন্যান্য প্রধান নদীর মতো নয়, আপার মেঘনা নদীটি সুস্থিত এবং আপাতদৃষ্টিতে একটি মজা নদী। নদীটির প্রস্থ ১৯৮৪ সালে ১ কিমি থেকে ১১.৫ কিমি-এর মধ্যে ছিল। আবার ১৯৯৩ সালে ১ থেকে ১১.৩ কিমি-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। প্রস্থের এ উচ্চ স্থানিক বিভিন্নতার কারণ ৯ কিমি অধিক চওড়া একটি স্থায়ী চরের উপস্থিতি। ১৯৮৪ সালে নদীর গড় প্রস্থ ছিল ৩.৪১ কিমি। অন্যদিকে ১৯৯৩ সালে তা ছিল ৩.৩৯ কিমি (সারণি-২)। নদীর ডান ও বাম তীর বরাবর তীর ভাঙনের গড় হার বছরে যথাক্রমে ৯ ও ৭ মিটার হতে দেখা যায়।

লোয়ার মেঘনা নদী  আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগে পদ্মা চান্দিনা পলি (chandina alluvium) ভেদ করে বর্তমান সঙ্গমস্থলে মেঘনায় পতিত হওয়ার পর লোয়ার মেঘনা নদীকে যমুনা, গঙ্গা ও মেঘনার সম্মিলিত প্রবাহ (discharge) বহন করতে হয়। আপার মেঘনা ও পদ্মা নদীর সঙ্গমকে লোয়ার মেঘনা নদীর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। দুটি চ্যানেলবেষ্টিত ব্যাপক ও গুচ্ছাকার বালুচর নিয়ে এ সঙ্গম গঠিত। সঙ্গমের সর্বোচ্চ প্রস্থ ১৪.৪ কিমি। এর গড় প্রস্থ ১৯৮৪ সালে ছিল ৭.৯৮ কিমি যা ১৯৯৩ সালে ৯.০১ কিমি বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ বাৎসরিক প্রশস্ততা বৃদ্ধির হার ১০ মিটার।

১৯৮৪ সালে চাঁদপুরের ভাটি অঞ্চলে নদী বিসর্পিল তরঙ্গ দৈর্ঘ্যসহ একটি একক সরু চ্যানেল নিয়ে গঠিত ছিল। কিন্তু ১৯৯৩ সালে নদীর পরিলেখ রূপ একাধিক চ্যানেলবিশিষ্ট চওড়া নদীতে রূপান্তরিত হয়। চাঁদপুরের ভাটিতে লোয়ার মেঘনা নদীর প্রস্থ ১৯৮৪ সালে স্থানীয়ভাবে ৩.৮২ কিমি ও ৭.৮৭ কিমি-এর মধ্যে এবং ১৯৯৩ সালে ৫.০৩ কিমি থেকে ১৩.০০ কিমি-এর মধ্যে ছিল। ভাটি অঞ্চলের মোহনায় নদীর গড় প্রস্থ ১৯৮৪ সালে ৫.৭৪ কিমি ও ১৯৯৩ সালে ৮.৮২ কিমি ছিল (সারণি ২)।

নদী তার উভয় তীর ভাঙার ফলে লোয়ার মেঘনা নদীতে মধ্যতলীয় চরের (medial bar) সৃষ্টি হয়। চাঁদপুরে ভাটি অঞ্চলে ১৯৮৪-১৯৯৩ সময়কালে ভাঙনের হার তীব্র ছিল, সে সময় কখনও কখনও এ ভাঙনের পরিমাণ বছরে ৮২৪ মিটার পর্যন্ত হয়েছিল। একই সময় ডান ও বাম তীর বরাবর গড় ভাঙনের হার ছিল বছরে যথাক্রমে ১৮২ ও ৬৬ মি (সারণি-১) যার মিলিত যোগফল (২৪৮ মি/বছরে) একই সময়ে যমুনা নদীর প্রশস্ততা বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি (১৮৪ মি/বছরে)।

আর্থ-সামাজিক প্রভাব  নদীভাঙনের আর্থ-সামাজিক প্রভাব মারাত্মক। উল্লেখ্য, অধিকাংশ নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন একে প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে ধরে নেয়। আবার অনেকে আল্লাহর গজব বলে এ দুর্যোগকে মেনে নিয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরিবর্তে দোয়া-মানৎ ইত্যাদির শরণাপন্ন হয়। আজ জাতীয় দারিদ্রে্যর একটা বড় কারণ এ নদীভাঙন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নদীভাঙনের কারণে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং বিপদাপন্ন লোকের সংখ্যা আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীভাঙনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত লোকের জমি, বসতভিটা, ফসল, গবাদি সম্পদ, গাছপালা, গৃহসামগ্রী সবকিছুই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নিঃস্ব, রিক্ত, সর্বস্বান্ত মানুষ ভূমিহীনের কাতারে সামিল হয়ে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ায়। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১০ লক্ষ লোক প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের শিকার হয়। এর ফলে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক পঞ্চাশ কোটি ডলার। প্রায় ৩ লক্ষ গৃহহীন পরিবার উন্মুক্ত আকাশের নিচে, পথের পাশে, বাঁধ, ফুটপাথ ও সরকারের খাস জমিতে এসে আশ্রয় নেয়। গরীব, ধনী নির্বিশেষে সবাই এ নদীভাঙনের শিকার হয়। বড় ও মাঝারি জোতদার কৃষকরা বেশি জমির মালিক বিধায় তারা ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষুদ্র ও ভূমিহীন চাষির ক্ষতির ভাগ কম। নদী তীরবর্তী অঞ্চলে ভাঙনের ফলে গ্রামীণ কৃষিকাজ দারুণভাবে ব্যাহত হয়। বসতভিটার সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমি, অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়। বিপন্ন জনগোষ্ঠীর কৃষি আয় কমে যায়। বড় বড় কৃষকরা এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর মাঝারি কৃষক ও প্রান্তিক চাষির দল। ক্ষতিগ্রস্ত লোকেরা সম্পদ হারিয়ে জমানো সঞ্চয়ের ওপর হাত বাড়ায় এবং প্রায়শই নতুন ঋণে জড়িয়ে পড়ে। গবেষকদের মতে, ভাঙনের ফলে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া ভূমির পরিমাণ নদীর তলদেশ থেকে জেগে ওঠা নতুন ভূমির পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি। এ নদী পয়স্তি ও নদী সিকস্তির ঘটনা বাংলাদেশের নদীর গতিপথ ব্যবস্থার একটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বৈচিত্র্য যা স্থানীয় রাজনীতির জন্ম দেয়।

নদীভাঙনের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে স্থানচ্যুতি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ তাৎক্ষণিক স্থানবদল কাছাকাছি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও দূর-দূরান্তে দেশান্তরি হওয়ার ঘটনাও খুব ব্যতিক্রমী নয়। ভাঙনপ্রবণ অঞ্চলে অধিকাংশ পরিবারই জীবদ্দশায় অন্তত একবার স্থানচ্যুতির শিকার হয়েছে। কারও কারও ক্ষেত্রে এ অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্ত্তচ্যুতির ঘটনা দশ বা ততোধিকবার ঘটেছে। ঢাকার বস্তিগুলির ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, এ সব ছিন্নমূল পরিবারের অধিকাংশই এসেছে ফরিদপুর (৩৪%), বরিশাল (২৫.৬%), কুমিল্লা (২৪.৩%) ও ঢাকা (১৪.৩%) থেকে। আরও নিবিড় অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, এসব বস্তিবাসীর অধিকাংশই আবার গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনা নদীর ও এদের সম্মিলিত মোহনার আশপাশে অবস্থিত কয়েকটি থানা নিয়ে গঠিত সীমিত এলাকা থেকে এসেছে। নদীভাঙনের ফলে স্থানচ্যুতির ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরো পরিবারই পথে বসে। এক হিসাবে দেখা যায়, ঐ এলাকার একটি পরিবার জীবদ্দশায় গড়ে ২.৩৩ বার ভাঙনের কবলে পড়ে। এদের মধ্যে অনেকে ৪-৫ বা ততোধিকবার এ দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছে। পরিবেশ দুর্যোগের কারণে শরণার্থীতে রূপান্তরিত জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ দিনমজুর বা রিকশাওয়ালায় পরিণত হয়। কাজের সুযোগের অভাবে এইসব উদ্বাস্ত্তর একটা বৃহত্তর অংশই বেকার থেকে যায়। এছাড়া এসব পরিবারের অধিকাংশেরই প্রধান উপার্জনকারী মহিলা। নদীভাঙনে আশ্রয়হীনা এ মহিলা-পরিচালিত যেসব পরিবার বিভিন্ন বাঁধের উপর অস্থায়ী নিবাস গড়ে তুলেছে, তারাই সবচেয়ে বঞ্চিত গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। সুখের বিষয় এ যে, আজকাল সমাজসেবী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এদের সমস্যাদি তুলে ধরছে এবং এদের বেঁচে থাকার উপায়-কৌশল নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।  [সিফাতুল কাদের চৌধুরী]

আরও দেখুন উপকূলীয় ভাঙন