জিআইএস


জিআইএস (Geographical Information Systems-GIS)  ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা; ভূ-পৃষ্ঠের কোনো স্থান সম্পর্কিত উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য গৃহীত প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানচিত্র এবং উপগ্রহ চিত্রে উপস্থাপিত পারিসরিক তথ্যের বিভিন্ন লেয়ার বা স্তর সহজ উপায়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যায় এবং এদের মধ্যকার পারিসরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা যায়।

GeologicalInformationSystem.jpg

বাংলাদেশে জিআইএস-এর ব্যবহার খুব সাম্প্রতিক হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। যে সকল খাতে স্থানিক সম্পর্কিত উপাত্ত, যেমন- জেলা, থানা, অথবা কোনো একটি ভূখন্ডের সীমানার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য ও বিষয়াদি ব্যবহার করা হয়ে থাকে সে সকল খাতে জিআইএস প্রযুক্তি অত্যন্ত উপযোগী। বিশেষ করে, ভূমি ব্যবহার, আদমশুমারি, নগর পরিকল্পনা, বন, পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস উত্তোলন শিল্প, বিভিন্ন সেবাখাত, পরিবহণ ব্যবস্থাসহ আরও অনেক ক্ষেত্রে জিআইএস প্রযুক্তি আজকাল ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হচ্ছে।

আধুনিক কালের পার্সোনাল কম্পিউটার বা পিসি থেকে শুরু করে সুপার কম্পিউটার পর্যন্ত সকল প্রকার কম্পিউটারে জিআইএস সচল হয় এবং বর্তমানে একাধিক সফটওয়্যারে জিআইএস সহজলভ্য হয়েছে। তবে জিআইএস স্থাপনার জন্য বেশকিছু উপকরণ প্রয়োজন, যেমন: কম্পিউটার, ডিজিটাইজার, জিপিএস (Global Positioning System), প্লটার, নেটওয়ার্ক, সিডি-রম ড্রাইভ, প্রিন্টার এবং জিআইএস ভিত্তিক সফটওয়্যার যেটি এ সকল উপকরণকে সংযোগ সাধনের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে প্রোগ্রামটিকে কার্যক্ষম করে।

আধুনিক জিআইএস প্রযুক্তির উন্নয়নে কানাডার ভূমিকা অগ্রগণ্য। কানাডার কৃষি পুনর্বাসন ও উন্নয়ন এজেন্সি (Agriculture Rehabilitation and Development Agency) ১৯৬৩ সালে কানাডা জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (সিজিআইএস) প্রযুক্তির প্রচলন করে। সিজিআইএস ছিল প্রথম কার্যকরী ভূমি সম্পদ প্রযুক্তি বিষয়ক জিআইএস। কানাডার পরিসংখ্যান বিভাগ ১৯৬৫ সালের দিকে ভৌগোলিক উপাত্ত অনুসন্ধান ব্যবস্থা নামে অন্য আরেকটি সিস্টেম চালু করে। জিআইএস প্রযুক্তির উন্নয়নে এটি ছিল কানাডার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তবে ১৯৭০-এর শেষভাগ পর্যন্ত জিআইএস তেমন কোনো ব্যাপকতা লাভ করে নি, কারণ এ সময়ের পূর্ব পর্যন্ত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অগ্রগতি লাভ করায় এবং উচ্চমূল্যের দরুন কম্পিউটার ব্যাপকভাবে সহজলভ্য হতে পারে নি। ১৯৮০ সালের দিকে জিআইএস প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত গন্ডি থেকে ব্যবসাক্ষেত্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি বহুমুখী কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

১৯৯১ সালে ইসপান (Irrigation Support Project for Asia and the Near East) ফ্লাড অ্যাকশন প্লান-১৯ (ফ্যাপ-১৯) প্রকল্পে  সর্বপ্রথম বাংলাদেশে জিআইএস ব্যবহার করে। ইসপান পরবর্তীতে ইজিআইএস (Environmental and GIS Support Projects for Water Sector Planning) নামে পুনর্গঠিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৫০টিরও অধিক প্রতিষ্ঠানে জিআইএস স্থাপনা রয়েছে। শুরুর দিকে অধিকাংশ জিআইএস স্থাপনা ছিল অনুদান সহায়তা হিসেবে লাভ করা এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও সামান্য সংখ্যক স্থানীয় জনশক্তি দ্বারা পরিচালিত। বর্তমানে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের অর্থায়নে জিআইএস ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং স্থানীয় জনশক্তি দ্বারা এ সকল ল্যাব পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে ব্যবহূত জিআইএস সফটওয়্যারসমূহ  বাংলাদেশে জিআইএস ব্যবহারকারীদের কাছে আর্ক-ইনফো (ArcInfo) এবং আর্ক-ভিউ জিআইএস (ArcView GIS) সফটওয়্যার দুটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। দক্ষ জিআইএস ব্যবহারকারীরা আর্কভিউ এক্সটেনশন টুল নিয়ে কাজ করে থাকেন, বিশেষ করে, ভৌগোলিক উপাত্তের জিআইএস-ভিত্তিক মডেলিং যেমন: পারিসরিক বিশ্লেষণ, ত্রিমাত্রিক বিশ্লেষণ (3D Analysis), নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ, ইমেজ বিশ্লেষণে এবং ইন্টারনেট ম্যাপ সার্ভার ইত্যাদি আর্কভিউ এক্সটেনশন টুল ব্যবহার করে থাকেন। জিআইএস এর অন্যান্য ব্যবহারযোগ্য সফটওয়্যারগুলি হচ্ছে: ইরদাস (ERDAS), ইরদাস ইমাজিন (ERDAS IMAGINE), ইদ্রিসি (IDRISI), টসকা (Tosca), ই.আর ম্যাপার (ER Mapper), স্পানস (SPANS), ম্যাপ-ইনফো (MapInfo), ম্যাপ-বেসিক (MapBasic), ইম্যাজিন (Imagine), আর্থ-ভিউ (Earth View), সার্ফার (Surfer), ল্যান্টাস্টিক নেটওয়ার্ক (Lantastic Network), অটোক্যাড (AutoCAD), আর্ক-এফ.এম (ArcFM), আর্ক-ম্যাপ (ArcMap), ম্যাপ-অবজেক্টস (Map Objects), আর্ক-অবজেক্টস (Arc Objects) এবং আর্ক-জিআইএস (ArcGIS)। উল্লিখিত সবগুলি জিআইএস সফটওয়্যার ডস (DOS), উইন্ডোজ (Windows) এবং ইউনিক্স (Unix) ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেমে সচল হয়।

বাংলাদেশে জিআইএস-এর প্রয়োগ  হার্ডওয়্যার স্থাপনে উচ্চ ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞের অভাবে বাংলাদেশে জিআইএস-এর প্রয়োগ বর্তমানে সীমিত। তবে এ সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশে জিআইএস-এর প্রয়োগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রণয়ন, উন্নয়ন ও তত্ত্বাবধানে জিআইএস আজকাল অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ছে। নিম্নে জিআইএস ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকান্ডের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো:

কৃষি মন্ত্রণালয় পরিচালিত কয়েকটি প্রকল্পে প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে জিআইএস ব্যবহার করা হয়। এ সকল প্রকল্পের মধ্যে জাতীয় ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্প (National Minor Irrigation Development Project) অন্যতম। দেশে জিআইএস ব্যবহারকারী অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) কৃষি মন্ত্রণালয়েরই আওতাভুক্ত। ইউএনডিপি (UNDP) ও ফাও (FAO)-এর কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ১৯৯৬ সাল থেকে Utilisation of Agro-ecological Zones Database and Installation of GIS for Agricultural Development শীর্ষক একটি প্রকল্প পরিচালনা করছে। কৃষি সংক্রান্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও গবেষণার প্রয়োজনে একটি জাতীয় কৃষিভূমি তথ্যব্যবস্থা ডাটাবেস তৈরির উদ্দেশ্যে পরিচালিত এ প্রকল্পটি জিআইএস প্রোগ্রামের ভিত্তিতে সম্পন্ন হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জিআইএস এবং দূর অনুধাবন প্রযুক্তির সাহায্যে স্বয়ংক্রিয় কার্টোগ্রাফি সেকশন গড়ে তুলেছে। বিবিএস জিআইএস-এর সাহায্যে তাদের বিভিন্ন ধরনের সংগৃহীত উপাত্ত বর্ণনা ও মানচিত্র সহযোগে উপস্থাপন করছে। এ প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনা, উন্নয়ন, আদমশুমারি ভিত্তিক জনসংখ্যা উপাত্ত জিআইএস ফরমেটে উপস্থাপনসহ বড় স্কেলের মৌজা মানচিত্র প্রণয়ন, বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের রিপোর্ট ও মানচিত্র তৈরি করা ছাড়াও গ্রাহকদের আরও অনেক প্রকার সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ (বিসিএএস) নামক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ১৯৯৩ সালে তাদের জিআইএস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। বিভিন্ন প্রকল্পে জিআইএস-এর প্রয়োগসহ বিসিএএস বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরে জিআইএস প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা পালন করছে। নিজস্ব জিআইএস সুবিধা ব্যবহার করে বিসিএএস সফলভাবে বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসকল প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সৌরশক্তি পাইলট সমীক্ষা প্রকল্প, ঢাকা শহরের স্বাস্থ্য সুবিধা, এবং বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন: দেশওয়ারি সমীক্ষা।

বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর ১৯৯৫ সালে জিআইএস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। এ সুবিধা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ব ব্যাঙ্কের আর্থিক সহায়তায় বনজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। বনায়ন পরিকল্পনাসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ড বন অধিদপ্তর জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাফ্যলের সঙ্গে সম্পন্ন করছে। ইতোমধ্যে এ দপ্তর জিআইএস ভিত্তিক বনায়ন মানচিত্র প্রণয়ন করেছে।

১৯৯১ সালে আরম্ভ হওয়া ফ্যাপ-১৯ এর আওতায় পরিচালিত পরিবেশগত ও জিআইএস প্রকল্পসমূহকে পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে একটি একক প্রকল্প ইজিআইএস (Environmental and GIS Support Projects for Water Sector Planning-EGIS) হিসেবে সমন্বয় সাধন করা হয়। নেদারল্যান্ড সরকারের আর্থিক সহায়তায় এবং বাংলাদেশ সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ইজিআইএস প্রকল্প ২০০২ সালে স্বায়ত্তশাসিত ইনস্টিটিউট ‘সিইজিআইএস’ (Center for Environmental and Geographic Information Services-CEGIS) প্রতিষ্ঠা করে। একটি ট্রাস্টি বোর্ডের ব্যবস্থাপনায় এ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে যার অধিকাংশ সদস্যই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। সিইজিআইএস-এর সেবা সরকারি এবং বেসরকারি খাতের জিআইএস-ভিত্তিক পরামর্শ প্রদান, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কাজে জড়িত সকলের জন্য উন্মুক্ত। সেইসঙ্গে দেশে জিআইএস-এর উন্নয়নে ইজিআইএস উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে। ডিজিটাল ইমেজ প্রক্রিয়াজাতকরন, বিশ্লেষণ, ডিজিটাল পারিসরিক ডাটাবেস তৈরি, মডেল নির্মাণ, বিভিন্ন ধরনের জিপিএস ভিত্তিক জরিপ পরিচালনা ও মেটা-ডাটাবেস তৈরিসহ জিআইএস হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার তৈরিতে ইজিআইএস দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এর পাশাপাশি ইজিআইএস হাই-রেজুলুশন অপটিক্যাল ইমেজ (ইউরোপিয়ান ইআরএস-১, ইআরএস-২; কানাডিয়ান রাডারস্যাট-১ এসএআর ইমেজ) থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সংগৃহীত এসকল উপাত্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট উপযোগী হবে।

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কম্পিউটারভিত্তিক জাতীয় ডাটাবেস তৈরি ও পরিচালনার উদ্দেশ্যে ঊনিশ শতকের শুরুতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) জিআইএস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। এলজিইডি-এর জিআইএস ইউনিট এ পর্যন্ত দেশের সকল উপজেলা ও থানার ভিত্তি মানচিত্র সিরিজ, জেলা মানচিত্র সিরিজ, এবং সড়ক মানচিত্র প্রস্ত্তত করেছে। ১৯৮৯ সালের দেশব্যাপী কভারেজকৃত SPOT বর্ণিল উপগ্রহ চিত্র থেকে প্রস্ত্ততকৃত এসকল মানচিত্র প্রশাসনিক সীমানা, ভৌত অবকাঠামো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতি প্যাটার্ন, কৃষি, ও আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো সম্বলিত একাধিক স্তর নিয়ে রচিত। এ ছাড়াও এলজিইডি স্থানীয় পর্যায়ে নীতি নির্ধারকদের প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জিআইএস ভিত্তিক পরিকল্পনা উপাদান তৈরি করেছে।

রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) ১৯৯৩ সালে জিআইএস স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করে। প্রধানত নগর পরিকল্পনা প্রণয়নে রাজউক জিআইএস সুবিধা প্রয়োগ করে থাকে। বিশেষ করে, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে নগর মানচিত্র প্রণয়ন ও উপাত্ত ব্যবস্থাপনায় রাজউক জিআইএস কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। জিআইএস প্রযুক্তির সাহায্যে পারিসরিক (spatial data) ও আরোপিত উপাত্ত (attribute data) ব্যবহার করে রাজউক প্রস্ত্ততকৃত মানচিত্রের মধ্যে রয়েছে নগরীয় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা মানচিত্র এবং অবকাঠামো মানচিত্র। এ মানচিত্রগুলি কৌশলগত ১:৫০০০০ প্রতিভূ অনুপাত থেকে বিস্তৃত ১:৩৯৬০ প্রতিভূ অনুপাতের হয়ে থাকে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ১৯৯৫ সালে ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (ওডিএ) আর্থিক সহায়তায় ইনস্টিটিউশনাল ডেভেলপমেন্ট কম্পোনেন্টস প্রকল্পের আওতায় জিআইএস-ভিত্তিক জাতীয় পরিবহণ নেটওয়ার্ক মানচিত্র তৈরির কাজ সম্পন্ন করে। ১৯৯৬ সালে এ প্রকল্পের মাধ্যমে সড়ক ও রেলপথের জন্য সফলভাবে একটি সমন্বিত ভৌগোলিক ডাটাবেস তৈরি করতে সক্ষম হয় যা ১৯৯৭ সাল থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহূত হচ্ছে।

মূলত ডিজিটাল ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র তৈরি ও প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (এসওবি) জিআইএস প্রযুক্তি স্থাপন করে। এ লক্ষ্যে এসওবি অন্যান্য জাতীয় প্রতিষ্ঠান যেমন, স্পারসো (SPARRSO), বিবিএস, ডিএলআরএস (ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর) এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন, জাইকা (Japan International Cooperation Agency), ফ্রান্সের আইজিএন, নেদারল্যান্ডের আইটিসি এবং যুক্তরাজ্যের অর্ডন্যান্স সার্ভের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

জিআইএস প্রযুক্তি স্থাপন (১৯৯১ সালে) ও ব্যবহারে অপর অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান স্পারসো। স্পারসো জিআইএস সুবিধা ব্যবহার করে দূর অনুধাবন প্রযুক্তি এবং পরিবেশগত ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতের গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পারিসরিক ও আরোপিত উপাত্ত নিয়ে কাজ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে স্পারসোর সফল কয়েকটি প্রকল্প হচ্ছে: শস্য মূল্যায়ন (Crop Assessment), বনভূমি মানচিত্রায়ন (Forest Cover Mapping), চিংড়ি চাষ সম্ভাবনাপূর্ণ এলাকার মানচিত্রায়ণ (Shrimp Culture Potentiality Mapping), আদমশুমারি মানচিত্র অঙ্কন (Census Mapping), প্রতিবেশগত পরিবর্তন মনিটরিং (Monitoring of Ecological Changes), এবং ভূমি ব্যবহার মানচিত্র (Landuse Mapping)।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) মৃত্তিকা ও ভূমি ব্যবহার সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রকার মানচিত্র তৈরি করা ছাড়াও একটি জাতীয় মৃত্তিকা ডাটাবেস তৈরি এবং থানাভিত্তিক ভূমি ও মৃত্তিকা ব্যবহার নির্দেশিকা প্রণয়ন প্রভৃতি কর্মকান্ড সম্পন্ন করেছে। এসআরডিআই কর্তৃক প্রস্ত্ততকৃত এসকল মানচিত্র ও মনিটরিং ব্যবস্থা সবই জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পন্ন করা হয়েছে।

সার্ফেস ওয়াটার মডেলিং সেন্টার (Surface Water Modelling Centre- SWMC)-এস.ডব্লিউ.এম.সি উপাত্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ, মডেল তৈরি এবং পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপাদান হিসেবে জিআইএস ব্যবহার করে থাকে। জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে এস.ডব্লিউ.এম.সি কর্ণফুলি পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণ নির্ণয় এবং শস্যের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন প্রভৃতি কর্মকান্ড সফলভাবে পরিচালনা করছে। জিআইএস ভিত্তিক সফটওয়্যার উৎপাদনেও এরা সফল হয়েছে। ইন্টারেক্টিভ ইনফরমেশন সিস্টেম (আইআইএস) উৎপাদিত সফটওয়্যারগুলির মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সফটওয়্যার যেখানে একটি ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থার আওতায় প্রস্ত্ততকৃত মানচিত্রে ভূসংস্থানিক তথ্যের সঙ্গে নদীখাত, কাঠামো, রাস্তাঘাট, বাঁধ, বাড়িঘর প্রভৃতি সংক্রান্ত তথ্যও সমন্বিতরূপে যৌক্তিক ডাটাবেস ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে (Rational Database Management System-RDMS) সংরক্ষণ করা হয়েছে।

পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা - ওয়ারপো (Water Resources Planning Organisation - WARPO) জাতীয় পানি নীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি জাতীয় পানি সম্পদ ডাটাবেস প্রস্ত্তত করেছে। বাংলাদেশ সরকার এ পানি নীতি অনুমোদন করেছে। ওয়ারপো তাদের প্রণীত ডাটাবেস নিয়মিত হালনাগাদ করে থাকে। পানি সম্পদ পরিকল্পনাবিদ ও গবেষকদের অত্যন্ত উপযোগী এ জাতীয় পানি সম্পদ উপাত্ত ব্যাংকটি জিআইএস ভিত্তিক গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস এবং এসকিউএল প্রোগ্রামের সাহায্যে ডিজাইন করা হয়েছে।

দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে পাঠ্যক্রমে জিআইএস অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি জিআইএস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ ১৯৯২ সালে জিআইএস ল্যাবরেটরি গড়ে তোলে। এর পরের বছর আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় জিআইএস ল্যাবরেটরি স্থাপন করে। এগুলি হচ্ছে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ পঠন বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগ। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ এবং মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে জিআইএস ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেছে। জিআইএস সুবিধা প্রতিষ্ঠা করেছে এমন আরও কিছু প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিসমূহ হচ্ছে: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডব্লিউডিবি), কেয়ার বাংলাদেশ, সিপ্রোকো কম্পিউটারস লিমিটেড, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, ডেনিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এজেন্সি-ড্যানিডা, ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালটেন্টস-ডিডিসি, পরিবেশ অধিদপ্তর, জিওসার্ভ লিমিটেড (GEOSERV Ltd), জিএসআরসি (Geographical Solutions Research Center -GSRC), আইসিডিডিআর,বি (International Centre for Diarrhoea Disease Research, Bangladesh; ICDDR,B), জাইকা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপিডিয়া প্রকল্প, এনআরপি (Natural Resources Programs -NRP), দ্য ম্যাপ্পা (The Mappa) প্রভৃতি।

বর্তমান গতিধারা  কৃষি বিষয়ক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বিভিন্ন সমস্যা যেমন, মৃত্তিকা উর্বরতার প্রতিবন্ধকতা, ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন, ভূমি ক্ষয় প্রভৃতি সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও মূল্যায়ন এবং টেকসই উপায়ে সম্ভাব্য প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কৃষি প্রতিবেশ আঞ্চলিকীকরণ পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চলের মাধ্যমে ভূপ্রকৃতি, মৃত্তিকা, পানিতাত্ত্বিক এবং কৃষি-জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পারিসরিকভাবে বিক্ষিপ্ত অঞ্চলসমূহকে বিন্যস্ত করা যায়। ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চলসমূহের ডাটাবেস ঢাকায় অবস্থিত বার্কের কম্পিউটার কেন্দ্রে সংরক্ষণ করা হয়। সংরক্ষিত এ ডাটাবেস বর্তমানে দেশের কৃষি গবেষক, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী এবং  ভূমি ও কৃষি সম্পদ ব্যবস্থাপনা তথা কৃষি উন্নয়ন বিষয়ক পরিকল্পনা প্রণয়নকারীরা তাদের নানা প্রয়োজন সরাসরি ব্যবহার করছে। সেইসঙ্গে এ উপাত্তভিত্তি একটি ব্যাপক বহুমাত্রিক জিআইএস ভিত্তিক ভূমি সম্পদ তথ্য ব্যবস্থা-এল.আর.আই.এস (Land Resources Information System-LRIS) গড়ে তোলার ভিত্তি রচনা করেছে। এল.আর.আই.এস-এ ভূমিসম্পদ সম্পর্কিত উপাত্ত ছাড়াও কৃষি উৎপাদনকে প্রভাবিতকারী আর্থসামাজিক ও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক অতিরিক্ত উপাত্তভিত্তি রয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে জিআইএস-ভিত্তিক বন্যা পূর্বাভাস মডেল মাইক-১১ তৈরি করা হয়েছে। মাইক-১১ ও এর জিআইএস ইন্টারফেস বন্যাসংক্রান্ত পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও কার্যক্রম পরিচালনা লেভেলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন পর্যায়ে, মাইক-১১ সিস্টেমটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ও নিষ্কাশন কাঠামো কার্যক্রম বিধিমালা নির্ণয় এবং বন্যা মোকাবেলা প্রস্ত্ততি কার্যক্রম গ্রহণে একটি মূল্যবান সফটওয়্যার হিসেবে বিবেচিত। বাস্তবায়ন পর্যায়ে, বন্যাপ্রবণ এলাকাসমূহে বাঁধ নির্মাণ কর্মসূচি গ্রহণ থেকে শুরু করে দুর্যোগ প্রস্ত্ততিমূলক প্রশিক্ষণ সহায়তায়ও মাইক-১১ প্রোগ্রামটি প্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সম্প্রতি ঢাকা শহরের নিম্নাঞ্চলসমূহের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে কতিপয় প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে এবং নগরীর নিম্নাঞ্চলের জন্য জিআইএস প্রযুক্তিভিত্তিক একটি পাইলট হাইড্রোডিনামিক নিষ্কাশন মডেল তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে, জলাবদ্ধতা নিরসনমূলক বিভিন্ন প্রকল্প মূল্যায়নের লক্ষ্যে ডিজিটাল এলিভিয়েশন মডেল ‘ডিইএম’ (Digital Elevation Model - DEM) এবং সার্ফেস ওয়াটার মডেলিং সেন্টার কর্তৃক তৈরিকৃত ‘মাউস’ মডেল স্থাপন করা হয়েছে।

দেশের আর্সেনিক গবেষকবৃন্দ বিস্তারিত আর্সেনিক দূষণ মানচিত্র প্রণয়ন, মডেল তৈরিকরণ, আর্সেনিক দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ভৌত প্রক্রিয়াসমূহের মডেল প্রণয়ন এবং গাণিতিক মডেল কৌশলের সাহায্যে জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনা কৌশল নির্ণয় প্রভৃতি কাজে জিআইএস প্রযুক্তিটি ব্যবহার করছেন। [মোহাম্মদ আবদুল হাদী]