তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই-মহবত জঙ্গী


তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই-মহবত জঙ্গী আলীবর্দী খানের সময় থেকে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও মৃত্যু পর্যন্ত বাংলার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বইটি মহবত জঙ্গকে উৎসর্গীকৃত। আলীবর্দী খানকে (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রি.) প্রদত্ত উপাধি ছিল মহবত জঙ্গ এবং এজন্যই বইটির এ নামকরণ করা হয়েছিল। বস্ত্তত, তাঁর বংশতালিকা দিয়ে বইটির শুরু এবং ক্রমান্বয়ে তাঁর ক্ষমতায় আরোহণ ও মৃত্যু পর্যন্ত ঘটনাবলি এতে বর্ণিত, কিন্তু গ্রন্থকার আরও কিছু যোগ করে গ্রন্থটিকে সিরাজউদ্দৌলার আমল পর্যন্ত প্রসারিত করেছেন।

তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই-মহবত জঙ্গী রচিত হয়েছিল ১১৭৭ হিজরি/ ১৭৬৩-৬৪ সালে এলাহাবাদে। এ গ্রন্থের বহু পান্ডুলিপি ভারতীয় এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে রক্ষিত আছে। এগুলির মধ্যে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত অনুলিপিটি এ অর্থে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ যে, শুধু এটিতেই আলীবর্দীর উত্তরাধিকারী সিরাজউদ্দৌলার একটি বিবরণ রয়েছে যা একটি অনন্য অংশ। অংশটি অনুচিন্তনের ফসলরূপে সংযোজিত করা হয়েছে বলে মনে হলেও এটা ঐতিহাসিকদের জন্য একটি প্রীতিকর সংযোজন। বিভিন্ন অনুলিপিতেই একই শিরোনাম নেই। তবে সর্বোত্তমভাবে সংরক্ষিত বলে বিবেচিত ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অনুলিপিটিতে তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই-মহবত জঙ্গী শিরোনাম রয়েছে। প্রতিটি অনুলিপির শিরোনাম ভিন্নতর হলেও প্রতিটিই যুক্তিসঙ্গত, কারণ শিরোনাম ভিন্নতর হলেও বই এবং বিষয়বস্ত্ত নওয়াব আলীবর্দী খানের জীবনীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

প্রতিটি অনুলিপির ভিন্ন ভিন্ন শিরোনাম থাকলেও গ্রন্থটির বিদিত কোনো অনুলিপিতেই রচয়িতার নাম নেই। আধুনিক পন্ডিতগণ সর্বসম্মতভাবে স্বীকার করেছেন যে, গোলাম আলী খানের পুত্র ইউসুফ আলী খান ছিলেন এ গ্রন্থের রচয়িতা। আলীবর্দী খানের অধীনে গোলাম আলী খান উচ্চ সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সিয়ার-উল-মুতাখখেরীনের লেখক সৈয়দ গোলাম হোসেন তবাতবাঈ তাঁর গ্রন্থে একাধিকবার ইউসুফ আলী খানের উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, তাঁর প্রদত্ত আলীবর্দী খানের জীবনী ও শাসনকালের বিবরণের জন্য তিনি ইউসুফ আলীখানের কাছে গভীরভাবে ঋণী। তিনি অবশ্য ইউসুফ আলীর বইটির শিরোনাম উল্লেখ করেন নি। উপরন্তু তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই-মহবত জঙ্গীর রীতি ও অভিব্যক্তি ইউসুফ আলী খানের অন্যান্য যেসব গ্রন্থে দেওয়া হয়েছে, সেগুলির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এ বইগুলি হচ্ছে: (ক) তাজকিরা যাতে আলীবর্দী খান ও কাব্যরচনায় তাঁর উৎসাহ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা রয়েছে, এবং (খ) হদিকত-উস-সাফা, যেটিতে গ্রন্থকার তাঁর আত্মজীবনী রচনার উল্লেখ করেছেন যা দিয়ে স্পষ্টতই তিনি তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই-মহবত জঙ্গীকে বুঝিয়েছেন।

এ গ্রন্থের লেখক ইউসুফ আলী খান ছিলেন আলীবর্দীর সরকারে পাটনার দীউয়ান-ই-খালসা গোলাম আলী খানের পুত্র। গোলাম আলী ১১৭৭ হিজরি/ ১৭৬৩ সালে এলাহাবাদে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং তাঁর পুত্র ইউসুফ আলী খান (ভূতপূর্ব ওয়াব) মীর কাসিমএর প্রতি তার আনুগত্যের কারণে সর্বদা মীরজাফর-এর ভয়ে ভীত থাকতেন। এটাও জানা যায় যে, ইউসুফ আলী খান নওয়াব সরফরাজ খান-এর (১৭৩৯-৪০) এক কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন এবং এ বিয়ের ফলে তাঁর জরিয়ত-উজ-জোহরা নামে এক মেয়ে ছিল যার বিয়ে হয়েছিল বেনারসের আলী ইবরাহিম খানের সঙ্গে। সরফরাজ খানের রাজত্বকালের বিবরণ দেওয়ার সময় ইউসুফ আলী সরফরাজ খানের চমৎকার চরিত্রের প্রশংসা করেছেন।

আলীবর্দী খানের আমলে সভাসদ ও সৈনিক হিসেবে ইউসুফ আলী পিতার মতোই প্রচুর মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের অন্যতম এবং তাঁর ছিল ব্যাপক অভিজ্ঞতা ও বিশাল জ্ঞান। বর্ণিত ঘটনাবলির প্রত্যক্ষদর্শী কর্তৃক রচিত হওয়ায় তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই-মহবত জঙ্গী নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং আধুনিক ঐতিহাসিকবৃন্দ এটিকে প্রামাণিক রূপে গ্রহণ করেছেন। এমনকি প্রায় সমসাময়িক ঐতিহাসিক গোলাম হোসেন তবাতবাঈ বেশ কিছু বাক্য সম্পূর্ণভাবে নকল করাসহ এ গ্রন্থ ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছেন।  [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি  JN Sarkar, Bengal Nawabs, Calcutta, 1952; KK Datta Alivardi and His Times, Calcutta, 1963; Abdus Subhan (ed), Tarikh-i-Bangalah-i-Mahabat Jangi, Calcutta, 1969.