দুদু মিয়া


দুদু মিয়া (১৮১৯-১৮৬২)  হাজী শরীয়তউল্লাহর একমাত্র পুত্র। তিনি ১৮১৯ সালে মাদারীপুর জেলার শ্যামাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম মুহসীনউদ্দীন। ‘দুদু মিয়া’ ছিল তাঁর ডাক নাম। ১৮৪০ সালে পিতার মৃত্যুর পর দুদু মিয়া ফরায়েজী আন্দোলন এর নেতৃত্ব লাভ করেন।

শিক্ষাগ্রহণের জন্য তিনি প্রায় পাঁচ বছর মক্কায় অতিবাহিত করেন এবং পিতার অসুস্থতার কারণে ১৯ বছর বয়সে দেশে ফিরে আসেন। এসময় দেশের পরিস্থিতি ছিল জটিল। হিন্দু জমিদার, ইউরোপীয় নীলকর, রক্ষণশীল উলেমা এবং সাবেকি (পুরাতন) মুসলিম সমাজের সাথে ফরায়েজীরা সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। এ সকল গোষ্ঠী পৃথক পৃথকভাবে এবং কখনও যৌথভাবে ফরায়েজীদের আক্রমণ করত। এ সংঘর্ষে সরকারও জমিদার নীলকরদের পক্ষ নিত। পিতার চেয়ে কম শিক্ষিত হলেও দুদু মিয়া ছিলেন যৌবনদীপ্ত, উদ্যমী এবং দক্ষ কূটনীতিজ্ঞ। বস্ত্তত বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার অসহায় গ্রামীণ সমাজে তিনি স্বীয় যুগের প্রবর্তন করেন।

ফরায়েজীরা যাতে কার্যকরভাবে বিরোধীদের মুখোমুখি হতে পারে সেজন্য তিনি সনাতন স্বশাসিত সংগঠন পঞ্চায়েত ব্যবস্থা-র পুনঃপ্রবর্তন করেন। গ্রামাঞ্চলের বিরোধসমূহ আলাপ-আলোচনা ও সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার জন্য এ পঞ্চায়েত প্রথা কার্যকর ভূমিকা পালন করে। পঞ্চায়েতের সুশৃংখল এবং সফল পরিচালনার জন্য তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন। এ বাহিনীর মাধ্যমে তিনি জমিদার ও নীলকরদের ভাড়াটে বাহিনীর শক্তি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করে দেন। ফলে ১৮৩৮ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত দুই দশক ফরায়েজী এলাকায় শান্তি বিরাজ করে। ফরায়েজীদের বাড়ি ও মহল্লা নিয়ে তিনি এক একটি (৫০ থেকে ৫০০ সদস্যের) এলাকা গঠন করেন এবং গ্রামবাসী ও তাঁর মধ্যে সংযোগ সাধনকারী হিসেবে গ্রাম খলিফা (গ্রামের প্রতিনিধি) নিয়োগ করেন। বেশ কিছু গ্রাম নিয়ে গঠিত হয়েছিল একটি গির্দ (সার্কেল)। একজন তত্ত্বাবধায়ক খলিফাকে এগুলির উপর কর্তৃত্ব দেওয়া হতো। তত্ত্বাবধায়ক খলিফাকে প্রধান করে গ্রাম খলিফাগণ একটি পরিষদ গঠন করতেন এবং সালিশি আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন দ্বন্দ্ব-কলহ মীমাংসা করতেন। বাহাদুরপুরে দুদুমিয়া তাঁর প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন। তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উপদেশ দেওয়ার জন্য এবং তত্ত্বাবধায়ক খলিফাদের প্রেরিত বিষয়াবলির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য তিনি কয়েকজন উপরিস্থ খলিফার সমন্বয়ে একটি পরামর্শ সভা গঠন করেন।

এরূপ ব্যবস্থার মাধ্যমে দুদু মিয়া ফরায়েজী সমাজের সর্বত্র তার প্রতীকী উপস্থিতি বজায় রাখেন এবং যে সকল অঞ্চল তখনও কোম্পানি প্রশাসনের বাইরে ছিল সে সব এলাকায় বেসরকারি প্রশাসনের ফলপ্রসূ উন্নয়ন সাধন করেন। এ সব এলাকায় এতদিন পর্যন্ত নীলকরগণ ছিল সকল বিষয়ে সর্বেসর্বা এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তএর ক্ষমতায় ক্ষমতাবান জমিদারগণ ছিল সরকারের সহায়ক।

পিতার আর্থ-সামাজিক নীতি অনুসরণ করে দুদু মিয়া মানব কল্যাণে সমতা ও ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা দেন এবং শ্রমের ওপর জমির মালিকানা নিহিত এ মতবাদ প্রচার করেন। তিনি ঘোষণা করেন ‘জমির মালিকানা কৃষকের’। তাঁর এ ঘোষণা নির্যাতিত কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের কৃষকরা ফরায়েজী আন্দোলনের সমর্থনে তাঁর চারপাশে ভিড় জমাতে থাকে। গ্রামভিত্তিক খিলাফত সংগঠনের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ সমাজের লোকদের ঝগড়া বিবাদ কমিয়ে আনেন এবং আপস-মীমাংসা সাধন করেন। অপরাধীদের খিলাফত আদালতে ডেকে এনে কার্যকরভাবে তাদের উপর বিচারকার্য প্রয়োগ করা হয়। ফরায়েজী খলিফার অনুমতি ব্যতীত কোনো বিরোধ নিয়ে সরকারি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার উপর তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তাঁর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে মামলার পক্ষে-বিপক্ষে কোনো প্রকার সাক্ষীসাবুদ জুটত না।

দুদু মিয়া অবশ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অস্বীকার করতেন না। বিভিন্ন সময় ইংরেজ অফিসারদের সাথে তিনি মেলামেশা করেছেন, তাদের সাথে বন্য মোষ শিকারে গেছেন এবং তাদেরকে তাঁর আসল উদ্দেশ্য বুঝতে দেন নি। খাস মহলের খাজনা তালিকায় প্রদর্শিত হারে জমিদারের রাজস্ব আদায়ের অধিকার তিনি স্বীকার করতেন। পাছে তাঁর অনুসারীদেরও তিতুমীর এর অনুসারীদের মতো ভাগ্যবিপর্যয় ঘটে সেজন্য তিনি পিতার বিচক্ষণতা অনুসরণ করে তাঁর কর্মকান্ড একজন আইনানুগ প্রজার অধিকারের মধ্যে সীমিত রাখেন। ব্রিটিশ সৈন্য বাহিনীর হাতে চূড়ান্তভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার এক বছর আগে ১৮৩০ সালে তিতুমীরের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটেছিল।

দুদু মিয়াকে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব এর পর সরকার বন্দি করে। ১৮৬১ সালে মুক্তির পূর্বপর্যন্ত কলকাতার নিকটবর্তী আলীপুর জেলে তাঁকে আটক রাখা হয়। ১৮৬২ সালে ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।  [মঈন-উদ-দীন আহমদ খান]

গ্রন্থপঞ্জি  Muin-ud-Din Ahmad Khan, History of the Fara’idi Movement, Dhaka , 1984.