ঢালি নৃত্য


ঢালি নৃত্য  পৌরুষব্যঞ্জক রণনৃত্যবিশেষ। আদিবাসীদের মধ্যে এ নৃত্য বিশেষভাবে প্রচলিত। মধ্যযুগে বাংলার হাড়ি-বাগ্দি-ডোমদের নিয়ে জমিদারদের সৃষ্ট ঢালি যোদ্ধাদের অনুসরণে এ নৃত্যের প্রচলন হয়। আক্রমণ ও প্রতিরোধের ভঙ্গিতে এ নৃত্য হয় উন্মাদনাপূর্ণ। ঢালি নৃত্যে নর্তক ডান হাতে লাঠি, কাঠের তরবারি বা বর্শা এবং বাম হাতে কাঠ, চামড়া বা বেতের তৈরি ঢাল সহযোগে আক্রমণাত্মক ও আত্মরক্ষাত্মক ভঙ্গিতে যুদ্ধাভিনয় করে। নৃত্যকালে ঢালের সাহায্যে প্রতিঘাত প্রতিরোধ এবং তরবারির সাহায্যে বিপক্ষকে আক্রমণের কৌশল প্রদর্শন করা হয়। একক বা দলবদ্ধভাবে এ নৃত্য পরিবেশন করা যায়। সাধারণত তিনজনের নৃত্য একসঙ্গে হয়ে থাকে। কখনওবা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে দুই দলে এ নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। অনেক সময় মূল ঢালিযোদ্ধা দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত থাকেন।

ঢালি নৃত্যে বিপক্ষকে আক্রমণের সাহস ও উৎসাহ, আঘাত প্রতিরোধের কৌশলজ্ঞান, শত্রুকে আক্রমণ করার উল্লাস বা নিজে আক্রান্ত হওয়ার যন্ত্রণা ইত্যাদি অঙ্গভঙ্গি ও মুখব্যঞ্জনা দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এছাড়া  ঢাক, ঢোল, টিকারা, কাঁসি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে শিল্পীর রণকৌশল এবং সতেজ ও বীরত্বপূর্ণ দৈহিক ভঙ্গি প্রদর্শিত হয়। প্রায়শই নর্তকের অঙ্গসজ্জা হিসেবে পরনে মালকোঁচা, মাথায় লাল ফেট্টি ও হাতের মণিবন্ধে কাপড় জড়ানো থাকে। কল্পিত জ্যামিতিক নকশাকারে ফুটে ওঠে শিল্পীর যুদ্ধাবস্থানশৈলী ও গতিময়তা। কৌশল প্রদর্শনে নর্তকগণ নৃত্যস্থলে চক্রাকারে আবর্তন করেন এবং পদকর্মে বৈচিত্র্যময় নকশা ফুটিয়ে তোলেন। বাংলাদেশের যশোর-খুলনা অঞ্চলে এ নৃত্যের বহুল প্রচলন রয়েছে। মুহররমের উৎসব উপলক্ষে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও এ নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।   [সমবারু চন্দ্র মহন্ত]