দত্ত, গুরুসদয়


দত্ত, গুরুসদয় (১৮৮২-১৯৪১) ব্রতচারী আন্দোলনের নেতা ও জাতীয়তাবাদী লেখক। ১৮৮২ সালের ১০ মে  সিলেট জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার বীরশ্রী গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর শিক্ষাজীবনের সূত্রপাত হয় স্বগ্রামের মাইনর স্কুলে। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি সিলেটের ইংরেজি স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (১৮৯৯) এবং কলকাতার  প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ (১৯০১) পাস করেন। ১৯০৩ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড যান এবং ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) পরীক্ষায় (১৯০৪) কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। সেখানে তিনি কিছুদিন কেমব্রিজ ইমানুয়েল কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯০৫ সালের শেষ দিকে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সদস্য হয়ে তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরে তিনি প্রথমে এসডিও পদে যোগদান করেন; পরে বঙ্গীয় সরকারের সচিব পদে এবং আরও পরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেন।

গুরুসদয় ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করলেও স্বাজাত্যবোধ ও দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে ছিলেন নির্ভীক। তিনি হাওড়া জেলার ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালে বামুনগাছিতে এক নৃশংস গুলিচালনার ঘটনা ঘটে। এ সংক্রান্ত মামলার ঐতিহাসিক রায়ে তিনি ইউরোপীয় এসপি ও সামরিক কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনা করেন, যা তখনকার ভারতীয়দের পক্ষে, বিশেষত ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কর্মরত কোনো ভারতীয় নাগরিকের পক্ষে দুঃসাধ্য ছিল। আর একবার ১৯৩০ সালের মে মাসে লবণ আইন অমান্য আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধী গ্রেফতার হলে বিক্ষুব্ধ জনতাকে ঠেকানোর জন্য কর্তৃপক্ষ গুলির আদেশ দিলে তিনি তা পালনে অস্বীকৃতি জানান। এতে কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রতি বিরাগভাজন হয়ে তাঁকে বীরভূমে বদলি করে।

গুরুসদয় অনেক সমাজসেবামূলক কাজ করেছেন এবং এ কাজে অন্যদেরও উৎসাহিত করেছেন। ১৯২৯ সালের শেষদিকে ময়মনসিংহে ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর পদে কর্মরত থাকাকালে তিনি গ্রামোন্নয়ন আন্দোলন শুরু করেন। গ্রামের আবর্জনা পরিষ্কার করা, শ্রমের মর্যাদা সম্পর্কে শিক্ষিত সমাজকে সচেতন করে তোলা ইত্যাদির মাধ্যমে গ্রামের জনগণকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৩১ সালে তিনি Rural Heritage Preservation Society of Bengal নামে একটি নতুন আন্দোলনও শুরু করেন। তাঁর মৃত পত্নীর নামানুসারে ‘সরোজনলিনী শিক্ষা সমিতি’ (১৯২৫) এবং ‘সরোজনলিনী নারীমঙ্গল সমিতি’ নামে দুটি সমাজকল্যাণ সংস্থাও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন।

গুরুসদয় দত্ত  লোকনৃত্যলোকসঙ্গীত, পল্লীর ব্রতানুষ্ঠান ইত্যাদির প্রতি খুবই উৎসাহী ছিলেন। তাই এসবের চর্চা ও সংরক্ষণের জন্য তিনি বেশকিছু সংস্থা ও সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। সেগুলি হচ্ছে: ময়মনসিংহ ফোক ড্যান্স অ্যান্ড ফোক মিউজিক সোসাইটি (১৯২৯), পল্লীসম্পদ রক্ষা সমিতি (১৯৩১), ব্রতচারী লোকনৃত্য সমিতি (১৯৩২), সাউথ ইন্ডিয়া ব্রতচারী সোসাইটি (১৯৩২), সর্বভারতীয় ব্রতচারী সমাজ ইত্যাদি। ১৯৪১ সালে কলকাতার অদূরে ব্রতচারী গ্রামের প্রতিষ্ঠা তাঁর এক প্রশংসনীয় কীর্তি। সেখানে তিনি ‘ব্রতচারী জনশিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি একবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরূপে তাঁর ব্রতচারী লোকনৃত্য সমিতিসহ লন্ডনের আন্তর্জাতিক লোকনৃত্য উৎসবে যোগদান করেন। লন্ডনেও তিনি একটি ব্রতচারী সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন।

গুরুসদয় বাংলার শক্তি  নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন (১৯৩৬)। তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা। শিশুদের উদ্দেশ্যে রচিত কিছু ছড়ার সংকলন নিয়ে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গ্রন্থ হচ্ছে ভজার বাঁশী (১৯২২)। তাঁর উল্লেখযোগ্য অন্যান্য গ্রন্থ: পল্লী সংস্কার (১৯২৫), Village Reconstruction (১৯২৫), গানের সাজি (১৯৩২), Indian Folk dance and Folklore Movement (১৯৩৩), Bratachari Synthesis (১৯৩৭), পটুয়া সঙ্গীত (১৯৩৯), A Woman of India (১৯৪১), ব্রতচারীর মর্মকথা (১৯৪০), The Folkdance of Bengal (১৯৫৪), শ্রীহট্টের লোকসঙ্গীত (১৯৬৬), Folk Arts and Crafts of Bengal (১৯৯০) ইত্যাদি। তিনি  লোকসংস্কৃতি ও লোকশিল্প সংগ্রহেরও চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর সংগৃহীত লোকসংস্কৃতির অনেক নিদর্শন কলকাতার উপকণ্ঠে ঠাকুরপুকুরে অবস্থিত জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ১৯৪১ সালের ২৫ মে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।  [বরুণকুমার চক্রবর্তী]

আরও দেখুন ব্রতচারী আন্দোলন