দূর অনুধাবন প্রযুক্তি


RemoteSensing.jpg

দূর অনুধাবন প্রযুক্তি (Remote Sensing)  দূর থেকে বস্ত্তর সঙ্গে শারীরিক সংস্পর্শে না এসে গৃহীত পরিমাপের সাহায্যে ভৌতিক পদার্থ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ। সাধারণত বিমান বা উপগ্রহ এ পদ্ধতি সমাধা করে। দূর অনুধাবন প্রযুক্তিকে তিনটি পর্বে বিভক্ত করা যায়: (ক) কোনো প্লাটফর্মে বসানো সেন্সর থেকে উপাত্ত সংগ্রহ, যেমন একটি উপগ্রহ (খ) উপাত্ত ব্যবহার এবং (গ) উপাত্তের ব্যাখ্যা যা পরীক্ষাকৃত পৃষ্ঠের বিষয়ভিত্তিক মানচিত্র প্রণয়ণে কাজে লাগে। তড়িৎ চুম্বকীয় বিকিরণ ব্যবহারকারী দূর অনুধাবন ব্যবস্থার

চারটি উপাদান আছে- সূত্র বা উৎস; ভূ-পৃষ্ঠের সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়া; বায়ুমন্ডলের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং একটি সেন্সর। তড়িৎ চুম্বকীয় বিকিরণের উৎস প্রাকৃতিক হতে পারে যেমন সূর্যের প্রতিফলিত আলো বা পৃথিবীর বিচ্ছুরিত উত্তাপ, অথবা মানুষ সৃষ্ট যেমন মাইক্রোওয়েভ রাডার। ভূ-পৃষ্ঠের পারস্পরিক ক্রিয়া অর্থাৎ পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে বিচ্ছুরিত বা প্রতিফলিত বিকিরণের পরিমাণ বা বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে বস্ত্তর বৈশিষ্ট্যের ওপর। তড়িৎচুম্বকীয় শক্তি বায়ুমন্ডলের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করার সময়ে বিকৃতিপ্রাপ্ত ও বিক্ষিপ্ত হয় যা বায়ুমন্ডলীয় মিথস্ক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত এবং বায়ুমন্ডল ও ভূ-পৃষ্ঠের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়াকারী তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ ধরা পড়ে একটি সেন্সরে- যেমন রেডিওমিটার বা ক্যামেরা।

কৌশল ভেদে তিন প্রকারের দূর অনুধাবন প্রযুক্তি প্লাটফর্ম রয়েছে। বিমান চিত্র দূর অনুধাবন প্রযুক্তির সবচেয়ে পুরানো পদ্ধতি এবং আজকের এ উপগ্রহ ও ইলেকট্রনিক স্ক্যানারের যুগেও তা দূর অনুধাবন প্রযুক্তি উপাত্তের সবচেয়ে বহুল ব্যবহূত পদ্ধতি। বিমানচিত্রের অর্থ কোনো বিমান বা বেলুনে স্থাপিত ক্যামেরার সাহায্যে ভূ-পৃষ্ঠের চিত্রগ্রহণ। বৃহদাকৃতির মানচিত্র প্রণয়ন বা সামরিক কাজে এ ধরনের চিত্র খুবই কার্যকর। রাডার ব্যবহারের মাধ্যমে বিমানচিত্রাদি সংগ্রহ করা হয়। এটি একটি উচ্চ ব্যয়বহুল কৌশল বা টেকনিক যা প্রধানত সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহূত হয়। ‘উপগ্রহ দূর অনুধাবন’ অধিকতর আধুনিক উদ্ভাবন। দূর অনুধাবন উপগ্রহসমূহের নক্সা প্রয়োজনমাফিক প্রণীত হয় এবং পৃথিবীর সম্পদরাজি, আবহাওয়া, যোগাযোগ বা সামরিক উদ্দেশ্যে এর ব্যবহার অতি ব্যাপক।

RemoteSensingGoogle.jpg

পৃথিবীর সম্পদরাজি নিরূপণের জন্য ব্যবহূত সবচেয়ে বহুল ব্যবহূত উপগ্রহ হচ্ছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ল্যান্ডস্যাট সিরিজ, ফ্রান্সের স্পট (spot) স্যাটেলাইট সিরিজ ও ভারতের IRS সিরিজ। এগুলো বিভিন্ন ধরনের স্ক্যানারের বাহক, যেমন মাল্টি স্পেকট্রাল স্ক্যানার (MSS), থিম্যাটিক ম্যাপার (TM), প্যানক্রোম্যাটিক (PAN) স্ক্যানার, হাই রেজোল্যুশন ভিজিবল (HRV) স্ক্যানার, লিনিয়ার ইমেজিং এবং সেল্ফ স্ক্যানিং (LISS) সিস্টেম, ওয়াইড ফিল্ড স্ক্যানার (WIFS) ইত্যাদি। সবচেয়ে বহুল প্রচলিত আবহাওয়া সংক্রান্ত উপগ্রহের মধ্যে রয়েছে NOAA, NIMBUS, GOES Meteos ও Himawari। ব্যবহারকারী দেশসমূহ সরাসরি উপগ্রহ কোম্পানি অথবা কোম্পানি নির্ধারিত গ্রাহক কেন্দ্রসমূহ থেকে সচিত্র কিংবা ডিজিটাল আকারে উপগ্রহ উপাত্ত ক্রয় করতে পারে।

বাংলাদেশে মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান বা স্পারসো (Space Research and Remote Sensing Organisation-SPARRSO) নামক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গঠনের পর সত্তরের দশকের প্রথম ভাগ থেকে উপগ্রহ

উপাত্তের ব্যবহার শুরু হয়। সে সময়ে স্পারসো আর্থ রিসোর্সেস টেকনোলজি স্যাটেলাইটের (ERTS) উপাত্ত নিয়মিতভাবে এবং বিনামূল্যে ব্যবহার করত। পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে ল্যান্ডস্যাট (Landsat) রাখা হয়। স্পারসো (SPARRSO) ল্যান্ডস্যাট সিরিজ ও পরবর্তীতে স্পট (SPOT) সিরিজের জন্য আশির দশকের মধ্যভাগে উপাত্ত গ্রাহক স্টেশন প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু প্রধানত নিয়মিত তহবিল যোগান না হওয়ায় কোনোটিই এখন আর চালু নেই। স্পারসো ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান (যেমন ISPAN/EGIS) ও সরকারী সংস্থা উপগ্রহ উপাত্ত নিয়মিত ব্যবহার করছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (Soil Resources Development Institute), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর মৃত্তিকা, পানি সেক্টর ও আবহাওয়া সংক্রান্ত পূর্বাভাষসহ ব্যাপক পরিসরে উপগ্রহ উপাত্তের প্রয়োগ করছে। বাংলাদেশে দূর অনুধাবন উপাত্তের সবচেয়ে সাধারণ প্রয়োগ যে সব উপ-বিভাগে কেন্দ্রীভূত সেগুলো হচ্ছে যথাক্রমে ভূতত্ত্ব, আবহাওয়াবিজ্ঞান, কৃষি, বন বিভাগ, পরিসংখ্যান, মৎস্য, সমুদ্র বিজ্ঞান, মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যা, পানি সম্পদ ও যন্ত্রায়ন (instrumentation)। সত্তরের ও আশির দশকের প্রথম দিকে ভূমি ব্যবহার, ভূমি-মানচিত্রায়ন এবং জল-ভূপ্রাকৃতিক ব্যাখ্যানে ল্যান্ডস্যাট এম.এস.এস (Landsat MSS) উপাত্ত ব্যবহার করা হতো। পরবর্তী পর্যায়ে নতুন প্রজন্মের উন্নততর মডেলের ল্যান্ডস্যাট টি.এম (Landsat TM) উপাত্ত ও স্পট (SPOT) চিত্র বাংলাদেশে ব্যাপক পরিসরে ব্যবহূত হচ্ছে। সম্প্রতি গবেষণার জন্যে আই.আর.এস- ১সি-প্যান (IRS- 1C PAN) উপাত্ত (ভূসম্পদ অনুসন্ধানী উপগ্রহ সমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ বিভাজন, ৫.৮ মিটার ভূ-বিভাজন) ব্যবহার করা হচ্ছে। [মোহা. শামসুল আলম এবং মাসুদ হাসান চৌধুরী]