ট্যাবু


ট্যাবু (Taboo)  শব্দের আভিধানিক অর্থ অলঙ্ঘনীয় বা নিষিদ্ধ, পবিত্র বা অপবিত্র বিবেচনা করে কোনো বস্ত্ত বা ব্যক্তিকে আলাদা করে রাখা। ট্যাবু পলিনেশীয় শব্দ। ‘ট্যাবু’ বলতে বোঝায়: ক. বস্ত্ত বা ব্যক্তির পবিত্র বা অপবিত্র ভাব, খ. এ পবিত্র বা অপবিত্র ভাব থেকে উদ্ভূত নিষেধাজ্ঞা এবং গ. নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার ফলে যেসব পবিত্রতার বা অপবিত্রতার সৃষ্টি হয়। এছাড়া ট্যাবুর লক্ষ্য হচ্ছে: ক. দলপতি বা গুরুজন ও কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি বা ধনসম্পদকে বিপদাপদ বা ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করা, খ. দুর্বল তথা নারী-শিশু-বৃদ্ধ ও সাধারণ মানুষকে যাদুকরি বিদ্যার প্রভাব থেকে রক্ষা করা, গ. মৃতদেহ স্পর্শ করার অশুভ প্রতিক্রিয়া থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখা, ঘ. জন্ম, বিবাহ, যৌনক্রিয়া ইত্যাদি প্রধান প্রধান ক্ষেত্রকে বিপদমুক্ত রাখা, ঙ. দেবতা ও প্রেতাত্মাদের কোপদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা, চ. মাতৃগর্ভস্থ সন্তানের সংরক্ষণ। ব্যক্তিগত সম্পত্তি, ক্ষেতখামার, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি চোরের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যও ট্যাবুর ভূমিকা রয়েছে। অধুনা মানুষের মধ্যে যে অর্থে বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মীয় অনুশাসন প্রচলিত রয়েছে, অনুরূপ অর্থে আগেরকার মানুষদের মধ্যেও প্রচলিত হয়েছিল ‘ট্যাবু’। এখনও অনেক মানুষের জীবনাচরণে সেই ধরনের বিশ্বাস ও বিধি-নিষেধের প্রচলন অব্যাহত। সম্ভবত সৃষ্টিকর্তার ধারণা গড়ে উঠার অনেক আগেই মানুষের মনে খন্ডিত বা স্থানকাল-পাত্রের সীমাবদ্ধতায় ভাল-মন্দ, পবিত্র-অপবিত্র এবং বহুবিধ অলৌকিক শক্তির ধারণা জাগে। আদিবাসীদের মধ্যে এমন অনেক বিধি-নিষেধের প্রচলন দেখা যায়, যা তারা নিজেদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে প্রয়োগ করে থাকে, যেমন এটা করা ঠিক নয়, ওটা নিষেধ ইত্যাদি। লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, কেন ঠিক নয়, কেন নিষিদ্ধ, তা নিয়ে তারা ভাবতেই চায় না। তারা এসব বিধি-নিষেধকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে বিশ্বাস করে। শুধু তাই নয়, তাদের বিশ্বাস ওই সব বিধি-নিষেধ অমান্য করা হলে ভয়াবহ পরিণতি ঘটবে, অমান্যাকারীকে চরম শাস্তি পেতেই হবে। যা কিছু পবিত্র, অসাধারণ এবং একইসঙ্গে সাংঘাতিক অশুচি ও অদ্ভুত, তার সবই ট্যাবু পর্যায়ভুক্ত। অশরীরী অস্তিত্বে বা আত্মায় এবং দেও-দৈত্যে বিশ্বাস ইত্যাদির উৎস অনুসন্ধান করলেই ট্যাবুর রহস্য উদঘাটিত হতে পারে। যে সকল প্রথা কোনো ধর্মমতের চিন্তার সঙ্গে বা অনুশাসনের সঙ্গে যুক্ত কোনো বস্ত্ত সম্পর্কে ভীতির সঞ্চার করে, সে সবই ট্যাবু। এছাড়াও কোনো আচারবিরুদ্ধ প্রথা বা আদব-কায়দা এবং কোনো জিনিস স্পর্শ করা বা গ্রহণ করা, কোনো নিষিদ্ধ উচ্চারণে আপত্তি, ইত্যাদিও ট্যাবু।

অনুমান করা যেতে পারে, ট্যাবু তথা বহু প্রাচীন সংস্কার বা আচার কোনো এক সময়ে বাইরে থেকে বিভিন্ন জাতিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। খুব সম্ভব পূর্ববর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ পিতৃপুরুষরা এসব ধারণা ও বিধি-নিষেধই পরবর্তী প্রজন্ম বা বংশধরদের মধ্যে সংক্রমিত করে গেছে। এরপর বংশ পরম্পরায় তা প্রতিপালিত হয়ে এসেছে, সামাজিক চাপে কেউ নিয়মভঙ্গ করতে সাহস করে নি। কালক্রমে এসব বিধি-নিষেধ সার্বজনীন বংশগত মানসিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হয়েছে। অবিকল আলৌকিক অস্তিত্বের প্রতি আস্থা, দৈবিক কর্তৃত্ব (Theory of Divine Authority), সূর্যগ্রহণকালীন উপাসনা, গ্রহণ শেষে রান্না করা সব খাদ্যসামগ্রী (দুধ ছাড়া) ফেলে দেওয়া, পাপ মোচনের জন্য তীর্থযাত্রা ইত্যাদি লোকাচার ও আনুষ্ঠানিকতা বংশানুক্রমিকভাবে প্রচলিত রয়েছে।

মৃত্যু-পরবর্তী প্রেতাত্মার ভয় আদিবাসীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে সংক্রমিত। মাউরি, অস্ট্রেলীয় নিগ্রো এবং এস্কিমোদের মধ্যে এক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন রূপে ভীতিকর ধারণা প্রচলিত। বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীদের পরলোকতত্ত্ব, স্বর্গ-নরক, মৃত আত্মার সদগতি কামনা, কফিনের সঙ্গে ব্যবহার্য সামগ্রী সাজিয়ে দেওয়া ইত্যাদি হয়তো-বা তারই ধারাবাহিকতা।

ট্যাবুর সমস্ত নিয়ম নিতান্ত ভাবাবেগ প্রসূত নয়। কৃতকর্মের অনুশোচনা, হত্যার জন্য মনস্তাপ ইত্যাদি বোধ অর্থাৎ অন্যায় কাজের জন্য শাস্তি বিধানের ভয়ভীতিও আদিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, ট্যাবু হচ্ছে বিবেকের আদেশ, এ আদেশ অমান্য করা হলে অত্যন্ত অপরাধবোধ হয়। গ্রিসীয় উপকথায় দেখা যায়, ইডিপাস যে কাজ সজ্ঞানে করে নি, এমনকি যে কাজ সে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই করেছিল, সেকথা জানা সত্ত্বেও তার অপরাধবোধ দূর হয় নি।

রামায়ণ মহাকাব্য অনুসারে বনের কুটিরে লক্ষ্মণের এঁকে দেওয়া গন্ডির বাইরে পা না দিলে ছদ্মবেশী রাবণের পক্ষে সীতা অপহরণ কিছুতেই সম্ভব ছিল না। সেই আদিকবি বাল্মীকির কাল থেকে হুবহু একালে চলে আসা স্বতঃসিদ্ধ ধারণার মতোই আমাদের ও আদিবাসীদের জীবনাচরণে অটুট রয়েছে বহু পূর্ব ধারণা। বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত চাকমা, গারো, হাজং, মুরং, সাঁওতাল সহ অনেক আদিবাসী বংশানুক্রমিকভাবে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচার মান্য করে থাকে। এদিকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদেরকেও অশুচি, যাত্রানাস্তি, ভাগ্যলিপি ইত্যাদি প্রভাবিত করে রেখেছে। ‘লগ্ন তো রাজার হাতে’– এমন ব্যঙ্গোক্তি সত্ত্বেও কাজের বেলায় পাঁজি দেখতে সবাই অভ্যস্ত।

প্রকৃতপক্ষে খাদ্যান্বেষী আদিম মানবগোষ্ঠী স্থানান্তরে গমনকালে যেসব অসুবিধার সম্মুখীন হতো, তাকে তারা ভাবতো অপশক্তি। আর এ থেকে আত্মরক্ষার জন্যই তারা হয়ত কল্পনা করে নিয়েছিল শুভশক্তিকে। শারীরিক নিরাপত্তার জন্য মানুষ যেমন নিজের ঘরে আশ্রয় গ্রহণ করে, তেমনই মানসিক নিরাপত্তার জন্যও ঐশী শক্তির ওপর ভরসা স্থাপন করে থাকে। এসবই ট্যাবুর ধারাবাহিকতা হিসেবে আজও মানব সমাজে আচরণীয়। [বেলাল মোহাম্মদ]