তারা২


তারা২  বৌদ্ধ দেবী। যিনি তারণ ( ত্রাণ) অর্থাৎ উদ্ধার করেন তিনিই তারা। বজ্রযান দেবীসংঘে অনেক তারা দেবীর উল্লেখ আছে। সাধনমালা, নিষ্পন্নযোগাবলী, অদ্বয়বজ্র প্রভৃতি গ্রন্থে যেসব বৌদ্ধ দেবীর সাধনমন্ত্রে ‘তারা’ শব্দটি সংযুক্ত আছে তাঁরা কোনো-না-কোনোভাবে মানুষকে বিপদ থেকে ত্রাণ বা উদ্ধার করেন; তাই তাঁরা ‘তারা’ নামে পরিচিত। প্রত্যেক তারাদেবীর গাত্রবর্ণ ভিন্ন ভিন্ন। তাঁদের এ গাত্রবর্ণ স্বস্ব কুলের প্রতীক। কুলপ্রধান ধ্যানী বুদ্ধগণের গাত্রবর্ণ অনুযায়ী তারাদেবীদের কুল নির্ধারিত হয়।

তারামূর্তি সাধারণত দ্বিবাহুবিশিষ্টা। রাত্রিকালে তাঁর বাম হাতে থাকে সবুজ পদ্ম এবং ডান হাতে বরদমুদ্রা। কোনো কোনো তারামূর্তির শিরস্ত্রাণে ধ্যানী বুদ্ধের ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি সংস্থাপিত হয়। এতে অবশ্য কোনটি কোন কুলের তারামূর্তি তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রস্তরমূর্তির ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও প্রকট হয়, কারণ তাতে কোনো বর্ণ সংযোজন করা যায় না।

আনুমানিক খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে বৌদ্ধধর্মে তারাকে দেবীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়। সপ্তম শতকে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন-সাং বাংলাদেশ ভ্রমণকালে পূজার বেদীতে সমাসীন প্রচুর তারামূর্তির সাক্ষাৎ পান। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত তারাদেবী মহাযান সম্প্রদায়ের অন্যান্য জনপ্রিয় দেবতার ন্যায় পূজিত হন এবং ক্রমশ তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এ সময় অনেক মন্দির, বিদ্যালয় বা মহাবিদ্যালয়ে তাঁর প্রতিকৃতি থাকত। দেবী তারার উদ্দেশে নৈবেদ্য নিবেদনের প্রথা জাভা পর্যন্ত পৌঁছেছিল এবং খ্রিস্টীয় ৭৭৯ অব্দে সেখানে তাঁর উদ্দেশে একটি বৌদ্ধ মন্দিরও নির্মিত হয়।

তিববতবাসীরা তারাদেবীকে ‘Sgrol-ma’ নামে অভিহিত করে। এর অর্থ ত্রাণ বা রক্ষাকর্তা, মুক্তিদাতা বা উদ্ধারকারী। মঙ্গোলীয়ায় তাঁকে ‘Dara eke’ বলে ডাকা হয়, যার অর্থ ‘মা তারা’। শুধু তাই নয়, তাঁকে সব বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বের জন্মদাত্রী হিসেবেও শ্রদ্ধা করা হয়।

তারাদেবী সাধারণত বসা অবস্থাতেই প্রতিনিধিত্ব করেন; কিন্তু যখন অবলোকিতেশ্বর বা তৎসমতুল্য অন্য কোনো দেবতার সহযোগিনী হন তখন তিনি দাঁড়ানো অবস্থাতেই থাকেন। তিনি অন্যান্য দেবমন্ডলীর ন্যায় নিজের সহযোগী সমভিব্যাহারে প্রতিনিধিত্ব করেন। বোধিসত্ত্বগণ যে ত্রয়োদশ রত্নালঙ্কারে ভূষিত থাকেন, দেবী তারার অতান্ত্রিক রূপেও তাই থাকে। এ সময় তাঁর মুখে থাকে স্মিত হাসি এবং চুলগুলি থাকে উচ্ছলিত ও কোঁকড়ানো। তাঁর তান্ত্রিক প্রতিমূর্তিও সর্বালঙ্কারে ভূষিত থাকে এবং ধর্মপালের ন্যায় প্রতীক ধারণ করে। এ সময় তাঁর তৃতীয় নয়ন থাকে সক্রিয় এবং চুলগুলি থাকে অবিন্যস্ত অবস্থায়। [ভিক্ষু সুনীথানন্দ]