দারুশিল্প


দারুশিল্প কাঠের গায়ে খোদাই করা নকশা। কাঠ বা দারু একটি জড় পদার্থ হলেও মানুষ তা খোদাই-এর মাধ্যমে প্রাণবন্ত করে তোলে। প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহূত খাট-পালঙ্ক, সিন্দুক, চৈত্য, নববধূর সিঁদুরদান, গৃহের আসবাব ইত্যাদি ছাড়াও কাঠের খুঁটি, শুঁড়ো, গৃহের স্তম্ভ প্রভৃতির গাত্র অলঙ্করণে দারুশিল্পের ব্যবহার দেখা যায়।

নকশাকৃত দরজা

অতীতের বাংলায় এবং আজকের বাংলাদেশে দারুশিল্পের প্রাচীন ঐতিহ্য ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংরক্ষণের অভাব এবং রাজনৈতিক কারণে বাংলার দারুশিল্পের নিদর্শন ব্যাপকভাবে পাওয়া না গেলেও এগারো ও বারো শতকের বেশ কয়েকটি দারুশিল্প মুন্সিগঞ্জ জেলার রামপাল থেকে সংগৃহীত হয়েছে। এগুলি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে। রামপাল থেকে প্রাপ্ত এগারো-বারো শতকের স্তম্ভদুটির অলঙ্করণশৈলী ছিল অতি নিখুঁত। মূর্তি, ফুল, লতা-পাতা রূপায়ণে কোথাও ছন্দপতন ঘটে নি। নির্মাণকালে এ দারুশিল্পকর্মে যে পাথরের মসৃণতা ছিল তা স্পষ্টই বোঝা যায়। ঢাকার টঙ্গিবাড়ির সোনারঙ থেকে প্রাপ্ত ধ্যানাসন মুদ্রায় উপবিষ্ট বিষ্ণু মূর্তিসম্বলিত কাঠের দ্বারশীর্ষটি বাংলার দারুশিল্পের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকায় এর অলঙ্করণশৈলী বিনষ্ট হয়েছে। টঙ্গিবাড়ি থেকে প্রাপ্ত লোকনাথটিও দারুশিল্পের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

মুন্সিগঞ্জের কাজীকসবা গ্রামের পুকুর খননকালে প্রাপ্ত সুরসুন্দরী ভাস্কর্যসম্বলিত স্থাপত্য নিদর্শনটি বাংলার এক অনন্য দারুশিল্প। টিয়া পাখি হাতে অতিভঙ্গ দন্ডায়মান সুরসুন্দরীর পানপাতা সদৃশ মুখমন্ডল, আয়ত চক্ষু, খাড়া নাক, মুখে স্মিত হাসি অনুসূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে। ফরিদপুর থেকে প্রাপ্ত কাঠের তীর্থঙ্কর মূর্তিটি দশ-এগারো শতকের বলে পন্ডিতগণ মনে করেন। এটি কলকাতার আশুতোষ জাদুঘরের সংগ্রহে আছে। দীনেশচন্দ্র সেনের বৃহৎ বঙ্গ গ্রন্থে সাতক্ষীরা জেলার একটি মন্দিরের (আনুমানিক চৌদ্দ শতক) কারুকার্যময় কাঠের শিল্পকর্মের উল্লেখ আছে।মালদহ জেলাতে কারুকার্যময় দারুশিল্পকর্ম পাওয়া গেছে যা ষোল শতকের বলে পন্ডিতগণ মনে করেন। এসব নির্দশন থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, বাংলায় দারুশিল্পের নিজস্ব ঐতিহ্য ছিল যা অদ্যাবধি লক্ষণীয়। তবে বাংলার দারুশিল্পে নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন ধারা সংযোজিত হয় সতেরো শতক থেকে ঊনিশ শতকের মধ্যে। বাংলায় বিদেশি বণিকদের যাতায়াতের সূত্র ধরে বিদেশি দারুশিল্পের অলঙ্করণশৈলী ও নকশা এদেশে প্রভাব বিস্তার করে। তখন থেকে বাংলায় নিজস্ব ঐতিহ্যগত দারুশিল্পের সঙ্গে বহিরাগত উপাদানের মিথস্ক্রিয়া ঘটে। ফলে সৃষ্ট হয় এক সঙ্কর শিল্পধারা।

নকশাকৃত বেড়া ও দরজা

ইউরোপীয় জীবনাদর্শ অনুকরণযোগ্য বিবেচিত হলে ইউরোপীয়দের অনুকরণে ভারত তথা বাংলায় বৈঠকখানা, শয়নকক্ষ ও খাবার ঘরের জন্য নির্মিত হতে থাকে স্বতন্ত্ররূপের অলঙ্কৃত আসবাবপত্র। আঠারো ও ঊনিশ শতকে এ ধরনের আসবাবের প্রতি আকর্ষণ শুধু উচ্চবিত্ত বা জমিদার শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নি, এর প্রভাব ভারত তথা বাংলার সকল শ্রেণীর মধ্যে বিস্তার লাভ করে। জনগণ তাঁদের সাধ্যমত বিদেশি নকশার অনুকরণে আসবাবপত্র তৈরি করতে থাকেন। বিদেশি প্রভাবে আসবাব তৈরি হলেও গ্রামবাংলায় লোকায়ত শৈলীতে আসবাবপত্রের নির্মাণকার্য অব্যাহত থাকে। গ্রামবাংলায় দারুশিল্পীরা তাঁদের নিজস্ব শৈলীর সঙ্গে বিদেশি নকশার সম্মিলন ঘটিয়েছেন, আবার কখনও শুধু লোকায়ত শৈলীতে বেড়া, সিন্দুক, খাট-পালঙ্ক, ঢেঁকি, প্যানেল ইত্যাদি তৈরি করেছেন।


নকশাকৃত খাট

দারুশিল্পে লোকায়ত নকশার মধ্যে পশুপাখি, দৈনন্দিন ও সামাজিক জীবনের বিভিন্ন দৃশ্য, বনফুল, কলমিলতা, লৌকিক দেবদেবী ইত্যাদি প্রাধান্য পেয়েছে। ধর্মীয় কাহিনী অবলম্বনেও দারুশিল্পে খোদিত হয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। এর মধ্যে রাধাকৃষ্ণ, কৃষ্ণের বস্ত্রহরণ, কৃষ্ণের গোচারণ দৃশ্য, দধিমন্থন, গৌর নিতাই, দুর্গা অন্যতম। এছাড়া কিছু প্রতীকধর্মী নকশাও দারুশিল্পে দেখা যায়। যেমন জোড়া পাখি, ময়ূর, বাঘ, সিংহ, হাতি, অশ্ব, তরঙ্গায়িত লতা, বৃক্ষ, মঙ্গলঘট, সর্প, পদ্ম, ফুটন্ত পদ্ম, জোড়া সংখ্যা ইত্যাদি। বিদেশি প্রভাবে তৈরি নকশার মধ্যে তরঙ্গায়িত পুষ্পলতা, কলকা, পেঁচা, সর্প, বোরাক, ফুলদানি হতে উত্থিতফুল, জালিকাজ, অ্যাকান্থাস, প্যাটেরা নকশা, পায়া নকশা, থাবাযুক্ত পায়া, ভিক্টোরিয়ান পায়া, ক্যান্ডিলাব্রা নকশা, জ্যামিতিক নকশা, আঙুরলতা ইত্যাদি প্রাধান্য পেয়েছে।

সাধারণত বাংলাদেশের লোকায়ত নকশা ও মিশ্র নকশায় গৃহের বেড়া, দরজা, প্যানেল, মন্দিরগাত্র, স্তম্ভ, খাট-পালঙ্ক, চেয়ার, টেবিল, সিন্দুক, প্রসাধনী বাক্স, পালকি, চৈত্য, রথ অলঙ্কৃত হয়ে থাকে। এসব অলঙ্করণে সূত্রধরের ভূমিকা প্রাধান্য পেলেও কখনও কখনও গৃহস্বামীর ভূমিকাও মুখ্য হয়ে ওঠে।

এভাবে দেশি ও বিদেশি নকশার মিশ্রণে বাংলাদেশে অলঙ্কৃত দারুশিল্পের ক্রমোন্নতি হতে থাকে। ১৯৪৭-এর পর বাংলাদেশের অনেক সূত্রধর ভারতে চলে গেলে বাংলাদেশে দারুশিল্পের অগ্রযাত্রা থেমে যায়। পরবর্তী সময়ে এদেশীয় সূত্রধরা দারুশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে এ শিল্পের বিকাশ ঘটে নি। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী দারুশিল্পের কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যদিও নিখুঁত কাজ প্রতিফলিত হচ্ছে না।

সতেরো থেকে ঊনিশ শতকে আসবাবের নকশার ক্ষেত্রে যে বৈচিত্র্য ছিল বর্তমানে তা লক্ষ্য করা যায় না। এখন আসবাবের অলঙ্করণ শৈলীতে এবং নকশায় নতুন ধারা সংযোজিত হচ্ছে।

নকশাকৃত সিন্দুক

পূর্বে খাট-পালঙ্কের নকশায় ভিক্টোরিয়ান আসবাবের অনুকরণে পায়াগুলিতে হাতির পা এবং সিংহ ও বাজপাখির থাবা খোদিত হতো। পালঙ্ক, চেয়ার, টেবিল, দেওয়াল তাক, আলমিরা ইত্যাদির অঙ্গসজ্জায় পরী, ময়ূর, সিংহমুখ, সিংহ, ঘোড়া ইত্যাদি নকশা স্থান পেত। বর্তমানে এসব নকশার পরিবর্তে আধুনিক নকশা সংযোজিত হচ্ছে। আসবাবের গঠনেও বৈচিত্র্য এসেছে। অধিকাংশ পালঙ্কে কারুকার্যময় পায়ার পরিবর্তে বক্সখাটের প্রচলন হয়েছে। পালঙ্কের সিরানা, মশারির ছত্রীতে এখন আর ফুললতাপাতার অলঙ্করণ হয় না। গ্রামাঞ্চলে ঐতিহ্য অনুযায়ী কুনের কাজযুক্ত পায়া, মশারির ছত্রী, পালঙ্কের সিরানা তৈরি হলেও খোদাই কাজের মধ্যে সূক্ষ্মতা নেই। এখন উচ্চবিত্ত পরিবারে কাঠের অলঙ্কৃত দরজা বেশ সমাদৃত হচ্ছে। এ সব দরজায় গাত্র-অলঙ্করণে খোদাই কাজের চেয়ে মেশিনে কাটা ফুললতাপাতা নকশা প্রাধান্য পাচ্ছে।

আসবাবের ক্ষেত্রেও একই ধারা লক্ষ্য করা যায়। এখন নতুন আঙ্গিকে আসবাব তৈরির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী আসবাবও তৈরি হচ্ছে। এর বড় পৃষ্ঠপোষক উচ্চবিত্ত পরিবার।

শুধু আসবাবই নয় দারুশিল্প পদ্ধতিটি ব্যবহূত হতে পারে বাদ্যযন্ত্র, পুতুল, তৈজসপত্র, গৃহসজ্জার নিদর্শন, ভাস্কর্য, নৌকা ও ট্রাকের সম্মুখভাগের অলঙ্করণে। দারু বা কাঠকে সাধারণত চার পদ্ধতিতে অলঙ্কৃত করা যায়, যেমন: Carving, Engraving, Inlay, Ges Painting। এগুলির মধ্যে খোদাই কাজটিই বেশি সমাদৃত হয়েছে। আঠারো-উনিশ শতকে ইনলে (Inlay) কাজ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ইনলে (Inlay) কাজে হাঁতির দাঁতের সূক্ষ্ম পাত ব্যবহার করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে ধাতব পাতও ইনলে কাজে ব্যবহূত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে কাঠের উপর ধাতবতারের ইনলে কাজ নতুনভাবে শুরু হয়েছে। Carving I Ges painting পদ্ধতি দুটির মাধ্যমে দারুশিল্পীরা বিভিন্ন নকশা কাঠে ফুটিয়ে তোলেন। সেসব নকশার উপর রঙের প্রলেপ দিয়ে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়।  [জিনাত মাহরুখ বানু]