থানা নির্বাহী অফিসার


থানা নির্বাহী অফিসার (টি.এন.ও)  থানা পর্যায়ের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা। জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার ১৯৮২ সালে প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও সংস্কারের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে। উক্ত কমিটির সুপারিশের অন্তর্ভুক্ত ছিল প্রতিনিধিত্বশীল থানা পরিষদ গঠন, যার প্রধান নির্বাহী হবেন একজন নির্বাচিত চেয়ারম্যান। উক্ত সুপারিশ বাস্তবায়নকল্পে সরকার মেট্রোপলিটান এলাকার বাইরের প্রতিটি থানাকে মান-উন্নীত থানায় রূপান্তর করে এবং থানার প্রশাসন পরিচালনার জন্য থানা নির্বাহী অফিসারের পদ সৃষ্টি করে। এছাড়াও প্রশাসনিক একক হিসেবে মহকুমা বিলুপ্ত করে জেলা সদর মহকুমা বাদে বাকি প্রতিটি মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়। জাতীয় ও আঞ্চলিক গুরুত্বসম্পন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যতীত সকল উন্নয়ন কার্যক্রম থানা পরিষদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। থানা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত থানা নির্বাহী অফিসার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন মর্মে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তদনুযায়ী স্থানীয় সরকার বিধি সংশোধন করা হয়।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারে কর্মরত সিনিয়র স্কেলভুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে থানা নির্বাহী অফিসার নিয়োগ করা হয়। থানা নির্বাহী অফিসারের দায়িত্ব নিম্নরূপ:

·   থানা পরিষদের চেয়ারম্যানের স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। তিনি পরিষদের একজন নির্বাহী হিসেবেও কাজ করবেন। তার কাজের জন্য তিনি থানা পরিষদ চেয়ারম্যানের নিকট জবাবদিহি করবেন। এ ছাড়াও তিনি থানা পরিষদের নীতিমালা প্রয়োগ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চেয়ারম্যানকে সহায়তা করবেন;

·   থানা পর্যায়ের প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যক্রম তত্ত্বাবধানে নির্বাচিত চেয়ারম্যানকে সহায়তা করা;

·   সমন্বিত থানা উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং উক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে থানা পরিষদকে সহায়তা করা;

·   ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা প্রয়োগ করা। কোনো কারণে থানা ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারি আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হলে অথবা থানা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকলে থানা নির্বাহী অফিসার মামলার আমল গ্রহণ, জামিন সংক্রান্ত বিষয়ে শুনানী গ্রহণ, শুনানী মুলতবি ঘোষণা ইত্যাদি কার্য সম্পাদন করবেন;

·   তিনি মুন্সেফ ব্যতীত থানা পর্যায়ে কর্মরত সকল কর্মকর্তার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের অনুবেদনকারী কর্মকর্তা। থানা পরিষদ চেয়ারম্যান উক্ত গোপনীয় প্রতিবেদন প্রতিস্বাক্ষর করেন। সংশ্লিষ্ট বিভাগের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা থানা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কারিগরি প্রতিবেদনকারী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন;

·   প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা, খাদ্য সামগ্রীসহ অন্যান্য মালামাল গ্রহণ এবং থানা পরিষদের নির্দেশ অনুযায়ী উক্ত ত্রাণসামগ্রী বিতরণ সংক্রান্ত জরুরি দায়িত্ব সম্পাদন করা;

·   সরকারি প্রোটোকল সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করা;

·   থানা পর্যায়ের বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন;

·   থানা প্রশাসনের সকল কাজে সরকারি নির্দেশাবলি যথাযথ অনুসরণ করা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা;

·   থানা পর্যায়ে তার বিভাগের সকল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং থানা পর্যায়ের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা;

·   মুন্সেফ ব্যতীত থানা পর্যায়ে কর্মরত সকল বিভাগীয় প্রধানের নৈমিত্তিক ছুটি মঞ্জুর করা এবং উল্লিখিত কর্মকর্তাদের ভ্রমণ ভাতা বিল প্রতিস্বাক্ষর করা;

·   থানা নির্বাহী অফিসারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে কর্মরত কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের আয়ন ব্যয়ন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা;

·   তার সরাসরি নিয়ন্ত্রণে কর্মরত কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের কার্যাবলি তদারক করা;

·   এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সরকার বা থানা পরিষদ চেয়ারম্যান কর্তৃক থানা নির্বাহী অফিসারের উপর অর্পিত অন্যান্য কার্যাবলি বা প্রচলিত আইন বা বিধিমূলে তার উপর সরকার কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদন করা।

পরবর্তী পর্যায়ে মান উন্নীত থানার নতুন নামকরণ হয় উপজেলা। জেলার নামের সঙ্গে উপজেলা নামটির সঙ্গতি রয়েছে বিধায় এরূপ নামকরণ করা হয়। প্রথমত, থানা পর্যায়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নামকরণ করা হয়েছিল থানা কমিশনার। সম্ভবত এ নাম প্রশাসনিক নামসমূহের ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু এ নামও সর্বগ্রাহ্য হয় নি, কারণ (ক) নামটি প্রশাসনিক সংস্কার কমিটির মূল সুপারিশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না এবং (খ) নামটিতে ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ ছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার নামটিই গৃহীত হয়।

বিশ শতকের নববইয়ের দশকের প্রথমদিকে উপজেলা পদ্ধতির বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নামটি পরিবর্তন করে পুনরায় থানা নির্বাহী অফিসার করা হয়। ২০০৯ সালে উপজেলা পদ্ধতি পুনরায় চালু হওয়ার পর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদবী পুনর্বহাল করা হয়।  [এ.এম.এম শওকত আলী]