ঠগী


ঠগী  ভিন্ন বানান ও উচ্চারণে বাংলাসহ সকল দক্ষিণ এশীয় ভাষায় প্রচলিত একটি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ ধোঁকাবাজ, প্রতারক। ইউরোপীয়গণ ঠগী শব্দটির গৃহীত মর্যাদা দেওয়ার আগেও উত্তর ভারতের লোকেরা তাদেরকে ফাঁসি শব্দ হতে ফাঁসিগর বলে অভিহিত করত। ঠগীদের উৎপত্তি অস্পষ্ট। সতেরো এবং আঠারো শতকে, বিশেষ করে কোম্পানির শাসনের প্রতিষ্ঠালগ্নে এদের উদ্ভব ঘটে। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের দুষ্কৃতিপরায়ণ উপজাতি হতে উদ্ভূত হয়ে ঠগীরা নওয়াবী আমলের শেষ ও ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার ক্রান্তিলগ্নে ক্রমান্বয়ে প্রায় সমগ্র ভারত জুড়ে তাদের কার্যপরিধি বিস্তার করে।

ভৃপ্রকৃতি এবং পরিবহণ ব্যবস্থাভেদে বিভিন্ন অঞ্চলে ঠগীদের কার্যপ্রণালী বিভিন্ন প্রকার ছিল। সাধারণত তারা দূরের যাত্রী ও তীর্থযাত্রীর ছদ্মবেশে দল বেঁধে চলাচল করত এবং আগন্তুক ভ্রমণকারীদের সঙ্গে মিশে যেত এবং তাদের প্রতি সহূদয়তা ও সহযোগিতার মনোভাব প্রদর্শন করে তাদের বিশ্বাস অর্জন করত। সময়-সুযোগ বুঝে ও নির্ধারিত স্থানে ঠগীরা তাদের প্রথানুযায়ী হতভাগ্য শিকারের গলায় রুমাল পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করত, তার সর্বস্ব লুণ্ঠন করত এবং ঠগী প্রথানুসারে তাকে সমাহিত করত। উদাহরণস্বরূপ, পরবর্তী শিকারের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হওয়ার আগে তারা সদ্যকৃত ঘটনাস্থলে সারা রাত ধরে পান-ভোজন ও নাচগান করত। বাংলার ঠগীরা প্রধানত নৌপথেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত। নদীর ঠগীরা সাধারণত তাদের হাতে পড়া হতভাগ্যদের মাথা পানিতে চুবিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করত।

ঠগীরা শীত মৌসুমে বাংলার জেলাসমূহে আসত এবং বংশগত স্থানীয় অপরাধীদের সহযোগিতায় বর্ষাকাল আসার আগ পর্যন্ত তাদের কাজ চালিয়ে যেত। উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক এর প্রশাসন ঠগীদের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক সামরিক ও বেসামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ফলে শত শত ঠগী ধরা পড়ে। তাদেরকে বিচার করে প্রকাশ্যে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। ঠগী উচ্ছেদ অভিযানের নেতা ছিলেন কর্নেল শ্লিম্যান। ঠগী আক্রমণে তাঁর নিষ্ঠার কারণে তার নাম ব্রিটিশ ভারতে পারিবারিক শব্দে পরিণত হয়। শ্লিম্যান পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে, বিভিন্ন ঠগী দলে অনেক মুসলমান সদস্য ছিল, যদিও ঠগী প্রথা ইসলাম বিরোধী। আরবে হজ্জ পালনকারীদের পথপ্রদর্শক (মুয়াল্লেম)-এর বেশে তারা বাংলার জেলাসমূহে আসত এবং ধনীদের অত্যাবশ্যকীয় হজ্জ পালনে উদ্বুদ্ধ করত। তাদের পরিচালনায় তারা হজ যাত্রা শুরু করলে ঠগীরা তাদের খুন ও তাদের মালামাল লুণ্ঠন করত। উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে আইন-শৃঙ্খলার প্রতি হুমকিস্বরূপ এ ঠগবাজী প্রায় সম্পূর্ণভাবে উৎখাত হয়ে যায়। কিন্তু চরম অপরাধী এবং দুধর্ষ দুর্বৃত্তদের বর্ণনার ক্ষেত্রে ঠগী শব্দটি সাহিত্যে স্থান দখল করে নিয়েছে।  [সিরাজুল ইসলাম]