তুগরল তুগান খান


তুগরল তুগান খান  ১২৩৬ থেকে ১২৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার অন্যতম শাসনকর্তা। তিনি সাহসী ও বিচক্ষণ বলে পরিচিত। লখনৌতিতে ক্ষমতা দখলের পূর্বে তিনি রাজ্য শাসনে প্রভূত অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ইলতুৎমিশ এর রাজত্বকালে তিনি বদায়ুনের শাসনকর্তা ছিলেন এবং ১২৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিহারে বদলি হন। এ সময়ে সাইফুদ্দীন আইবক লখনৌতির শাসনকর্তা ছিলেন। তিনি ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। একই বছর সুলতান রাজিয়া দিল্লির সিংহাসনে তাঁর পিতার স্থলাভিষিক্ত হন।

সাইফুদ্দীনের মৃত্যুর পর আউর খান আইবক নামে তাঁর জনৈক সহযোগী লখনৌতিতে ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু বিহারের শাসনকর্তা তুগরল তুগান খান এ ক্ষমতা দখল মেনে নেন নি। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযান করে তাঁকে পরাজিত ও নিহত করেন এবং লখনৌতি ও বিহার একক কর্তৃত্বে নিয়ে আসেন। সুলতান রাজিয়ার নিকট থেকে স্বীকৃতি নিয়ে তিনি স্বীয় অবস্থানকে বৈধ করে নেন। দিল্লিতে যখনই কোনো নতুন সুলতান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতেন তখনই তিনি তার জন্য উপহার পাঠিয়ে সুলতানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতেন।

তুগরল দশ বছরের মতো (১২৩৬-১২৪৫) ক্ষমতায় ছিলেন। এ সময়ে তিনি পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী না হয়ে উত্তর ভারতে আধিপত্য বিস্তারে ব্রতী হন। এ লক্ষ্য অর্জনে তিনি ত্রিহুতে (উত্তর বিহার) প্রথম সফল অভিযান করেন এবং পরে ১২৪২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে পশ্চিম অভিমুখে অগ্রসর হন। দিল্লিতে ক্ষমতা দখল নিয়ে সংশয় তাঁকে আরও সাহসী করে তোলে এবং তিনি কারা (এলাহাবাদ) পর্যন্ত অগ্রসর হন। সেখানেই তিনি সুলতান মাসুদ শাহের দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার খবর পান।

তুগরল তুগান খানের উত্তর ভারতে ব্যস্ততার সুযোগে উড়িষ্যার রাজা প্রথম নরসিংহদেব (তৃতীয় অনঙ্গভীমের পুত্র) দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে লখনৌর পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং মুসলিম রাষ্ট্রে লুঠতরাজ শুরু করেন। অতএব কারা থেকে তিনি সুলতানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে মূল্যবান উপঢৌকনসহ প্রতিনিধিদল দিল্লিতে পাঠান, আর নিজে ঐতিহাসিক মিনহাজকে নিয়ে ১২৪৩ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে লখনৌতিতে ফিরে আসেন।

দিল্লির সুলতানের অনুমোদন লাভের পর তুগরল ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে উড়িষ্যা বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং তাদেরকে লখনৌ প্রায় সত্তর মাইল দক্ষিণে কাটাসিন সীমান্তের ওপারে বিতাড়িত করেন। তিনি উড়িষ্যা রাজ্যের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন; কিন্তু অকস্মাৎ পশ্চাৎ দিক থেকে আক্রান্ত হন। তবে তিনি নিরাপদে পশ্চাদপসরণ করেন। উড়িষ্যা বাহিনী লখনৌর দখল করে এর শাসনকর্তাকে হত্যা করে। এ পরিস্থিতিতে সামরিক সাহায্য চেয়ে তুগরল দিল্লিতে প্রতিনিধি পাঠান। সুলতান মাসুদ শাহ সঙ্গে সঙ্গে কারা-মানিকপুরের (এলাহাবাদ) শাসনকর্তা মালিক কারা কাশ খান ও অযোধ্যার শাসনকর্তা মালিক তমার খানকে তাঁদের সম্মিলিত বাহিনী নিয়ে তুগরল খানের সাহায্যে অগ্রসর হওয়ার আদেশ দেন। ইত্যবসরে উড়িষ্যা বাহিনী মুসলিম রাজ্যের আরও অভ্যন্তরে প্রবেশ করে; এমনকি ১২৪৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে তারা লখনৌতির উপকণ্ঠে পৌঁছে। তুগরলের সাহায্যার্থে উত্তর ভারত থেকে অতিরিক্ত সৈন্যবাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে উড়িষ্যার সৈন্যরা দ্রুত পালিয়ে যায়।

উড়িষ্যা বাহিনী চলে যাওয়ার পর মালিক তমার খান লখনৌতির শাসনকর্তৃত্ব তার হাতে ছেড়ে দেয়ার জন্য তুগরলের উপর চাপ সৃষ্টি করেন এবং কয়েকটি সংঘর্ষে তাঁকে পরাজিত করেন। তামার খান লখনৌতি শহরে অবস্থান গ্রহণ করেন। আরও কিছু বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের পর ঐতিহাসিক মিনহাজের মধ্যস্থতায় উভয়ের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়। চুক্তি অনুসারে তুগরল লখনৌতি ও বিহারের অধিকার তমার খানকে ছেড়ে দেন; বিনিময়ে তুগরলকে নির্বিবাদে তার ধনসম্পদ ও লোকলস্কর নিয়ে লখনৌতি ত্যাগ করার সুযোগ দেওয়া হয়।

১২৪৫ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে তুগরল দিল্লি পৌঁছান। তমার খানের ঔদ্ধত্য প্রতিহত করার সামর্থ্য সুলতান মাসুদের ছিল না। পরবর্তী সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ (ছোট) তুগরলকে তমার খানের সাবেক প্রদেশ অযোধ্যার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছার পরপরই ১২৪৬ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে তুগরল খানের মৃত্যু হয়। বিস্ময়করভাবে একই দিনে তমার খানেরও লখনৌতিতে মৃত্যু হয়  [এম. দেলওয়ার হোসেন]