ডলফিন


ডলফিন

ডলফিন (Dolphin)  Cetacea বর্গের Delphinidae (সামুদ্রিক ডলফিন) ও Platanistidae (স্বাদুপানির ডলফিন) গোত্রের জলচর স্তন্যপায়ী। তিমি আর শুশুকও (porpoise) এ বর্গভুক্ত। ডলফিনকে প্রায়শ শুশুক বলা হয়। ডলফিন অর্থ ঠোঁট; ওদের নাক ঠোঁটের মতো, শরীর লম্বাটে। শুশুক (গোত্র Phoceonidae) আকারে ছোট, নাক বোঁচা। ডলফিন নামের একটি মাছও আছে Dolphin fish (Coryphaena hipparus)। লম্বা গড়নের এ মাছটি নীল রঙের, তাতে উজ্জ্বল সোনালি, সবুজ ও বেগুনি আভা আছে। ওজন ৩০ কেজি, লম্বায় প্রায় ২ মিটার। একা কিংবা পালে থাকে।

সামুদ্রিক ডলফিন প্রজাতির সংখ্যা ৩২, স্বাদুপানির ৫। এরা দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার নদীর বাসিন্দা। নদীর ডলফিন দৃশ্যত তাদের পূর্বপুরুষ তিমির মতো। দেহ দৈর্ঘ্য ২.৭ মিটার পর্যন্ত হয়। এরা ঘোলা পানির বাসিন্দা; দৃষ্টিশক্তি সীমিত ও চলাচলে প্রতিধ্বনি নির্ভর (echolocation)। গঙ্গার শুশুক Platanista gangetica বাংলাদেশেও আছে যাদের অক্ষিলেন্স নেই, একপাশে সাঁতার কাটে, একটি দাঁড় দিয়ে নদীর তল অাঁচ করে তলবাসী কাঁকড়া ও মাছ ধরে। সিন্ধু নদীর ডলফিনরা পিঠসাঁতারে সিঙ্গি-মাগুর শিকার করে। বাংলাদেশে ৪ প্রজাতির সামুদ্রিক ও ১ প্রজাতির স্বাদুপানির ডলফিন আছে (সারণি)।

সারণি বাংলাদেশে ডলফিনের অবস্থা ও বিস্তার।

গোত্র  বৈজ্ঞানিক নাম ইংরেজি নাম  স্থানীয় নাম বিস্তার
Delphinidae Delphinus delphis Common Dolphin ডলফিন সুন্দরবন/ উপকূলীয় দ্বীপ
Globicephala macrorhynchus Short-finned PilotWhale/ Indian Pilot Whale ডলফিন সুন্দরবন
Orcaella brevirostris Irrawaddy Dolphin/ Irrawaddy River Dolphin/ Snubfin Dolphin ডলফিন/  শিশু/শুশুক সুন্দরবন
Peponocephala electra Melon-headed Dolphin/ Many-toothed Blackfish/ Broad-beaked Dolphin ডলফিন/  শিশু/শুশুক উপকূলীয় দ্বীপ, সুন্দরবন
Platanistidae Platanista gangetica Ganges River Dolphin/ Ganges Susu/Susu/ Gangetic Dolphin/ Blind River Dolphin ডলফিন/  শিশু/ শুশুক/হুচ্চুম/হুম ব্যাপক

অধিকাংশ ডলফিন দলবদ্ধভাবে চলে ও প্রধানত মৎস্যভুক। তারা পিঠের একটি ছিদ্র দিয়ে শ্বাস নেয়। গড়ন মাছের মতো, শরীর লম্বাটে, লোমহীন। এদের ১৬০-২০০টি ধারালো দাঁত থাকে। চোখ মাঝারি আকারের, কানের ছিদ্র খুব ছোট। শ্বাস ফেলার ফুটো অর্ধচন্দ্রাকৃতি। অধিকাংশ ডলফিনের পিঠ কালো, বুক সাদা। ডলফিন একবারে একটি বাচ্চা দেয় এবং সন্তানের প্রতি যত্নশীল হয়। শক্তিশালী অনুভূমিক লেজপাখনার সাহায্যে এরা পানির তলায় ও উপরে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করে এবং সামনের ও পিঠের পাখনাগুলি হালের কাজ করে। ঘন ঘন খোলস বদলানোর জন্য এদের শরীরের উপর কোনো পরজীবী সংক্রমণ ঘটে না। চর্বির একটি স্তর তাদের ঠান্ডা থেকে বাঁচায় ও ক্ষত ভরাট করে। বুদ্ধিমত্তা, ক্রীড়াদক্ষতা ও বন্ধুসুলভ স্বভাবের জন্য ডলফিন খুবই জনপ্রিয়। ডলফিনের গুরুত্ব এখন বেড়েছে, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪০টি জলক্রীড়া কেন্দ্রে তারা ব্যবহূত হচ্ছে এবং ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য সহজলভ্য হয়ে উঠছে। সুপরিচিত দুটি প্রজাতি হলো সাধারণ ডলফিন (Delphinus delphis) এবং উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল ও ভূমধ্যসাগরের বোতল-নাক ডলফিন (Tursiops truncatus)। সাধারণ ডলফিন গড়ে ২.৪ মিটার লম্বা ও ওজন ৭৫ কেজি, বাঁচে প্রায় ৫০ বছর। ডলফিন মানুষের শোনা শব্দের ১০ গুণ কম্পাঙ্ক পর্যন্ত অজস্র ধরনের শব্দ উৎপাদন করে। প্রতিটি ডলফিন একটি বিশেষ শিসের সাহায্যে নিজেকে শনাক্ত করে এবং বাচ্চারা খুব দ্রুত মায়ের শিস শনাক্ত করতে শেখে। টিক টিক ও কট কট আওয়াজ ওদের প্রতিধ্বনি নির্ভর শনাক্তির ভিত্তি এবং তা দ্বারা ডলফিন আশপাশের বস্ত্তরাশির আকার, অবস্থা ও প্রকৃতি সম্পর্কে নিখুঁত তথ্যাদি সংগ্রহ করে। তারা এভাবে পারস্পরিক তথ্যাদি বিনিময় করতেও পারে। মার্কিন নৌবাহিনী জলতলের স্টেশনে সংবাদ পৌঁছানো, আহত ডুবুরিদের উদ্ধার ও তাদের হাঙ্গরের শিকার থেকে রক্ষা এবং ডুবোজাহাজ খোঁজা ও সেগুলি ধ্বংসের জন্য ডলফিনদের সফল প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ডলফিন একটি খাদ্যও বটে এবং কিছুকাল আগেও মাছ শিকারিরা ডলফিন ধরত। এখনও জাপানিরা যথেষ্ট পরিমাণ ডলফিন শিকার করে। পুরাকালে গ্রিকরা ডলফিনদের নিজেদের সংস্কৃতিভুক্ত করেছিল। মাছ ধরার সময় দুর্ঘটনায় অজস্র ডলফিন মারা যায়। ছোট ছোট ডলফিনরা পৃথিবীর সর্বত্র গিলনেট, সেটনেট, টানা-বড়শি, ট্রলার ও টানাজালে ধরা পড়ে।

কাব্য, সাহিত্য, চিত্রশিল্প ও ভাস্কর্যে ডলফিন সর্বত্র সমাদৃত। এ জাতীয় প্রাণীর অন্যতম প্রথম সমীক্ষক ছিলেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (খ্রিপূ ৩৮৪-৩২২)। সুইডিস জীববিদ লিনিয়াস (Linnaeus) তিমি ও ডলফিনকে স্তন্যপায়ী হিসেবে প্রথম শনাক্ত করেন।  [মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম]

আরও দেখুন জলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী; শুশুক; স্তন্যপায়ী