নগরায়ণ


নগরায়ণ বিষয়ে বাংলাদেশের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীতেই এখানে পুন্ড্রনগরের (বর্তমানে মহাস্থানগড় নামে পরিচিত) মতো নগর গড়ে উঠেছিল। নগরায়ণের দীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও মোট জনসংখ্যার তুলনায় সরকারিভাবে সংজ্ঞায়িত নগরকেন্দ্রগুলিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর অনুপাত বিবেচনায় বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বের স্বল্পতম নগরায়িত দেশগুলির অন্যতম। এমনকি একবিংশ শতাব্দীর সূচনায় ২০০১ সালেও জাতীয় জনসংখ্যার মাত্র ২৩ শতাংশ নগর ও শহরগুলিতে বাস করছিল। তবে জনসংখ্যার বিশাল আকৃতির কারণে চূড়ান্ত বিবেচনায় ২৩ শতাংশের অর্থ দাঁড়ায় ২৮ মিলিয়নেরও অধিক মানুষ।

মহাস্থানগড় (স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম) ভূমি নকশা

বিগত শতাব্দীর সূচনালগ্নে ১৯০১ সালে ব্রিটিশ ভারতে অবস্থিত বর্তমান বাংলাদেশ ভূখন্ডে মোট জনসংখ্যার মাত্র ২.৪৩ শতাংশ (বা ০.৭ মিলিয়নের মতো) শহর এলাকায় বাস করতো। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। ১৯৪১ সালে জনসংখ্যার ৪ শতাংশেরও কম শহরে বাস করতো এবং শহরাঞ্চলের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১.৫৪ মিলিয়ন। ১৯৪৭ সালের পর থেকে নগরায়ণে গতি সঞ্চারিত হয়। এসময় ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে পূর্ববঙ্গ (বর্তমানের বাংলাদেশ) হয় পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৪১-১৯৫১ দশকের তুলনায় (১৮.৩৮%) ১৯৫১-১৯৬১ সময়কালে শহরাঞ্চলের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে (৪৫.১১%) বৃদ্ধি পায়। শহরাঞ্চলের মোট জনসংখ্যা ১৯৫১ সালের ১.৮ মিলিয়ন থেকে ১৯৬১ সালে ২.৬ মিলিয়নে উন্নীত হয়। এই দ্রুত প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ১৯৪৭ সালের পর ভারত থেকে মুসলমানদের বড় মাপের অভিবাসন, যারা মূলত শহরাঞ্চলেই বসতি স্থাপন করে।

সারণি ১ বাংলাদেশের জাতীয় ও শহুরে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি ১৯০১-২০০১।

আদমশুমারির বছর মোট জাতীয় জনসংখ্যা (মিলিয়ন) মোট জনসংখ্যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার (%) মোট শহুরে জনসংখ্যা(মিলিয়ন) মোট জনসংখ্যার শতাংশ হিসেবে শহুরে জনসংখ্যা শহুরে জনসংখ্যার দশকওয়ারি বৃদ্ধি (%) শহুরে জনসংখ্যার (গুণনীনয়কের সূচক ভিত্তিক) বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (%)
১৯০১ ২৮.২ - ০.৭০ ২.৪৩ - -
১৯১১ ৩১.৬৫ ০.৯৪ ০.৮০ ২.৫৪ ১৪.৬ ১.৩৯
১৯২২ ৩৩.২৫ ০.৬০ ০.৮৭ ২.৬১ ৮.৮৫ ০.৮৪
১৯৩১ ৩৫.৬০ ০.৭৪ ১.০৭ ৩.০১ ২২.২ ২.০০
১৯৪১ ৪১.৯৯ ১.৭০ ১.৫৪ ৩.৬৬ ৪৩.২ ৩.৫৯
১৯৫১ ৪৪.১৭ ০.৫০ ১.৮৩ ৪.৩৪ ১৮.৩ ১.৫৮
১৯৬১ ৫৫.২২ ২.২৬ ২.৬৪ ৫.১৯ ৪৫.১ ৩.৭২
১৯৭৪ ৭৬.৩৭ ২.৪৮ ৬.০০ ৮.৮৭ ১৩৭.৫৭ ৬.৬২
১৯৮১ ৮৯.৯১ ২.৩২ ১৩.৫৬ ১৫.৫৪ ১১০.৬৮ ১০.০৩
১৯৯১ ১১১.৪৫ ২.১৭ ২২.৪৫ ২০.১৫ ৬৯.৭৫ ৫.৪৩
২০০১ ১২৩.১ ১.৪৭ ২৮.৬১ ২৩.১০ ৩৭.০৫ ৩.২৫

সূত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (২০০৩); বাংলাদেশ আদমশুমারি প্রতিবেদন, ১৯৯১, ২০০১; শহরাঞ্চলের উপর প্রতিবেদন, ১৯৯৭।

১৯৬১ থেকে ১৯৭৪ সাল মেয়াদে এই প্রবৃদ্ধি ছিল বিস্ময়কর, যার হার ছিল ১৩৭.৬ শতাংশ। এ সময়ে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ঘটে গড়ে ৬.৭ শতাংশ, যা কিনা পূর্ববর্তী দশকে ছিল ৩.৭ শতাংশ। এই দ্রুত নগরায়ণকে দুটো কারণ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, মূলত কর্মসংস্থানের সুযোগের সন্ধানে পল্লী অঞ্চল থেকে দরিদ্রদের শহরে অভিবাসন। একটি হিসাব অনুযায়ী ১৯৭৪ সালে মোট শহুরে জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশই গ্রামাঞ্চল থেকে এসেছিল। দ্বিতীয়ত, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ঘটে যাওয়া সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলিও নগরায়ণকে প্রভাবিত করেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকার নতুন মর্যাদা ছিল একটি বড় আকর্ষণ।

১৯৬১ সালে মোট জনসংখ্যার ৫.২ শতাংশের তুলনায় ১৯৭৪ সালে শহুরে জনসংখ্যা ৮.৯ শতাংশে উন্নীত হয়। দুই আদমশুমারির মধ্যবর্তী ১৯৭৪-৮১ মেয়াদে এই পরিবর্তন ছিল ১১১ শতাংশ; এ সময়ে শহুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। পূববর্তী দশকের মতোই অভিবাসন ও প্রাকৃতিক প্রবৃদ্ধি দুটো উপাদানই এতে অবদান রেখেছিল। ১৯৭৪-৮১ সময়কালে শহুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ৩০ শতাংশই ঘটেছিল শহরাঞ্চলের সংজ্ঞায় দেশব্যাপী ৪৬০টি থানা সদরকে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে। ১৯৮১-৯১ সময়কালে শহুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার পূর্ববর্তী দশকের তুলনায় হ্রাস পেয়ে ৫.৪ শতাংশে দাঁড়ায়। ১৯৯১ সালে মোট শহুরে জনসংখ্যা ছিল ২২.৪৫ মিলিয়ন, যা ছিল মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। আর ২০০১ সালে শহুরে জনসংখ্যা দাঁড়ায় ২৮.৬ মিলিয়ন, যা মোট জনসংখ্যার ২৩.১ শতাংশ ছিল।

ভবিষ্যতে শহুরে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি  বাংলাদেশে বর্তমানে শহুরে জনসংখ্যা কতো তা সঠিকভাবে বলা দুষ্কর। এর জন্য আমাদের ২০১১ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত আদম শুমারির ফলাফল প্রাশের পূর্বপর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা কার্যক্রম ২০১০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬০ মিলিয়ন বলা হয়েছে। এই সংখ্যা বেশি মনে হলেও আতাহারুল ইসলামের গবেষণার ফলাফলে ২০১১ সালের ১৫৯.৪ মিলিয়ন জনসংখ্যা উপরোক্ত সংখ্যার যথার্থতাই প্রমাণ করে। জাতীয় নীতি নির্ধারকদের বিভিন্ন তথ্য বিবরণীতেও জনসংখ্যাকে ১৫০-১৬০ মিলিয়ন উল্লেখ করা হয়েছে। এর ২৫ শতাংশ নগরাঞ্চলে বাস করে- এই অনুমানের ভিত্তিতে ২০১০ সালে দেশের শহুরে জনসংখ্যা হবে ৩৭ থেকে ৪০ মিলিয়ন। ২০৫১ সালের জন্য জাতীয় জনসংখ্যার যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে সে অনুযায়ী তা সর্বনিম্ন ১৮৮.১ মিলিয়ন, মধ্যম ১৯৯.৩ মিলিয়ন এবং সর্বোচ্চ ২৪৩.৯ মিলিয়ন হতে পারে (ইসলাম, ২০০৩)। তিনি ২০২১ সালের জন্য সর্বোচ্চ ১৮৫.২ মিলিয়ন জনসংখ্যার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যা যথেষ্ট বাস্তবভিত্তিক বলে মনে হয়; এমনকি ২০১০ সালে জনসংখ্যা ১৬০ মিলিয়ন ধরা হলেও এই হিসাব কম বলেই মনে হবে। ২০৫১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং এরপর তা হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা হয়।

২০২১ এবং ২০৫১ সালের জন্য উপরে বর্ণিত প্রাক্কলন অনুযায়ী মোট শহুরে জনসংখ্যা ২০২১ সালে ৫০ মিলিয়ন (২৭%) এবং ২০৫০ সালে ৮০ মিলিয়ন (৩৩%) হবে বলে অনুমান করা হয়। ২০৭৫ সাল নাগাদ শহুরে জনসংখ্যা ১২০ মিলিয়নে (মোট জনসংখ্যার ৫০%) উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে নগর কেন্দ্রের সংজ্ঞায় পরিবর্তন, জনসংখ্যার বণ্টনে নীতিগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে ভবিষ্যতে নগরাঞ্চল সম্প্রসারণের ধারায় নাটকীয় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই ৫০% শতাংশের পর্যায়টি ২০৫০ সালের অনেক আগেই অর্জিত হতে পারে।

বাংলাদেশের মত একটি ক্ষদ্র আয়তনের দেশে বিপুল জনসংখ্যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। বর্তমানের ১৬০ মিলিয়ন মানুষ ইতিমধ্যেই ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। শহরাঞ্চলে ৩৮ মিলিয়ন মানুষের বাসস্থান সঙ্কুলানই একটি বিরাট প্রতিবন্ধকতা আর এর দ্বিগুণ সংখ্যক মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা অনেকটাই দুঃসাধ্য ব্যাপার।

নগরায়ণ বৃদ্ধির উপাদান এবং অভিবাসনের কারণসমূহ  গত তিন দশকে বাংলাদেশে শহুরে জনসংখ্যার যে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটেছে তার পেছনে কয়েকটি কারণ সন্নিবেশিত রয়েছে। এর মধ্যে আছে: স্থানীয় শহুরে জনসংখ্যার প্রাকৃতিক প্রবৃদ্ধির উঁচু হার; বিদ্যমান নগর এলাকার ভূখন্ডগত বিস্তার ও এর সংজ্ঞায় পরিবর্তন এবং গ্রামাঞ্চল থেকে শহর এলাকায় অভিবাসন।

শহুরে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধিতে অভিবাসনই সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী উপাদান হিসেবে কাজ করেছে, ১৯৭৪-৮১ সময়কালে যার অবদান ছিল ৪০ শতাংশ। ঢাকার মতো বড় নগরীর ক্ষেত্রে এই অবদান আরো বেশি (৭০% শতাংশ পর্যন্ত) হতে পারে।

পল্লী এলাকা থেকে শহরাঞ্চলে উচ্চ হারে অভিবাসনের পেছনে পল্লীর বহির্মুখী ‘চাপ’ ও শহরের অন্তর্মুখী ‘টান’ কাজ করেছে। বড় নগর-কেন্দ্রগুলো, বিশেষত ঢাকা থেকে গেছে প্রধানতম আকর্ষণ হিসেবে। গ্রামাঞ্চল থেকে বহির্মুখী অভিবাসনের পেছনে গ্রাম্য দারিদ্র্য ও ভূমিহীনতা ছিল মুখ্য কারণগুলি অন্যতম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষত নদীতীরের ভাঙন প্রায়শই তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে কাজ করেছে। শহুরে ‘টান’-এর মধ্যে আছে কর্মসংস্থানের প্রকৃত ও ধারণাগত সুযোগ এবং আর্থ-সামাজিক সুযোগ-সুবিধা।


মানচিত্র-১: বাংলাদেশের নগরায়ণের ধাপ অনুযায়ী জেলাওয়ারি বিন্যাস ২০০১

জেলাওয়ারি নগরায়ণ পরিস্থিতি  বিদ্যমান ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি বা প্রভাবের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই একটি দেশে নগরায়ণের বিন্যাস ঘটে। যেহেতু এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে এই শক্তির পার্থক্য থাকে, তাই নগরায়ণের বিন্যাসেও পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। শহুরে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নগরায়ণের বিভিন্ন ধাপের বিবেচনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার মধ্যে যথেষ্ট তফাৎ দেখা যায়। বস্ত্তত, এই পার্থক্য সাতক্ষীরা জেলার ৭.২ শতাংশ থেকে শুরু করে ঢাকা জেলার ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। ঢাকা জেলা হলো দেশের সবচেয়ে নগরায়িত এলাকা। ঢাকার বাইরে অন্য তিনটি সর্বোচ্চ নগরায়িত জেলা হলো নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও খুলনা। এসব জেলায় শহুরে জনগোষ্ঠীর অনুপাত যথাক্রমে ৫৫.৬ শতাংশ, ৫৩.৩ শতাংশ এবং ৫০.৩ শতাংশ। কেবল চারটি জেলা অর্থাৎ বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও রাজশাহীতে নগরায়ণের অনুপাত ৩১ থেকে ৪০ শতাংশ। অন্য তিনটি জেলা চুয়াডাঙ্গা, পাবনা ও নবাবগঞ্জে এই অনুপাত মোট জনসংখ্যার ২১ থেকে ৩০ শতাংশ।

অধিকাংশ জেলায়, বা মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪১টিতে নগরায়ণের হার অত্যন্ত কম; অর্থাৎ এসব জেলায় জনসংখ্যার ১১ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত শহর এলাকায় বাস করে (সারণি ২)। ১১টি জেলা আছে যেগুলির শহুরে জনসংখ্যা ১০ শতাংশেরও কম। এগুলি হলো: পটুয়াখালী, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, নেত্রকোনা, সাতক্ষীরা, জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, গাইবান্ধা এবং মৌলভীবাজার। সারণি ২’এ বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় নগরায়ণের পর্যায় প্রদর্শন করা হয়েছে।

সারণি ২ নগরায়ণের ধাপ অনুযায়ী জেলাওয়ারি বিন্যাস ২০০১ ।

নগরায়ণের ধাপ (শহুরে জনসংখ্যার শতাংশ) জেলার সংখ্যা মোট জেলার শতাংশ
<১০ ১১ ১৭.১৮
১১-২০ ৪১ ৬৪.০৬
২১-৩০ ৪.৬৮
৩১-৪০ ৬.২৫
৪১-৫০ ৩.১২
৫১-৬০ ৩.১২
৬০> ১.৫৬
মোট ৬৪ ৯৯.৯৭

সূত্র বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ২০০১।

শহুরে জনসংখ্যা ও নগরকেন্দ্রের বণ্টন  বাংলাদেশে শহুরে জনসংখ্যার অসম বণ্টন পরিলক্ষিত হয়। এর কারণ অনেক, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো: নগর ও শহরের আকার, বিভিন্ন ভৌগোলিক কারণ, উন্নয়নের গতি ও বিন্যাস এবং অবকাঠামো ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের উন্নয়ন। বাংলাদেশের আদমশুমারি কমিশন দেশের নগরকেন্দ্রগুলিকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে; মহানগরী (মেগাসিটি), পরিসংখ্যানগত মেট্রোপলিটন এলাকা (এসএমএ), পৌরসভা ও অন্যান্য নগরকেন্দ্র। ৫ মিলিয়নের অধিক জনসংখ্যাবিশিষ্ট একটি মহানগরীকে মেগাসিটি বলা হয়ে থাকে। দেশে একটিই মেগাসিটি রয়েছে, আর তা হলো ঢাকা। ২০১০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১০.৭ মিলিয়ন।

সিটি কর্পোরেশন ও নাগরিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত সন্নিহিত এলাকাসমূহ নিয়ে পরিসংখ্যানগত মেট্রোপলিটন এলাকা বা এসএমএ গঠিত। এই সংজ্ঞার ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (২০০১) মেগাসিটি ঢাকার বাইরে দেশে তিনটি মহানগরীকে এসএমএ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এগুলি হলো চট্টগ্রাম (৩.৩৯ মিলিয়ন), খুলনা (১.৩৪ মিলিয়ন) এবং রাজশাহী (০.৭ মিলিয়ন)।

নগরকেন্দ্রের পরবর্তী শ্রেণি হলো পৌরসভা। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় ঘোষিত পৌরসভাগুলির নগরকেন্দ্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক মর্যাদা আছে। ২০০১ সালের আদমশুমারির সময় দেশে ২২৩টি পৌরসভা ছিল। ২০১০ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০৯-এ। আদমশুমারির সময় ১১টি পৌরসভাকে বৃহত্তম চারটি নগরী অর্থাৎ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অপর ২১২টি পৌরসভার মোট জনসংখ্যা ছিল ৯ মিলিয়ন বা মোট শহুরে জনসংখ্যার ৩১ শতাংশ।

অন্যান্য নগরকেন্দ্র হলো উপজেলা সদর এবং গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত বড় বাজার এলাকা যেগুলিকে এখনো পৌরসভা ঘোষণা করা হয় নি। অন্য যেসব এলাকায় নাগরিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান সেগুলিকে অন্যান্য নগরাঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

২০০১ সালে বাংলাদেশে ছিল একটি মেগাসিটি, দুটি মিলিয়ন জনসংখ্যার নগরী, এবং ১৮টি শহর- যার জনসংখ্যা ছিল ১ মিলিয়নের নীচে কিন্তু ১ লক্ষের উপরে (সারণি ৩)। কেবল দু’টি ছাড়া অন্য সবগুলিরই ১৯৯১-২০০১ সময়কালে ইতিবাচক বিস্তার ঘটেছে।

২০০১ সালে বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থায় ৫২২টি নগরকেন্দ্র ছিল। ১৯৯১ সালে এই সংখ্যা একই ছিল, তবে ১৯৮১-তে এটা আরো কম ছিল (৪৯১)। ৬৪টি জেলার প্রতিটিতেই যথাযথ পরিসরের নগরকেন্দ্র বিদ্যমান।

ঢাকার প্রাধান্য ও নগরকেন্দ্রিকতা  চতুর্দিকে নগরকেন্দ্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নগর পরিস্থিতির বৈশিষ্ট্য মূলত প্রাধান্য ও কেন্দ্রিকতার। দেশের প্রায় ৩৮% শহুরে জনগোষ্ঠি নিয়ে দেশের রাজধানী ও বৃহত্তম নগরী ঢাকার রয়েছে একক প্রাধান্য (সারণি ৪)। একটি প্রধান নগরী হিসেবে ঢাকার মর্যাদার ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে এবং সম্ভবত ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।

সারণি ৩  বাংলাদেশে ০.১০ মিলিয়নের অধিক জনসংখ্যাবিশিষ্ট নগরকেন্দ্রগুলির প্রবৃদ্ধি।

নগরকেন্দ্রের নাম আয়তন (বর্গ কি.মি.) জনসংখ্যা ১৯৯১ (মিলিয়ন) জনসংখ্যা ২০০১ (মিলিয়ন) মোট শহুরে জনসংখ্যার শতাংশ, ২০০১ দশ বছরে প্রবৃদ্ধির হার
ঢাকা এসএমএ ১৩৫৩ ৬.৮৪৪ ১০.৭১২ ৩৭.৪৫ ৫৬.৫২
চট্টগ্রাম এসএমএ ৯৮৬ ২.৩৪৮ ৩.৩৮৬ ১১.৮৪ ৪৪.১৭
খুলনা এসএমএ ২৬৭ ১.০০২ ১.৩৪১ ৪.৬৯ ৩৩.৮৪
রাজশাহী এসএমএ ৩৭৭ ০.৫৪৫ ০.৭০০ ২.৪৫ ২৮.৫৫
সিলেট সিটি কর্পোরেশন ৫৪ ০.১১৭ ০.৩২০ ১.১২ ১৭২.৮২
রংপুর পৌরসভা ৫৮ ০.১৯১ ০.২৫২ ০.৮৮ ৩১.৫৮
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন ৪০ ০.১৭০ ০.২২৫ ০.৭৯ ৩১.৯৭
ময়মনসিংহ পৌরসভা ৯২ ০.১৮৯ ০.২১০ ০.৭৩ ১১.১০
যশোর পৌরসভা ৩৬ ০.১৪০ ০.১৯২ ০.৬৭ ৩৭.৬০
নওয়াবগঞ্জ পৌরসভা ৪৬ ০.১৩১ ০.১৬৩ ০.৫৭ ২৫.১৪
বগুড়া পৌরসভা ২২ ০.১২০ ০.১৬২ ০.৫৭ ৩৪.৯৩
কুমিল্লা পৌরসভা ৫৯ ০.১৩৫ ০.১৬১ ০.৫৬ ১৮.৯২
দিনাজপুর পৌরসভা ২৫ ০.১২৮ ০.১৫৬ ০.৫৫ ২২.২৯
সিরাজগঞ্জ পৌরসভা ২০ ০.১০৮ ০.১৩০ ০.৪৫ ২০.২২
জামালপুর পৌরসভা ৫৫ ০.১০৪ ০.১২৮ ০.৪৫ ২৩.৬৬
মাধবদী পৌরসভা -- ০.০০০ ০.১২৩ ০.৪৩ --
টাঙ্গাইল পৌরসভা ৩৫ ০.১০৬ ০.১১৯ ০.৪২ ১২.৩২
পাবনা পৌরসভা ৪৪ ০.১০৩ ০.১১২ ০.৩৯ ৮.৮৯
নওগাঁ পৌরসভা ৩৭ ০.১০১ ০.১০৭ ০.৩৭ ৫.৫২
বি.বাড়িয়া পৌরসভা ৩৬ ০.১০৯ ০.১০৪ ০.৩৬ -৪.৫১
সৈয়দপুর পৌরসভা ৩৪ ০.১০৫ ০.১০০ ০.৩৫ -৪.৩২

সূত্র বিবিএস ১৯৯১, ১৯৯৭ এবং ২০০৩।

মানচিত্র-২:বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রসমূহ, ২০০১

দেশের মোট শহুরে জনসংখ্যার ৫৬% নিয়ে চারটি বৃহত্তম মহানগর এলাকা অর্থাৎ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীর প্রাধান্য এক্ষেত্রে আরও মজবুত। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের নিরীখেও নগর কেন্দ্রিকরণে অসমতা দেখা যায়। এ কথাটা বিশেষত ঢাকার জন্য প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় ভোগের ৫০% ঢাকায় ঘটে থাকে। বিভিন্ন শিল্প ও সরকারি বিনিয়োগের একটি বিশাল ও অসমানুপাতিক অংশ এ অঞ্চলে কেন্দ্রিভূত আছে। সরকার ঘোষিত বিকেন্দ্রীকরণের নীতিমালা সত্ত্বেও ঢাকা মহানগর ও এর আশপাশের এলাকায় স্থাপিত শিল্প-কারখানার ঘনত্ব মাত্রাতিরিক্ত বেশি। উদাহরণস্বরূপ, দেশের ৪,১০৭টি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানার ৭৫ শতাংশই ঢাকা মহানগর অঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছে। সমাজ-সেবা খাত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক খাতেও এই কেন্দ্রীভূত অবস্থা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, বিগত দশকে প্রতিষ্ঠিত দেশের ৬২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৫টির অবস্থান ঢাকা মহানগরীতে। চিকিৎসা সেবা ও সুযোগের ক্ষেত্রেও অনুরূপ পরিস্থিতি দৃশ্যমান। বন্দর থাকার ফলে শিল্প-কারখানার বহুল উপস্থিতির মাধ্যমে দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামেও এ ধরনের কেন্দ্রিকরণ ঘটেছে।

মহানগরীসমূহের বাইরে বাংলাদেশের শহর এবং জেলা সদরগুলিকে অপ্রধান নগর হিসেবে বিবেচনা করা যায়। সাধারণত এগুলির জনসংখ্যা ৫০ হাজার থেকে ০.৫ মিলিয়ন। তবে নগর বিষয়ক অধিকাংশ প্রকল্পের ডকুমেন্টে রাজধানী বা প্রধান নগরীর বাইরে যাবতীয় নগরাঞ্চলকে অপ্রধান বা মধ্যম নগর হিসেবে দেখানো হয়েছে। ৫০ হাজারের কম জনসংখ্যা অধ্যুষিত নগর কেন্দ্রগুলিকে গ্রাম্য-শহর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

নগর দারিদ্র্য দারিদ্র্য একটি বহুমাত্রিক বিষয়। তবে দেশে দারিদ্র্য প্রবণতার হিসাব নির্ণয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতি বিবেচনা করা যায়। এই পদ্ধতি বিবিএস-এর গৃহস্থালি ব্যয় সমীক্ষায় প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রায় ঐতিহাসিকভাবেই দারিদ্র্য বাংলাদেশের পল্লী ও শহরাঞ্চলে ব্যাপক মাত্রায় বিরাজমান। দারিদ্র্যকে ‘দারিদ্র্য রেখা ১-এর নীচে’ অথবা ‘দরিদ্র’ এবং ‘দারিদ্র্য রেখা ২-এর নীচে’ অথবা ‘চরম দরিদ্র’ শ্রেণিতে বিভাজন করা হয়েছে।

সারণি ৪ জাতীয় ও নগর প্রেক্ষাপটে ঢাকার প্রাধান্য।

বছর জনসংখ্যা (মিলিয়ন) জাতীয় জনসংখ্যার শতাংশ শহুরে জনসংখ্যার শতাংশ
১৯৭৪ ১.৭৭ ৩.০ ২৮.২
১৯৮১ ৩.৪৫ ৩.৮ ২৬.০
১৯৯১ ৬.৮৪ ৫.৮ ৩০.৫
২০০১ ১০.৭১ ৮.০ ৩৭.৪
২০০৫ ১২.০০ ৮.৬ ৩৭.৫

সূত্র বিবিএস, ১৯৯৪, এবং ২০০৫-এর জন্য অনুমিত হিসাব।

বিবিএস’এর পরিসংখ্যান মোতাবেক ১৯৭৩-৭৪ সালে দেশে শহুরে জনসংখ্যার ৮১.৪% ছিল দারিদ্র্য রেখা-১ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত এবং ৪৪.৩% ছিল দারিদ্র্য রেখা-২ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ১৯৮৫-৮৬ সালে এই হার যথাক্রমে ৫৬% ও ১৯%-এ হ্রাস পায়। ২০০০ সালে প্রথমোক্ত শ্রেণির দারিদ্রে্যর হার ৫২.৫ শতাংশে হ্রাস পেলেও দ্বিতীয়োক্ত শ্রেণির দারিদ্র্য ২৫ শতাংশে উন্নীত হয় (বিবিএস, সারণি, ২০০৪, এস.পি.বি)।

২০০০ সালে নগর দরিদ্রদের মোট সংখ্যা নিরূপিত হয়েছিল দারিদ্র্য রেখা-১ শ্রেণিভুক্ত (দরিদ্র) ১৩.২ মিলিয়ন এবং দারিদ্র্য রেখা-২ শ্রেণিভুক্ত (চরম-দরিদ্র) ৬ মিলিয়ন। অধিকাংশ নগর দরিদ্রই বস্তি এলাকায় বাস করে, যেখানে ভৌত-পরিবেশগত সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত অপ্রতুল।

নগরায়ণের পরিণতি  নগরায়ণ বিশ্বের সর্বত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের একটি কার্যকরী বাহন হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায়, জাতীয় অর্থনীতিতে নগরায়ণ তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে। যদিও উন্নয়নশীল বিশ্বে নগরায়ণের হার ৪০ শতাংশেরও কম, তাদের নগর খাত থেকে জিডিপি’র ৬০ শতাংশেরও বেশি অর্জিত হয়। এমনকি বাংলাদেশেও (২৫ শতাংশ নাগরিক জনগোষ্ঠি নিয়ে) এই খাত জিডিপি’তে ৬৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখে (সিইউএস, ২০১০)। এই অবদান ১৯৭২-৭৩ সালের ২৫ শতাংশ থেকে ১৯৯৫-৯৬ সালে ৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়। এ থেকে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হওয়া যায় যে নগরায়ণ সামষ্টিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনছে। স্বাক্ষরতার উচ্চতর হার, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শ্রেয়তর স্বাস্থ্য সূচকের মাধ্যমে নগরায়ণ সামাজিক উন্নয়নকেও প্রভাবিত করে। বৃহত্তর নগরায়ণ সাংস্কৃতিক উন্নয়নেও ইতিবাচক অবদান রাখে।

সারণি ৫ ক্যালরি গ্রহণের  সুপারিশকৃত মাত্রা এবং চরম দারিদ্র্য রেখার নীচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ও অনুপাত।

বছর দারিদ্র্য রেখা-১ দারিদ্র্য রেখা-২
নগর পল্লী নগর পল্লী
দরিদ্রের সংখ্যা (মিলিয়ন)
১৯৮১-৮২ ৬.৪ ৬০.৯ ৩.০ ৪৩.১
১৯৮৩-৮৪ ৭.১ ৪৭.০ ৩.৮ ৩১.৩
১৯৮৫-৮৬ ৭.০ ৪৪.২ ২.৪ ১৯.১
১৯৮৮-৮৯ ৬.৩ ৪৩.৪ ৩.৫ ২৬.০
১৯৯১-৯২ ৬.৮ ৪৪.৮ ৩.৮ ২৬.৫
১৯৯৫-৯৬ ৯.৬ ৪৫.৭ ৫.২ ২৩.৯
২০০০ (প্রাক্কলিত) ১৩.২ ৪২.৬ ৬.০ ১৮.৮
নগর ও পল্লী এলাকার জনসংখ্যার তুলনায় দরিদ্রদের অনুপাত (শতাংশ)
১৯৮১-৮২ ৬৬.০ ৭৩.৮ ৩০.৭ ৫২.২
১৯৮৩-৮৪ ৬৬.০ ৫৭.০ ৩৫.০ ৩৮.০
১৯৮৫-৮৬ ৫৬.০ ৫১.০ ১৯.০ ২২.০
১৯৮৮-৮৯ ৪৭.৬ ৪৮.০ ২৬.৪ ২৮.৬
১৯৯১-৯২ ৪৬.৭ ৪৭.৮ ২৬.২ ২৮.৩
১৯৯৫-৯৬ ৪৯.৭ ৪৭.১ ২৭.৩ ২৪.৬
২০০০ (প্রাক্কলিত) ৫২.৫ ৪৪.৩ ২৫.০ ১৮.৭

সরাসরি ক্যালরি গ্রহণ পদ্ধতির ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে নোট: (ক) দারিদ্র্য রেখা-১ (দরিদ্র) - সুপারিশকৃত ক্যালরি (২১২২ কিলোক্যালরি/দিন/জন)  (খ) দারিদ্র্য রেখা-২ (‘চরম’ দারিদ্র্য) - সুপারিশকৃত ক্যালরি (১৮০৫ কিলোক্যালরি/দিন/জন)। সূত্র বিবিএস, ২০০৬, (পৃ. ৪১১)। বাংলাদেশ গৃহস্থালি ব্যয় সমীক্ষা প্রতিবেদন ১৯৮৮-৮৯, ১৯৯১-৯২, ১৯৯৫-৯৬ এবং ২০০০’ এর ভিত্তিতে সংকলিত, বিবিএস।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের একটি সুনির্দিষ্ট ও ইতিবাচক ফল হলো বিশেষত ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে লক্ষ লক্ষ নারী শ্রমিকের আনুষ্ঠানিক শিল্প খাত, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে কর্মসংস্থান। এর বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, যেমন নারীর ক্ষমতায়ন এবং জনসংখ্যাতাত্ত্বিক কাঠামোয় পরিবর্তন - যার মধ্যে আছে নগর এলাকায় লিঙ্গ অনুপাতের ক্ষেত্রে ভারসাম্য অর্জন।

বিশেষত মহানগর এলাকায় নগরায়ণের বিস্তার এবং রাজধানী ঢাকা মেগাসিটিতে পরিণত হওয়ায় বহির্বিশ্বের সাথে বর্ধিত যোগাযোগের ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া অঙ্গনে সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে; গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম আয়োজন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী, সংগীতানুষ্ঠান, কনসার্ট ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনই এর প্রমাণ। যদিও এসকল কর্মকান্ডের অধিকাংশই ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী, আধুনিক এবং প্রগতিশীল, তবে এর সমান্তরালে কয়েকটি ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রক্ষণশীল আবেগ বা প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধবিশ্বাসেরও স্ফূরণ ঘটছে।

বিগত দশকগুলিতে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার শেকড় আরো গভীরে প্রোথিত হয়েছে। এটা নগর এলাকার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যার প্রমাণ পাওয়া যায় সাম্প্রতিক কালে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচন থেকে, যাতে নারীদেরকে সংরক্ষিত আসনে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনসমূহেও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে নারীরা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছে। বিশ্বের যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটা একটি অনন্য অর্জন। তবে পৌর প্রশাসনে অধিকতর অংশগ্রহণের সুযোগ ও স্বচ্ছতার অভাবে এই অর্জন কিছুটা সীমিত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকেও নগর পর্যায়ে স্থানীয় সরকারের (এমনকি ঢাকায়ও) স্বায়ত্তশাসন ও পরিপূর্ণ ক্ষমতার অভাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এখনো সর্বাত্মক।

দ্রুত নগরায়ণের ফলে নাগরিক ভৌত অবকাঠামোর দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে এবং কৃষি ও বন খাতের আওতাধীন অঞ্চলসমূহ নির্মাণ কাঠামোয় ঢাকা পড়ে যায়। পাশাপাশি বর্ধনশীল জনসংখ্যার চাপে কৃষি-জমি ও বনাঞ্চল এবং জলাধারসমূহ আরো দ্রুত গতিতে বেদখল হয়ে যায়। দ্রুত নগরায়ণ বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, স্যানিটেশন, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য অপসারণ, পরিবহণ, টেলিযোগাযোগ, কেবল সংযোগ এবং স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো নাগরিক সেবা ও উপযোগের উপরও প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে। এ সকল খাতের প্রতিটিতে সেবার স্বল্পতা বা অপর্যাপ্ততা এবং সাধারণভাবে অব্যবস্থাপনা সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

দ্রুত নগরায়ণের ফলে নগরের অভ্যন্তরে ব্যাপক ও ভয়ংকর নেতিবাচক ফলাফল নগরের পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তোলে, যা বর্তমানে ঢাকায় দৃশ্যমান। এর বায়ূ, পানি ও মাটি এখন বিপজ্জনক মাত্রায় দুষিত হয়ে পড়েছে। ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত মেগাসিটি মনে করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের অনেকগুলি শহর বন্যা, নদী-ভাঙন ও ঘুর্ণিঝড়ের মতো বড় মাপের প্রাকৃতিক দুর্যোগের হুমকির মধ্যে থাকে। গ্রাম্য দরিদ্রদের অভিবাসনের ফলে শহরাঞ্চলের জনসংখ্যা অতি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় দারিদ্র্য বিমোচনের কাজটিও কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পদক্ষেপের ফলে নগরাঞ্চলে দারিদ্রে্যর হার তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমে এসেছে, এই হার এখনো বেশ উঁচু (৫৩%)। সংখ্যার দিক দিয়ে বর্তমানে ১৩.২০ মিলিয়ন নগর দরিদ্র রয়েছে। এদের অধিকাংশই নিজেদের জন্য বসবাসের উপযোগী গৃহ বা অন্যান্য আর্থ-সামাজিক সেবা নিশ্চিত করতে অক্ষম। এর তাৎক্ষণিক পরিণতি হলো বস্তি এবং অননুমোদিত বসতির দ্রুত সম্প্রসারণ।

নগর দরিদ্রদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা এবং কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধার জন্য তাদের দ্রুত বর্ধনশীল চাহিদার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সরকার বা স্থানীয় নগর কর্তৃপক্ষের কোনোটিই এগুলি যথেষ্ট পরিমাণে মেটাতে সক্ষম নয়। এসব সরকারি সংস্থায় বিশেষত পর্যাপ্ত আর্থিক সম্পদ, কর্মী ও কারিগরি দক্ষতা নেই। অধিকন্তু, আনুষ্ঠানিক ব্যক্তিখাত (কর্পোরেট/আধুনিক) বর্ধিষ্ণু শহুরে জনসংখ্যার চাকরির চাহিদা মেটাতে অক্ষম। তবে এটা লক্ষ্যণীয় যে গত বিশ বছরে শহর অঞ্চলের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান খাতে তাৎপর্যপূর্ণ সম্প্রসারণ ঘটেছে (বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে)। এই বিশাল শহুরে শ্রমশক্তির অধিকাংশের নিয়োগে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিখাতের ব্যর্থতার ফলে একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যক্তিখাতের বলিষ্ঠ সম্প্রসারণ ঘটেছে (উৎপাদন, বাণিজ্য, সেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে)। অনানুষ্ঠানিক খাতের গুণাগুণ অন্যত্র মূল্যায়ন করা হলেও বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনাবিদ ও ব্যবস্থাপকেরা তা পুরোপুরি উপলদ্ধি করতে অক্ষম। এর ফলে এক্ষেত্রে একটি টানাপোড়েন ক্রিয়াশীল থাকে। উভয় পক্ষই (একদিকে নগর পরিকল্পনাবিদ ও কর্তৃপক্ষ এবং অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতের চালকেরা) সবসময় একটি মুখোমুখি অবস্থানে থাকে।

যেহেতু একবিংশ শতাব্দীকে একটি বিশ্বায়ন ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির কাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাই বাংলাদেশের শহর ও গ্রাম উভয় অঙ্গনে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের নগর অঞ্চলগুলি এখন উন্নত বিশ্বের মেট্রোপলিটন কেন্দ্র বা বৈশ্বিক নগরীর প্রান্তিক বলয় হিসেবে কাজ করছে। আমাদের শহরগুলিতে শিল্প স্থাপন করা হয় যাতে করে উন্নত বিশ্বে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করা যায়। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে এটা ইতিবাচক অবদান রাখে; তবে একই সঙ্গে নগরের ভেতরে ও চারিদিকে এর পরিবশেগত প্রভাবও দৃশ্যমান। তাছাড়া শহুরে সমাজে এর নেতিবাচক সামাজিক প্রভাবও (যেমন অসমতা বেড়ে যাওয়া) থাকে। একটি দ্রুত বর্ধনশীল শহুরে ধনিক শ্রেণীর কারণে ঢাকা শহরের চারদিকের জলাধার অথবা চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ের উপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ে; অন্যদিকে স্বল্প আয় উপার্জনকারী শিল্প শ্রমিক অথবা অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী তাদের বসবাসের জন্য অত্যন্ত নিম্নমানের বস্তি নির্মাণ করতে বাধ্য হয়।

নগর উন্নয়ন ও সুশাসন পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অতি সাম্প্রতিক। ১৯৬০ ও ১৯৭০’এর দশকে একটি জাতীয় নগর পরিকল্পনা ব্যবস্থা চালুর প্রয়াস চালানো হয়েছিল, যাতে নগর কেন্দ্রগুলির অবস্থান, আকার, পরিসর ও ভূমিকার মতো বৈশিষ্ট্য বিবেচিত হওয়ার কথা ছিল; তবে এটি কাগুজে পরিকল্পনা হিসেবেই রয়ে গেছে। এর পরিবর্তে উন্নয়ন পরিকল্পনায় নগরসমূহ ভিন্ন ভিন্ন একক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ১৯৫০’এর দশকের শেষে এবং ১৯৬০’এর দশকের শুরুতে বৃহত্তম চারটি নগরীকে মাস্টার-প্ল্যানের আওতায় আনা হয়। এসকল মাস্টার-প্ল্যান তৈরি করা ও পরিকল্পনা মোতাবেক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিটি নগরীর জন্য একটি করে নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি করা হয়। এর মাধ্যমে ঢাকার জন্য ডিআইটি (রাজউক), চট্টগ্রামের জন্য সিডিএ, খুলনার জন্য কেডিএ এবং রাজশাহীর জন্য আরডিএ প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা প্রণয়নের সামর্থ্য অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় এসকল সংস্থা জাতিসংঘ অথবা স্থানীয় পরামর্শক গোষ্ঠীর সহায়তায় পরিকল্পনা প্রস্ত্তত করে। এই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলির বর্তমানে কিছু স্থানীয় অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়নের সামর্থ্য আছে।

মাস্টার-প্ল্যানগুলির সুপারিশ মোতাবেক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলি প্রকল্প গ্রহণ করে থাকে। প্রশাসনিকভাবে তারা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ। এর বিপরীতে, নগরীর স্থানীয় সরকার বা সিটি কর্পোরেশনগুলি স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বাবলীর মধ্যে আছে সংরক্ষণমূলক কার্যক্রম, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ, সড়কসমূহে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করা, উদ্যান, সরোবর ও খেলার মাঠের রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সেবা প্রদান ইত্যাদি। পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ, পরিবহণ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, টেলিযোগাযোগ, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে আরো বেশ কয়েকটি সংস্থা দায়িত্ব পালন করছে। বস্ত্তত, ঢাকা মহানগরীতে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে ৪১টি সরকারি সংস্থা কর্মরত রয়েছে (ইসলাম, ২০০৫)। এই বহুবিধ সংস্থা থাকার কারণে সমন্বয় ও সুশাসনের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়। ঢাকার ক্ষেত্রে এই সমস্যা এত মারাত্মক যে সুশাসন ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

অন্যান্য বড় শহরে সিটি মেয়রের উদ্যোগেই সমন্বয় ও সুশাসনের সমস্যাগুলি সমাধান করা হয়। অপরাপর অপ্রধান নগর ও শহরের জন্য পৃথক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অস্তিত্ব নাই। তবে এক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পৌরসভার উপর বর্তায়। তবে পৌরসভাগুলির যেহেতু নিজস্ব নগর পরিকল্পনাবিদ নেই, তাই তাদের পক্ষে মাস্টার-প্ল্যান প্রস্ত্তত করে থাকে নগর উন্নয়ন পরিদপ্তর (ইউডিডি), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অথবা তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে নগর শাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (ইউজিআইআইপি) আওতায় ২২টি অপ্রধান শহরকে নগর উন্নয়ন দপ্তর বা কোষ প্রতিষ্ঠায় কিছু সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।  [নজরুল ইসলাম]