তারিখ-ই-ফিরুজশাহী (বরনী)


তারিখ-ই-ফিরুজশাহী (বরনী) জিয়াউদ্দীন বরনী বিরচিত ইতিহাস গ্রন্থ। সুলতান ফিরুজশাহ তুগলক-এর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। সুলতানি আমলের ইতিহাস সাহিত্যের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। গ্রন্থকার নিজেই অভিমত দেন যে, গ্রন্থটির বিশাল গুরুত্ব রয়েছে। তাঁর মতে এটি বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের এক চমৎকার সমাহার। গ্রন্থটিতে রাজন্যশ্রেণি ও আমীর উমরাহদের বর্ণনা আছে। একইভাবে এটি সরকারের প্রবিধানসমূহ, আইন, প্রশাসনিক বিষয়াবলি, কর্মবিধি এবং পরামর্শের এক আকর গ্রন্থ। ঐতিহাসিক যথার্থই দাবি করেন যে এখানে যা কিছু লেখা হয়েছে সবই সত্য ও সঠিক এবং বিশ্বাসযোগ্য। মধ্যযুগে ভারত উপমহাদেশে লিখিত অন্যান্য ইতিহাস গ্রন্থের মত এটি শুধু ঘটনাবলির কালানুক্রমিক বর্ণনা নয়। এ গ্রন্থে আমরা সামাজিক অগ্রগতি ও ভূ-সম্পত্তিগত বিষয়াবলির বিবরণ পাই। আধুনিক পন্ডিতবর্গ বরনীর ইতিহাসকে একটা নিশ্চিত বিজ্ঞান বলে অভিহিত করেন। এটি হলো সামাজিক রীতি-নীতির বিজ্ঞান যার ভিত্তি হচ্ছে পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা, ধর্ম বা উপাখ্যান নয়। জিয়াউদ্দীন বরনী মিনহাজের তবকাত-ই-নাসিরী এর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং তিনি এ গ্রন্থের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন। মিনহাজের বর্ণনার আওতায় যে বিষয়াবলি আসে সেগুলি আবার বর্ণনা করা তিনি পছন্দ করেন নি। এজন্য    

গিয়াসউদ্দীন বলবন-এর সিংহাসন আরোহণের ঘটনা থেকে তাঁর ইতিহাসের বর্ণনা শুরু হয়। বলবন থেকে ফিরুজ শাহ তুগলক পর্যন্ত দিল্লির সকল সুলতানের ইতিহাস তিনি বর্ণনা করেন। ১৩৫৭ খ্রিস্টাব্দে, অর্থাৎ ফিরুজ শাহ তুগলকের রাজত্বের ষষ্ঠ বছরে তিনি তাঁর ইতিহাস রচনা শেষ করেন এবং ক্ষমতাসীন সুলতানের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় তারিখ-ই-ফিরুজশাহী। তিনি ফিরুজ শাহের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার আশা করে ব্যর্থ হন। বলবনের সময়ে বরনী ছিলেন বালক, সুলতান মুহম্মদ বিন তুগলক এর আমলে তিনি সভাসদ হিসেবে দরবারে যোগ দেন এবং সুলতানের মৃত্যু পর্যন্ত সতেরো বছর যাবৎ তাঁর নাদিম (জন্মসঙ্গী) ছিলেন। সুলতান প্রায়ই তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করতেন এবং ইতিহাসবিদ হিসেবে তাঁর মেধার স্বীকৃতি দেন। কিন্তু ফিরুজ শাহ তুগলক সিংহাসনে আরোহণ করার পর বরনী দরবারে তাঁর প্রভাব হারান এবং হঠাৎ করে তাঁর কর্মজীবনের অবসান ঘটে।

জিয়াউদ্দীন বরনী সম্ভ্রান্তবংশীয় ছিলেন এবং প্রশাসনের উঁচু পর্যায়ের লোকজন ও বিজ্ঞজনের সঙ্গে তাঁর মেলামেশা ও যোগাযোগ ছিল। তাঁর মাতামহ সিপাহসালার হুসামুদ্দীন মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বলবনের অধীনে একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর পিতার নাম মুয়ায়িদুল মুলক। তিনি জালালুদ্দীন ফিরুজ খলজীর পুত্র আরকালী খানের নায়েব পদে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর চাচা আলাউল মুলক জালালুদ্দীন খলজীর বিরুদ্ধে আলাউদ্দীন খলজীর ষড়যন্ত্রে প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন। সিংহাসন দখল করার পর আলাউদ্দীন আলাউল মুলকের পদমর্যাদা বহু গুণে বৃদ্ধি করেন। এজন্য বরনীর বাল্যকালে সংঘটিত বিষয়াবলির ওপর তথ্য সংগ্রহে তাঁকে বিশেষ কোনো অসুবিধায় পড়তে হয় নি এবং মুহম্মদ বিন তুগলকের কাল থেকে তিনি আমীর খসরু এবং আমীর হাসান সাজ্জির অন্যতম বন্ধু ও নিকট সহযোগী ছিলেন। আমীর খসরু শুধু একজন মহান কবি নন, ঐতিহাসিকও ছিলেন, আর অন্যদিকে আমীর হাসান ছিলেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রখ্যাত সুফি লেখক।

বরণী তাঁর তারিখ-ই-ফিরুজশাহী গ্রন্থে বলবন কর্তৃক মুইজুদ্দীন তুগরলের বিদ্রোহ দমন (বরণী তাঁকে মুগিসউদ্দীন বলে অভিহিত করেন কিন্তু তাঁর মুদ্রার সাক্ষ্যে নাম সংশোধন করা হয়েছে) এবং লখনৌতিতে প্রশাসনিক বিলিব্যবস্থার পর তাঁর দিল্লি প্রত্যাবর্তনের বিস্তারিত বিবরণ দেন। লখনৌতি রাজ্যে বলবন সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে তুগরলের সমর্থকদের নৃশংসভাবে যে হত্যা করেছিলেন তা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে তিনি দ্বিধা করেন নি। তিনি উল্লেখ করেন যে, বলবনের বর্বরোচিত নৃশংসতা এমনকি তাঁর সহযোগীদেরকেও আতঙ্কিত করে তোলে। তারা বলাবলি করতে থাকেন যে, বলবনের ক্ষমতার দিন ফুরিয়ে আসছে। বলবনের মৃত্যুর পর যখন তাঁর ছেলে বুগরা খান-এর অধীনে লখনৌতি স্বাধীন হয়ে যায় তখন বরনীর ধারাবাহিক বর্ণনায় আবার ছেদ পড়ে। তিনি সুলতান রুকনুদ্দীন কায়কাউস এবং সুলতান শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহ সম্বন্ধে কোনো বিবরণ দেন নি। আবার যখন সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুগলক বাংলা অভিযান করেন এবং লখনৌতিতে দিল্লির অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় তখন বরনী কিছু কিছু বিবরণ দিতে সক্ষম হন। মুহম্মদ বিন তুগলকের আমলে বাংলা স্বাধীন হয়ে যায়, তাই এ সময়কার বরনী পরিবেশিত বাংলার বিবরণ খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু বরনী আবার ফিরুজ শাহ তুগলকের দুবার বাংলা অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ দেন। একারণে তারিখ-ই-ফিরুজশাহীতে যে সময় কালের ইতিহাস বর্ণিত হয়, তাতে যদিও দিল্লি সালতানাতের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তারিত ইতিহাস আছে, কিন্তু বাংলার মুসলিম শাসনের ইতিহাস সেখানে খাপছাড়া এবং ধারাবাহিকতাহীন। কারণ হিসেবে বলা যায় যে, বলবন গিয়াসউদ্দীন তুগলক এবং মুহম্মদ বিন তুগলকের রাজত্বের প্রথম দিকে বাংলা খুব অল্পসময়ের জন্য দিল্লি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। জিয়াউদ্দীন বরনী কখনও বাংলায় আসেন নি, কিন্তু তবুও কিছু কিছু এলাকার যেমন জাজনগর, সোনারগাঁও, লখনৌতি, একডালার ভৌগোলিক বর্ণনা দিতে তিনি ভুল করেন নি। তিনি বাংলার প্রশাসনিক বিভাগেরও, যেমন দিয়ার-ই-বাংলা, ইকলিম-ই-বাংলা এবং আরসাহ-ই-বাংলার নির্দেশনা দেন। অবশ্য তিনি দিয়ার, ইকলিম বা আরশার সংজ্ঞা দেননি এবং স্থান-নাম শনাক্ত করার জন্য বিশেষ কোনো ইঙ্গিত তাঁর বিবরণে নেই। তাই কিছু কিছু স্থানের, যেমন একডালা বা জাজনগর অথবা কিছু শব্দের, যেমন দিয়ার, ইকলিম বা আরসাহর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা খুবই জটিল ব্যাপার। কিন্তু বরনী কর্তৃক এ সকল শব্দকোষের ব্যবহার আধুনিক পন্ডিতদের মধ্যে এগুলির প্রকৃতি জানার জন্য এবং মুসলিম শাসনের উত্তরণ যুগে মুসলিম প্রশাসন ব্যবস্থার ক্রমবিকাশের ব্যাপারে বেশ কৌতূহল জাগায়।  [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি  Zia-ud-din Barani, Tarikh-i-Firuzshahi, Bibliotheca Indica, Calcutta, 1862; RC Majumdar, AD Pusalkar and AK Majumdar (ed), The Delhi Sultanate, Bombay, 1960; Agha Mahdi Husain, The Tughluq Dynasty, New Delhi, 1976; KA Nizami, On History and Historians of Mediaeval India, New Delhi, 1983.