দে, রেভারেন্ড লালবিহারী


দে, রেভারেন্ড লালবিহারী (১৮২৪-১৮৯৪) লেখক ও বহুখ্যাত ভারতীয় খ্রিস্টান পন্ডিত। ১৮২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর বর্ধমান জেলার সোনাপলাশী গ্রামের এক সুবর্ণবণিক পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা রাধাকান্ত দে ছিলেন কলকাতার একজন সাধারণ বিল ব্রোকার। তখনকার দিনে সামান্য ইংরেজি জ্ঞানও ইউরোপিয়দের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক সুযোগ এনে দিত। তাই রাধাকান্ত পুত্র লালবিহারীকে কলকাতায়  আলেকজান্ডার ডাফ প্রতিষ্ঠিত (১৮৩০) জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশনে শিক্ষালাভের জন্য পাঠান। স্কুলটি ছিল অবৈতনিক। ডাফ সাহেব পেশায় ছিলেন একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক। তাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল যত বেশি সম্ভব ভারতীয়দের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা। ডাফের ইনস্টিটিউশনে লালবিহারী যে ধরনের শিক্ষালাভ করেন, তা তাঁকে নিজধর্মের প্রতি বিদ্বেষী করে তোলে এবং ১৮৪৩ সালে তিনি রেভা. কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। ১৮৫১ সালে  তিনি চার্চের ধর্মযাজকরূপে কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর ধর্মপ্রচারের ক্ষেত্র ছিল বর্ধমান জেলা। ১৮৫৫ সালে তিনি কলকাতার Free Church Presbytery কর্তৃক ‘রেভারেন্ড’ পদে উন্নীত হন।

বর্ধমানে কর্মরত থাকা অবস্থায় লালবিহারী সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং Bengal Peasant Life (১৮৭৪) ও Folk Tales of Bengal (১৮৭৫) নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। দুটি গ্রন্থই দেশিয় এবং ইউরোপিয় শিক্ষিত সমাজের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করে। লালবিহারীর পূর্বে আর কোনো বাঙালি লেখক গ্রামীণ জনগণ এবং তাদের জীবনধারা সম্পর্কে এমন পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণিক চিত্র তুলে ধরতে পারেননি। সেসময় জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবনতি ঘটছিল এবং তা বিদ্রোহের রূপ ধারণ করছিল। লালবিহারীর Bengal Peasant Life গ্রন্থে এই বিক্ষুব্ধ গ্রামীণ জীবনেরই এক বাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা কেন বিদ্রোহী আচরণ করছিল তার কারণও চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এ গ্রন্থে।

লালবিহারী দে’র দুটি বিখ্যাত  উপন্যাস চন্দ্রমুখী (১৮৫৯) এবং গোবিন্দ সামন্ত Bengal Peasant Life থেকে বিষয়বস্ত্ত নিয়ে রচিত। এতে জমিদার কর্তৃক কৃষক-অত্যাচারের নির্মম কাহিনী যথার্থভাবে চিত্রিত হয়েছে। লালবিহারীর পান্ডিত্যপূর্ণ সংকলন Folk Tales of Bengal গ্রামীণ সমাজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংগ্রহে পথিকৃতের কৃতিত্ব দাবি করে। বাস্তবিকপক্ষে এর মাধ্যমে তিনি লোকসাহিত্যের আধুনিক অধ্যয়নের পথ সুগম করেন, যা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল।

শিক্ষাক্ষেত্রে লালবিহারী দে’র গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো দেশিয় ভাষায় শিক্ষাদান এবং বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব উত্থাপন। তাঁর এই প্রস্তাব অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালির জোরালো সমর্থন লাভ করে। তিনি অরুণোদয় নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন যার একটি নীতিই ছিল দেশিয় ভাষায় শিক্ষাদানের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করা। শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ১৮৮২ সালের শিক্ষা কমিশন (হান্টার কমিশন)-এর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। সমাজের নিম্ন শ্রেণির লোকজনদের মধ্যে শিক্ষাকে জনপ্রিয় করার উদ্দেশ্যে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়নের দায়িত্ব সরকার কর্তৃক এই কমিশনের ওপর অর্পিত হয়। আধুনিকমনস্ক লালবিহারী দে প্রথম এই নির্যাতিত শ্রেণির মূল সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করেন এবং তার সমাধানেরও পথ নির্দেশ করেন।

লালবিহারী ছিলেন জমিদারি প্রথার বিরোধী। কৃষকদের দুর্দশা সম্পর্কে তাঁর রচনাবলি তাঁরই সমকালীন দুই প্রতিভাধর লেখক  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং কিশোরীচাঁদ মিত্রের চিন্তাজগতকে প্রভাবিত করেছিল। তাঁরা দুজনেই কৃষকদের সমস্যা সম্পর্কে ক্ষুরধার লেখা প্রকাশ করেন। তাঁদের মতামত ১৮৮০ সালের রেন্ট কমিশনের রিপোর্টকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। ফলে ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল ল্যান্ড টেন্যানসি অ্যাক্ট কার্যকর হয়, যা বাংলার কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার ‘ম্যাগনা কার্টা’ নামে পরিচিত। ১৮৯৪ সালের ২৮ অক্টোবর লালবিহারীর মৃত্যু হয়।  [সিরাজুল ইসলাম]