নক্সী কাঁথার মাঠ


নক্সী কাঁথার মাঠ  একটি কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ। রচয়িতা কবি  জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬ ) রচনাকাল ১৯২৯। নক্সী কাঁথার মাঠ একটি  শিল্পসফল কাহিনি কাব্য। কাব্যটি চোদ্দটি সর্গ বা ছোট ছোট দৃশ্যপটে বর্ণিত। কাব্যিকভাবে সবকটি দৃশ্য মিলে এতে একটি সামগ্রিক জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে অসাধারণ শৈল্পিকতার সঙ্গে।

নাটকীয় দৃশ্য পরম্পরায় সজ্জিত এ কাব্যের কাহিনীচিত্র পল্লিকিশোর রূপা ও পল্লিকিশোরী সাজুর প্রেমের পটভূমি, বিকাশ  ও এর করুণ পরিণতিকে আশ্রয় করে দৈনন্দিন কর্মধারা, প্রতিদিনকার ঘরকন্নার অতি বাস্তব ছবি, গ্রামীণ উৎসব-অনুষ্ঠানের নিপুণ বর্ণনা, গ্রাম্য-কলহ, জমিজমা-সংক্রান্ত দাঙ্গাহাঙ্গামা, মামলা-মোকদ্দমা প্রভৃতি বিষয়ে পল্লবিত। এর প্রতিটি দৃশ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ, বাস্তবধর্মী ও কবিত্বময়। রূপা ও সাজুর এ কাহিনিকে কবি ‘করুণ গাথা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন কারণ মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে দুটি প্রাণ প্রেমের জন্যে প্রায়শ্চিত্ত করেছে। আর নক্সী কাঁথার ফোঁড়ে ফোঁড়ে সে বেদনার কাহিনি বিধৃত হয়েছে:

‘বহুদিন পরে গাঁয়ের লোকেরা গভীর রাতের কালে,

শুনিল কে যেন বাজাইছে বাঁশি বেদনার তালে তালে।

প্রভাতে সকলে আসিয়া দেখিল সেই কবরের গায়

রোগ পান্ডুর একটি বিদেশী মরিয়া রয়েছে হায়।

সারা গায়ে তার জরায়ে রয়েছে সেই নক্সী কাঁথা,

আজও গাঁর লোকে বাঁশী বাজাইয়া গায় এ করুণ গাথা।’

লোকজ প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ, কলহ, ঘৃণা ও বীরত্বের গাথা চিত্রায়নে এ কাব্য কবির সৃষ্টিকুশলতায় সমৃদ্ধ। এ কাব্যটি প্রকৃতপক্ষে পুরাতন কাব্যগাথার বিবর্তিত সাহিত্যিক রূপ। এতে ভাষার পরিমার্জন সত্ত্বেও গঠনরীতিতে প্রাচীন গাথার অনুসৃতি লক্ষ করা যায়, পাশাপাশি আধুনিক যুগোচিত কাহিনির বিস্তৃতি সাধন, মনোবিশ্লেষণ, চরিত্রাঙ্কণ ও বিস্তৃত বর্ণনার প্রতি প্রবণতা রয়েছে। কাব্যের ভাষা ভঙ্গিতে গ্রাম্যগাথার আদল সামান্য বজায় রেখেও সামাজিক পটভূমিতে প্রতিস্থাপন করে কাব্যের আখ্যান ভাগ বিস্তৃত করেছেন, গল্পাংশ বর্ণনায় নাটকীয় সংস্থান সৃষ্টি, চরিত্রগুলোর পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার ঝোঁক এবং নরনারীর হূদয়াবেগ নাড়া দেবার চেষ্টা করেছেন এবং অতি সফলভাবে। সর্বোপরি কাব্যের ভাষা দ্রুতগতিসম্পন্ন, সরল, অনাড়ম্বর ও লোকজ অলংকারসমৃদ্ধ।

কবির অন্যান্য কাব্যের মতো এ কাব্যেও বৈষ্ণব প্রভাব রয়েছে; বৈষ্ণব পদকর্তাদের মতো তিনি রূপার কৃষ্ণরূপে-গ্রাম্য লোকদের চিত্ত নিবেদনের স্বরূপের মধ্যে বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলাকে প্রত্যক্ষ করেছেন। এ কাব্যটি সম্পর্কে  দীনেশচন্দ্র সেন মন্তব্য করেছেন-‘ইহার উপাদান বাঙ্গালীর চিরাভ্যস্ত, গীতিকবিতার কতকগুলি সুর ও ছন্দ, কিন্তু নানা সুর একত্র করিয়া একটি বড় রাগিনী সৃষ্টি করার শিল্পশক্তি ইহার আছে। নানা কুসুমের মালার মতই খন্ড কবিতা লিখে একটা অখন্ডরূপ দেওয়ার বিলক্ষণ শক্তি ইনি দেখাইয়াছেন, ইহাতে মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের ক্ষমতা ও প্রচুর সৌন্দর্যের সমাবেশ দেখা যায়।’ ১৯৩৯ সালে E.M Milford The Field of the Embroidered Quilt নামে এর ইংরেজি অনুবাদ করেন।  [শামীমা আক্তার]