ত্রিপুরা১


ত্রিপুরা১  ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের অন্যতম। এর উত্তর, পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব অংশ বাংলাদেশের সীমান্ত দ্বারা পরিবেষ্টিত।

একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে ত্রিপুরার অস্তিত্ব কয়েক শতকের। প্রাচীন উপকথা অনুসারে ত্রিপুরার সীমানা বিস্তৃত ছিল গারো পাহাড় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত। ১২৬৮ থেকে ১২৮১ সাল পর্যন্ত বাংলার শাসক ছিলেন তুগরল তুগান খান। তিনি সর্বপ্রথম ত্রিপুরার একটি অংশ জয় করে বাংলার সঙ্গে যুক্ত করেন। সুলতান  হুসেন শাহ ১৫১৩ সালে ত্রিপুরার সমভূমি অঞ্চলের বৃহত্তর অংশ অধিকার করেন। বাংলার মুগল সুবাহদার  ইব্রাহিম খান (১৬৮৯-১৬৯৮) সমগ্র ত্রিপুরা জয় করে মুগল সাম্রাজ্যের একটি করদ রাজ্যে পরিণত করেন। মুর্শিদকুলি খানের শাসনকালে ত্রিপুরার সমভূমি অঞ্চলের নতুন নামকরণ হয় রওশনাবাদ পরগনা, এবং ত্রিপুরারাজকে সে অঞ্চলের জমিদার ঘোষণা করা হয়। ত্রিপুরার মাণিক্য রাজারা পাহাড়ি ত্রিপুরার অধীনস্থ রাজা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনী জেলা সমন্বয়ে গঠিত হয় রওশনাবাদ পরগনা। কুমিল্লা ছিল রাজার জমিদারির সদর দপ্তর। ১৭৯০ সালে গঠিত নতুন ত্রিপুরা জেলার মূল অংশ ছিল ত্রিপুরার রাজার জমিদারি এলাকা। ১৯৬০ সালে এ জেলার নতুন নামকরণ হয় কুমিল্লা।

মাণিক্য রাজবংশের রাজারা ত্রিপুরা রাজ্য শাসন করতেন। মাণিক্য রাজারা নিজেদের প্রাচীন হিন্দু রাজাদের বংশধর বলে দাবি করতেন। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ত্রিপুরাকে ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একীভূত করার একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন ত্রিপুরার প্রতিভূ মহারানী। ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর ভারত সরকার রাজ্যটির প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ত্রিপুরা ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত আইন সভাহীন একটি অঞ্চল হিসেবে ঘোষিত হয় এবং ১৯৬৩ সালের ১ জুলাই সেখানে একটি মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি ত্রিপুরা একটি রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে।

বর্তমান ত্রিপুরা রাজ্যের মোট আয়তন ১০,৪৯২ বর্গ কিলোমিটার। এর আন্তর্জাতিক সীমান্তের প্রায় ৮৪ শতাংশ বাংলাদেশের সীমান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট (৮৩৯ কিমি)। ত্রিপুরার ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য: ৬০ শতাংশ পাহাড়ি ভূমি, ৬০ শতাংশ বনভূমি, ৫২.৭৬ শতাংশ বনজ আচ্ছাদন, ৩৬ শতাংশ সংরক্ষিত বনাঞ্চল, ৩০ শতাংশ ব্যবহার উপযোগী স্থাপনা। ভারত বিভাগের পর ত্রিপুরা রাজার জমিদারি বা রওশনাবাদ পরগনা পূর্ব বাংলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫০ সালের  ইস্ট বেঙ্গল স্টেট অ্যাকুয়িজিশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্ট অনুসারে জমিদারি ব্যবস্থা বিলোপের পর ত্রিপুরার রাজা জমিদারি অধিকার হারান।

১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ত্রিপুরার মোট জনসংখ্যা ২৭,৫৭,২০৫; গ্রামীণ জনসংখ্যা ২৩,৩৫,৪৮৪, শহুরে জনসংখ্যা ৪,২১,৭২১; পুরুষ ১৪,১৭,৯৩১, মহিলা ১৩,৩৯,২৭৫। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিমিতে ২৬২ জন; তফসিলি সম্প্রদায় ১৬%, উপজাতি ৩১% (১৯টি উপজাতীয় গোষ্ঠী), অন্যান্য পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী ৪৬% (কেন্দ্রীয় তালিকায় এসব গোষ্ঠীর সংখ্যা ৩৫)। শিক্ষার হার ৬০.৪৪%। প্রধান ভাষা  বাংলা ও কাকবোরাক।  [সিরাজুল ইসলাম]