জ্যোতির্বিদ্যা


জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy)  মহাবিশ্বে বিরাজমান গ্রহ, নক্ষত্র ও অন্যান্য জ্যোতিষ্কের গতি-প্রকৃতি সমন্ধীয় বিদ্যা। বিজ্ঞানের প্রাচীনতম শাখাসমূহের অন্যতম হচ্ছে জ্যোতির্বিদ্যা বা জ্যোতির্বিজ্ঞান। প্রাচীনকালের বহু সভ্যতায়ই জ্যোতিষ্কসমূহের নিয়মপূর্ণ গতিবিধি পন্ডিতদের কাছে পরম কৌতূহলের বিষয় ছিল। প্রাচীন পন্ডিতবর্গ সূর্য, চন্দ্র ও গ্রহাদির পারস্পরিক স্থান পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন এবং তা থেকে ভবিষ্যৎ ঘটনাবলি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করতেন। আদিতে পন্ডিতগণ জ্যোতিষ্কসমূহের গতিবিধি ও আবর্তন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কাল গণনা (দিন, মাস ও বছর) সূচনা করেন এবং এর ভিত্তিতেই বর্ষপঞ্জি গণনাপদ্ধতির উদ্ভব হয়। পরবর্তীতে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চালব্ধ জ্ঞান নৌচালনায় বিশেষ করে দিক নির্ণয়ে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।

খ্রিস্টপূর্ব ১৩ শতকেই চীনারা তাদের কাজকর্মের প্রয়োজনে বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করত। প্রায় ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চীনা পন্ডিত শি শেন (Shih Shen) ৮০০টি নক্ষত্রের বর্ণনা সম্বলিত একটি নক্ষত্রপঞ্জি তৈরি করেছিলেন। এটিই জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে প্রাচীনতম নক্ষত্রপঞ্জি বলে বিবেচিত। প্রাচীন জ্যোতির্বিদদের বেশিরভাগই ছিলেন পুরোহিত, যার ফলে তাদের অনেকেই ক্রমে ক্রমে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও গতিবিধির সঙ্গে মানুষের ভাগ্যের সম্পর্ক আছে বলে মত প্রকাশ করতে থাকেন। এভাবে জ্যোতির্বিদ্যা ধীরে ধীরে জ্যোতিষ শাস্ত্রে (Astrology) রূপ নিতে থাকে। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর পর থেকে জ্যোতিষ শাস্ত্রকে জ্যোতির্বিদ্যা থেকে আলাদা করা হয়েছে। গ্রহ ও নক্ষত্রাদির দূরত্ব, ওজন, বস্ত্তবিন্যাস, গঠনপদ্ধতি প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক আলোচনাকেই বর্তমানকালে জ্যোতিবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে জ্যোতিষ শাস্ত্রের কোনো স্থান নেই। ফলে এখন পদার্থর্বিদ্যা,  গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

ভারতবর্ষে বৈদিক কাল থেকেই জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে সেসময় কেবলমাত্র সূর্য ও চন্দ্রের গতিবিধিই পর্যবেক্ষণ করা হতো। সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন বিভাগের মাধ্যমে ঋতুকাল নিরূপণ করা হতো এবং বৎসর গণনা করা হতো। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার দ্বারা বৎসরকে মাসে ভাগ করা হতো। পুরাকালের কতিপয় গ্রন্থ থেকে প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার স্বরূপ সমন্ধে জানা যায়। এ সকল গ্রন্থের মধ্যে প্রাচীনতম হচ্ছে বেদ। বেদের আনুষঙ্গিক ছয় প্রকার শাখা আছে, এগুলিকে বেদাঙ্গ বলে। বেদাঙ্গগুলোর পঞ্চম বেদাঙ্গ হচ্ছে জ্যোতিষ্ক যাতে গ্রহ-নক্ষত্রাদির বিবরণ রয়েছে। হিন্দুদের যাবতীয় ধর্ম-কর্মে গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদির অবস্থান জানার প্রয়োজন হওয়াতে হিন্দুদের সকল শাস্ত্রেই জ্যোতির্বিদ্যার উল্লেখ রয়েছে এবং সকল যুগেই জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা করা হয়েছে। ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা তিনটি শাখায় বিভক্ত: গণিত, হোরা এবং সংহিতা। যে শাখায় গ্রহগসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে গণিত শাস্ত্র বা গণিত তন্ত্র বলে। হোরা শাস্ত্রে গ্রহসমূহের অবস্থান ও লগ্ন অনুযায়ী যাত্রা, বিবাহ প্রভৃতির শুভাশুভ নির্ণয় করা হয় এবং জন্মকালে গ্রহের অবস্থানদৃষ্টে জাতকের কোষ্ঠী নির্ণয় করা হয়। জ্যোতিষ শাস্ত্রের গণিত শাখা আবার দুই প্রকার: সিদ্ধান্ত ও করণ। সিদ্ধান্তে প্রমাণাদি প্রয়োগের পর প্রত্যেকটি গণনার ফল নির্ণয় করা হতো। করণে শুধুমাত্র গণনাপদ্ধতি লিপিবদ্ধ থাকে। অবস্থান বিষয়ক সূত্র দ্বারা গ্রহের অবস্থান নির্ণয় করা যায়, কিন্তু কি উপায়ে সেই সূত্র আবিষ্কার করা যেতে পারে, করণে তার কোনো উল্লেখ নেই। সম্পূর্ণরূপে করণের ওপর নির্ভর করার ফলে কালক্রমে ভারতবর্ষে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার পরিবর্তে জ্যোতিষ শাস্ত্র চর্চা প্রাধান্য পেতে থাকে। জ্যোতিষীরা শুধুমাত্র কোষ্ঠী নির্ণয় এবং করণের সাহায্যে নানাবিধ গণনা করাতেই নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখেন।

হিন্দু ধর্মে বেদের পরেই পুরাণের স্থান। প্রাচীনকালের উপাখ্যান ও জনশ্রুতি দিয়েই পুরাণ গঠিত। পুরাণের মোট সংখ্যা আঠারো। পুরাণে জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত আলোচনা রয়েছে তবে তা রূপক ও কাহিনী দ্বারা আচ্ছন্ন। সূর্য, চন্দ্র ও গ্রহের গতির বর্ণনা দিতে নানাপ্রকার রূপকের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তারামন্ডল সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে নানাপ্রকার কাহিনী রচনা করা হয়েছে। পুরাণে প্রত্যেক জ্যোতিষ্কে মানুষের স্বভাব আরোপ করা হয়েছে। যেমন: সূর্য ভ্রমণ করে, কিন্তু সূর্যের মতো শক্তিশালী মহিমান্বিত কোনো মানুষ পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করতে পারে না; অতএব সূর্যের ভ্রমণের জন্য রথের কল্পনা করা হয়েছে। রথ টানার জন্য অশ্বের কল্পনাও করা হয়েছে। পুরাণের বর্ণনা অনুসারে গ্রহ-নক্ষত্র আকাশে বিচিত্র গতিতে চলাফেরার মাধ্যমে পৃথিবীর ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করে এবং পৃথিবীর মানুষ ও ঘটনাবলীর ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

পুরাণ মতে, সৃষ্টির আদিতে সর্বত্রই কেবল পানি ছিল। এ পানি ক্রমে চক্রাকারে পাক খেতে থাকে এবং তা থেকে ফেনার উৎপত্তি হয়। এ ছাড়াও পানি থেকে এক প্রকার সাদা জিনিস বের হয় যা থেকে সৃষ্টিকর্তা একটা ডিম বা অন্ড সৃষ্টি করেন। এ অন্ড ফেটে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং এ অন্ডের ভিতর থেকে ব্রহ্মার আবির্ভাব হয়, সেজন্য একে ব্রহ্মান্ড বলে। এ ফাটা অন্ডের এক অংশ পৃথিবী এবং অন্য অংশ আকাশ। অন্ডটি ফাটবার সময় যে সমস্ত টুকরা অংশ পড়ে, পুরাণমতে সেগুলিই বৃষ্টি। ব্রহ্মান্ডের আয়তন সম্পর্কে বলা হয়েছে যে,  ব্রহ্মান্ডের সর্বনিম্ন অংশে ১ কোটি ৮৫ লক্ষ যোজন বিস্তৃত গাঢ় অন্ধকার। এর পরেই নরক। নরকের বিস্তৃতি ১৩ কোটি ১২ লক্ষ যোজন। এর পরে আবার ১ লক্ষ যোজন অন্ধকার, এ অন্ধকারের উপরে ৩৪,০০০ যোজন বিস্তৃত বজ্র। এর উপরে ৬০,০০০ যোজনব্যাপী গর্ভ বা মধ্যপৃথিবী। গর্ভের উপরে ৩০,০০০ যোজনব্যাপী স্বর্ণপৃথিবী। এর উপরে সপ্তপৃথিবী, প্রত্যেক পৃথিবীর বিস্তার ১০,০০০ যোজন।

বিষ্ণু পুরাণমতে, ভূমন্ডলে সাতটি পাতাল আছে। এদের নাম যথাক্রমে অতল, বিতল, নিতল, গভস্তিমৎ, মহাতল, শ্রেষ্ঠ-সুতল ও পাতাল। এ পাতালের প্রত্যেকটি ১০ হাজার যোজন পরিমিত। ভূমন্ডলের এক লক্ষ যোজন উপরে সূর্যমন্ডল; তার এক লক্ষ যোজন উপরে চন্দ্রমন্ডল। তারও এক লক্ষ যোজন উপরে নক্ষত্রমন্ডল। এর দুই লক্ষ যোজন উপরে যথাক্রমে বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনিগ্রহ মন্ডল। শনিগ্রহ মন্ডলের একলক্ষ যোজন উপরে সপ্তর্ষিমন্ডল। তার এক লক্ষ যোজন উপরে ধ্রুবমন্ডল। এ ধ্রুবমন্ডলের চারদিকে সমস্ত জ্যোতিষ্ক পরিভ্রমণ করে। পুরাণ যুগ বা পুরাণ-পূর্ব যুগের ভারতীয় জ্যোতির্বিদগণ মনে করতেন যে, চন্দ্র অপেক্ষা সূর্য নিকটবর্তী এবং নক্ষত্রমন্ডল বুধমন্ডল অপেক্ষাও নিকটবর্তী। ভারতীয় প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যাতে বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনির সঙ্গে সূর্য ও চন্দ্রকে গ্রহ বলা ছাড়াও রাহু ও কেতু নামে আরও দুটি গ্রহের কল্পনা করা হতো।

হিন্দুদের যাবতীয় কাজকর্মের বিধিবিধান সংহিতা নামক সংকলন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ থাকে। সংহিতাকে দুইভাগে বিভক্ত করা হয়। একটি ব্যবহারিক ভাগ, অন্যটি ফলভাগ। তিথি নক্ষত্র অনুযায়ী কাজ করার বিধানসমূহ যে ভাগে লিপিবদ্ধ থাকে, তাকে ব্যবহার ভাগ বলে; আর যে ভাগে নৈসর্গিক বা পারিপার্শ্বিক অবস্থাদৃষ্টে কর্মের শুভাশুভ নির্ণয় করা হয়, তাকে ফলভাগ বলে। ফলভাগের উপর নির্ভর করেই গণকগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবহার ভাগের জন্য জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। অতি প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার যাবতীয় জ্ঞান সংহিতায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু এ সমস্ত প্রাচীন সংহিতার কোনো সন্ধান বর্তমানে পাওয়া যায় না।

ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার গ্রন্থকে সিদ্ধান্ত গ্রন্থ বলে। আর্যভট্ট (৪৭৬ খ্রি.?-৫৫০ খ্রি.?) কৃত আর্যভট্টীয়,  বরাহমিহির (৪৯৯ খ্রি.? -৫৮৭ খ্রি.?) সংকলিত পঞ্চসিদ্ধান্তিকা, ব্রহ্মগুপ্ত (৫৯৮ খ্রি.?-৬৬৫ খ্রি.?) কৃত ব্রাহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত এবং ভাস্করাচার্য (১১১৪ খ্রি.? - ১১৮৫ খ্রি.?) কৃত গণিতাধ্যায় ও গোলাধ্যায় সিদ্ধান্তগ্রন্থের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এগুলো ছাড়াও অধিকতর প্রাঞ্জল ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হচ্ছে অজ্ঞাতনামা জ্যোতির্বিদ (বা ময়দানব) কৃত সূর্যসিদ্ধান্ত।

সিদ্ধান্তযুগের জ্যোতির্বিদগণ তাঁদের গবেষণালব্ধ জ্ঞানের সঙ্গে পুরাণের বর্ণনাকে খাপ খাওয়ানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। পুরাণের সঙ্গে যেখানেই গবেষণার বিরোধ দেখা দিয়েছে, সেখানে তাঁরা পুরাণকে শ্রদ্ধার সঙ্গে উপক্ষা করে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। সিদ্ধান্তের প্রবক্তাগণের মতে, পৃথিবী গোলাকার; এর উত্তরার্ধ স্থলভাগ এবং দক্ষিণার্ধ জলভাগ। পৌলিশ সিদ্ধান্তে পৃথিবী ব্রহ্মান্ডের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এবং এর আকৃতি গোলাকার বলে স্বীকার করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে এর এক অর্ধ স্থল, অন্য অর্ধ জল। সুমেরু পর্বত স্থলার্ধে অবস্থিত এবং এখানে দেবতাগণ বাস করেন। এর শীর্ষদেশেই উত্তর মেরু। জলার্ধে বাড়ব মুখ অবস্থিত, যেখানে দৈত্য ও নাগগণ বাস করেন। যে রেখা দ্বারা পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত, তার নাম নিরক্ষরেখা। এর চারদিকে চারটি বিখ্যাত নগর রয়েছে। পূর্বে যমকোটি, পশ্চিমে রোম, দক্ষিণে লঙ্কা এবং উত্তরে সিদ্ধুপুর। দুই মেরুতে পৃথিবী অক্ষ দ্বারা আবদ্ধ। সূর্য যখন সুমেরু পর্বত ও লঙ্কার সংযোজক রেখায় উদিত হয়, যম কোটিতে তখন মধ্যাহ্ন, সিদ্ধপুরে সন্ধ্যা এবং রোমে মধ্যরাত্রি।

সিদ্ধান্ত সংকলক বরাহমিহির মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তাঁর মতে, কদম্বফুলের পাঁপড়ি যেমন কদম্বপৃষ্ঠে সংযুক্ত থাকে, সকল মানুষই সেরূপ ভূ-পৃষ্ঠে সংযুক্ত। এমন নয় যে, কারো পা মাটিতে অন্য কারো মাথা মাটিতে। সকলেই মাটিতে পা রেখে মাথা উচুঁ করে দাঁড়ায়। পৃথিবী সকল পদার্থকেই তার কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে; সেজন্য সমস্ত জায়গা থেকেই পৃথিবীর কেন্দ্র নিচের দিকে এবং আকাশ উপরের দিকে। এভাবে এ সকল সিদ্ধান্ত গ্রন্থসমূহের মধ্যে সূর্য, চন্দ্র প্রভৃতির আবর্তনকাল, গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও গতি, সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণে গণনা, উদয়াস্ত গণনা প্রভৃতি আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার সকল বিষয়ই পাওয়া যায়। অবশ্য সূর্যই যে সৌরজগতের কেন্দ্র একথা তাঁরা নির্ণয় করতে পারেন নি, ভূ-কেন্দ্রিক মতবাদই এ সকল সিদ্ধান্ত গ্রন্থের ভিত্তি।

বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা  বাংলাদেশে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার ইতিহাস একেবারেই সাম্প্রতিক কালের। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকেই বাংলাদেশে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা শুরু হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা প্রধানত তাত্ত্বিক পর্যায়ের, বিশেষ করে, পাকিস্তান আমলে। কেননা, পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান বা মহাকাশ প্রযুক্তি অনেক ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে এক্ষেত্রে কোনো সংগঠিত প্রয়াস সাধিত হয় নি। পাকিস্তান আমলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গণিতের শাখা হিসেবে জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ানো হতো।

স্বাধীনতা উত্তরকালে কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এদের মধ্যে বিশিষ্ট গণিতবিদ  মোহাম্মদ আব্দুল জববার স্মরণযোগ্য যাকে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রদূত বলা হয়ে থাকে। তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধান ও পরিকল্পনায় নির্মিত হয় বাংলাদেশের প্রথম সিলেসশিয়াল গ্লোব বা ‘খ-গোলক’। জ্যোতির্বিজ্ঞান শাস্ত্রকে বাংলাভাষায় জনপ্রিয় করার জন্য তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তারা পরিচিতি, খগোল পরিচয় এবং প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান জাদুঘর ১৯৮০ সাল থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক কার্যক্রম শুরু করে। একটি চার ইঞ্চি প্রতিফলন টেলিস্কোপের মাধ্যমে জনসাধারণকে সে সময় আকাশ পর্যবেক্ষণ করানো হতো। এছাড়া ১০ আসনবিশিষ্ট একটি মিনি প্লানেটরিয়াম বা নভোথিয়েটারের মাধ্যমে রাতের আকাশ চেনাবার ব্যবস্থা ছিল।

জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় আগ্রহী একদল তরুণ ১৯৮৮ সালে  বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন গঠন করলে পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানে সুসংগঠিতভাবে কিছু কাজ শুরু হয়। তারা মূলত জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন ঘটনা যেমন - চন্দ্র বা সূর্য গ্রহণ, কোনো উজ্জ্বল ধুমকেতুর আগমন, উল্কাঝড়, গ্রহদের প্রতিযোগ ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে এবং সাধারণ মানুষের জন্য ক্যাম্প উন্মুক্ত রাখে। যদিও এর পূর্বে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি নামে অপর একটি সংগঠন যাত্রা শুরু করেছিল, তবে তার সাংগঠনিক কার্যক্রম ছিল খুবই সীমিত এবং বেশিরভাগই বিজ্ঞান জাদুঘরকেন্দ্রিক। অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন তাদের মহাকাশ বিষয়ক পত্রিকা মহাকাশ বার্তা এর নিয়মিত প্রকাশনার মধ্য দিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয়াবলীকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এতসব সত্ত্বেও স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা খুবই সীমিত এবং প্রাথমিক পর্যায়েরই বলা চলে। [মাসুদ হাসান চৌধুরী এবং মোঃ মাহবুব মোর্শেদ]