ঢাকাপট্টি


ঢাকাপট্টি  ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকা থেকে আসামে বসবাসের উদ্দেশ্যে পেশাজীবী অভিবাসীদের নিয়ে গঠিত প্রথম স্থায়ী বসতি। ঊনিশ শতকের প্রথমভাগে আসাম অঞ্চল ব্রিটিশদের অধিনস্ত হলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ও চা উৎপাদনকারীগণ নির্দিষ্ট কয়েকটি কাজের জন্য ঢাকা থেকে ব্যাপক সংখ্যক দক্ষ শ্রমিক আসামে নিয়ে যান। এ প্রক্রিয়ায় বিস্কুট ও রুটি প্রস্ত্ততকারক, দর্জি, বই বাঁধাইকারক, তোষক বা গদি ও বালিশ প্রস্ত্ততের কারিগর প্রমুখ শ্রমজীবীরা ঢাকা থেকে আসামে অভিবাসন করে। এতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল ব্রিটিশরা। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষই তাদেরকে আসামে বসবাসের সুবিধাজনক স্থান নির্ধারণ করে দেন ও প্রয়োজনে তাদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ উনিশ শতকের প্রথম পর্বে সুস্পষ্টভাবে আসামের কর্তৃত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই ঢাকা থেকে দক্ষ পেশাজীবীদের আসামে স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সূচনা করে। ঢাকা থেকে পেশাজীবীদের একটা বড় অংশ আসামের ব্রহ্মপুত্র নদীতীরবর্তী জোড়হাট, নগাঁও এবং বরাক উপত্যকার শীলচর অঞ্চলে তাদের নতুন বসতি গড়ে তুলেছিল। ঢাকা থেকে আগত পেশাজীবীদের এ নতুন বসতিই আসামে ‘ঢাকাপট্টি’ নামে পরিচিত হয়। এমনকি বর্তমানেও এ অঞ্চল ঢাকাপট্টি নামেই পরিচিত। আসাম অঞ্চলে বিভিন্ন কাজে দক্ষ পেশাজীবীদের অভাব ছিল বলেই ব্রিটিশদের আর্থিক সহায়তায় সেখানে ঢাকাপট্টি নামে নতুন আবাসভূমি গড়ে উঠেছিল।

ব্রিটিশ কর্তৃক আসাম বিজয়ের অনতিবিলম্বেই ১৮২৬ সালে জোড়হাট অঞ্চলে প্রথম ঢাকাপট্টি স্থাপিত হয়। সেখানকার চকবাজারে ‘সুলতান বেকারি’ নামে একটি বিস্কুট তৈরির কারখানা স্থাপন করে জনৈক গুলজার বেপারী এ প্রক্রিয়ার সূচনা করেন। এর ধারাবাহিকতায় আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে চা বাগান ও অন্যান্য প্রশাসনিক কেন্দ্রসমূহে যেখানে বিস্কুট ও অন্যান্য বিদেশী পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছিল সে সব স্থানে একাধিক বেকারি বা বিস্কুট তৈরির কারখানা স্থাপিত হতে থাকে।

কেন্দ্রীয় আসামের নগাঁওয়ে গড়ে ওঠা নতুন গুরুত্বপূর্ণ শহরে দ্বিতীয় ঢাকাপট্টিটি স্থাপিত হয়। এ অঞ্চলে ঢাকাপট্টির প্রতিষ্ঠাতা জনৈক আমিরুদ্দিন বেপারী। ১৯০৫ সালে পূর্ব বঙ্গ ও আসাম প্রদেশ সৃষ্টি হলে আসাম-বেঙ্গল রেইলওয়ের প্রতিষ্ঠার পথ ধরে বাংলা থেকে আসামে অভিবাসন প্রক্রিয়া নতুন গতি সঞ্চার করে। ১৯০৫ সাল থেকে শুরু হওয়া ঢাকা থেকে আসামের অভিবাসীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীর এবং তাদের অনেকেরই পেশা ছিল দোকানদারি এবং আয়ুর্বেদিক ঔষুধ বিক্রয়। তারা প্রায় সমগ্র আসামে ‘সাধনা ঔষধালয়’ নামে একাধিক বিপনী বা চেইনসপ স্থাপন করে। ওই সকল বিপনীর অনেকগুলো এখনো বর্তমান। ঢাকা থেকে অভিবাসী হয়ে অধিকাংশ হিন্দুরা আসামের শিলচর অঞ্চলে স্থায়ী বসবাস গড়ে তোলে। নতুন অধিবাসীদের মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বণিক এবং মুসলমানরা ‘বেপারী’ পদবি ধারণ করে। হিন্দু অভিবাসীদের মধ্যে প্রথম শিলচরে গমনকারী পরেশচন্দ্র বণিক ছিলেন ঢাকাইপট্টি স্থাপনকারীদের উদ্যোক্তা।  [সিরাজুল ইসলাম]

আরও দেখুন লাইন সিস্টেম