দিনাজপুর মিউজিয়াম


দিনাজপুর মিউজিয়াম  ১৯৬৮ সালের এপ্রিলে দিনাজপুর নাজিমুদ্দিন হলের দক্ষিণ পার্শ্বে নির্মিত টিনসেডে স্থাপিত হয়। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন দিনাজপুর জেলা প্রশাসক প্রত্নতত্ত্ববিদ এ.কে.এম যাকারিয়া প্রত্নতাত্ত্বিক বস্ত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রদর্শনীর জন্য দিনাজপুর শহরে প্রথম মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এমতাবস্থায় এ.কে.এম যাকারিয়া, সৈয়দ মোশাররফ হোসেন, অধ্যক্ষ মোশাররফ হোসেন মাহমুদ, ইতিহাসবিদ মেহরাব আলী প্রমুখ বিদগ্ধ জনের সহযোগিতা লাভ করেন এবং খাজা নাজিমুদ্দিন মুসলিম হল ও লাইব্রেরির সভাপতি হিসেবে (পদাধিকার বলে) এক সভা আহবান করেন। এ সভায় মিউজিয়াম স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মিউজিয়ামের কিউরেটর নিযুক্ত হন ইতিহাসবিদ মেহরাব আলী। মিউজিয়াম পরিচালনার জন্য সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি মিউজিয়াম পরিচালনা কমিটি গঠিত হয়। নাজিমুদ্দিন হলের সভাপতি এ.কে.এম জাকারিয়া এবং সম্পাদক অধ্যক্ষ মোকাররম হোসেন মাহমুদ পদাধিকার বলে উক্ত কমিটির সভাপতি ও সম্পাদক নিযুক্ত হন।

১৯৬৮ সালে মাঝামাঝিতে দিনাজপুর মিউজিয়াম নওয়াবগঞ্জ উপজেলায় সীতাকোট বিহারে পূর্ব পাকিস্তান প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাথে প্রথম যৌথভাবে খননকার্যে অংশগ্রহণ করে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক বস্ত্ত আবিস্কার করে। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত মিউজিয়ামের জন্য সংগৃহীত বস্ত্তর সংখ্যা ছিল ৮ শতাধিক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মিউজিয়াম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ধাতব বস্ত্তসমূহ লুট হয় এবং প্রস্তর মূর্তিগুলি ভেঙ্গে ফেলা হয়। সে সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত বস্ত্তগুলির মধ্যে ছিল প্রস্তর ভাস্কর্য, বিভিন্ন দেবদেবীর ব্রোঞ্জ মূর্তি (১৭), পিতলের মূতি, কাঠের মূর্তি, প্রস্তর স্তম্ভ, খিলান ও প্রস্তর শিল্পের অন্যান্য নিদর্শন, পোড়ামাটির চিত্র ফলক, অলংকৃত প্রাচীন ইট, প্রাচীন মুদ্রা, প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্র, বাংলা ও আরবি-ফারসি ভাষায় উৎকীর্ণ শিলালিপি, বাংলা ও আরবি-ফারসি ভাষায় উৎকীর্ণ ইস্টকলিপি, আরবি, ফারসি, উর্দু বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লিপিবদ্ধ দলিলপত্র, ভূর্জ ও তালপত্র এবং তুলট কাগজে লিপিবদ্ধ সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় হস্তলিখিত পান্ডুলিপি, হস্তলিখিত কোরান শরীফ ইত্যাদি, কিছু প্রাচীন চিত্র,  কিছু প্রাচীন আসবাব ও তৈজসপত্র,  সীতাকোট বিহার থেকে উদ্ধারকৃত প্রত্নবস্ত্ত এবং অন্যান্য প্রত্নবস্ত্ত।

১৯৭২ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত মিউজিয়ামের কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছিল। এরপর Norwegian Organization for Relief and Development (NORAD)-এর ১৫ লক্ষ টাকা আর্থিক অনুদানে (১৯৮৩-১৯৮৫) টিন সেডের দক্ষিণ পার্শ্বে একটি দ্বিতল মিউজিয়াম ভবন নির্মিত হয়। নীচতলায় মিউজিয়াম গ্যালারি এবং উপরতলায় একটি লাইব্রেরির ব্যবস্থা রাখা হয়। বর্তমানে মিউজিয়ামে সংরক্ষিত প্রত্নবস্ত্তর সংখ্যা ১৩১৩। প্রত্নবস্ত্তসমূহের মধ্যে রয়েছে মূর্তি (হিন্দু ৯৯, বৌদ্ধ ৩, জৈন ২, ভগ্ন ৬৪, অন্যান্য ৯), মুদ্রা (উপনিবেশিক আমলের ৬৭৫, পাকিস্তানী ৯০, খোদাইকৃত মুদ্রা ৬, ভারতীয় ১৭, বিদেশি ২৩), শিলালিপি পাথরের শিলালিপি ১৪, পোড়ামাটির ১০), ছোট বস্ত্ত (পোড়ামাটির ফলক ১৬, মৃৎপাত্র ৪, অলঙ্কৃত ইস্টক খন্ড ১০২), বিভিন্ন ধরনের বস্ত্ত (পোড়ামাটি ১৭, পাথরবস্ত্ত ১৭, মুক্তিযুদ্ধের বস্ত্ত ৮৩, কাঠ জাতীয় দ্রব্যাদি ২, ভাঙ্গা মৃৎপাত্র ২, পদক ৬, বাঁশ জাতীয় ৪, ছবি সংক্রান্ত ৩, অন্যান্য ৪৫।  [মুহম্মদ মনিরুজ্জামান]