ঢাকা মাদ্রাসা


ঢাকা মাদ্রাসা (মোহসিনীয়া মাদ্রাসা)  বেঙ্গল সরকারের ১৮৭৩ সালের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর জর্জ ক্যাম্পবেলের সময়ে মাদ্রাসা সংস্কার কমিটির অনুমোদনক্রমে ঢাকায় আলিয়া মাদ্রাসার একটি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। হাজী মুহম্মদ মোহসীন ফান্ডের আর্থিক সহযোগিতায় মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয় বলে এর নামকরণ করা মোহসিনীয়া মাদ্রাসা। তবে মাদ্রাসাটি ঢাকা মাদ্রাসা নামেই সমধিক পরিচিতি লাভ করে। এ মাদ্রাসার প্রথম সুপারিনটেন্ডেন্ট ছিলেন বাহরুল উলুম মাওলানা  ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দী

ঢাকা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল যেসব দরিদ্র মুসলিম ছাত্ররা অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার জন্য স্কুল, কলেজে যেতে পারত না, তাদের লেখাপড়া করার সুযোগ করে দেওয়া। মওলানা ওবায়দুল্লাহ ১৮৭৪ সালের ১৬ মার্চ ঢাকার পাটুয়াটুলীতে একটি ভাড়া বাড়িতে মাদ্রাসা, হোস্টেল এবং নিজের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে মাদ্রাসার কার্যক্রম শুরু করেন। পরে তিনি রায়সাহেব বাজারে তিনতলা আরেকটি বাড়ি ভাড়া করে মাদ্রাসা স্থানান্তর করেন। প্রথম বছরে মাদ্রাসার ছাত্রসংখ্যা ছিল ১৬৯। ১৮৭৫ সালে মাদ্রাসা ছাত্রদের ইংরেজি শিক্ষা দেওয়ার জন্য অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগ খোলা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে এ বিভাগ জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

নওয়াব  খাজা আবদুল গণি মাদ্রাসার নিজস্ব জমি কেনার জন্য সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা দান করেন। এ অর্থ দিয়ে বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্কের পার্শ্বে মাদ্রাসার নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য দুই একর চল্লিশ শতাংশ জমি ক্রয় করা হয়। মাওলানা ওবায়দুল্লাহর তত্ত্বাবধানে মুসলিম স্থাপত্য রীতি অনুযায়ী মাদ্রাসা ভবন নির্মাণ করা হয়। এ মাদ্রাসার নকশা তৈরি করেন মেজর ম্যান এবং ভবন নির্মাণের প্রকৌশলী ছিলেন বিভিয়ান স্কট। ১৮৮০ সালে মাদ্রাসা নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়। ঢাকা মাদ্রাসায় শুধু আরবি ও ইংরেজি বিভাগ ছিল। আরবি বিভাগে ৭টি শ্রেণি ছিল। এ মাদ্রাসায় কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার সিলেবাস অনুসরণ করা হতো। এ মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের ছাত্ররা পড়াশুনা করত এন্ট্রান্স পর্যন্ত। ১৮৮১ সালে এ মাদ্রাসা থেকে তিনজন ছাত্র প্রথম এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়। ১৮৮৩ সালে ৩৩৮ ছাত্রের মধ্যে ২০২ জন ছিল ইংরেজি বিভাগের। এ বিভাগে আরবি, ফারসি, বাংলা ও বিজ্ঞান শিক্ষার পাশাপাশি পাশ্চাত্য সংস্কৃতিও পড়ানো হতো। ১৮৭৪ সাল থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত হাজী মুহম্মদ মোহসীন ফান্ড হতে এ মাদ্রাসার ব্যয় নির্বাহ করা হতো।

১৯১৫ সালে নিউ স্কিম পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হলে ঢাকা মাদ্রাসা হাই মাদ্রাসায় উন্নীত হয়। ১৯১৬ সালে অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগ আলাদা হয়ে ঢাকা সরকারি মুসলিম হাই স্কুল নাম ধারণ করে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ভর্তির সুবিধার্থে এ মাদ্রাসাকে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে রূপান্তর করা হয়।

১৯৪৭ সালে মাদ্রাসা বিভাগে ৪টি শ্রেণি ও কলেজ বিভাগে ১টি শ্রেণি ছিল। ১৯৫৭ সালে মানবিক বিভাগ চালু করা হয়। ১৯৬২ সালে মাদ্রাসা তুলে দিলে মাদ্রাসার ক্লাসগুলি মাধ্যমিক ক্লাসের সাথে একত্রীকরণ করা হয়। ১৯৬৮ সালে কলেজ থেকে স্কুল আলাদা করে বাণিজ্য বিভাগ খোলা হয়। তখন কলেজের নামকরণ হয় সরকারি ইসলামিয়া কলেজ আর হাইস্কুলের নামকরণ হয় ইসলামিয়া সরকারি হাইস্কুল। ১৯৭০ সালে কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়।

১৯৭২ সালে কলেজের নতুন নামকরণ হয়  কবি নজরুল সরকারি কলেজ।  [আ.ব.ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দীকী]