দুগ্ধখামার


দুগ্ধখামার (Dairy farm)  দুগ্ধবতী গাভী পালনের জন্য গবাদি পশুর খামার। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ করে দুগ্ধ উন্নয়ন খাতে পশুসম্পদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। চাষাবাদ, ফসলমাড়াই ও পরিবহণের জন্য ব্যবহার ছাড়াও পশুসম্পদ দুধ, মাংস, চামড়া প্রভৃতি উৎপাদনের প্রধান উৎস। দেশে রয়েছে প্রায় ২৩০.৪০ লক্ষ গরু যার মধ্যে প্রায় ১০০ লক্ষ দুগ্ধবতী গাভী।

বাংলাদেশে স্থানীয় গরু ছোট ‘জেবু’ ধরনের, পরিণত বয়সে দৈহিক ওজন হয় ১৫০ থেকে ১৮০ কেজি; প্রতি বছরে প্রায় ২৫০ লিটার দুধ উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন, দুগ্ধদানকাল মাত্র প্রায় ৫ মাস। গাভী ৩-৪ বছর বয়সে প্রথম বাচ্চা প্রসব করে। পরবর্তী বাচ্চা জন্মদানের মধ্যবর্তী সময় মোটামুটি ১৮ মাস, তবে পর্যাপ্ত পুষ্টি দেয়া না হলে অথবা ভারবাহী কাজে ব্যবহূত হলে আরও বিলম্ব হতে পারে। কিছু উন্নত স্বাস্থ্যবান গরু দেখা যায় শহর এলাকার আশেপাশে এবং বাঘাবাড়িঘাট এলাকায়, যেখানে শীতকালীন চারণভূমি পাওয়া যায় এবং যেখানে হরিয়ানা, শাহীওয়াল ও সিন্ধি জাতের সঙ্গে স্থানীয় গরুকে সংকরায়ণ করা হয়েছে। এসব সংকরজাত গাভী দুগ্ধদান সময়কালে ৭৫০ লিটার পর্যন্ত দুধ দিতে পারে।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ইউরোপীয় দেশগুলি থেকে গুঁড়া দুধ বা দুগ্ধজাতপণ্য আমদানি সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে। সেই সঙ্গে বিশ্ববাজারে দুধের দাম বৃদ্ধির ফলে দেশে দুগ্ধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রে নতুনভাবে সচেতনতা সৃষ্টি হয়। একটি অনুকূল সরকারি নীতির কারণে সম্প্রতি বিপুল সংখ্যক বেসরকারি উদ্যোক্তা শহর ও উপশহর এলাকায় ক্ষুদ্র দুগ্ধখামার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছে।

বর্তমানে দেশে অনেক তালিকাভুক্ত ক্ষুদ্র দুগ্ধখামার রয়েছে। এসব খামারে ৫-২০০ গাভী রয়েছে যাদের ২০% স্থানীয় (গড়ে প্রতি গাভী দিনে ১.৫ লিটার দুধ দেয়) এবং ৮০% সংকরজাতের (প্রতি গাভী গড়ে দিনে ৫.৫ লিটার দুধ দেয়)। এসব খামারের ব্যবস্থাপনা সাধারণত উন্নত ধরনের কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাজারের তৃণজাতীয় ও দানাদার পশুখাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। ব্যয় লাভ অনুপাত ১:১.০৩ নিয়ে এসব খামার সামান্য লাভজনক প্রতিষ্ঠান। তবে এসব খামার বছরে প্রায় ৬৫০ জন-দিবস কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ইতোমধ্যে এসব খামারের অনেকগুলির বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উদাহরণস্বরূপ, বগুড়ায় ২০১টি তালিকাভুক্ত ক্ষুদ্রাকৃতির প্রতিষ্ঠিত খামারের মধ্যে দুগ্ধ বাজারজাতকরণ ও অধিকতর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সমস্যার কারণে ১৪৭টি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।

পশুখাদ্য উৎপাদনের ভূমিসহ ২০০-এর অধিক দুগ্ধবতী গাভীর খামারকে বৃহৎ খামার হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়। এগুলি প্রধানত দুধরনের, সরকারি মালিকানাধীন খামার এবং বেসরকারি খাতে প্রতিষ্ঠিত খামার। অধিকাংশ বৃহদাকৃতির খামার সরকারের মালিকানাধীন, ৬টি মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়াধীন এবং ৩টি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন। রাজশাহী দুগ্ধখামার ব্যতীত, অধিকাংশ খামারে সংকর ও বিশুদ্ধ বিদেশি জাতের গবাদিপশু রয়েছে। এসব খামারে রয়েছে তাদের নিজস্ব দুগ্ধ-প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা। পাস্ত্তরিত মোড়কজাত দুধ সরকারি হাসপাতাল, আর্মি কোয়ার্টারস এবং কিছু পরিমাণে খোলা বাজারে বিক্রয় করা হয়। দেশে বেশ বড় আকারের কিছু বেসরকারি দুগ্ধখামার রয়েছে যেমন, ধামরাই ডেইরি, টিউলিপ ডেইরি, ও গোছিহাটা ডেইরি খামার। এসব খামারে রয়েছে তাদের নিজস্ব শীতলকরণ, পাস্ত্তরিতকরণ, মোড়কজাতকরণ ও পরিবহণ ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে পাস্ত্তরিত তরল দুধ পলিব্যাগে করে শহরাঞ্চলে বিক্রয় করা হয়। এসব খামারের অধিকাংশ গাভী সংকরজাত, কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশুদ্ধজাতও (ফ্রিজিয়ান) দেখা যায়।  [কাজী এম এমদাদুল হক]

আরও দেখুন দুধ; দুগ্ধজাত পণ্য

দুগ্ধজাত পণ্য (Dairy products) মিষ্টান্নসহ দুধের তৈরি যাবতীয়  খাদ্যসামগ্রী। বহুকাল আগে থেকেই বাংলাদেশের মানুষের খাবারে দুগ্ধজাতপণ্য ঐতিহ্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উল্লেখযোগ্য দুগ্ধজাতপণ্য হচ্ছে সর বা ক্রিম (cream), দই, ছানা, মাখন, ঘি, পনির প্রভৃতি। ক্রিমে স্নেহপদার্থের পরিমাণ শতকরা ১৮ ভাগের কম নয়, সাধারণত ১৮ থেকে ৮০ ভাগের মধ্যে। স্থানীয়ভাবে সর, মালাই হিসেবেও পরিচিত। মাখন, ঘি ও আইসক্রিম তৈরিতে ক্রিমের ব্যবহার ব্যাপক।

দই  গাঁজনকৃত দুগ্ধপণ্য যা স্বাভাবিক দুধ বা দুধের সর থেকে তৈরি করা যায়। বিশুদ্ধভাবে উৎপাদিত যে কোনো গাঁজানোর উপযোগী অণুজীব সামান্য পরিমাণে ব্যবহার করে দই তৈরি করা যায়। সামান্য পরিমাণ পূর্বে তৈরিকৃত দই দুধে যোগ করেও দই তৈরি করা যায়। দই মিষ্টি হতে পারে বা ফলের রস প্রভৃতি দিয়ে সুঘ্রাণযুক্ত করা যেতে পারে। উন্নতমানের দই তৈরির জন্য বিশুদ্ধভাবে উৎপাদিত Streptococcus thermophilusLactobacillus species ব্যবহার করা হয়। বগুড়ায় তৈরি দই বিশেষভাবে জনপ্রিয়। সাধারণত দইয়ের পুষ্টিমান নির্ভর করে দুধ ও তৈরির সময় ব্যবহূত অন্যান্য উপাদানের ওপর।

পনির  তৈরি করা হয় ঘনীভূত দুধ থেকে। দুধের ঘনীভূত অংশ থেকে জলীয় অংশ আলাদা করার জন্য ছোট ছোট টুকরা করা হয়। ঘনীভূত দুধ শুকানো হয়, লবণ মিশানো হয়, তারপর চাপ প্রয়োগে পনিরের চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। তৈরির কৌশল ও স্বাদের ওপর ভিত্তি করে পনিরের বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়। কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রামের পনির মান ও স্বাদের জন্য বিখ্যাত।

ছানা ফুটন্ত দুধে পর্যাপ্ত টক, ছানার পানি, লেবুর রস বা সাইট্রিক এসিড দ্রবণ মিশিয়ে জমানো দুধের স্নেহপদার্থের (entrained milk fat) সঙ্গে আমিষ পৃথক করে তৈরি করা হয়। ছানাকে মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে তৈরি করা যায় নানাধরনের মিষ্টি, যেমন রসগোল্লা, সন্দেশ, কাঁচাগোল্লা, চমচম, মন্ডা, রসমালাই, ছানামুখী প্রভৃতি। নাটোরের কাঁচাগোল্লা, টাঙ্গাইলের চমচম ও কুমিল্লার রসমালাই, মুক্তাগাছার মন্ডা, ব্রাক্ষণবাড়ীয়ার ছানামুখী প্রভূতি নামকরা মিষ্টি। ভারতীয় উপমহাদেশ বিশেষ করে বাংলাদেশে মিষ্টান্ন অত্যন্ত জনপ্রিয় খাদ্য, বিশেষ ধরনের অনুষ্ঠানে একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। মহিষের দুধ ছানা তৈরির জন্য উপযোগী নয়।

মাখন  ক্রীমের মন্থনের (churning) মাধ্যমে তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় শতকরা ৩৫-৪২ ভাগ স্নেহপদার্থবিশিষ্ট ক্রিম, যা তৈরির পরপরই বা কিছু সময় রেখে টক করে ব্যবহার করা যায়। মাখনের উপাদান বিভিন্ন হতে পারে। একটি গড়মাত্রার মাখনে রয়েছে শতকরা ৪২ ভাগ স্নেহপদার্থ, ০.৪ ভাগ আমিষ, ১৫ ভাগ পানি, ২ ভাগ লবণ, এবং খাদ্যপ্রাণ এ ও ডি।

ঘি  শোধনকৃত মাখন, এতে শতকরা প্রায় ৯৯.৭ ভাগ দুগ্ধ-স্নেহপদার্থ থাকতে পারে এবং গরু ও মহিষ উভয়ের দুধ থেকে তৈরি করা যায়। ঘি শক্তির একটি ঘনীভূত উৎস এবং বাংলাদেশে পোলাও, বিরিয়ানি, রোস্ট, কোরমা ও এ ধরনের অন্যান্য সুস্বাদু খাদ্য তৈরিতে ব্যবহূত হয়।  [এ.কে.এম আবদুল মান্নান]