দন্ডভুক্তি


দন্ডভুক্তি  প্রাচীন বাংলার একটি প্রশাসনিক বিভাগ বা ভুক্তি। পশ্চিমবঙ্গের (ভারত) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এ ভুক্তিটি বিস্তৃত ছিল। দন্ডভুক্তি বা দন্ডভুক্তিমন্ডল সাত শতকের প্রথমার্ধে প্রাধান্য লাভ করে। এ সময় গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক এর অধীনস্থ মহাপ্রতিহার শুভকীর্তি এ ভুক্তি শাসন করছিলেন। দন্ডভুক্তিমন্ডল ও উৎকলের প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল শশাঙ্কের অধীনস্থ সামন্ত-মহারাজ সোমদত্তের উপর। মেদিনীপুরে প্রাপ্ত শশাঙ্কের দুটি তাম্রশাসন, বাংলার কম্বোজ শাসকদের ইরদা তাম্রশাসন এবং রাজেন্দ্র চোলের তিরুমুলাই তাম্রশাসনে একটি স্বতন্ত্র ভূ-রাজনৈতিক একক হিসেবে দন্ডভুক্তির উল্লেখ রয়েছে। সন্ধ্যাকর নন্দীও তাঁর রামচরিতম্ এ দন্ডভুক্তির উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণাদির ভিত্তিতে মনে করা যায় যে, দন্ডভুক্তি গঠিত হয়েছিল বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল এবং উড়িষ্যার বালাশোর জেলার একটি অংশ নিয়ে। মেদিনীপুর জেলার আধুনিক দান্তান বা দাতান এলাকার নামকরণের মধ্যে দন্ডভুক্তির স্মৃতি বিদ্যমান।

ভৌমকর রানীর দুটি তাম্রশাসনে উল্লেখ আছে যে, দন্ডভুক্তিমন্ডল উত্তর-তোসালির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল এবং তমাল-খন্ড ও দক্ষিণ-খন্ড নামের দুটি জেলা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ দুটি জেলাকে যথাক্রমে তমলুক ও দাকিনমল বলে শনাক্ত করা হয়েছে। মেদিনীপুর জেলার মুগল আমলের রাজস্ব বিবরণীতেও পরগণা হিসেবে এ দুটি নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। ইরদা তাম্রশাসনে (খ্রিস্টীয় দশ শতক) কম্বোজ রাজাদের দ্বারা শাসিত বর্ধমানভুক্তির সঙ্গে দন্ডভুক্তিমন্ডলের সংযুক্তির উল্লেখ রয়েছে। তামিল তিরুমুলাই লিপিতে (খ্রিস্টীয় এগারো শতক) দন্ডভুক্তিকে দক্ষিণ ও উত্তর রাঢ় থেকে স্বতন্ত্র দেখানো হয়েছে এবং এর অবস্থান নির্দেশ করা হয়েছে  উড়িষ্যা ও দক্ষিণ রাঢ়ের মাঝামাঝি অঞ্চলে।

উল্লেখ্য যে, পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার তমলুক, বাহিরি এবং দান্তান থেকে প্রচুর পরিমাণ প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে এবং এগুলি বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির ওপর আলোকপাত করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মনে করা হয় যে, সুপরিচিত বন্দর তাম্রলিপ্ত হয়ত দন্ডভুক্তি জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।  [রূপেন্দ্র কুমার চট্টোপাধ্যায়]