তুজুক-ই-বাবুরী


তুজুক-ই-বাবুরী ভারতে মুগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দীন বাবুরের আত্মজীবনী। এটি বাবুরনামা বা বাবুরের স্মৃতিকথা নামেও পরিচিত। বাবুর এটি তুর্কি ভাষায় রচনা করেন এবং এটি মুগল রাজ কর্মকর্তা বৈরাম খান খান--খানানের পুত্র আবদুর রহিম খান-ই-খানান কর্তৃক ফারসি ভাষায় অনূদিত হয়। ইউরোপীয় পন্ডিতদের সমাদৃত এ গ্রন্থ বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

লেখক যে পৃথিবীতে বাস করেছিলেন এবং তিনি যেসব মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন তারই যথাযথ বিবরণ হলো বাবুরনামা। আধুনিক পন্ডিতদের মতে, এমন জীবন্ত, কৌতুহলোদ্দীপক ও নিজের জীবনের সত্যনিষ্ঠ বর্ণনা বাবুরের ন্যায় আর কোনো রাজন্য লিপিবদ্ধ করেন নি। তিনি অকপটভাবে তাঁর জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতা অথবা তাঁর ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে লিখেছেন যা পাঠককে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। তাঁর লেখার ধরন পারস্যদেশীয় অন্যান্য লেখকদের মতো আড়ম্বরপূর্ণ ও অলঙ্কারসমৃদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল সরল এবং স্পষ্ট। এতে কোনো কপটতা ছিল না। সত্যের প্রতি গভীর অনুরাগের সঙ্গে বাবুর ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি যেভাবে ঘটেছিল ঠিক সেভাইে লিপিবদ্ধ করেন।

বাবুর প্রকৃতি অনুরাগী ছিলেন। তিনি আনন্দ পেতেন নদী এবং তাঁর নিজ দেশের তৃণভূমি ও চারণভূমি অবলোকন করে। তাঁর দেশের বসন্তকাল, হ্রদ, গাছপালা, ফুল ও ফল সবকিছুই  তাকে এত মুগ্ধ করেছিল যে, তিনি যখন ভারতে এসেছিলেন এবং সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তখনও তিনি তাঁর ফারগনাকে ভুলে যেতে পারেন নি। প্রকৃতির প্রতি তাঁর এ অনুরাগের ফলে তাঁর কাব্য প্রতিভা বিকশিত হয়েছিল। যৌবনকালের প্রথম থেকেই তিনি কবিতা লেখার চর্চা করতেন। তুর্কি ভাষায় লেখা তাঁর ‘দীউয়ান’কে (কবিতা সংগ্রহ) উল্লেখযোগ্য প্রশংসনীয় কাজ বলে বিবেচনা করা হয়। গদ্যরচনায়ও তাঁর দক্ষতা সমানভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি তুর্কি ও ফারসি উভয় ভাষাতেই সহজভাবে লিখতে পারতেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গদ্যরচনাগুলির মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান গদ্যরচনা হলো তাঁর আত্মজীবনী।

ভারত সম্পর্কে বাবুরের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অভিযানের সময়ে ভারতে বিরাজমান রাজনৈতিক অবস্থার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন এবং হিন্দুস্থানের উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের যথাযথ বিবরণও তিনি লিপিবদ্ধ করেন। তিনি পর্বতমালা, নদ-নদী, বন-জঙ্গল, ঝর্না এবং বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য, ফলমূল, ও শাক-সব্জির উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন যে, তাদের বাগান বা প্রাসাদে পানি সরবরাহের জন্য কোনো নালা বা খাল নেই, তাঁদের কৃষক ও নিম্ন শ্রেণির লোকেরা প্রায় নগ্ন থাকত এবং তারা তাদের নগ্নতা ঢাকার জন্য ল্যাঙ্গোট (langoti-এক ধরনের সংক্ষিপ্ত পোশাক) ব্যবহার করত। তিনি আরও বলেন যে, সোনা ও রূপার প্রাচুর্য হিন্দুস্থানকে এক বিশেষ মহিমায় উজ্জ্বল করেছে। হিন্দুস্থানের আবহাওয়া ছিল মনোরম। সেখানে যেকোনো বৃত্তি বা পেশায় শ্রমিকদের অভাব ছিল না। কিন্তু তাদের অধিকাংশ পেশা ছিল বংশানুক্রমিক এবং বিশেষ ধরনের কাজের জন্য বিশেষ লোকদেরকে নির্দিষ্ট করে রাখা হতো।

বাংলা সম্পর্কে বাবুরের পর্যবেক্ষণও উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলায় আসেননি, কিন্তু তাঁকে বাংলার সুলতান নুসরত শাহের সাথে শক্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। তীক্ষ্ণদৃষ্টিসম্পন্ন পর্যবেক্ষক হিসেবে তিনি বাংলার সুলতান, তার দেশ ও মানুষ সম্পর্কে তথ্যাদি সংগ্রহ করেন। বাংলা সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ যথার্থ বলেই মনে হয়। পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আফগানরা ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু তাঁরা প্রধানত বিহারেই জড়ো হয়েছিলেন। ফলে বাংলা মুগল আক্রমণের আওতায় এসে যায়। নুসরত শাহ এ অবস্থার গুরুত্ব অনুধাবন করে তাঁর সীমান্ত রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বাবুর গোগরা নদীর তীরে বক্সারের নিকটবর্তী নুসরত শাহের রাজ্য সীমান্তে আক্রমণ করেন। বাবুর বিজয়ী হলেও তিনি বাংলার সুলতানের এলাকা দখল করেন নি। অতঃপর তিনি আফগানদের দিকে মনোনিবেশ করেন।

বাবুর নুসরত শাহকে ভারতের মহান শাসকদের মধ্যে একজন বলে প্রশংসা করেন। তিনি বাংলার সৈন্যদেরও, বিশেষ করে নাবিক ও বন্দুকধারীদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন যে, বাঙালিরা সিংহাসনের প্রতি অনুগত এবং সিংহাসন যিনিই দখল করুন না কেন, তারা তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন যে, বাংলায় বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার বিরল। বাবুর বাংলায় প্রচলিত অন্যান্য রীতির কথাও উল্লেখ করেন। প্রথমত, নতুন শাসক তাঁর পূর্ববর্তী শাসকের সঞ্চিত সম্পদ খরচ করেন না। তাঁর ব্যয় মিটানোর জন্য তিনি নিজেই ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। দ্বিতীয়ত, বাঙালিরা সম্পদ জমানোকে সুনজরে দেখত না এবং তৃতীয়ত, তারা নির্দিষ্ট পরগনার রাজস্ব নির্দিষ্ট কাজের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখত।  [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি  Ishwari Prasad, A Short History of the Muslim Rule in India, Allahabad, 1958; AS Beveridge (tr), Memoirs of Babur, 2 Vol., New Delhi, 1970.