ডিফেন্স সার্ভিসেস কম্যান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ


ডিফেন্স সার্ভিসেস কম্যান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ  বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর অফিসারদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দানের জন্য ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ সামরিক উপদেষ্টা দলের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত এ কলেজটির উদ্বোধন হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ব্রিটিশ সামরিক উপদেষ্টা দলটি প্রথমদিকে কয়েকটি কোর্স পরিচালনা করেন। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তারা কোর্স পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানটিই ছিল বাংলাদেশে সামরিক শিক্ষাদানের সর্বোচ্চ কেন্দ্র।

স্টাফ কলেজ যুগপৎ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অফিসারদের প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করে। প্রাথমিক বছরগুলিতে তিন বাহিনীর জন্য ছয় মাস মেয়াদি যৌথ কোর্স চালু ছিল। ১৯৮০ সাল থেকে কোর্সের মেয়াদ দশ মাস করা হয় এবং বিদেশি প্রশিক্ষণার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত করা হয়। ওই বছর থেকে বিমান প্রশিক্ষণ শাখা এবং ১৯৮২ সালে নৌপ্রশিক্ষণ শাখা পৃথক করা হয়। অবশ্য তিনটি শাখাই যৌথ পাঠক্রম অনুসরণ করে। এ কলেজ বাংলাদেশের সামরিক অফিসারদের জন্য বন্ধু রাষ্ট্রগুলির প্রতিরক্ষা বাহিনীর অফিসারদের অভিজ্ঞতার অংশীদারিত্ব সহ সামরিক প্রশিক্ষণের এক অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মাত্র ৩০ জন ছাত্র নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিটি কোর্সে ১৫০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করে। সেনা পরিচালনা ও সেনাসদস্য নিয়োগের দায়িত্ব পালনে অধিকতর দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে তিন বাহিনীর জন্য নির্বাচিত কর্মকর্তাদের গড়ে তোলাই স্টাফ কলেজের লক্ষ্য। এ কলেজে প্রশিক্ষণের পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে : (ক) জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিস্তৃত জ্ঞান এবং তাতে সামরিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা; (খ) সশস্ত্র বাহিনীতে সদস্য নিয়োগের নীতি সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান এবং পাল্টা আক্রমণ থেকে শুরু করে বিক্ষিপ্ত যুদ্ধে সামরিক আক্রমণ পরিচালনার সামগ্রিক বিষয়ে জ্ঞান লাভ; (গ) শান্তি ও যুদ্ধাবস্থায় সেনা পরিচালনা ও এতদসংক্রান্ত কার্যক্রমের নীতি ও কৌশল আয়ত্ত করা; (ঘ) ছাত্রদের মৌখিক ও লিখিতভাবে মত প্রকাশের ক্ষমতা অর্জন করতে হয়; (ঙ) ছাত্রদের বিভিন্ন কার্যক্রমে নেতৃত্ব দানের এবং গবেষণার সুযোগ দেওয়া হয়; (চ) সেনা পরিচালনা ও নেতৃত্ব দান। সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল পদমর্যাদার একজন অফিসার এ কলেজের কম্যান্ড্যান্ট বা প্রধান থাকেন।

১৯৯৩ সাল থেকে স্টাফ কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। এ কলেজ থেকে সাফল্যের সঙ্গে কোর্স সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীদের মাস্টার অব ডিফেন্স স্টাডিজ ডিগ্রি প্রদান করা হয়। কোর্সের মেয়াদকাল ৪৪ সপ্তাহ।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী কলেজ গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান থাকেন। গভর্নিং বডির অপর সদস্যরা হলেন তিন বাহিনীর প্রধানগণ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, বৈদেশিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবগণ, সশস্ত্র বাহিনী ডিভিশনের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, কলেজের কম্যান্ড্যান্ট, এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরগণ।

স্টাফ কলেজের পাঠ্যসূচির ৪০% যৌথ শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে এবং ৬০% এককভাবে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের অধ্যয়নের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। মাঝারি পর্যায়ের পদমর্যাদার অফিসার ও ইউনিট কম্যান্ডারদের অবশ্য গ্রহণীয় কলাকৌশল ও জ্ঞান দানের লক্ষ্যে এ পাঠ্যসূচির মূল অংশ প্রণীত হয়। অতিরিক্ত বিষয়গুলি অধ্যয়ন করতে হয় যাতে সমসাময়িক ঘটনাবলি ও বিষয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অগ্রগতি সম্পর্কে অফিসারগণ অবহিত হতে পারেন।

১৯৯৮ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ২৬টি বন্ধুরাষ্ট্রের ২৮৪ জন অফিসারসহ সর্বমোট ১৫৫৪ জন সামরিক অফিসার এ প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছেন। এ যাবৎ বাহরায়েন, ব্রাজিল, ব্রুনেই, চীন, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, জর্দান, কেনিয়া, কুয়েত, মালয়েশিয়া, নেপাল, নাইজেরিয়া, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, সুদান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, জাম্বিয়া, মিশর ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অফিসাররা এ কলেজে শিক্ষালাভ করেছেন। [শেখ আমিনুর রহমান]